ঢাকা, রবিবার, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

অন্ধ শিল্পী রাজীবের বিরল প্রতিভা (ভিডিও)

তানজিমুল হক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-১৩ ৯:০৭:২০ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-১৩ ২:৪৭:৫১ পিএম

মনে পড়ে ‘লালু ভুলু’ সিনেমায় খুরশিদ আলমের কণ্ঠে ‘তোমরা যারা আজ আমাদের ভাবছো মানুষ কিনা’ অথবা আব্দুল জব্বারের গাওয়া ‘এতটুকু আশা’ সিনেমায় ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’ গানের কথা?

ভুলে যাওয়া সহজ নয়! বিশেষ করে গত শতাব্দীর শেষ দিকে যাদের বেড়ে ওঠা, তারা এই দেশের হাটে-মাঠে-ঘাটে প্রাণ আকুল করা কণ্ঠে এমন অনেক গান শুনেছেন। না, বড় কিংবা বিখ্যাত কোনো গায়কের কণ্ঠে নয়, গানগুলো শোনা যায় জীবন যুদ্ধে লড়াই করে যাওয়া কোনো গায়কের কণ্ঠে। সংগীতশিল্পীর মর্যাদা এই সমাজ তাদের হয়তো দেয় না, হৃদয়ের অন্ধ কুঠুরিতে গুমরে মরে সেই সাধ। ক্ষুধার দু’মুঠো অন্ন জোগানোই তাদের লক্ষ্য। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার খুঁজতে সরস্বতীর বীণা তারা হাতে তুলে নেন। অনেকের সেই সাধ্যও থাকে না। তখন বীণার স্থান নেয় একতারা, টিনের কলস, মাটির হাঁড়ি অথবা আপন শরীরের কোনো অঙ্গ। হাঁটুর উপর তাল ঠুকে, দু’আঙুলে তুড়ি বাজিয়ে তারা উড়িয়ে দিতে চান জীবনের অপ্রাপ্তিগুলো। স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় তারা পুনরায় পুড়তে চান না। তেমনই একজন রাজিবুল ইসলাম রাজীব।

‘একটি টাকা দাও না ও ভাই... একটি টাকা দাও না’, ‘নাম আমার রাজীব কানা... বাড়ি তানোর থানারে ভাই’, ‘চোখ বুজিলে দুনিয়া আন্ধার’ ইত্যাদি হাজারো গান রাজীবের মুখস্থ। কারণ ওই গানই তার সহায়, সাধনা এবং একমাত্র জীবিকা। এসব গান গেয়ে বৃহত্তর রাজশাহীর পথে পথে সুর লহরী ছড়িয়ে দেন তিনি। বিনিময়ের উপার্জনে চলে সংসার। রাজীবের গানে মুগ্ধ হয়েছেন অনেকেই। গত দেড়যুগ তিনি এভাবেই গান গেয়ে অসংখ্য শ্রোতার মন জয় করেছেন।

রাজীব পথশিল্পী। বয়স ৩০ বছর। বাড়ি রাজশাহীর তানোর পৌরসভার গাইনপাড়া। চার ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয়। বাবা মোহাম্মদ বাক্কার ছিলেন কৃষিশ্রমিক। ছিলেন কারণ, আট বছর আগেই তিনি পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছেন। এখন তিন ভাই, বোনের পৃথক সংসার। রাজীবের সংসারে রয়েছে মা চম্পা বিবি, স্ত্রী জাবেদা বিবি এবং দুই শিশুকন্যা রাজিয়া সুলতানা ও কাফিয়া সুলতানা। 

রাজীবের বাড়ির ছোট্ট উঠানে বসে কথা হয় তার সঙ্গে। কথায় কথায় উঠে আসে জীবনের প্রতিবন্ধকতা এবং সুখ-দুঃখের সাতকাহন। রাজীবকে হাতড়ে হাতড়ে পথ চলতে হয়। কথা বলার সময় বারবার কেঁপে ওঠে চোখের পাতা। সেখানে জমাটবাধা একতাল অন্ধকার অহর্নিশ চেপে বসে থাকে। রাজীব বলেন, ‘আমি জন্মগতভাবে অন্ধ। একারণে ছয় বছর বয়সে বাবা-মা রাজশাহী মহানগরীর ষষ্ঠিতলা প্রতিবন্ধী স্কুলে ভর্তি করে দেন। সেখানে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করে চলে আসি গ্রামের বাড়ি।’

