ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০১ জানুয়ারি ২০২৬ ||  পৌষ ১৮ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

নতুন সাইনবোর্ড-ব্যানারে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক, আমানতকারীরা টাকা তুলছেন

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:১৬, ১ জানুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১৭:১৮, ১ জানুয়ারি ২০২৬
নতুন সাইনবোর্ড-ব্যানারে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক, আমানতকারীরা টাকা তুলছেন

নতুন সাইনবোর্ড-ব্যানারে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। ছবি: রাইজিংবিডি

ইংরেজি বছরের প্রথম দিন থেকে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে গ্রাহকরা টাকা উঠাতে পারছেন। ব্যাংকের শাখাগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম চলছে। বিভিন্ন শাখা থেকে টাকার জন্য রিকুইজিশন প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেই অনুযায়ী অর্থ পেলে শাখাগুলো শুক্রবার থেকে পুরোপুরি গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গাইডলাইন মেনে লেনদেন করতে পারবেন বলেন জানিয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা।

বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল, পল্টন ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাংকের শাখায় খোঁজ নিয়ে এমনটিই জানা গেছে।

আরো পড়ুন:

দেশে কার্যরত সংকটে থাকা এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত করে করা হয়েছে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’।

রাজধানীর কয়েকটি শাখায় গিয়ে দেখা যায়, বেশ কিছু শাখায় আগের নাম পাল্টে নতুন গঠন হওয়া সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নামে সাইনবোর্ড, ব্যানার টানানো হয়েছে। আবার কোনো কোনো শাখায় সাইবোর্ড, ব্যানার টানানোর কাজ চলছে।

ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা জানান, যেসব শাখায় আগে থেকে রিকুইজিশন দেওয়া ছিল সেগুলোতে নতুন বছরের শুরুতে স্বাভাবিক লেনদেন শুরু হয়েছে। সাধারণ গ্রাহকরা টাকা জমা দেওয়ার পাশাপাশি আমানত বিমার আওতায় দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করতে পারছেন। আর যেসব শাখা থেকে আজ রিকুইজিশন পাঠানো হয়েছে সেগুলোতে শুক্রবার থেকে টাকা উত্তোলন করতে পারবেন গ্রাহকরা। তবে সব শাখায় লেনদেন শুরু হয়েছে।

এক্সিম ব্যাংকের দনিয়া শাখার ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে এম বদরুল হক বলেন, “আমরা আজ রিকুইজিশন দিয়েছি। আগামীকাল থেকে আমানতকারী, গ্রাহকরা আমাদের শাখা থেকে টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। একই সঙ্গে আমাদের শাখায় নতুন গঠন করা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সাইনবোর্ড টানানোর কাজ চলছে।”

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে টাকা তুলছেন আমানতকারীরা।


রাজধানীর তোপখানা রোডে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে বৃহস্পতিবার দেখা গেছে, গ্রাহকরা আসছেন। স্বাভাবিক লেনদেন চলছে। ব্যাংক কর্মকর্তারা ব্যস্ত সময় পার করছেন। ব্যাংকটির শাখা ব‌্যবস্থাপক তৌফিক এলাহী বলেন, “আমরা নতুন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যানার টানিয়েছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে লেনদেন করছি। গ্রাহকরা টাকা তুলছেন। আবার অনেকে নতুন আমানত রাখার জন্য আসছেন।”

এদিকে দীর্ঘদিন পরে অর্থ উত্তোলন করতে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করছেন আমানতকারীরা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের রাজধানীর তোপখানা রোড শাখায় টাকা উত্তোলন করতে আসা ফরহাদ মোল্লা বলেন, “আমাদের বিশ্বাস ছিল সরকার যেহেতু ব্যাংকগুলো একত্রে করেছে টাকা উঠাতে পারব। আর সেই বিশ্বাস আজ সত্যি হলো। প্রয়োজনে কিছু টাকা উত্তোলন করেছি। যেহেতু সরকার এই ব্যাংকগুলো একত্রে করেছে তাই সব টাকা উঠাব না। প্রয়োজন হলে আগের মতো টাকা উত্তোলন করব।”

সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, “আমাদের শাখায় নতুন ব্যানার টানানো হয়েছে। আজ সকালে আমরা রিকুইজিশন দিয়েছি। আগামীকাল থেকে গ্রাহকরা তাদের আমানতের টাকা উত্তোলন করতে পারবেন।”

এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় স্কিম চূড়ান্ত করেছে। যেসব সাধারণ গ্রাহকের হিসাবে আমানত দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আছে, তাদের অর্থ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে। ‘আমানত সুরক্ষা আইন’-এর আওতায় এই অর্থ যেকোনো সময় একবারে পুরোটা গ্রাহকরা উত্তোলন করতে পারবেন। যেসব গ্রাহকদের হিসাবে দুই লাখ টাকার বেশি জমা রয়েছে, প্রতি তিন মাস পর সেসব গ্রাহক সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা করে দুই বছর পর্যন্ত তুলতে পারবেন।

