যে কারণে মুজতবা আলী ‘কিংবদন্তি’
শাহ মতিন টিপু || রাইজিংবিডি.কম
সৈয়দ মুজতবা আলী
শাহ মতিন টিপু : বাংলা সাহিত্যে মুজতবা আলীর পাকাপোক্ত স্থান রম্যলেখক হিসেবে। অবশ্য এটাই তার একমাত্র পরিচয় নয়। রম্যর বাইরেও আছে তার সাহিত্য সম্ভার।
মুজতবা-গবেষক নূরুর রহমান খান (মুজতবা-সাহিত্যের রূপবৈচিত্র্য ও রচনাশৈলী, ঢাকা থেকে ২০১০ সালে প্রকাশিত) সেগুলোকে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন এভাবে: ক. হাস্যরস-প্রধান গল্প, খ. করুণ রসাত্মক গল্প, গ. বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক গল্প, ঘ. প্রণয়মুখ্য গল্প, ঙ. অম্লমধুর গল্প, চ. ভয়ংকর রসের গল্প। ভয়ংকর রসের গল্প অবশ্য মাত্র একটি, ‘রাক্ষসী’, যেখানে এক বৃদ্ধার মৃতদেহের বর্ণনা সত্যিই ভয়ংকর।
সৈয়দ মুজতবা আলী গল্প-উপন্যাস লিখতেন, কিন্তু বলতেনই আসলে। যে চারটি উপন্যাস তিনি লিখেছেন, তার তিনটিই পাঠকদৃষ্টিতে অসাধারণ সৃষ্টি। কেবল শেষ উপন্যাস ‘তুলনাহীনা’ প্রথম তিনটির তুলনায় কিছুটা বিক্ষিপ্ত। এর ঘটনাপ্রবাহ ১৯৭১-এর পটভূমির। কিন্তু প্রথম তিনটি উপন্যাস ঠাসবুনটে লেখা।
শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্ম ১৯০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর পিতার কর্মস্থল সিলেটের করিমগঞ্জে। পিতা সৈয়দ সিকন্দর আলী ছিলেন সাব-রেজিস্ট্রার। পিতার নিবাস ছিল হবিগঞ্জের উত্তরসুর গ্রামে। চাকরিসূত্রে পিতার কর্মস্থল পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নের পর মুজতবা আলী শেষপর্যন্ত শান্তিনিকেতন-এ ভর্তি হন এবং পাঁচ বছর অধ্যয়ন করে ১৯২৬ সালে তিনি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। বিশ্বভারতীতে তিনি বহু ভাষা শেখার সুযোগ পান। সংস্কৃত, সাংখ্য, বেদান্ত, ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, ফারসি, আরবি, রুশ, ইতালিয়ান, উর্দু, হিন্দি ও গুজরাটি- এমন ১৮টি ভাষায় দখল ছিল তার।
গীতা তার সম্পূর্ণ মুখস্ত ছিল। এমনকী রবীন্দ্রনাথের গীতিবিতানও টপ টু বটম ঠোটস্ত ছিল তার। একবার এক অনুষ্ঠানে এক হিন্দু পুরোহিত গীতা সম্বন্ধে বক্তব্য রাখছিলেন। সেই সভায় সৈয়দ মুজতবা আলী উপস্থিত ছিলেন। দূর্ভাগ্যক্রমে সেই পুরোহিত যে সব রেফারেন্স গীতা থেকে সংস্কৃত ভাষায় দিচ্ছিলেন তাতে কিছু ভুল ছিল। সৈয়দ মুজতবা আলী অবশেষে দাঁড়িয়ে উনার সমস্ত রেফারেন্স মূল সংস্কৃত ভাষায় কি হবে তা সম্পূর্ণ মুখস্থ বলে গেলেন। সমস্ত সভার দর্শক বিস্ময়ে হতবাক।
ভারতের অন্যত্র বিশ্বভারতীর ডিগ্রি স্বীকৃত না হওয়ায় মুজতবা আলী প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রবেশিকা পাস করে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালে ‘হুমবল্ট’ বৃত্তি নিয়ে তিনি জার্মানি গিয়ে বার্লিন ও বন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। সেখানে তিনি দর্শন বিভাগে তুলনামূলক ধর্মশাস্ত্রে গবেষণা করে ১৯৩২ সালে ডি ফিল লাভ করেন। তিনি ১৯৩৪-৩৫ সালে মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। এভাবে পড়ালেখায় তিনি প্রচুর সময় কাটিয়েছেন।
