রাজনৈতিক সরকারের হাত ধরেই পুঁজিবাজারে গতি ফিরবে, প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের
ফাইল ফটো
দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতা বিরাজ করছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে পুঁজিবাজারে। এ অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকট তৈরি করেছে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা ছিল পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন মেলেনি।
ফলে চলতি বছরে পুঁজিবাজারে ধারাবাহিকভাবে সূচক, লেনদেন, মূলধন কমেছে। পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন বহু সাধারণ বিনিয়োগকারী। সার্বিকভাবে চরম অস্থিরতার মধ্যে পুঁজিবাজার আরো একটি বছর পার করলো।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে আশা-নিরাশার দোলাচলে শুরু হচ্ছে নতুন বছর ২০২৬। এ বছর স্টেকহোল্ডারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে পুঁজিবাজারে গতিশীল করাই বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক সরকারের হাত ধরে দেশের অর্থনীতিতে গতি আসবে। সেই সঙ্গে পুঁজিবাজারেও গতি ফিরে পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন বছরে গতিশীল পুঁজিবাজার চান বিনিয়োগকারীসহ সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রত্যাশা, পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় নতুন বছরে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে, হারানো পুঁজি ফিরে পাবেন।
গত বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুঁজিবাজারের উন্নয়নে নানা সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সংস্কার যথাযথভাবে সম্পন্ন করা গেলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে, পুঁজিবাজারকে গতিশীল করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ফিরতে হবে। তারা বিনিয়োগে ফিরলেই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো সম্ভব হবে। এতেই পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে।
গত বছরের ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি ডিএসইর প্রধান ডিএসইএক্স সূচক ছিল ৫ হাজার ২১৬.৪৪ পয়েন্টে। আর ৩০ ডিসেম্বর তা অবস্থান করে ৪ হাজার ৮৬৫.৩৪ পয়েন্টে। ফলে প্রায় এক বছরের ব্যবধানে ডিএসইএক্স সূচক কমেছে ৩৫১.১০ পয়েন্ট বা ৬.৭৩ শতাংশ।
এদিকে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পুনর্গঠিত বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ দায়িত্ব নেওয়ার দিন অর্থাৎ ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স সূচক ছিল ৫ হাজার ৭৭৫.৪৯ পয়েন্টে। তার কাজে যোগদানের পর থেকে ডিএসইএক্স সূচক কমেছে ৯১০.১৫ পয়েন্ট বা ১৫.৭৫ শতাংশ।
তবে চলতি বছরের ২৮ মে ডিএসইএক্স সূচক সর্বনিম্ন কমে দাঁড়িয়েছিল ৪ হাজার ৬১৫.৪০ পয়েন্টে; যা গত ৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। অবশ্য চলতি বছরের ৭ সেপ্টেম্বর ডিএসইএক্স সূচক সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৬৩৬.১৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছিল।
এদিকে গত বছরের চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি সিএসইর সিএসইএক্স সূচক ছিল ৮ হাজার ৮৩৮.৬৩ পয়েন্টে। আর ৩০ ডিসেম্বর তা অবস্থান করছে ৮ হাজার ৩৯৩.৫৩ পয়েন্টে। ফলে প্রায় এক বছরের ব্যবধানে সিএসইএক্স সূচক কমেছে ৪৪৫.১০ পয়েন্ট বা ৫.০৩ শতাংশ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, “২০২৫ অনেক প্রত্যাশা থাকলেও হতাশা দিয়ে শেষ হয়েছে। তবে ২০২৬ নতুন বছরে নতুন কিছু প্রত্যাশা রয়েছে। পুঁজিবাজারে যেসব সংস্কার এত দিন করা হয়েছে সেগুলোর সুফল এ বছর থেকে পাওয়া যাবে বলে আশা করছি। বাজারে এই সংস্কারগুলো দরকার ছিল। বাজার এখন তার নিজের গতিতে চলছে। এখানে বিগত সময়ের মতো কৃত্রিমভাবে বাজার বাড়ানো বা কমানো হচ্ছে না।”
তিনি আরো বলেন, “বাজারে একেবারে কারসাজি বন্ধ করা যাবে না। কিন্তু গত ১৫ বছরের মতো বাজারে অনেক বেশি কারসাজি হচ্ছে না। এখন যেসব সংস্কার করা হয়েছে সেগুলোর সুফল পাওয়া শুরু হলে বাজার প্রাকৃতিকভাবে উঠানামা করবে। এতে সকলের আস্থা ফিরে আসবে। যারা চলে গিয়েছে তারা এবং যারা এখন বিনিয়োগ করছে না তারাও ফিরে আসবে। তাই নতুন বছর ভালো কিছু হবে বলে প্রত্যাশা রয়েছে।”
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, “আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক সরকারের হাত ধরে দেশের অর্থনীতিতে গতি আসবে। সেই সঙ্গে পুঁজিবাজারেও গতি ফিরবে- এমন প্রত্যাশাই করছি। বর্তমানে নির্বাচিত সরকার না থাকায় দেশের অর্থনীতি ও পুঁজিবাজার স্থবির হয়ে আছে। বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাচ্ছে না। তাই বিনিয়োগ কম হচ্ছে। কিন্তু নতুন বছরের শুরুতে নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার আসবে এতে আস্থা ফিরতে শুরু করবে। এতে অর্থনীতিতে যেমন গতি ফিরবে, তেমনি পুঁজিবাজারেও গতি আসবে। আর বাজারে যে বিনিয়োগ করবে এজন্য ভালো কোম্পানির শেয়ার হাতেগোনা কয়েকটি। তাই নতুন বছরে আইপিও আইন বাস্তবায়ন হলে ভালো কিছু কোম্পানি তালিকাভুক্ত হবে বলে আশা করছি। এতে আস্থা যেমন বাড়বে তেমনি বিনিয়োগকারী আসতে শুরু করবে। তাই নতুন বছরে প্রত্যাশা অনেক। যা নির্বাচনের মাধ্যমে পূরণ হবে বলে আশা রয়েছে।”
ঢাকা/এনটি/এস