ঢাকা     বুধবার   ০৬ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ২৩ ১৪৩৩ || ১৯ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

খুলনার ঝুঁকিপূর্ণ ৬০ ভবন উচ্ছেদ হয়নি একযুগেও

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:১০, ৪ জানুয়ারি ২০১৬   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
খুলনার ঝুঁকিপূর্ণ ৬০ ভবন উচ্ছেদ হয়নি একযুগেও

ঝুঁকিপূর্ণ সমাজসেবা অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান, খুলনা : পলেস্তারা খসে পড়েছে। ভেঙে গেছে সানসেটও। আবার ছাদের নিচের বিভিন্ন অংশও খুলে পড়ছে। জন্মেছে গাছ-পালাও। বিভিন্ন অংশে ধরেছে ফাঁটল।

 

এমন একাধিক চিত্র খুলনা নগরীর বড় বাজারসহ বিভিন্ন এলাকার ভবনে। ভবনগুলো পরিত্যক্ত ঘোষিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ। এরপরও এসব ভবনে চলছে বসবাস এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা। একের পর এক ভূমিকম্প এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে এসব ভবন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

 

এ ধরনের ৬০টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা কেসিসির পক্ষ থেকে দীর্ঘ এক যুগ আগে করা হলেও তা লাল ফিতায় বন্দি রয়েছে। ফলে যে কোনো মুহূর্তে এসব ভবন ধসে আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন নগরবাসী। তবে কেসিসি কর্তৃপক্ষ বলছে, আগামী সপ্তাহ থেকেই এসব ভবন উচ্ছেদে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৪ সালে সিটি করপোরেশনের একটি কমিটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে তা ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সে উদ্যোগ বেশিদূর এগোয়নি।  এ ছাড়া যাচাই-বাছাই শেষে গত বছরও ঝুঁকিপূর্ণ ও বসবাসের অনুপযোগী ৪৮টি ভবনের ছাদ ভেঙে সিলগালা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেটিও বর্তমানে থমকে আছে।

 

সূত্র মতে, খুলনা মহানগরীতে দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে নগরবাসী বসবাস করছেন। এসব ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মধ্যে নগরীর বড়বাজারে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। এ বাজারের অধিকাংশ দ্বিতীয়তলা ও তিনতলা ভবনের ওপরের অংশে ভাড়াটিয়ারা পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন, দ্বিতীয়তলায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের গোডাউন এবং নিচতলায় বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর ব্যবসা রয়েছে। এ বাজারে ২০০৮ সালে ভবন ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

 

বড়বাজারের ব্যবসায়ী মুকেশ রায় বলেন, এ বাজারের অধিকাংশ ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ। যে কোনো সময়ই এসব ভবন ধসে পড়তে পারে। ইতিমধ্যেই দুটি ভবন ধসে লোকও মারা গেছে। এ ছাড়া গত বছরের ২৫ এপ্রিলের ভয়াবহ ভূমিকম্পে একটি ভবনে ফাঁটল ধরে। এ কারণে এসব ভবনের ব্যবসায়ী ও ভাড়াটিয়ারা চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।

 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পরিত্যক্ত ঘোষিত খুলনা জেলা কারাগার ভবন, টুটপাড়া আনসার ক্যাম্পের ভেতরে ভূতেরবাড়ি, খুলনা জেনারেল  হাসপাতালের পরিত্যক্ত ভবন, খুলনা প্রেসক্লাবের বিপরীতে স্যার ইকবাল রোড, বসুপাড়া, হাজি মহসিন রোড, গগন বাবু রোড, মুন্সীপাড়া, রায়পাড়া, দোলখোলা, বানিয়াখামার, টুটপাড়া, মুজগুন্নী, খালিশপুর, দৌলতপুরসহ বিভিন্ন স্থানে দুই শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে।

 

মহানগরী এলাকায় প্রাচীনকালের জরাজীর্ণ ভবনও রয়েছে। এসব ভবনের দুই ও তিনতলার  দেয়ালের মধ্যে বটগাছের চারাসহ বিভিন্ন প্রকারের উদ্ভিদ জন্ম নিয়েছে। বিগত সময়ে এ ভবনগুলো ভেঙে ফেলার জন্য নোটিশ দেওয়া হলেও তা ভাঙা সম্ভব হয়নি। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে ফেলার নোটিশ পেয়ে অনেকেই কৌশলে আদালতে স্থিতিবস্থা জারির আবেদন করেন। এভাবেই বিভিন্ন কৌশলে সুযোগ গ্রহণ করে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ব্যবহার চলছে।

 

এদিকে গেল বছরের ১১ জুলাই সার্কিট হাউজ সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় খুলনা মহানগরীতে অবস্থানরত সরকারি ও বেসরকারি ৪৮টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ও বসবাসের অনুপযোগী ভবনের ছাদ ভেঙে  ফেলে ভবনগুলো সিলগালা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

 

ওই সভায় জানানো হয়, ২০১০ সালের জরিপে খুলনা মহানগরীতে সরকারি ও বেসরকারি মিলে মোট ৪৮টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ও বসবাসের অনুপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

 

 

ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে উল্লাসিনী সিনেমা হল, পূজা উদযাপন কমিটির অফিস, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, সদর হাসপাতালের পুরাতন ভবন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী উচ্চ বিদ্যালয়, প্রত্যাশা-৭১, সত্য নারায়ণ মন্দির, ২৬ নম্বর রোডের আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড অফিস, বড়বাজার এলাকার হোটেল আফগানিয়া, বলাকা হোটেল, জনতা ব্যাংক রুজভেল্ট শাখা, দেবেন বাবু রোডস্থ আটকেপড়া পাকিস্তানি সাধারণ প্রত্যাবাসন কমিটির অফিস, বয়রাস্থ সোনালী ব্যাংক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, নগর আওয়ামী লীগের সাবেক দপ্তর সম্পাদক শ্যামল সিংহ রায়ের মালিকানাধীন ৫নং পুরাতন যশোর রোডস্থ ভবন, পূজা উদযাপন কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা শ্যামল হালদারের মালিকানাধীন হেলাতলা রোডস্থ ভবন, টুটপাড়া পুরাতন পুলিশ ফাঁড়ি, গভমেন্ট একোয়ার্স স্ট্রেট।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৬ মে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় দুর্যোগ  ব্যবস্থাপনা কাউন্সিলের (এনডিএনসি) সভায় দেশের সব ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে লাল সাইনবোর্ড টানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব সরোজ কুমার নাথ স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশনার চিঠি ২৩ আগস্ট কেসিসি কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু সরেজমিনে ঘুরে ঝুঁকিপূর্ণ সব ভবনে লাল সাইনবোর্ড দেখা যায়নি।

 

যদিও এ ব্যাপারে কেসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আরিফ নাজমুল আহসান বলেন, নগরীর ৪৮টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই লাল সাইনবোর্ড টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন এসব ভবনের বাসিন্দাদের সরে যেতে বলা হচ্ছে। স্বেচ্ছায় না গেলে ভবনের দরজা-জানালা খুলে নিয়ে তাদের যেতে বাধ্য করা হবে। ভবন খালি করেই আগামী সপ্তাহ থেকে এসব ভবন উচ্ছেদে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে মামলা থাকায় ৭/৮টি ভবনে এখনই কিছু করা যাচ্ছে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

 

উল্লেখ্য, গেল বছরের ২৫ এপ্রিলের ভূকম্পনে নগরীর দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির পাশে পাঁচতলা একটি ভবনের নিচতলা দেবে যায়। এ ছাড়া হেলাতলা মোড়ের একটি চারতলা ভবন, পিকচার প্যালেস মোড়ে আজমল প্লাজা এবং দৌলতপুরের হোটেল বোরাক ভবন হেলে পড়ে। একইভাবে বড়বাজারের একটি ভবন, নগরীর গগন বাবু রোড এলাকায় খানজাহান আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং কেডি ঘোষ রোড এলাকায় একটি ভবনেও ফাঁটল দেখা দেয়।

 

এ ছাড়া ২৭ জুন নগরীর আহসান আহমেদ রোডস্থ একটি বাড়ির ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ধসে আবিদা আরেফিন শাপলা নামে এক স্কুলছাত্রীর মৃত্যু হয়। সর্বশেষ সোমবারের ভূমিকম্পে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। আবারো ভূমিকম্প এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে যে কোনো মুহূর্তে এসব ভবন ধসে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন নগরবাসী।

 

 

 

 

রাইজিংবিডি/খুলনা/৪ জানুয়ারি ২০১৬/মুহাম্মদ নূরুজ্জামান/রিশিত

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়