সব পাখি ঘরে ফেরে। রাজীবও ফিরে আসেন কিন্তু আবার বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি তাকে নিতে হয় মনে মনে। রাজীব বলেন, ‘প্রতিবেশী শিশুরা দেখতাম খেলাধুলা করত। কিন্তু আমি তাদের সঙ্গে মিশতে পারতাম না। তারা আমাকে খেলায় নিত না। একা একা সময় কাটত। ভর করত নিঃসঙ্গতা।’ নিঃসঙ্গ রাজীবের উদাস করা সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা কাটতে চাইত না। একাকীত্বের এই সময়গুলোতে তার সঙ্গী হয় রেডিও। গান শুনে সময় কাটাতেন রাজীব। শুনতে শুনতে গান মুখস্থ হয়ে যেত। অবসরে সেই গান আপনমনে গাইত সে।

গাইতে গাইতে গায়েন- এই তত্ত্ব রাজীবের জীবনে দারুণভাবে সত্য হয়েছে। কিন্তু শুধু কণ্ঠে কী হবে? রাজীব গানগুলোকে আরও শ্রুতিমধুর করার জন্য অ্যালুমিনিয়ামের গামলা এবং হাঁড়ি বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। নাহ্‌, তাতেও মন ভরে না। কোথায় যেন কেটে যাচ্ছে তাল-লয়! রাজীব এবার অ্যালুমিনিয়ামের কলসি বাজিয়ে গান গাওয়ার চেষ্টা করেন। একসময় সেটি পছন্দ হয়। সেই থেকে ওই কলসিই তার গানের একমাত্র বাদ্যযন্ত্র!

একপর্যায়ে গানের সঙ্গেই রাজীবের আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মাত্র ১০ থেকে ১১ বছর বয়সে গানকেই জীবিকা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। গত ২০ বছর রাজশাহী মহানগরীর আদালত চত্বর, কোর্ট ও শিরোইল স্টেশন, রাজশাহী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, লক্ষ্মীপুর, পদ্মারপাড়ে বড়কুঠি, রেলগেট, রাজশাহী প্রেসক্লাব চত্বরসহ বিভিন্ন স্থানে গানের আসর বসিয়েছেন তিনি। নাটোর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা সদর ও পথে-প্রান্তরেও গান গেয়ে দর্শক মন জয় করেছেন। 

রাজীব বলেন, ‘খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হয়। চটপট চারটে মুখে দিয়েই বেরিয়ে পড়ি। সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে তানোর উপজেলা সদরে চলে যাই বাস ধরতে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাসের ছাদে উঠতে হয় রাজশাহী সদরে যাওয়ার জন্য।’

তবে তার কাছ থেকে কেউ ভাড়া নেন না। ফেরার পথে আয় বেশি হলে নিজ থেকেই ভাড়া দিয়ে দেন রাজীব। অনেক সময় ভাড়ার বিনিময়ে গান শোনাতে হয়। হাসিমুখেই এই আবদার পূরণ করেন তিনি। রাজীব বলেন, ‘গান শোনাতে আমার কষ্ট হয় না। আমি ছোটবেলা থেকে কষ্ট করে বড় হয়েছি। আমার অনেক গান ইউটিউবে ভাইরাল হয়েছে। তারপরও খুব অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। গান যেহেতু আমার উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম তাই দরদ দিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে গাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু সেভাবে উপার্জন হয় না। দিনে মাত্র তিন থেকে চারশ টাকা দিয়ে কি সংসার চলে?’

