ঢাকা, শুক্রবার, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

আগ্রার বিমান ঘাঁটিতে হঠাৎ পাকিস্তানের আক্রমণ

শাহ মতিন টিপু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-০৩ ১০:৫৭:৪৬ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-০৩ ১১:২০:৩৫ এএম
চূড়ান্ত বিজয় অভিযানে মিত্রবাহিনীর ট্যাঙ্ক

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের রক্তাক্ত ইতিহাসে ৩ ডিসেম্বর ছিল অন্যতম গুরুত্ববহ দিন। প্রত্যক্ষ লড়াইয়ের পরিণতি নির্ধারিত হয়েছিল এইদিনে। দিনটিতে রক্তাক্ত যুদ্ধর বাঁক বদল হয়েছিল ভীষণভাবে।

এইদিন পাকিস্তান ভারতীয় বিমানঘাঁটিগুলোতে বোমাবর্ষণ ও পশ্চিম সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে আর্টিলারি গোলা নিক্ষেপ শুরু করলে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। সেই সঙ্গে সূচিত হয় পূর্ব রণাঙ্গনে বাংলাদেশ-ভারত মিলিত বাহিনীর যুদ্ধ-তৎপরতার চূড়ান্ত অধ্যায়।

পাকিস্তানি সেনা বাহিনী বাংলাদেশের মাটিতে অবস্থান সুদৃঢ় করতে ভারতে এই বিমান হামলা চালিয়েছিল। পাকিস্তান ভেবেছিল মুক্তিযুদ্ধকে দুই দেশের মধ্যকার যুদ্ধ হিসেবে দেখানো গেলে জাতিসংঘের কাছ থেকে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা আসবে। জাতিসংঘ তখন উভয় পক্ষকে বাধ্য করবে এবং উভয় দেশে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করবে।

পাকিস্তানের বিমান সেনারা এইদিন বিকেলের দিকে ভারতের অমৃতসর, পাঠানকোর্ট, শ্রীনগর, অবন্তীপুর, উত্তরাইলসহ দিল্লির কাছাকাছি আগ্রার বিমান ঘাঁটিতে আক্রমণ করে। ভারতের উপর পাকিস্তান বাহিনীর এ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে রাত সাড়ে ১১টায় ভারতীয় সেনারা পাকিস্তানের ওপর পাল্টা হামলা করে।

বিকেল ৫টায় রেডিও পাকিস্তানে সংক্ষিপ্ত এক বিশেষ সংবাদে প্রচার করে ‘ভারত পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্তজুড়ে আক্রমণ শুরু করেছে। বিস্তারিত খবর এখনো আসছে।’ ৫টা ৯ মিনিটে পেশোয়ার বিমানবন্দর থেকে ১২টি যুদ্ধবিমান উড়ে যায় কাশ্মীরের শ্রীনগর ও অনন্তপুরের উদ্দেশে এবং সারগোদা বিমানঘাঁটি থেকে ৮টি মিরেজ বিমান উড়ে যায় অমৃতসর ও পাঠানকোর্টের দিকে। দুটি যুদ্ধবিমান বিশেষভাবে পাঠানো হয় ভারত ভূখন্ডের গভীরে আগ্রায় আঘাত করার উদ্দেশ্যে। মোট ৩২টি যুদ্ধবিমান অংশ নেয় এই আক্রমণে।

ওইদিন বিকেলে এ সময়টিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কোলকাতার ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে এক বিশাল জনসভায় বক্তৃতা করছিলেন। দ্রুত তিনি দিল্লি প্রত্যাবর্তন করেন। মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠকের পর মধ্যরাত্রির কিছু পরে বেতার ভাষণে তিনি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে বলেন, ‘এতোদিন ধরে বাংলাদেশে যে যুদ্ধ চলে আসছিল তা ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।’

