ঢাকা, শনিবার, ২৭ আষাঢ় ১৪২৭, ১১ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

এককালে ঢাকায় যেভাবে ঈদ পালিত হতো

অনার্য মুর্শিদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-২৮ ১২:৪২:৩৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-২৮ ২:০২:৩১ পিএম
১৯৫৪ সালে ঢাকায় ঈদের জামাত, জেমস বার্কের তোলা

ঢাকায় ঈদ অনেকের কাছেই পানসে মনে হতে পারে! কিন্তু এই নগরে এককালে ঈদ কি এতোটাই পানসে ছিল? কয়েক দশক আগের ইতিহাস বলছে, ঢাকার ঈদ  ছিল খুবই জাঁকজমকপূর্ণ। যদিও তার আগের ইতিহাস বলছে ভিন্নকথা। ইংরেজ আমলে এই শহরে ক্রিসমাসের উৎসব হতো জাঁকজমকভাবে। মুঘল আমলে ঈদ উৎসব ধনীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। নায়েব-নাজিম এবং পঞ্চায়েত সর্দারদের আমল থেকে এই উৎসব সর্বজনীন হতে থাকে। ঢাকায় ঈদ উৎসবের সর্বজনীনতা  নিয়ে ঢাকা থেকে প্রকাশিত গোরা হিন্দুদের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত সাপ্তাহিক ‘সারস্বতপত্র’ ১৮৮৩ সালের ঈদ আয়োজনে লিখেছে: ‘‘এটা সত্যি যে ঢাকার সমাজের অনেক ক্রুটি ও দুর্নাম আছে। কিন্তু এখন যখন দেখি গরু কোরবানি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন চলছে সে সময় ঢাকা এসব থেকে মুক্ত। ঢাকার হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে নিখুঁত ভালো সম্পর্কই বিদ্যমান। উভয়ে উভয়ের ধর্মীয় উৎসবাদিতে যোগ দেয় এবং কেউ কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিতে চায় না। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের উচিত ঢাকাকে অনুসরণ করা।’’

মির্জা নাথানও তাঁর গ্রন্থ ‘বাহারিস্তান ই-গায়বী’তে বলেছেন: ‘‘রমজান মাসের শুরু থেকে ঈদ পর্যন্ত প্রতিদিন বন্ধুবান্ধব পরস্পর মিলিত হতো পরস্পরের তাঁবুতে। এটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সাধারণ এক রীতি।’’

ঢাকার ঈদ সর্বজনীন হওয়ার অনেকগুলো কারণ আছে। একটি উল্লেখযোগ্য কারণ ঈদে পালিত আচার অনুষ্ঠানের অধিকাংশই ছিল স্থানীয়, তথা হিন্দুয়ানি। গত চার দশকে এই উৎসবে ছিল বাহারি রকমের বৈচিত্র্য। গেল দুই দশক থেকে সেই ঐহিত্যও আমরা প্রায় হারাতে বসেছি। এখন ঈদ হয়ে উঠছে ঘরোয়া। এবার না হয় করোনার কারণে বন্দী ঘরে ঈদ কাটছে আমাদের। পার্ক আর বিনোদনের স্থানগুলোতে বেড়ানো ছাড়া ঢাকাবাসীর বর্তমানে আর কোনো ঈদ আনন্দ কি ছিল না?

ঈদগাহ ও ঈদের জামাত: ঢাকার ঈদগাহ সম্পর্কে শ্রী কেদারনাথ মজুমদার ‘ঢাকার ইতিহাস’ গ্রন্থের ২য় খণ্ডে লিখেছেন: ‘ঢাকার ধানমন্ডী এলাকায় অবস্থিত ঈদগাহ ময়দানটি আশপাশ থেকে বেশ উঁচু। প্রতি বছর এখানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। রাজপুত্র শাহ সুজার নির্দেশে ১৬৮০ সালে এই ঈদগাহ নির্মাণ করেন মীর আবুল কাশেম।’’

এই ঈদগাহ’র পাশ দিয়ে একসময় কলকল করে বয়ে যেত পাণ্ডু নদীর একটি শাখা। এই শাখা নদী জাফরাবাদের সাতগম্বুজ মসজিদের কাছে মিলিত হতো বুড়িগঙ্গার সঙ্গে। ঈদগাহসংলগ্ন মসজিদটি বর্তমানে সরকারের পুরাকীর্তি বিভাগের অধীনে আছে। তবে এর একটা অংশ চলে গেছে মাদ্রাসা এবং নতুন মসজিদের দখলে। ঐতিহাসিক তায়েশের লেখা থেকে জানা যায়, ‘‘তবুও উনিশ শতকের শেষের দিকে শহরের মুসলমানেরা ঈদের নামাজ পড়তেন এই ঈদগাহে এবং এখানে আয়োজন করা হতো একটি মেলার।’  

ঢাকায় ঈদমেলা: ঢাকায় ঈদের জামাতের পাশাপাশি মেলা জমত। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তার ‘ঢাকা সমগ্র-১’ বইয়ে লিখেছেন: ‘‘আশরাফ-উজ-জামান তাঁর আত্মজীবনীমূলক এক নিবন্ধে ঈদ মেলার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ঈদের মেলা হ’ত চকবাজারে এবং রমনা ময়দানে। বাঁশের তৈরি খঞ্চা ডালা আসত নানা রকমের। কাঠের খেলনা, ময়দা এবং ছানার খাবারের দোকান বসতো সুন্দর করে সাজিয়ে। কাবলীর নাচ হ’ত বিকেল বেলা।’’

ঈদ মিছিল: ঢাকার ঈদ আনন্দে ঈদ মিছিল একটি উল্লেখযোগ্য সংস্কৃতি। দেশের আর কোথাও এ ধরনের সংস্কৃতি দেখা যায়নি। মুঘল আমলে এটি দরবারি আনন্দ হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরে এটি গণমানুষের মিছিলে রূপ নেয়। উনিশ শতকের প্রথম দিকে আলম মুসাওয়ার নামে একজন চিত্রশিল্পী ঢাকার ঈদের মিছিল এবং মহররমের মার্সিয়া মিছিলের কিছু ছবি আঁকেন। ছবিগুলোতে দেখা যায়, ঈদের মিছিলে নায়েব-নাজিমদের নিমতলী প্রাসাদ (বর্তমানে এশিয়াটিক সোসাইটির পেছনে), চকবাজার, হোসেনি দালানের মতো সেই সময়ের  ঢাকার বিশেষ বিশেষ স্থাপনার সামনে দিয়ে যেত। মিছিলে থাকত সজ্জিত হাতি, ঘোড়া, ঘোড়ার গাড়ি, পালকি এবং অস্ত্র হাতে সৈন্যদল। কখনো কখনো ব্যান্ডপার্টিও দেখা যেত। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের অনেকের হাতে থাকত রং-বেরঙের ছাতা এবং নানান রকম বাদ্যযন্ত্র। এই মিছিল দেখার জন্য ঢাকাবাসী বেশ আগেই রাস্তার দুই ধারের উঁচু স্থাপনায় দাঁড়িয়ে যেত। ঈদ ধর্মীয় উৎসব হলেও এই মিছিলটি ছিল সম্পূর্ণ বঙ্গীয়। এই লেখকের নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘কসিদা অব ঢাকা’তে কাসিদাশিল্পী জুম্মন মিয়ার মেয়ে ইয়াসমিন ইসলাম বলেন, ‘‘আব্বা ঈদের দিন নামাজ শেষে  আমাদের ঈদ মিছিলে নিয়ে যেতেন। মিছিলটি শিশু একাডেমি থেকে হাইকোর্ট মাজার হয়ে গুলিস্তান পর্যন্ত যেত। আমাদের সব ভাইবোন, চাচাতো ভাই বোন, ভাইয়ের বউয়েরা মিলে দলবেঁধে মিছিলে যেতাম।’’
 


সর্বশেষে ঢাকার ঈদ মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন মেয়র মো. হানিফ। তারপর দীর্ঘদিন ঈদ মিছিল বন্ধ ছিল। পরবর্তীতে এটি স্বল্প পরিসরে আয়োজন করে হাজারীবাগের ‘ঢাকাবাসী’ সংগঠন। মিছিলের ধরন অনেকটা পরিবর্তিত হয়ে গেলেও তারা এখনো এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। এখানকার ঈদ মিছিলের ব্যানারে তারা ঢাকার নাগরিক সমস্যাগুলোর মধ্য থেকে যেকোনো একটিকে স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করেন।

ঈদ মিছিলে শুধু ব্যান্ড পার্টির বাদ্যই বাজত না, মিছিলে গাওয়া হতো এক প্রকার বিশেষ সংগীত। এটাকে স্থানীয় ভাষায় ‘কাসিদা’ বলা হয়। রমজানের রাতে যারা ঢাকার অলিগলিতে এই সংগীত গেয়ে রোজাদারদের ঘুম ভাঙাতেন তারাই কাসিদা গাইতেন। কাসিদাগুলো বিভিন্ন নামে পরিচিত- আমাদি কাসিদা, খোশ আমদদী কাসিদা, চাঁদারাতি আমাদ কাসিদা, ঈদ মোবারক কাসিদা।

মেহেদি আসর ও সাজসজ্জা: দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত ও নেপালে বিভিন্ন আনন্দ-উৎসবে মেহেদির কারুকাজে মেয়েরা হাত-পা রাঙিয়ে থাকে। এসব কারুকাজে শোভা পায়  ফুল, পাখি, লতাপাতা, ধর্মীয় প্রতীক এবং স্থাপত্য। যখন বাটা মেহেদীর প্রচলন ছিল তখন নকশা করতে কষ্ট হতো। টিউব মেহেদি আসার পর নকশাতেও পরিবর্তন এসেছে। মুঘল স্থাপত্যের প্রভাবও পড়েছে এসব নকশায়, পুরনো ঐতিহ্য ও আধুনিকতা সমন্বয় ঘটছে। মেহেদি পরার উৎস খুঁজলে দেখা যায় মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতেই প্রথম প্রচলন শুরু হয়। মেহেদিতে হাত রাঙানো এখন প্রায় শিল্পের পর্যায়ে চলে এসেছে। ঈদ ছাড়াও অন্যান্য উৎসবেও মেহেদির প্রচলন আছে। পার্লারেও এখন মেহেদিতে হাত রাঙানো হয়।
হাজারীবাগের ‘ঢাকাবাসী’ সংগঠন প্রতিবছর ‘শাহজাদী মেহেদি আসর’-এর আয়োজন করে। ২০০২ সাল থেকে সংগঠনটি দরিদ্র, ছিন্নমূল মানুষের শিশুদের মেহেদি পরিয়ে আসছে।

ঈদের আগে দর্জিপাড়ায় সে হিড়িক এখন আর নেই। ওয়াশিং মেশিনের আগমনে লন্ড্রির ভিড়টাও কমেছে। ঢাকার চকবাজারে এক কাগজের টুপি পাওয়া যেত। এই টুপি স্বল্পমূল্যের হলেও খুবই নান্দনিক ছিল। ফলে এটা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

রবীন্দ্রনাথের ‘বাঁশি’ কবিতায় আছে: ‘ঘরেতে এল না সে তো, মনে তার নিত্য আসা-যাওয়া/ পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।’ ঢাকাই শাড়ির সেই ঐতিহ্য আজ আর নেই বললেই চলে। সেখানে স্থান করে নিয়েছে বিদেশি পোষাক। মিরপুর ও নারয়ণগঞ্জের তাঁতগুলো একের পর এক বন্ধ হতে চলছে। ঈদের আগে তাদের যে পরিমাণ ব্যস্ততা ছিল সেই ব্যস্ততা এখন আর কল্পনাও করা যায় না। ফলে মসলিনের মতো ঢাকার তাঁতও যে খুব শীঘ্রই জাদুঘরে চলে যাবে এ কথা বলা যায়। একই রকমভাবে বলা যায়, ঢাকার অলিগলিতে ফেরিওয়ালাদের আনাগোনার কথা। এখন তাদের আর দেখা যায় না। সবশেষে হতো জুতো কেনা। ঈদের ২ মাস আগ থেকেই পুরান ঢাকার চামারটুলিতে সারারাত আলো জ্বলত। বংশালেও চলত দিন-রাত জুতা বানানোর কাজ। দীর্ঘদিন এসব জুতার কারখানা হাজারীবাগকেন্দ্রিক ছিল।

চুল কাটাও যে একটা শিল্প, ঢাকার নরসুন্দরদের কাজ দেখলেই বোঝা যায়। প্রয়োজনীয় এই কাজ কখন শিল্পের পর্যায়ে চলে গেছে ঢাকাবাসী হয়ত বুঝতেই পারেনি। অন্যান্য সময়ের চেয়ে ঈদের এক সপ্তাহ আগে নরসুন্দরের দোকানে ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
 


ঈদের খাবার: একসময় গ্রাম বাংলার মতো ঢাকার ঘরে ঘরেও তৈরি হতো বাংলা সেমাই। ছোট্ট একটা মেশিনে চালের আটা ঢুকানো হতো। তারপর হাত দিয়ে কাঁচা সেমাই পড়ত মেশিনের ঝালি দিয়ে। বাজারে বিভিন্ন রকম সেমাইয়ে সাথে এই সেমাইটি আর পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে পারেনি। চকবাজারের বাহারি ইফতারের খ্যাতি দেশজুড়ে। ইফতারের খাবার আর ঈদের দিনের খাবারের মধ্যে সামান্য একটু পার্থক্য ছিল। শিরমাল, বাকেরখানি, চাপাতি, নানরুটি, কাকচা কুলিচা, নানখাতাই, শিক কাবাব, হাড্ডি কাবাব, মাছ ও মাংসের কোফতা, শামি ও টিকা কাবাব, পরোটা, বোগদাদি রুটি, শবরাতি রুটি, মোরগ কাবাব, ফালুদার শরবতসহ নানারকম ফল পুরান ঢাকাবাসীর নিত্যখাবার। বিশেষ উৎসবে ব্যবস্থা করা হতো তোরাবন্দি খাবারের। ঈদের দিন ধনীরা এই খাবারের আয়োজন করত। এ ধরনের খাবার প্রসঙ্গে আবু যোহা নূর তার এক লেখায় উল্লেখ করেছেন: ‘‘রইসদের বাড়িতে এইসব খাবার প্রস্তুত হইত। নৌকা বানাইয়া লাল বানাতের নিচে সারি সারি বরতন ও পেয়ালা সাজাইয়া মেহমানদের সামনে এইসব খাবার রাখা হইত। এই খাবারের সারিতে থাকিত চারি প্রকারের রুটি; চারি রকমের পোলাও চারি রকমের নানরুটি, চারি প্রকারের কাবাব; পানির বোরানি চাটনি অর্থাৎ প্রত্যেক পদের খাবার; চারি পদের থাকিত। মোট চব্বিশ পদের নিচে থাকিত না।’’

বিনোদন: ঢাকায় ঈদের দিনের বিশেষ আকর্ষণ ছিলো বিভিন্ন জায়গায় কাবুলিওয়ালাদের নাচ। ঢাকার স্থায়ী কাবুলিওয়ালা ছাড়াও ঈদের আগ থেকেই অনেক কাবুলিওয়ালা ঢাকায় বাড়ি ভাড়া করে থাকত এবং ঈদের দিনগুলোতে বিভিন্ন জায়গায় ঢোল বাজিয়ে নাচত, দর্শকদের বিনোদিত করত।

ঈদে ঢাকাবাসীর আরেকটি বিনোদন ছিলো কাওয়ালীর আসর। বাড়ির আঙিনায়, ছাদে শামিয়ানা টানিয়ে সারা রাত কাওয়ালী চলত। চাঁদ রাত ও ঈদের রাতেই হতো এসব আসর। স্থানীয় শিল্পী ছাড়াও বিহারি ক্যাম্পের কিছু অবাঙালি কাওয়ালি পরিবেশন করতেন।

অগ্রসরমান নাগরিক সভ্যতা, যান্ত্রিকতা ঢাকাবাসীর কাছ থেকে ঈদের ঐতিহ্য ছিনিয়ে নিয়েছে। সব ঐতিহ্যকে হয়তো ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। অদূর ভবিষ্যতে এ নগরীকে জানতে হলেও অন্তত ঢাকাবাসীর নিজস্ব সংস্কৃতি সংরক্ষণ করা উচিত।



ঢাকা/তারা