ঢাকা     রোববার   ১৭ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ৩ ১৪৩৩ || ২৯ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ছাপচিত্রের ইন্দ্রজাল

অনার্য মুর্শিদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:৫৮, ২৫ জুন ২০১৯   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
ছাপচিত্রের ইন্দ্রজাল

অনার্য মুর্শিদ: শিকারের রক্তমাখা হাতে কে কখন গুহার দেয়ালে ছাপচিত্র এঁকেছিল কে জানে! সে অর্থে ছাপচিত্র কেনো, পৃথিবীর কোনো শিল্পকলার সুনির্ধারিত ইতিহাস নেই। তবু মানুষ একটি নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে তার জানার বৃত্ত আঁকতে চায়। সে বিবেচনায় চীন ছাপচিত্রের কেন্দ্রভূমি, আবিষ্কারক। অষ্টম শতাব্দীতে কাঠের পাটাতনে খোদাই করে কাগজে ছেপে মানুষের কাছে বুদ্ধের বাণী পৌঁছে দিত চীনারা। চীনের এই আবিষ্কার ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বে। রঙিন ছবির যন্ত্র তখনো আসেনি ভারতবর্ষে। তাতে কি! ছাপচিত্রের কল্যাণে মানুষ একসময় রঙিন বইও পেয়েছে। আঠারো শতকের বটতলার বইগুলো তার উজ্জ্বল স্বাক্ষর।

ইউরোপ যখন একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ছাপচিত্র আঁকত তখন ইংল্যান্ড ছিল স্বতন্ত্র। এদিকে কলকাতা আর্ট কলেজ ও শান্তিনিকেতন রেখাচিত্রের বৈশিষ্ট্য, সাদা কালো বিভাজনের বৈশিষ্ট্য দুটোই প্রায় আয়ত্ব করে ফেলেছে। রবি বর্মা ও ললিতমোহন সেনের ছাপচিত্র তার প্রকৃষ্ট উদহারণ। এরপর ভারতবর্ষের ছাপচিত্রে যে নতুনত্ব আসেনি তা বলার দুঃসাহস বোধ হয় কারোর নেই। মোহাম্মদ কিবরিয়ার মিনিমাইজেশন আন্দোলনে যে শুধু ফর্মের ব্যাপ্তি কমেছে তা নয়, স্পেসের ব্যাপ্তি বাড়িয়ে টেকচারের ক্ষেত্র তিনি যেভাবে ক্রিয়াশীল করেছেন তাতে বাংলার চিত্রকলা ও ছাপচিত্র একটি নতুন ধারা পেয়েছে। ঢাকার ছাপচিত্র দীর্ঘদিন সেরকম কোনো নতুন ধারা বা মাত্রা দেখতে পায়নি দর্শক।

‘অঁলিয়স ফ্রসেজ দো ঢাকা’য় চলমান ইকবাল বাহার চৌধুরী ‘নুড়ি ও পাথর’ শিরোনামের চিত্রকর্ম সম্পর্কে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষক ড. রশীদ আমীন বলেন- ‘ইকবাল বাহার চৌধুরী ছাপচিত্র মাধ্যমের কুশলী শিল্পী। নবীন এই ছাপচিত্রী নানা ধরণের অপ্রচলিত মাধ্যমে ছাপাই ছবি নির্মাণ করে ইতিমধ্যে শিল্প রসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ছাপাই ছবি বলতে আমরা প্রচলিতভাবে বুঝি এচিং, লিথোগ্রাফ, উডকাট ইত্যাদি। কিন্তু ইকবাল প্রচলিত মাধ্যমের গণ্ডি পেরিয়ে এক ভিন্নধর্মী নিরীক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত করেছে। হার্ডবোর্ডের উপর আঁচড় কেটে কখনো ইন্টাগলিও পদ্ধতিতে, আবার নানা উপাদান যুক্ত করে কোলাজ পদ্ধতিতে ছাপ নিয়ে একেবারেই ছাপাই ছবির একটি অন্য দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ছাপাই ছবির এই পদ্ধতি একাডেমিকভাবে সেইভাবে স্বীকৃত না হলেও, ইকবাল তার এই নিরীক্ষাধর্মীতার পথ থেকে বিচ্যুত হয় নি। শেষ বিচারে ইকবালেরই জয় হয়েছে।’

একজন রশীদ আমিনের চোখে আপনিও নিরীক্ষণ করতে পারেন। হয়ত আপনিও আবিষ্কার করবেন নতুন এক ইকবালকে। সেই ইকবালের শিল্পকর্ম হয়ত আপনার কাছে নতুন কোনো ধারা মনে নাও হতে পারে, কিন্তু একটা বোধ নিয়ে যে আপনি গ্যালারি থেকে ফিরবেন তাতে সন্দেহ নেই।

ইকবাল মুদ্রণ মাধ্যমের শিল্পী হলেও গ্যালারিতে তার আঁকা বেশ কিছু জলরংয়ের ছবিও স্থান পেয়েছে। ইকবালের ছবি সম্পর্কে যদি বলতে হয় তাহলে তার ছবির অধরা দিকটিই বেশি স্পষ্ট হয়। হয়ত তার বর্ণচোরা মন তাকে এ ধারায় প্রভাবিত করেছে। গ্যালারির বড় দেয়ালটিতে সাঁটানো পাঁচটি ‘অ্যাবসার্ড মুড’ এর ছবি অন্তত তাই বলে। তবে কোথাও কোথাও শিল্পীর বক্তব্য বা বর্ণনার বিষয় দর্শকের চোখে স্পষ্ট ধরা দেয়নি যে তা নয়। ‘রিচ্যুয়েল কমিউনিকেশন’ নামের উড ইন্টাগ্যালিওটি তার উদহারণ। প্রচীন গুহায় আঁকা শিকারের দৃশ্য এবং ধর্মের আর্বিভাবের চিত্র তুলে এনেছেন শিল্পী। বিষয়ের দিক থেকে শিল্পীকে অনেক ক্ষেত্রে বাস্তববাদী এবং বস্তুবাদী মনে হলেও ছবির সাংগীতিক আলোর প্রক্ষেপণ এবং ভৌতিক অন্ধকারের দ্রবণে তার ঐন্দ্রজালিক সত্তা পরিস্ফুট হয়েছে। যাতে শিল্পীকে শুধু ভাবের মানুষই মনে হয় না তার সত্তার দ্বৈতরূপটিও ধরা পড়ে। এটি শিল্পীর একক চিত্র প্রদর্শনী। প্রদর্শনীটি চলবে ২৯ জুন ২০১৯ পর্যন্ত। প্রদর্শনীটি সকলের জন্য উন্মুক্ত।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৫ জুন ২০১৯/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়