কলেজ ড্রপআউট বিজয়ের জীবনের পৃষ্ঠা উল্টে দেখুন
বক্তব্য রাখছেন বিজয়
ভারতের দক্ষিণী সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেতা বিজয় জোসেফ চন্দ্রশেখর। ভক্তদের কাছে ‘থালাপাতি বিজয়’ নামে অধিক পরিচিত। এতদিন রুপালি পর্দায় বীরোচিত ভূমিকায় ক্ষমতাবানদের দম্ভ চূর্ণ করেছেন। তবে বিজয় আর ঝাঁ চকচকে রুপালি পর্দায় আটকে নেই; বরং রাজনীতির ময়দানে নেমে রীতিমতো ঝাঁকুনি দিয়েছেন।
ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে ২৩৪ আসনের মধ্যে বিজয়ের দল তামিলাগা ভেত্রি কোঝাগম (টিভিকে) ১০৮টি আসন পেয়েছে। ফলে তামিলনাড়ুর রাজনীতির সমীকরণ পুরোপুরি বদলে গেছে। রুপালি পর্দার মতো রাজনীতির মাঠে চমকপ্রদ ফল বিজয়কে সাফল্যের চূড়ায় নিয়ে গেছে। কলেজ ড্রপআউট ছেলেটি এখন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীর মসনদে বসতে যাচ্ছেন। ফলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এই তারকা; তৈরি হয়েছে তার জীবন নিয়ে কৌতূহল, বিশেষ করে তার শিক্ষাজীবন ও ক্যারিয়ার আলোচনার তুঙ্গে। চলুন, বিজয়ের জীবনের পৃষ্ঠা উল্টে দেখি—
চেন্নাইয়ে বিজয়ের শিক্ষাজীবন শুরু
ভারতের চেন্নাইয়ে বিজয়ের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। এ শহরের কোদামবাক্কামের ফাতিমা স্কুলে পড়াশোনা করেন তিনি। পরবর্তীতে বিরুগামবাক্কামের বালালোক স্কুলে ভর্তি হন। অন্য শিক্ষার্থীদের মতোই, তার স্কুলজীবনও বেশ সাধারণ ছিল। এমন কোনো বড় খবর বা একাডেমিক সাফল্য তার ছিল না, যা ভবিষ্যতে তারকাখ্যাতির ইঙ্গিত দেয়।
কলেজ ড্রপআউট
স্কুলজীবন শেষ করার পর, লয়োলা কলেজে ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন বিজয়। এখানেই তার শিক্ষাজীবনে বড় একটি মোড় আসে। কারণ বিজয় স্নাতক ডিগ্রি সম্পূর্ণ করেননি। বরং অভিনয়ের জন্য মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেন। অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে যখন একাডেমিক ডিগ্রিকে প্রাধান্য দিতে বলা হয়, তখন বিজয় বেছে নেন ভিন্ন একটি পথ; যা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চিত।
নম্বর নয়, আবেগ বেছে নেন বিজয়
পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে অভিনয়ে মন দেওয়ার সিদ্ধান্তই বিজয়ের জীবন বদলে দেয়। বিজয় পুরোপুরি চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন। যদিও শিশুশিল্পী হিসেবে আগে থেকেই তার পরিচিতি ছিল। বছরের পর বছর ধরে বিজয় গড়ে তোলেন তার বিশাল ভক্ত-অনুসারী গোষ্ঠী; হয়ে ওঠেন দক্ষিণী সিনেমার অন্যতম বড় নাম। “একাডেমিক সাফল্যই একজন মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে”—প্রচলিত এই ধারণাকে ভেঙে দেন বিজয়। যদিও তার গল্পটা আলাদা। কারণ ধারাবাহিকতা, শৃঙ্খলা এবং নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা, বিজয়ের জীবনের সাফল্যে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
চলচ্চিত্র থেকে রাজনীতি
শিশুশিল্পী হিসেবে রুপালি জগতে পা রেখে তামিল সিনেমার শীর্ষ নায়কদের একজনে পরিণত হন থালাপাতি বিজয়। সর্বশেষ ‘থালাপাতি ৬৯’ সিনেমার জন্য ২৭৫ কোটি রুপি পারিশ্রমিক নিয়েছেন তিনি। ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থাকা অবস্থায় ‘তামিলাগা ভেটরি কাজাগম’ নামে রাজনৈতিক দল গঠন করেন এই নায়ক। বিজয় এখন শুধু একজন চলচ্চিত্র তারকা নন, বরং একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও নজরকাড়া; রীতিমতো উদাহরণ তিনি।
ছাব্বিশের তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে তার দলের পারফরম্যান্স তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বিজয়ের গল্পকে অনেক তরুণ-তরুণী নিজের জীবনের গল্প মনে করেন। সবাই একাডেমিক পথে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যান না, আর সব সফলতার গল্পই ভালো নম্বর বা ডিগ্রি দিয়েও শুরু হয় না। শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, আপনি কী করতে চান তা খুঁজে বের করা জরুরি—বিজয়ের জীবন এসব কথা মনে করিয়ে দেয়। কারণ লক্ষ্যে অটল থাকলে, অপ্রত্যাশিতভাবেও জীবনে সাফল্য ধরা দেয়।
কলেজ ড্রপআউট হলেও শিক্ষা নিয়ে বিজয়ের প্রতিশ্রুতি
ব্যক্তিগত জীবনে বিজয় তার কলেজের ডিগ্রি সম্পূর্ণ করতে না পারলেও শিক্ষা তার রাজনৈতিক বার্তার অন্যতম প্রধান অংশ হয়ে উঠেছে। নির্বাচনি প্রচারের সময় তামিলাগা ভেত্রি কোঝাগম (টিভিকে) দলের প্রধান বিজয় গ্রামীণ পরিবারের জন্য শক্তিশালী একটি প্রতিশ্রুতি দেন। বিজয় বলেন, “যদি আমার দল ক্ষমতায় আসে, তবে যে কৃষকের দুই একরের কম জমি রয়েছে, তার সন্তানদের উচ্চশিক্ষার সমস্ত খরচ সরকার বহন করবে।” এই প্রতিশ্রুতি ব্যাখ্যা করে বিজয় জানান, সুবিধাটি কেবল সেইসব পরিবার পাবে, যাদের কোনো সদস্য সরকারি চাকরি করেন না। এর উদ্দেশ্য তাদের সহায়তা করা; যারা ক্রমবর্ধমান কলেজ খরচের কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন।
চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার
থালাপাতির বিজয়ের বাবার নাম এসএ চন্দ্রশেখর। তিনি ছিলেন তামিল সিনেমার পরিচালক। মা শোভা চন্দ্রশেখর ছিলেন গায়িকা। মাত্র ১০ বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ে নাম লেখান বিজয়। ‘বেট্রি’ নামের সিনেমাটি পরিচালনা করেন তার বাবা। প্রথম সিনেমার জন্য ৫০০ রুপি পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন। এরপর বেশ কয়েকটি সিনেমায় তাকে দেখা যায়। অভিষেকের আট বছর পর অর্থাৎ ১৯৯২ সালে ‘নালায়া থেরপু’ সিনেমায় প্রথম নায়কের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। তার প্রথম ব্লকবাস্টার সিনেমা ‘পুভে উনাকাগা’। এটি মুক্তি পায় ১৯৯৬ সালে।
তবে ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া এই অভিনেতার ‘থিরুমালাই’ সিনেমাটি তার ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যুক্ত করে। পরের বছর ‘ঘিল্লি’ সিনেমায় একজন কাবাডি খেলোয়াড়ের ভূমিকায় অভিনয় করে সকলের মন জয় করেন। এই সিনেমার মাধ্যমে প্রথম তামিল অভিনেতা হিসেবে বক্স অফিসে ৫০ কোটি রুপি আয় করেন। পরবর্তী সময়ে ‘থিরুপাচি’, ‘সাচেন’, ‘শিবাকাসি’, ‘পক্কিরি’, ‘কাবালান’, ‘নানবান’, ‘থুপ্পাক্কি’, ‘কাত্থি’, ‘মার্সাল’, ‘সরকার’, ‘মাস্টার’ প্রভৃতি সিনেমা তাকে তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়।
বিজয় জোসেফ চন্দ্রশেখর থেকে থালাপাতি বিজয়
২০১০ সালে এক সাক্ষাৎকারে বিজয় জানান, তিনি যখন চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন, তখন রজনীকান্তের ‘থালাপাতি’ সিনেমা মুক্তি পায়। সেই সময় কেউ একজন সেই সিনেমার সঙ্গে মিলিয়ে তাকে ‘ইলায়াথালাপতি’ ডাকেন। সেই থেকে তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়—‘থালাপতি’।
সম্মাননা
অভিনয় দক্ষতা ও কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ অনেক পুরস্কার জিতেছেন বিজয়। এর মধ্যে রয়েছে—সেরা অভিনেতা হিসেবে আটবার স্টার ইন্ডিয়া অ্যাওয়ার্ড, তিনবার তামিলনাড়ু রাজ্য সরকারের পুরস্কার ও সীমা (এসআইআইএমএ) অ্যাওয়ার্ডসহ বেশ কিছু পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ফোর্বস ইন্ডিয়ার জরিপে একাধিকবার শীর্ষ ১০০ তারকার তালিকায় জায়গা করে নেন বিজয়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই তারকা একাধিকবার গুগল ও টুইটারে সবচেয়ে বেশিবার খোঁজা তারকার তালিকায়ও স্থান পেয়েছেন।
*ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে
ঢাকা/শান্ত
প্রধানমন্ত্রীর কাছে সিএজির অডিট রিপোর্ট পেশ