তবে ৬০ বছরের বেশি বয়সী গ্রাহক অথবা ক্যানসার ও কিডনি ডায়ালাইসিসের মতো গুরুতর রোগে আক্রান্ত আমানতকারীদের জন্য স্কিমে মানবিক বিবেচনায় বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। তারা তাদের চিকিৎসার প্রয়োজনে নির্ধারিত সময়সীমা বা সীমার বাইরে গিয়েও আমানতের অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন।

এর আগে, একীভূত প্রক্রিয়ার আওতায় পাঁচটি ব্যাংকের সব ধরনের চলতি, সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানতসহ তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ, দায়-দেনা এবং আগের সব চুক্তি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

গত ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ব্যাংকগুলোর গ্রাহকদের টাকা পুরোপুরি নিরাপদ থাকবে। এছাড়া গ্রাহক ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত উত্তোলন করতে পারবেন।যারা এখনই আমানত তুলবেন না, তারা বাজারভিত্তিক মুনাফা পাবেন এবং প্রয়োজনে আমানতের বিপরীতে ঋণ নিতে পারবে।এছাড়া গ্রাহক আমানতের টাকা তুলতে পারবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, পাঁচটি ব্যাংকের সব চলতি, সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানত এখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আওতায় চলে গেছে। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগে স্থায়ী আমানতের টাকা তোলা যাবে না। তবে আমানতকারীরা তাদের বর্তমান জমা করা অর্থের বিপরীতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ বা বিনিয়োগ সুবিধা নিতে পারবেন। আর নতুন করে জমা দেওয়া আমানতের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ বা বিনিয়োগের সুযোগ থাকবে।

 সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের লোগো। 


এছাড়া পাঁচটি ব্যাংকে কর্মরত যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা মামলা নেই, তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে যুক্ত হবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে নতুন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ প্রয়োজনে চাকরির শর্তাবলি নতুন করে নির্ধারণ করতে পারবে। তবে কেউ যদি লিখিতভাবে চাকরি না করার ইচ্ছা জানান, তাহলে তিনি ইস্তফা দেওয়ার সুযোগ পাবেন।

ব্যাংক রেজল্যুশন-২০২৫ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, রেজল্যুশন স্কিম কার্যকর হওয়ার দিন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্তৃপক্ষ নতুন করে ভিন্ন নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হস্তান্তর হওয়া ব্যাংকগুলোর নামে থাকা সব ব্যাংকিং কাগজপত্র বৈধ থাকবে। অর্থাৎ আগের ব্যাংকের নামে ছাপানো বা ব্যবহৃত চেকবই, ডিপোজিট স্লিপ, টাকা উত্তোলনের স্লিপ, ভাউচার, ফরম, রসিদ, আবেদনপত্রসহ সব ধরনের ব্যাংকিং দলিল এখন হস্তান্তরগ্রহীতা ব্যাংকের অনুমোদিত ও বৈধ দলিল হিসেবে গণ্য হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, নতুন ব্যবস্থাপনায় গ্রাহকদের জমা টাকা পুরোপুরি নিরাপদ থাকবে এবং আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে লেনদেন চলবে। এই রেজল্যুশন প্রক্রিয়া ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ।

নতুন ব্যাংকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন জোরদার করা হবে, যাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এসব সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে আমানতকারীদের আস্থা ফিরবে এবং পুরো আর্থিক খাত আরো স্থিতিশীল হবে বলে আশা করছে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা প্রদান করেছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানির স্থায়ী আমানত এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকে শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধনে রূপান্তর করা হবে। তবে, শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, প্রভিডেন্ট ফান্ড, জয়েন্ট ভেঞ্চার, বহুজাতিক কোম্পানি ও বিদেশি দূতাবাস এ বিধানের আওতায় পড়বে না।

একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের লোগো।


গত সরকারের সময়ে কয়েকটি প্রভাবশালী গ্রুপ জালিয়াতির মাধ্যমে ডজনখানেক ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ তুলে নেয়। এসব অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারির চাপেই ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে গভীর সংকটে পড়ে। এর মধ্যে গভীর সংকটে পড়ে শরিয়াহ ভিত্তিক এই ইসলামী ব্যাংকগুলো। এসব ব্যাংকে সুশাসনের ঘাটতি, অনিয়ম ও জালিয়াতির কারণে আর্থিক ক্ষতি দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এক বছরের বেশি সময় ধরে এসব ব্যাংকে তারল্য সহায়তা দিলেও কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি।

ফলে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী গত ৫ নভেম্বর এসব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। পরে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। 

ঢাকা/নাজমুল/সাইফ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়