ঢাকা     শনিবার   ১১ এপ্রিল ২০২৬ ||  চৈত্র ২৮ ১৪৩২ || ২২ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

আলো হাতে বিন্দুবাসিনীর বালিকারা

শাহেদ হোসেন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:২২, ৩০ মে ২০১৭   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
আলো হাতে বিন্দুবাসিনীর বালিকারা

বিন্দুবাসিনী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বাইরের অংশ

শাহেদ হোসেন : মহানির্বাণ তন্ত্রে বলা হয়েছে, ‘কন্যা প্যেবং পালনীয়া/শিক্ষানীয়তি যত্নতঃ’। অর্থাৎ ‘কন্যা সন্তানকে ভালভাবে পালন করবে, তার শিক্ষার প্রতি যত্ন নেবে।’ পালনের দায়িত্বটা পিতার কাঁধে বর্তালেও শিক্ষার যত্ন কিন্তু শিক্ষাগুরু কিংবা প্রতিষ্ঠানের ওপরেই বর্তায়। শতাব্দী ধরে টাঙ্গাইল শহরের বিন্দুবাসিনী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মেয়েরা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যত্নের সাথেই বেড়ে উঠছে।

প্রতিবেদন তৈরির জন্য সম্প্রতি শতবর্ষী বিন্দুবাসিনী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। প্রধান শিক্ষক মো. রেজুয়ানের কক্ষে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করতেই টেবিলের পাশে ঘূর্ণায়মান রিচার্জেবল ফ্যানের হালকা বাতাস প্রচণ্ড গরমে কিছুটা স্বস্তি এনে দিল। এই ফাঁকে বলে নেই, টাঙ্গাইল শহরে লোডশেডিংয়ের মাত্রা এতোটাই বেশি যে, এখানে বিদ্যুৎ কখন যায় না, বরং কখন আসে- তার হিসেব রাখাটাই মুশকিল। পরিচয় দিয়ে কথাবার্তা বলার ফাঁকে সেখানে উপস্থিত সহকারী শিক্ষক সাইদুল হাসান প্রধান শিক্ষককে বলছিলেন, ‘স্যার, লোডশেডিংয়ে মেয়েদের কষ্ট অবর্ণনীয়। ওদের এভাবে ক্লাসে রাখতে খুব কষ্ট হয়।’ সাইদুল হাসান যখন কথাগুলো বলছিলেন, তখন কণ্ঠে যতোটা না ছিল শিক্ষকের স্নেহ, তারচেয়ে বেশি ছিল পিতৃত্বের মমত্ববোধ। বোঝাই যায়, এই মমত্ববোধের কারণেই এখানকার শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের যত্মটাও বেশি।

১৯৯৭ সালে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া বিন্দুবাসিনী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্ম ১৮৮২ সালের ৮ এপ্রিল। পাঁচ আনির জমিদার দ্বারকানাথ রায় চৌধুরীর স্ত্রী বিন্দুবাসিনী রায় চৌধুরানী শূন্য দশমিক ৮২ একর জমির ওপর স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। তার নামেই প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি প্রথমে দেখভাল করতেন তারই দুই ছেলে প্রমথ নাথ রায় চৌধুরী ও  মন্মথ রায় চৌধুরী। প্রতিষ্ঠাকালে এটি ছিল প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯২২ সালে এটি মাধ্যমিক স্তরে এবং ১৯৩৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠানটিকে বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি দেয়। ১৯৬৮ সালে ১৫ নভেম্বর এই স্কুলটি জতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে স্কুলটি মোট ১ দশমিক ২৯ একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

প্রধান শিক্ষক মো. রেজুয়ান জানালেন, প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রভাতি ও দিবা শাখায় এখন প্রায় ২ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। আর শিক্ষক রয়েছেন ৫৫জন। বিন্দুবাসিনী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের সঙ্গে এই স্কুলের কিন্তু একটি আশ্চর্যরকম মিল আছে। ছেলেদের স্কুলটিতে যেমন মানবিক বিভাগ থাকা সত্ত্বেও সেখানে কোনো শিক্ষার্থী নেই, মেয়েদের এই স্কুলটিতেও একই অবস্থা। এখানে নবম ও দশম শ্রেণির প্রায় সব শিক্ষার্থীই বিজ্ঞান বিভাগে। বাণিজ্য বিভাগে পড়ছে এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা সর্বসাকুল্যে ১৫ জনের মতো। শিক্ষার্থী আর অভিভাবক সবারই আগ্রহ বিজ্ঞান বিভাগে।

ভালো স্কুল মানেই ভালো ফলাফল। প্রধান শিক্ষক জানালেন, প্রাথমিক, সমাপনী, জেএসসিতে তার স্কুলে পাসের হার শতভাগ। এসএসসিতে কোনো বছর দুএকজন শিক্ষার্থী অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে পরীক্ষায় অংশ না নিলে পাসের হার ৯৮ দশমিক ৫ থেকে ৯৯ শতাংশে থাকে। ২০১২ সালে স্কুলটি ঢাকা বোর্ডে ১০ম, পরের বছর ২০তম এবং এর পরের বছর ১১তম অবস্থানে ছিল। এবারও এখানে পাসের হার শতভাগ। চলতি বছর এসএসসিতে পরীক্ষার্থী ছিল ২৮১ জন। এদের মধ্যে এ প্লাস পেয়েছে ২৩৯ জন, এ পেয়েছে ৪১ জন এবং এ মাইনাস পেয়েছে মাত্র একজন।

পড়াশোনার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমেও এই স্কুলের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বেশ সাফল্যজনক। গত বছর বাংলাদেশ টেলিভিশনে অনুষ্ঠিত ‘মা ও শিশু’ বিষয়ক স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্কুলের অংশগ্রহণকারীরা। একই বছর শিক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ক-গ্রুপে জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা। চলতি বছর সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে রানার আপ হয়েছিল এখানকার শিক্ষার্থীরা। ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় স্কুল শাখা থেকে জাতীয় পর্যায়েও অংশগ্রহণ রয়েছে এখানকার শিক্ষার্থীদের। প্রধান শিক্ষক জানালেন, শিক্ষার্থীরা হারুক বা জিতুক সেটা বড় কথা নয়, জাতীয় পর্যায়ে খেলাধুলাসহ সব ধরণের প্রতিযোগিতায় এই স্কুলের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ যেন থাকে সেই চেষ্টা করা হয়।

 


প্রধান শিক্ষক মো. রেজুয়ান

 

স্কুলে ভর্তি প্রতিযোগিতা কেমন জানতে চাইলে হেসে ফেলেন প্রধান শিক্ষক মো. রেজুয়ান। তিনি বললেন, ‘আপনাকে সর্বশেষ ভর্তি আবেদন ও আসন সংখ্যার চিত্রটা দেখাই, প্রতিযোগিতার অবস্থা নিজেই বুঝতে পারবেন। চলতি বছর প্রথম শ্রেণিতে আবেদন পড়েছে ২০০৯টি, আসন ছিল ১২০টি। তৃতীয় শ্রেণিতে আসন ছিল সাতটি, আবেদন পড়েছে ৫১৯টি। আর ষষ্ঠ শ্রেণিতে আসন ছিল ১২০টি, আবেদন পড়েছে ১ হাজার ৫৫৬টি।’

পড়াশোনা, খেলাধুলা কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জেলায় বিন্দুবাসিনীর বালিকারা এগিয়ে থাকলেও জাতীয় পর্যায়ে সফল ব্যক্তিদের তালিকায় তাদের নাম দেখা যায় না কেন? বিষয়টি জানতে চাইলে মো. রেজুয়ান বললেন, ‘এর পেছনে কাজ করে আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা। এইচএসসি বা বড়জোর অনার্সের পর ৯০ শতাংশেরও বেশি মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। বাকী যারা থাকে তাদের কেউ চাকরি-বাকরি করে আবার কেউ করে না। তবে ইদানিং চিত্রটা কিছু বদলেছে। টাঙ্গাইলের বর্তমান জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা লায়লা খানম এই স্কুলেরই প্রাক্তন ছাত্রী।’

মো. রেজুয়ান জানালেন, ভালো ফলাফলের জন্য এই স্কুলে সারা বছরই শিক্ষার্থীদের বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়। এর পাশাপাশি তাদের মানসিক বিকাশটা যেন সুন্দর হয় তার জন্যও থাকে বিশেষ নজরদারি। প্রতি শ্রেণিতেই দুই থেকে তিনজন করে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি করা হয়েছে। কোনো ছাত্রী অস্বাভাবিক কিংবা সন্দেহজনক আচরণ করছে কিনা প্রতিনিধিরা সরাসরি প্রধান শিক্ষককে তা জানায়। স্কুলের প্রত্যেক ছাত্রীর কাছেই প্রধান শিক্ষকের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর দেওয়া আছে। যে কোনো সমস্যায় যখনই প্রয়োজন তখনই ছাত্রীদের ফোন করতে বলা হয়েছে। স্কুল আঙ্গিনায় যাতে কোনো বখাটে বা বহিরাগত প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য সীমানা প্রাচীরের ভেতরে ও বাইরে বসানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা।

বিদায় বেলা ঐতিহ্যবাহী এই স্কুলটির প্রধান শিক্ষক জানালেন, টাঙ্গাইলের নারীদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতেই শত বছর আগে এক মহিয়সী নারীর হাত দিয়ে যাত্রা করেছিল বিন্দুবাসিনী বালিকা বিদ্যালয়। আজ ও আগামীতেও যেন এই স্কুলের মেয়েরা দেশের জন্য আলোর মশাল হাতে এগিয়ে যেতে পারে সে চেষ্টাই করে যাচ্ছেন এখানকার শিক্ষকরা।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩০ মে ২০১৭/শাহেদ/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়