ঢাকা     মঙ্গলবার   ০৫ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ২২ ১৪৩৩ || ১৮ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

মমতা পদত্যাগ না করলে কী হবে, কী আছে ভারতের সংবিধানে

সুচরিতা কংসবণিক, কলকাতা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:১৫, ৫ মে ২০২৬  
মমতা পদত্যাগ না করলে কী হবে, কী আছে ভারতের সংবিধানে

পশ্চিমবঙ্গের বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন ডেকে বলেছেন, তিনি এখনই পদত্যাগ করবেন না।

পরাজয় মেনে নিতে নারাজ বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে এসে জানিয়ে দিলেন, তিনি এখনই পদত্যাগ করছেন না। ভারতের নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলাফলে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির পরও মমতা যদি সত্যিই পদত্যাগ না করেন, তাহলে কী হতে পারে? তা নিয়ে কি নতুন সংকট সৃষ্টি হতে পারে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে? এ বিষয়ে ভারতের সংবিধানে কী বলা আছে, সেটিও এখনোর আলোচনার তুঙ্গে।

মঙ্গলবার (৫ মে) কলকাতার কালীঘাটের বাড়িতে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে মমতা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, “এখনই ইস্তফা দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।”

আরো পড়ুন:

 উল্টো তিনি দাবি করেন, “আমরা হারিনি, জোর করে ভোট লুট করা হয়েছে। ইস্তফার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে?” 

এদিকে বিদায়ী সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৭ মে। এই তারিখের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা ছাড়তে হবে মমতাকে।

মমতা শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ না করলে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক দৃষ্টান্ত তৈরি হবে। কারণ, ভোটে হেরে যাওয়ার পরও বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা হস্তান্তর না করার নজির ভারতে নেই। 

সংবিধানেও এমন পরিস্থিতির বিষয়ে আলাদা করে কিছু বলা নেই। কারণ, কোনো মুখ্যমন্ত্রী ভোটে পরাজিত হয়েও রাজ্যপালের কাছে যে ইস্তফা দেবেন না, এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হবে বলে কেউ মনে করেন না।

ভোটে হারলে রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর ইস্তফা দেওয়াটা ‘নিয়ম’ নয়। এটি সাধারণভাবে রেওয়াজ, রীতি বা সাংবিধানিক শিষ্টাচার। ইস্তফা না দিলে আনুষ্ঠানিকভাবে আগামী ৭ মে পর্যন্ত মমতাই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন। কারণ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৭ মে, বৃহস্পতিবার। 

৭ তারিখ পার হলেই মমতার মুখ্যমন্ত্রীর পদ থাকবে না। ইস্তফা না দিলেও নামের আগে জুড়ে যাবে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী।

১৫ বছর আগে ২০১১ সালের ১৩ মে দুপুর ১টা নাগাদ ভোটের ফল স্পষ্ট হওয়ার পরই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রাজভবনে গিয়ে তৎকালীন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে ইস্তফাপত্র তুলে দিয়েছিলেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি রাজভবন থেকে সরকারি গাড়ি ছেড়ে দিয়ে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের পার্টি অফিসে গিয়েছিলেন দলের গাড়িতে করে। 

সিনিয়র অ্যাডভোকেট শেখর নাফাদে এই বিষয়ে বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যপালের কাছে যেতে অস্বীকার করলেও কোনো পরিবর্তন আসবে না। রাজ্যপাল বিধানসভা ও সরকার ভেঙে দিতে পারেন, যেহেতু জনগণের ম্যান্ডেট শেষ হয়ে গেছে। মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তাই বিধি মেনেই সরকারকে বিদায় নিতে হবে।”

তিনি আরো বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদত্যাগ না করলেও নতুন বিধানসভা গঠন এবং নতুন মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়াই রাজ্যপাল নতুন বিধানসভায় সরকারের জন্য নতুন মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগ করতে পারেন।”

“মেয়াদের মাঝপথে মুখ্যমন্ত্রী পরিবর্তনে সাংবিধানিক বাধা থাকলেও বিধানসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন বিধানসভা গঠনে কোনো বাধা নেই,” যোগ করেন শেখর নাফাদে। 

এমন পরিস্থিতিতে সব নজর এখন রাজ্যপালের ওপর। রাজ্যপাল এখানে সাংবিধানিক রেফারি হিসেবে কাজ করেন। তিনি এটি নিশ্চিত করেন যেন সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনপুষ্ট একটি সরকার ক্ষমতায় থাকে।

সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে রাজ্যপালের তরফে তিনটি পদক্ষেপ অনুসরণ করা হয়। প্রথমত, বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বলা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, যদি কোনো অনিশ্চয়তা থাকে, তাহরে বিধানসভায় ফ্লোর টেস্ট বা শক্তি পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে এবং তৃতীয়ত, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে নতুন সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি দাবি করেন তার কাছে পর্যাপ্ত বিধায়কের সমর্থন রয়েছে কিংবা বিধানসভার রেজাল্ট চ্যালেঞ্জ করে মমতা যদি হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন, তাহলে আরো একটি পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। সেক্ষেত্রে বিধানসভার বিশেষ অধিবেশন ডাকতে পারেন রাজ্যপাল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভার সেই ফ্লোরে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দিতে হবে। ভোটাভুটিতে হেরে গেলে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে ক্ষমতা ছাড়তে হবে এবং তারপরও পদত্যাগ না করলে রাজ্যপাল তাকে সঙ্গে সঙ্গেই অপসারণ করতে পারবেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মমতার পদত্যাগ না করার ঘোষণা মূলত একটি রাজনৈতিক অবস্থান এবং সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার মুখে শেষপর্যন্ত তাকে পদত্যাগ করতে হবে অথবা তিনি বরখাস্ত হবেন।

বুধবার (৬ মে) রাতে কলকাতায় আসার কথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর। রাতেই তিনি বিজেপির পরিষদীয় দলের সঙ্গে বৈঠক করে নেতার নাম ঘোষণা করতে পারেন। যিনি পরিষদীয় দলের নেতা হবেন, তিনিই হবেন পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী। তিনিই রাজ্যপালের কাছে গিয়ে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আর্জি জানাবেন। তারপর হবে শপথগ্রহণ।

যদি ৮ মে শপথগ্রহণ হয়, তাহলে ৭ তারিখে তৃণমূল সরকারের মেয়াদ শেষ এবং ৮ তারিখে শপথগ্রহণের মধ্যে কোনো ফাঁক থাকবে না। তা না হয়ে ৯ তারিখ বা তার পরের কোনো দিনে শপথগ্রহণ হলে মধ্যবর্তী স্বল্পসময় রাজ্যপাল পুরো বিষয়টি তত্ত্বাবধান করবেন এবং তা হবে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনসাপেক্ষে। 

ভারতীয় সংবিধানের ১৬৪(১) ধারা অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালের সুপারিশক্রমে পদে থাকেন। সাধারণত বিদায়ী সরকারের মেয়াদ শেষ ও নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের মধ্যবর্তী এই সময়ে অনেক ক্ষেত্রে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীকে ‘তত্ত্বাবধায়ক’ (কেয়ারটেকার) মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে রাজ্যপাল কাজ চালানোর অনুরোধ করেন এবং বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীকেই পুনঃনিয়োগ করেন। তেমন কেউ না হলে তিনি নিজে এক-দু’দিন তত্ত্বাবধায়ন করতে পারেন। রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করারও সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সাধারণত এত কম সময়ের জন্য ‘সংকট’ না হলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয় না।

তবে সবই নির্ভর করছে বিজেপি পরিষদীয় দল শপথের দিনক্ষণ কবে চূড়ান্ত করে তার ওপরে। কিন্তু মমতা ইস্তফা না দিলে কোনো সংকট তৈরি হবে না। কারণ, বিধানসভার মেয়াদ শেষের সঙ্গে সঙ্গেই তার মুখ্যমন্ত্রিত্বের মেয়াদও শেষ হয়ে যাবে। তবে প্রচলিত ‘রীতি’ না-মানায় তার ভাবমূর্তির ওপর কোনো প্রভাব পড়ে কি না, তা সময়ই বলবে। 

ভারতে বিভিন্ন রাজ্যে এবং রাজনৈতিক দলে নির্বাচনের পর একাধিকবার ক্ষমতার হস্তান্তর হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পর বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীরা সরে দাঁড়িয়েছেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে সরকার গঠনের সুযোগ করে দিয়েছেন। এমনকি কদাচিৎ কোনো বিরোধ বা বিলম্বের ঘটনা ঘটলেও আদালত সবসময় একটি নীতিই বহাল রেখেছে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা অবশ্যই বিধানসভার মেঝেতে যাচাই করতে হবে। সংখ্যাতত্ত্বে স্পষ্ট ব্যবধানে হারার পর কোনো নেতাই ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেননি।

এপ্রিল মাসে দুই দফায় ভোটগ্রহণের পর সোমবার (৪ মে) পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। টানা তিনবার এই রাজ্য শাসনের দায়িত্ব পাওয়া মমতার সামনে এবার ইতিহাস তৈরির হাতছানি ছিল। তবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তাকে আর চাননি। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জিতেছে বিজেপি। তারা সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে; বুধবার (৬ মে) বিজেপির নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রূপরেখা জানা যেতে পারে।

ঢাকা/রাসেল

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়