মুজতবা আলীর চাকরিজীবন শুরু হয় কাবুলের কৃষিবিজ্ঞান কলেজে ফরাসি ও ইংরেজি ভাষার প্রভাষকরূপে (১৯২৭-১৯২৯)। ১৯৩৫ সালে তিনি বরোদা কলেজে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক হন। তিনি বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস বিভাগে খন্ডকালীন প্রভাষক হিসেবেও কিছুকাল দায়িত্ব পালন করেন। পরে পেশার পরিবর্তন করে মুজতবা আলী ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশন্সের সচিব ও অল ইন্ডিয়া রেডিওর কর্মকর্তা হন। সবশেষে তিনি বিশ্বভারতীর ইসলামের ইতিহাস বিভাগে রীডার (১৯৬১) হিসেবে যোগদান করে সেখান থেকেই ১৯৬৫ সালে অবসর গ্রহণ করেন।
শান্তিনিকেতনে অধ্যয়নকালেই হস্তলিখিত বিশ্বভারতী পত্রিকায় তার কয়েকটি লেখা প্রকাশিত হয়। তিনি সত্যপীর, রায়পিথোরা, ওমর খৈয়াম, টেকচাঁদ, প্রিয়দর্শী ইত্যাদি ছদ্মনামে আনন্দবাজার, দেশ, সত্যযুগ, শনিবারের চিঠি, বসুমতী, হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড প্রভৃতি পত্র-পত্রিকায় কলাম লিখতেন। এ ছাড়া মোহাম্মদী, চতুরঙ্গ, মাতৃভূমি, কালান্তর, আল-ইসলাহ্ প্রভৃতি সাময়িক পত্রেরও তিনি নিয়মিত লেখক ছিলেন।
গ্রন্থাকারে তার মোট ত্রিশটি উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ ও ভ্রমণকাহিনী প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: ভ্রমণকাহিনী ‘দেশে-বিদেশে’, ‘জলে-ডাঙায়’। উপন্যাস ‘অবিশ্বাস্য’, ‘শবনম’। রম্যরচনা ‘পঞ্চতন্ত্র’, ‘ময়ূরকণ্ঠী’ এবং ছোটগল্প ‘চাচা-কাহিনী’, ‘টুনি মেম’ ইত্যাদি। তার আরেকটি অনবদ্য গ্রন্থ ‘পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’।
সৈয়দ মুজতবা আলী ‘দেশে-বিদেশে’ গ্রন্থখানি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই হইচই ফেলে দেন এবং পাঠকচিত্ত জয় করতে সক্ষম হন। কাবুলে অবস্থানের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও অন্তরঙ্গ উপলব্ধির ফসল এই গ্রন্থখানি। সামগ্রিকভাবে তিনি উভয় বঙ্গে সমান জনপ্রিয় ও সমাদৃত লেখক ছিলেন। আন্তর্জাতিক চেতনায় সমৃদ্ধ এই লেখকের বিশ্বমানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং অননুকরণীয় রচনাশৈলী তাকে এই সম্মানের অধিকারী করেছে। তদুপরি তিনি যে নৈপুণ্যের সঙ্গে বিদেশি চরিত্র ও আবহ বাংলা সাহিত্যে এনেছেন তাও তুলনাহীন।
মুজতবা আলী বহুদেশ ভ্রমণ করেছেন, কর্মক্ষেত্রের পরিবর্তন করেছেন এবং বহুজনের সান্নিধ্য লাভ করেছেন। তাই তার লেখায় সে প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। তার রম্যবিষয়ক ছোট ছোট রচনা পাঠকদের চিত্তবিনোদন ও অনাবিল আনন্দদানে তুলনাহীন। বিশেষ করে উপন্যাস ও ছোটগল্পে মানবজীবনের অন্তহীন দুঃখ-বেদনা ও অপূর্ণতার কথা তিনি সহানুভূতির সঙ্গে চিত্রিত করেছেন। ১৯৭৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মৃত্যু হয় এই গুণি লেখকের।
সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাতিজা সাবেক পররাষ্ট্র সচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী তার এই গুণি চাচা সম্পর্কে এক নিবন্ধে উল্লেখ করেন- ‘