ভারতও এর জবাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং তাদের পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তানের হামলা প্রতিহত করে। ভারতের সামরিক বাহিনী বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যৌথবাহিনী তৈরি করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। পাকিস্তানিরা আগেভাগেই তাদের অবস্থান থেকে পিছু হটায় সেসব স্থানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ‘মুক্তাঞ্চল’হিসেবে ঘোষণা করে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভিন্নমাত্রা পায়। পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে শুরু হয় যৌথ কমান্ডের সম্মুখযুদ্ধ। ভারতীয় সেনাবাহিনী চারদিক থেকে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। সন্মুখ সমরে হানাদার বাহিনীদের একে একে পরাস্ত করে বাংলার দামাল ছেলেরা বিজয় কেতন উড়াতে উড়াতে এগুতে থাকে ঢাকার দিকে।

বাঙালির মুক্তিযুদ্ধকে আন্তর্জাতিক যুদ্ধে পরিণত করার মতো শেষ অস্ত্র বেছে নেয় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। পাকিস্তানের ভারত আক্রমণের জের ধরে পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানের চার ডিভিশন সৈন্যের সঙ্গে ভারতের সাত ডিভিশন সৈন্য ও অনিয়মিত মুক্তিযোদ্ধারা মুখোমুখি হয়। মনোবল চাঙ্গা হয়ে ওঠে বাংলার মুক্তিপাগল দামাল ছেলেদের। সময় ঘনিয়ে আসতে শুরু করে এই মাটি আর বাংলার স্বাধীনতার শত্রুদের। বাঙালীর জীবন-মরণ লড়াইয়ে ভারতের সহযোগিতার ধারা বাড়তে থাকে।

অন্যদিকে একাত্তরের এই দিনে ভারতীয় বিমান ও নৌবাহিনী এবং বাংলাদেশের বিমানবাহিনী বাংলাদেশে মধ্যরাত থেকে এ্যাকশন শুরু করে। ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে গিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন পাক ঘাঁটির ওপর বোমা বর্ষণ করে। এদের প্রধান লক্ষ্য ছিল অবশ্য ঢাকা ও চট্টগ্রাম। ঢাকা ছিল পাক বিমানবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি। এ ঘাঁটিতেই ছিল তাদের জঙ্গী বিমানগুলো।

রাত ৯টার দিকে একটি অটার বিমান নিয়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর দু’জন চৌকস অফিসার ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শামসুল আলম ও ক্যাপ্টেন আকরাম (স্বাধীনতার পর দু’জনই সাহসিকতার জন্য বীরউত্তম খেতাব পান) দু’জন গানার নিয়ে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল জ্বালানি সংরক্ষণাগারে একের পর এক রকেট নিক্ষেপ করে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করে দেন।

ঘন কুয়াশার মধ্যে উড্ডয়ন বিপজ্জনক হলেও দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বদরুল আলম (স্বাধীনতার পর এই দু’জনও সাহসিকতার জন্য বীরউত্তম খেতাব পান) আরেকটি ‘এ্যালুয়েট’ যুদ্ধবিমান নিয়ে চট্টগ্রামের জ্বালানি সংরক্ষণাগারে উপর্যুপরি বোমাবর্ষণ করে ধ্বংস করে দেয়। অকস্মাৎ বাংলাদেশে বিমানবাহিনীর বীর সেনাদের হামলায় গোদানাইল ও চট্টগ্রামের ফুয়েল পাম্প ধ্বংস হয়ে গেলে মনোবলে চিড় ধরে পাকিস্তানি দখলদারদের।

আর বাংলাদেশে নেমেই ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রধান লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানী জঙ্গী বিমানগুলো শেষ করে দেয়া। যাতে লড়াইয়ের শুরুতেই আকাশটা মিত্রপক্ষের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। বাংলাদেশ ও ভারতীয় বিমানবাহিনীর বীর সেনারা তা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে তা করতে সক্ষম হয়। নিশ্চিত পরাজয়ের দিকে ধাবিত হয় পাক হানাদার বাহিনী।

এদিকে দেশের অভ্যন্তরে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দাপটে ১৯৭১ সালের এইদিনটিতে পাক-হানাদার মুক্ত হয়েছিল বরগুনা, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া, সিরাজগঞ্জের কাজীপুর।



ঢাকা/ টিপু

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন