RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     সোমবার   ২৬ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ১১ ১৪২৭ ||  ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

নাটকের সাহিত্য মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে : মাসুম রেজা

আমিনুল ইসলাম শান্ত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০২:১২, ১৯ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
নাটকের সাহিত্য মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে : মাসুম রেজা

নাট্যকার মাসুম রেজা। বছরের শুরুতে মঞ্চে নিয়ে আসছেন ‘জলবাসর’। নাট্যদল দেশ নাটকের প্রতীক্ষিত এ প্রযোজনার রিহার্সেল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে চলছে। বন্যা মির্জা, নাজনীন চুমকিসহ অনেকেই নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করবেন। আগামী ২৪ জানুয়ারি শিল্পকলা একাডেমির মূল হলে নাটকটির উদ্বোধনী মঞ্চায়ন অনুষ্ঠিত হবে।  ‘জলবাসর’-এর বিভিন্ন দিক রাইজিংবিডির সহ-সম্পাদক আমিনুল ইসলাম শান্ত’র সঙ্গে কথোপকথনে বলেছেন তিনি।  

রাইজিংবিডি: শুরুতেই ‘জলবাসর’ নাটকের বিষয়ে সম্পর্কে জানতে চাই।

মাসুম রেজা: এ নাটকে আমি একটি ধারা তৈরির চেষ্টা করেছি। সাধারণত মঞ্চনাটকগুলো যেমন হয়। নাটকগুলোতে খানিকটা ইউরোপিয়ান ধাঁচ লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু নাটক হলো সাহিত্য। এটি সাহিত্য আকারেও পাঠ করা যায়। নাটক সাহিত্য না হলে এই বিভাগে নোবেল কিংবা বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেয়া হতো না। নাটকের সাহিত্য মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে— এটা আমরা রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছি। আমার গুরু সেলিম আল দীনও এই ভাবনার মানুষ ছিলেন। তাঁরও ভাবনা ছিল— নাটক সাহিত্য। নাটক পাঠ করতে হবে। স্যারের নাটক পড়লে সাহিত্যের যে রস সেটা পাওয়া যায়। আমিও এই কাজটি করার চেষ্টা করছি। তারই ফল ‘জলবাসর’। নাটকটি এপিক ঘরানার। 

রাইজিংবিডি: তবে কি গল্পের ধাঁচেও আমরা পরিবর্তন দেখতে পাব?

মাসুম রেজা: নাটকের গল্প তিন বোনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেছে। দর্শী, দোপাটি, দাওয়া নামে এই তিন বোন রূপার গহনা তৈরি করে। যে উঠোনে বসে তারা গহনা তৈরি করে সেখানে একটি গাছ আছে। এই গাছ অনেক আগে তাদের পূর্বপুরুষ রোপণ করেছিলেন। গাছটি একদল মানুষ চুরি করে কেটে নিয়ে যেতে আসে। এসময় গাছের উপর বজ্রপাত হয়। গাছটি মারা যায় কিন্তু কোনো ছায়া থাকে না। গাছটিতে বেশ কিছু আখ্যান লেখা থাকে, যা কেউ পড়তে পারে না। অন্যদিকে আরেক ব্যক্তির উপর বজ্রপাত হয়। সেও ছায়াহীন হয়ে যায়। তারও শরীরের কোনো ছায়া থাকে না। কিন্তু তার ছায়া ঘুরতে ঘুরতে এই বাড়িতে আসে। লোকটিও নিজের ছায়া খুঁজতে এসে বৃক্ষটিতে লেখা আখ্যান পাঠ করে। এই আখ্যানে তিন বোনের গল্প লেখা থাকে। লোকটি আখ্যানে যা পাঠ করে তাই সমগ্র নাটকে ঘটতে থাকে। মহাভারতে ব্যাসদেব যা লিখেছেন তা ঘটতে থাকে। যা ঘটে তা দেখে তিনি লিখেছেন বিষয়টি কিন্তু তা নয়। এটা এক ধরনের লেখার কৌশল। এই নাটকে এরকম একটি লেখার কৌশলে রয়েছে। তবে আমার নাটকের গল্প পুরোপুরি মৌলিক।

রাইজিংবিডি: নাটকের গল্পে কোন সময় তুলে ধরেছেন?

মাসুম রেজা: আমার লেখা ‘সুরগাঁও’, ‘নিত্যপুরাণ’ নাটকের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখতে পাবেন এগুলো সময় নিরপেক্ষ। ‘জলবাসর’ নাটকও তাই। বর্তমানে বিশ্ব চরাচরের পরিবেশ ও প্রকৃতি এই নাটকের বিষয়বস্তু। প্রকৃতিকে আমরা ধ্বংস করে দিচ্ছি। কিন্তু প্রকৃতি হচ্ছে মানুষের প্রকৃত ছায়া। প্রকৃতি আমার আপনার পাশে ছায়ার মতো থাকে। এখন প্রকৃতি যদি ধ্বংস করি, তবে ছায়াকেই ধ্বংস করা হবে। এজন্য এই নাটকের গল্পে আমি একটি মানুষ তৈরি করেছি যার কোনো ছায়া নাই। সেই মানুষটিই প্রকৃতির গল্প বলবে। প্রকৃতি ধ্বংসের গল্পই ‘জলবাসর’ নাটকের গল্প।

রাইজিংবিডি: গল্পটি দর্শকের কাছে দুর্বোদ্ধ মনে হতে পারে...

মাসুম রেজা: গল্পটি খুবই বিস্তৃত, প্রশস্ত এবং দুর্বোদ্ধ। কিন্তু গল্পটি কেউ যদি বুঝার চেষ্টা করেন তবে এটি খুবই সরল গল্প। নতুন একটি ধারা তৈরির কথা আগেই বলেছি। সেই ধারা এই নাটকে তৈরির চেষ্টা করেছি। এই রীতিকে আমি বলছি- সম্মুখ বাস্তবতা। মানে সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে সেটা। এই রীতিটা মূলত করে গেছেন আমার গুরু সেলিম আল দীন। তার ‘নিমজ্জন’ নাটকে এটা আছে। ম্যাজিক রিয়েলিজম নিয়ে মার্কেজ, জার্মান লেখকরা সাহিত্য রচনা করেছেন। আমরা বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে যে বাস্তবতার মধ্যে আছি, এটা আসলে আমাদের বাস্তবতা নয়। আমাদের বাস্তবতা সেটা যা সম্মুখে আসছে বা কল্পনা কিংবা আকাঙ্ক্ষা করি।  

রাইজিংবিডি: অভিনয়শিল্পীদের বিষয়ে জানতে চাই।

মাসুম রেজা: আমাদের দলে আগে যারা কাজ করতেন, তাদের অনেকে টেলিভিশন নাটক বা অন্য ব্যস্ততার কারণে মঞ্চনাটক থেকে দূরে ছিলেন। তাদের অনেকে এ নাটকে অভিনয় করবেন। যেমন নাজনীন চুমকি, বন্যা মির্জা, সুষমা সরকার, ফিরোজ আলম, কামাল আহমেদ, তিথিসহ অনেকে। এতে সতেরোটি চরিত্র রয়েছে। বিশাল কাস্টের একটি নাটক। 

রাইজিংবিডি: নাটকের কারিগরি দিক ...

মাসুম রেজা: এ নাটকের কারিগরি দিকটাও অনেক বড়। মঞ্চ পরিকল্পনা, আলোক পরিকল্পনা, কস্টিউম ডিজাইন সব দলের ছেলেমেয়েরা করেছে।  কস্টিউম ডিজাইন করছে বন্যা মির্জা, আলোক পরিকল্পনা করছে টিটু, সেট ডিজাইন করছে মুকুল। এই নাটকের সেট অনেক বড় হবে। আনন্দের ব্যাপার হলো— পোস্টার ডিজাইন করছেন আফজাল হোসেন।

রাইজিংবিডি: উপস্থাপনার ক্ষেত্রে বিশেষ কী রয়েছে?

মাসুম রেজা: এ নাটকের অভিনয়ের প্যাটার্ন আলাদা। সংলাপ জোরে উচ্চারণের বিষয়টি মাথায় রেখে কাজ করছি। মানে সংলাপ প্রক্ষেপণ একটু জোর দিয়ে করা। শিল্পীদের চরিত্র বুঝিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বলিনি, তুমি এই চরিত্রটি নিজের ভেতর ধারণ করো। বরং চরিত্রটি কীভাবে হেসেছে, কীভাবে কেঁদেছে, কীভাবে কথা বলেছে তা দেখিয়েছি। শিল্পীদের বলেছি, দর্শককে দেখাও তুমি তুমিই। এই দুই পদ্ধতির মাঝে অনেক পার্থক্য আছে। একটা হচ্ছে— একটি চরিত্র বুঝে নিয়ে কপি করে দর্শককে দেখানো। অন্যটি হচ্ছে— ওই চরিত্রটি হয়ে ওটাই দর্শককে দেখানো। আমরা ওই চরিত্র হয়ে দর্শককে দেখাতে চাচ্ছি না। কারণ যা ঘটেনি তাই আমরা গল্পে বলার চেষ্টা করছি। অর্থাৎ বলছি- এটা ঘটবে। নাটকটি জাদুবাস্তব কিন্তু আমি এর নামকরণ করেছি- সম্মুখ বাস্তব।

রাইজিংবিডি: বর্তমান সময়ের মঞ্চনাটক নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

মাসুম রেজা: মঞ্চনাটকের মূল্যায়নের সময় এখনো আসেনি। মঞ্চনাটক যখন প্রতিষ্ঠিত হবে তখন এই মূল্যায়ন করা যাবে। যে পরিস্থিতিতে মঞ্চনাটক আছে, সেখান থেকে সবাই মিলে প্রচেষ্টা চালাচ্ছি যাতে মঞ্চনাটকে আবার জোয়ার আসে। মঞ্চনাটক যাতে স্বমহীমায় ফিরে আসে। এজন্য মঞ্চনাটকের মূল্যায়নের চাইতে যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছি সেটার মূল্যায়ন এখন জরুরি বলে মনে করি। সেক্ষেত্রে যদি দেখি, গত বছর প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি নতুন নাটক মঞ্চে এসেছে। এসব নাটকের মধ্যে বেশ কিছু মানসম্পন্ন নাটক রয়েছে। দর্শক বেড়েছে। হয়তো সব নাটকের শো হাউস ফুল হয় না, কিন্তু কোনো কোনো নাটকে সেটা হয়। আবার কোনো কোনো নাটকে একদমই কোনো দর্শক হয় না। একটি বিষয় পরিষ্কার- দর্শক ভালো নাটকটি দেখতে আসেন। এই ভালো নাটকের সংখ্যা বাড়তে থাকলে দর্শক আরো বাড়বে। কিছুদিন আগে জামিল আহমেদ ভাই বলেছিলেন, ‘সব মিলিয়ে আমাদের পাঁচ হাজার দর্শক আছে। পাঁচ হাজারের ভেতরে তিন হাজারই আমাদের নাট্যকর্মী।’ আমি মনে করি, এই জায়গা থেকে এখন উতরে গিয়েছি। এখন পঞ্চাশ হাজার দর্শক তো আছেই। যারা নিয়মিত নাটক দেখেন। আর এই সংখ্যা অচিরেই কয়েক গুণ বেড়ে যাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

রাইজিংবিডি: মঞ্চনাটকে পেশাদারিত্ব নিয়ে মঞ্চকর্মীদের মধ্যে এক প্রকার হতাশা লক্ষ্য করা যায়।

মাসুম রেজা: আমি যখন মঞ্চনাটকে কাজ করি তখন অন্য একটি চাকরি করতাম। মঞ্চনাটক করতে করতে অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হলো, জানা-শোনা হলো। তখন আমাকে বলা হলো, তুমি মঞ্চে লিখছ, তাহলে টেলিভিশন নাটকও লেখ। আমি টেলিভিশনে লিখলাম। এটা আমার প্রাপ্য। মঞ্চনাটক না লিখে, যদি টেলিভিশন নাটক লিখব সেটা টার্গেট করে লেখা শুরু করতাম তবে মনে হয় না বেশিদিন কন্টিনিউ করতে পারতাম। জীবনের শুরু থেকেই আমি মঞ্চনাটক ভালোবেসেছি। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার জীবন সবসময় আমি নাটকের সঙ্গেই জড়িত ছিলাম। নাটকের চর্চাটা এমন পর্যায়ে গেল যে, টেলিভিশন-চলচ্চিত্রের মানুষও আমাকে লিখতে বলল। তারপর এ মাধ্যমেও লেখা শুরু করলাম। এরপর এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো কাকে নাটক দেব, কাকে দেব না- এ নিয়ে সংকটে পড়ে যেতাম। এটা হয়েছে মঞ্চনাটক চর্চা করেছি বলে। এখন আমি যদি কিছু পাওয়ার আশায় মঞ্চনাটকে আসি তাহলে হবে না। মঞ্চনাটক কারো জীবিকা দিতে পারে না। এটা আমাদের দেশের ক্ষেত্রে বলছি। অন্যান্য দেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। যেমন: ভারতে মঞ্চকর্মীরা পারিশ্রামিক পায়। এটা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া বাস্তবায়ন সম্ভব না। আমাদের ক্রিকেট ও ফুটবল বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে, এজন্য সরকার তাদের এতটা পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে। আমরাও চাচ্ছি— নাটক করছি, ভাতা দেন, পৃষ্ঠপোষকতা দেন। কিন্তু সরকার কেন দেবে? আমাদের নাটক যতদিন না আন্তর্জাতিকভাবে দেশের পতাকা বহন করছে ততদিন মনে হয় না এ বিষয়ে কার্যকরী কিছু হবে।

 

ঢাকা/শান্ত/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়