মুজতবা আমার দাদা-দাদির আদরের ছোট ছেলে। দাদিই নাম দিয়েছিলেন ‘সেতারা’ বা শুকতারা (একটু মেয়েলি কিসিমের নাম), ডাকতেন ‘সিতু’ বলে। কালেক্রমে সেই সিতু মিঞা-ই হলেন বিরাট প-িত ও সুপ্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক। তাকে গড়েছেন তার মা, বাবা ও সারা পরিবার, বিশেষ করে তার দুই বড় ভাই সৈয়দ মোস্তফা আলী ও সৈয়দ মরতুজা আলী। যারা লেখাপড়া শেষ করেই সরকারি চাকরিতে ঢুকলেন ও সারা পরিবারের দায়িত্বভার কাঁধে নিয়েছিলেন। তাদেরও বিরাট সাহিত্য প্রতিভা ছিল। কিন্তু চাচাকে তারা সংসারের দায় থেকে মুক্তি দিলেন। পড়ালেন দেশে ও বিদেশে। চাচা তার অগ্রজদের এ অবদান কখনও ভুলেননি। স্মরণ করেছেন বারবার ও তাদের উৎসর্গ করেছেন তার অনবদ্য দুটি বই।
সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী আরও লেখেন- স্বাধীনচেতা মুজতবা আলী সারা জীবন এক ভবঘুরে জীবনযাপন করলেন। কোথাও স্থায়ীভাবে থাকলেন না। স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেন না। পাকিস্তানের কট্টরপন্থীরা তাকে ‘ভারতের দালাল’ অপবাদ দিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল। কলকাতায় জনপ্রিয়তা, সুনাম ও পুরস্কার সবই পেলেন। তবে কলকাতার রক্ষণশীল লেখক সমাজ তাকে ঈর্ষা করত ও বলে বেড়াত যে, ‘মুজতবা আলীর ধর্ম নিরপেক্ষ উদার দৃষ্টিভঙ্গি একটা আইওয়াশ, আসলে আলী একজন ধুরন্ধর পাকিস্তানি এজেন্ট।’ এক দুর্বল মুহূর্তে চাচা দুঃখ করে তার গুণগ্রাহী বিখ্যাত লেখক শংকরকে বলেছিলেন, ‘এক একটা লোক থাকে যে সব জায়গায় ছন্দপতন ঘটায়, আমি বোধহয় সেই রকম লোক।’
‘বই কিনে কেউ কখনও দেউলিয়া হয় না’ এই ডায়লগটি কিন্তু সৈয়দ মুজতবা আলীর। বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদানের কারণে ১৯৪৯ সালে তিনি অর্জন করেন নরসিং দাস পুরস্কার। এ ছাড়া ১৯৬১ সালে অর্জন করেন আনন্দ পুরস্কার।
সৈয়দ মুজতবা আলী প্রসঙ্গে এক নিবন্ধে অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম লেখেন-
‘জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাশের বাংলা ভাষার অভিধানে ‘কিংবদন্তী’ শব্দটির অর্থ এভাবে দেওয়া হয়েছে: লোক-পরম্পরায় কথিত ও শ্রুত বিষয়। তাহলে কারও পক্ষে কিংবদন্তীর বিষয়ে পরিণত হতে হলে লোকপরম্পরার একটি দীর্ঘ সময়ক্রম প্রয়োজন। কিন্তু সৈয়দ মুজতবা আলী যে তাঁর জীবদ্দশাতেই কিংবদন্তীর চরিত্রে পরিণত হলেন, সেটি কী প্রকারে? যাঁরা মুজতবা-সাহিত্য পড়েছেন, তাঁদের কাছে উত্তরটি সোজা- কিংবদন্তী শব্দের ভেতরে বদ্ বা বলার যে বিষয়টি আছে, সেই ‘বলা’ই তাঁকে এই মহিমা দিয়েছে। তিনি বলে গেছেন তাঁর গল্প-উপন্যাস-কাহিনিগুলো, তাঁর মতো করে; মানুষ তাঁকে নিয়ে বলে গেছে তাদের যা বলার তা; এবং এক (লোক) প্রজন্মে তিনি অর্জন করেছেন এক ঈর্ষণীয় উচ্চতা, যে উচ্চতায় কিংবদন্তীর চরিত্রেরা উড়ে বেড়ায়।’
রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫/টিপু
রাইজিংবিডি.কম