জাবেদা বিবি বলেন, ‘আমার বড় মেয়ে রাজিয়া সুলতানা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ছোট মেয়েও স্কুলে যায়। সংসারের এই বাড়তি টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়। আমার স্বামীর জন্য কোন টিভি চ্যানেল বা প্রতিষ্ঠান শিল্পী হিসেবে একটি স্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা করে দিলে সংসারে হয়তো কিছুটা স্বচ্ছলতা আসত। এভাবে একজন অন্ধ মানুষ আর কতদিন চলতে পারবে?’

রাজীবের অন্ধত্ব নিয়ে দুঃখপ্রকাশ করে চম্পা বিবি বলেন, ‘রাজীব অন্ধ তিনমাস বয়সে বুঝতে পারি। এরপর বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা করিয়েছি। কিন্তু ভালো হয়নি। গরিব মানুষ আমরা। ভালোভাবে চিকিৎসা করতে পারি নাই। আল্লাহ্ রাজীবকে গলা (কণ্ঠ) দিয়েছেন। ছেলেটা গান শুনিয়ে  মানুষকে আনন্দ দেয়। ও যেন আরও আনন্দ দিতে পারে, আরও ভালো গান গাইতে পারে- এই দোয়া করি।’

রাজীবের প্রতিবেশী রাজশাহী জজ আদালতের আইনজীবী মনোয়ার হোসেন বাবু বলেন, ‘অন্ধ হলেও গান গাওয়ার সহজাত প্রতিভা নিয়ে জন্মেছেন রাজীব। অসাধারণ প্রতিভা! সংগীতের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলসহ সারাদেশে পরিচিতি পেয়েছেন। তবে তার প্রতিভাকে পৃষ্ঠপোষকতা করা দরকার। একটু সহযোগিতা পেলে তিনি আরও বড় শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবেন।’

রাজীব দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার সাউন্ড বক্স নষ্ট হয়ে গেছে। গান গাওয়ার সময় ভালো সাউন্ড হয় না। শ্রোতা অসন্তুষ্ট হয়। এ কারণে উপার্জনও কমে গেছে। কোন প্রতিষ্ঠান যদি ভালোমানের একটি সাউন্ড বক্সের ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে খুব উপকৃত হতাম। পাশাপাশি বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে যদি আমি গান গাইতে পারতাম তাহলেও আমার উপার্জন বাড়ত। সংসারে সবাইকে নিয়ে একটু ভালো থাকতে পারতাম।’

মনে পড়ে অঞ্জন দত্তের সেই গান- একটু ভালো করে বাঁচবো বলে আর একটু বেশি রোজগার...। জীবনের এই তারুণ্যে আরেকটু ভালো করে বাঁচার উপায় খুঁজছেন রাজীব। কিন্তু উপায় মিলছে না। রাজীব বলেন, ‘আমার এক হাজারেরও বেশি গান মুখস্থ। আমি নিজেও কিছু গান বেঁধেছি। সেগুলো সুর করে শ্রোতাদের শোনাই। তবে আমি সাধারণত জনপ্রিয় বাংলা গান শোনাতে পছন্দ করি। হিন্দি গান গাইতে একদম ভালো লাগে না। জানি, হিন্দি গান অনেকে শুনতে চান, আয়ও ভালো হয়, তারপরও আমার ভালো লাগে না।’

উঠান থেকে সূর্য পশ্চিমে সরে যেতে থাকে। আঁধার নামার অপেক্ষায় দুয়ারে বসে থাকেন রাজীব। আমি বিদায় নিয়ে পথে নামি। হঠাৎ মনে পড়ে ‘দোস্তি’ সিনেমায় মোহাম্মদ রফির গাওয়া অন্ধ গায়কের সেই গান- জানেওয়ালা জারা মুরকে দেখ মুঝে, এক ইনসান হুঁ মে তুমহারি তারা...। গানটি কি রাজীবের মুখস্থ আছে? ফিরে গিয়ে জানতে ইচ্ছে করে না। কী লাভ বিষাদ বাড়িয়ে!

 

রাজশাহী/তানজিমুল হক/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন