ঢাকা     শুক্রবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ১০ ১৪২৭ ||  ০৭ সফর ১৪৪২

চিংড়ি চাষ থেকে মুক্তির জন্য রক্তক্ষয়

রফিকুল ইসলাম মন্টু || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:৩১, ১২ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১১:৫৬, ২৮ আগস্ট ২০২০
চিংড়ি চাষ থেকে মুক্তির জন্য রক্তক্ষয়

পশ্চিম উপকূলে মাঠের পর মাঠ চিংড়ি চাষ হচ্ছে। এই চাষের বিরুদ্ধে আন্দোলনও হয়েছে।

উন্নত দেশের ধনীদের রসনাবিলাসের জন্য তাদেরই সৃষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর ফড়িয়াবাজিতে চিংড়ি-চক্রান্তের যে জাল পাতা হয় এই গরিব দেশের উপকূলে, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন কম হয়নি। ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত চিংড়ি চাষ-বিরোধী তীব্র আন্দোলন হয়েছে উপকূলীয় অঞ্চলে। খুলনার পাইকগাছা ছিল এ আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রস্থল। এখান থেকে বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। একই সময়ে অন্যান্য স্থানেও গড়ে ওঠে চিংড়ি চাষে প্রতিরোধ। এজন্য মানুষ জীবন পর্যন্ত দিয়েছে! এভাবে বেশ কিছু এলাকা চিংড়ি চাষমুক্ত রাখা সম্ভব হয়েছে।

পাইকগাছার দেলুটি ও গড়ইখালী এ রকম দুটি চিংড়ি আগ্রাসনমুক্ত ইউনিয়ন। খুলনার পাইকগাছা উপজেলার দ্বীপ ইউনিয়ন দেলুটি। সেখানকার চাষিরা তুলনামূলক ভালো আছেন। গত তরমুজ ও সবজির মৌসুমে এক বিঘা জমি থেকে লাখ টাকাও উপার্জন করেছেন সেখানকার চাষিরা। এসবই আন্দোলনের ফসল দাবি করে চিংড়ি চাষ-বিরোধী নেতারা জানান, দাকোপ বটিয়াঘাটার অনেক এলাকা চিংড়ি চাষমুক্ত। এসব এলাকার মানুষ বছরে দু’বার ধান চাষ করেন। গরু, বাছুর আগের মতো উন্মুক্ত- পরিবেশটাই অন্যরকম!

খুলনার পাইকগাছা উপজেলার সোলাদানা খেয়াঘাটে দাঁড়িয়ে শিবসা নদীর ওপারে যে দ্বীপ দেখা যায়, তার নাম দেলুটি। নদীর গা ঘেঁষে ঘুরে গেছে বেড়িবাঁধ। বাঁধের দু’ধারে বাবলা গাছের সারি আর ভেতরে সবুজে ভরা অন্যরকম এক গ্রাম। বাড়িগুলো ছাওয়া ঘন গাছপালায়। গোয়ালে আছে গরু; আছে সবজি ক্ষেত, ধানের আবাদ।   

শিবসা নদীর ঠিক অন্যপাড়ে একই উপজেলার আরেকটি ইউনিয়ন সোলাদানা। এই ইউনিয়নের ছবি একেবারেই উল্টো। খোলা ফসলি মাঠের চিহ্ন নেই। এখানে আগে কোথায় খাল ছিল, কোথায় মাঠ ছিল ঠিক করে কেউ আর এখন বলতে পারে না। চারদিকে পানির ভেতর দিয়ে মাথা উঁচু করে আছে লবণে পোড়া বাড়িঘর। ঘরের সামনে উঠোনের কথা প্রায় ভুলেই গেছে এই ইউনিয়নের বেশিরভাগ মানুষ। ঘর থেকে বের হলেই লবণ-পানি। চিংড়ি ঘেরের এই লবণ পানির কারণে জীবনের অনেক নিয়ম বদলাতে হয়েছে বাসিন্দাদের। সুপেয় খাবার পানির জন্য ব্যয় করতে হয় অনেকটা সময় ও শ্রম। গবাদিপশু লালন-পালন বাদ দিয়েছেন অনেকে। অথচ এক সময় এই এলাকা গ্রাম-বাংলার আর দশটা জায়গার মতোই ছিল সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা। সেই সোলাদানায় একদিন হানা দেয় চিংড়ি চাষ, আর দ্রুত বদলে যায় পরিবেশ। অথচ ঠিকই টিকে থাকে দেলুটির সবুজ। কীভাবে?

১৯৯০ সালের কথা। চিংড়ি চাষিরা ফসলি মাঠ দখলে নিতে মরিয়া। অন্যদিকে খাস জমি লিজ নিয়ে ফসল আবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করেন যে ভূমিহীন মানুষ, তারা এর বিরোধিতা করেন। এদের সঙ্গে যুক্ত হন ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ। একদিকে তৎকালীন প্রভাবশালী চিংড়ি চাষি ওয়াজেদ আলী বিশ্বাসের লোকজন, অন্যদিকে দেলুটির সর্বস্তরের নাগরিক গোষ্ঠী। তুমুল লড়াইয়ে নাগরিক গোষ্ঠীর জয় হয় বটে, কিন্তু প্রাণ দিতে হয় দেলুটির ভূমিহীন সমিতির নেত্রী করুণাময়ী সরদারকে।

তৃণমূলের এই নেত্রীর আত্মত্যাগই বাঁচিয়ে রেখেছে দেলুটির সবুজ- বলছিলেন দেলুটির সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সমরেশ কান্তি হালদার। ভূমিহীন আন্দোলনের অগ্রভাবে ছিলেন তিনি। এলাকায় তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা। চারবারের নির্বাচনে কোনো পোস্টার বা ক্যাম্পেইন ছাড়াই ভোট পেয়ে জিতেছেন তিনি। তার মুখেই জানা গেল, এলাকাবাসীর আন্দোলনের ফসল আজকের সবুজ দেলুটি। ইউনিয়নের আওতাধীন চারটি পোল্ডারের মধ্যে তিনটিই চিংড়ি চাষের আওতায় চলে গেছে। শুধু এই ২২ নম্বর পোল্ডারটি চিংড়িমুক্ত রাখা সম্ভব হয়েছে। আর এই পোল্ডারের আওতাধীন ১৩টি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ কৃষিকাজ করে বেশ ভালো আছে।

স্লুইজ গেট ও পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও দেলুটির ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। স্লুইজ গেটগুলো পুরনো হলেও সংস্কার করা হয়েছে বেশ কয়েকবার। নেদারল্যান্ড সরকার পরিচালিত ব্লুগোল্ড প্রকল্পের আওতায় স্লুইজ গেট সংস্কার করা হয়। স্লুইজ গেট ও পানি ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলোও সক্রিয় এবং এর সঙ্গে স্থানীয় জনসাধারণ সম্পৃক্ত রয়েছে।  

করুণাময়ী সরদার, চিংড়ি-বিরোধী আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছেন। ছবি সৌজন্য: নিজেরা করি

 

করুণাময়ীর রক্তমাখা সবুজ
চিংড়ি চাষ-বিরোধী আন্দোলনে করুণাময়ী সরদার ছিলেন সামনের সারিতে। প্রতিপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করতে এগিয়ে গিয়ে গুলির আঘাতে প্রাণ দিয়েছেন। এ কারণেই চিংড়িবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে ‘করুণাময়ী’ নামটি জ্বলজ্বল করছে। তাঁর হত্যাকাণ্ডের দিন ৭ নভেম্বর এলাকার মানুষ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করে। তাঁর স্মরণে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ।

ভূমিহীন করুণাময়ী সরকারি খাস জমি বরাদ্দ নিয়ে সপরিবারে জমিতে ধান আবাদ করতেন। সংসারের প্রধান আয় ছিল এটাই। কিন্তু ধান চাষ টিকিয়ে রাখার সামনে বড় বাধা ছিল লোনা পানির চিংড়ি চাষ। ফলে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান তিনি। তাঁকে সমর্থন দেয় আরও অনেকে। আস্তে আস্তে চিংড়িবিরোধী আন্দোলন জোরদার হয়। জীবিকার তাগিদে লড়াইয়ে নামে ভূমিহীন মানুষ।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করুণাময়ীর সাহসের কথা। ১৯৯০ সালের মে-জুন মাসের দিকে দেলুটিতে চিংড়ি চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠেন তৎকালীন জাতীয় পার্টির প্রভাবশালী নেতা ওয়াজেদ আলী বিশ্বাস। ইউনিয়নের অন্যান্য এলাকা থেকে প্রায় ৪০০ বিঘা জমি লিজ নেন তিনি। ২২ নম্বর পোল্ডারের জমিতেও লোলুপ দৃষ্টি পড়ে তার। কিন্তু এলাকার ভূমিহীনেরা কিছুতেই এ জমি ছাড়বে না। হরিণখোলা বিত্তহীন সমিতি রুখে দাঁড়ায়। বাঁধ কেটে লোনা পানি কিছুতেই জমিতে ঢোকাতে দেয় না তারা।

বাধ্য হয়ে সে বছর ৭ নভেম্বর বাঁধ কেটে লোনা পানি  ঢোকানোর জন্য ওয়াজেদ আলী বিশ্বাসের লোকজন আসে। যে কোনো মূল্যে তারা বাঁধ কাটবেই। এর বিপরীতে প্রস্তুতি নেয় ভূমিহীন সমিতির সদস্যরা। তারা মিছিল নিয়ে হরিণখোলায় হাজির হয়। ২২ নম্বর পোল্ডারের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন জড়ো হয় ভূমিহীনদের সমর্থনে। সঙ্গে ছিলেন এলাকার ইউপি মেম্বারসহ নেতৃস্থানীয় লোকজন। দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান ও বাদানুবাদের এক পর্যায়ে গর্জে ওঠে দখলদারদের বন্দুক। একের পর এক বোমা ফাটায় তারা। ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় চারদিক। এরই মধ্যে প্রতিপক্ষের ছোড়া একটি গুলি সরাসরি আঘাত করে করুণাময়ীর মাথায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। তাঁর মৃতদেহ পরে আর পাওয়া যায়নি। যেন দেলুটির সবুজের মাঝেই মিশে আছে করুণাময়ীর লাল রক্ত।    

বাঁধ মেরামতে স্বেচ্ছাশ্রমের বিরল দৃষ্টান্ত
‘আম্পানের পর কুড়িকাহুনিয়ায় আমরা যে বাঁধ দিয়েছিলাম, তা ভেঙে গেছে। আজ ভাটার সময় বাঁধ বাঁধা হবে। পুরুষ মানুষ কেউ বাড়িতে থাকবেন না। সবাই চলে আসবেন কাজে।’ প্রতাপনগর ইউনিয়নের কেন্দ্রবিন্দু তালতলা বাজারে মাইকে ঘোষণা হচ্ছে। ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হতে থাকে বাজারের দোকানপাট। সবার মধ্যে তাড়া, সময় কম। ভাটার সময়টুকুর মধ্যে যতটা সম্ভব কাজ সারতে হবে। সব কাজ ফেলে মানুষ ছুটতে শুরু করে কুড়িকাহুনিয়া আর হরিশখালীর দিকে। বাঁধ জোড়া লাগাতে না পারলে যে রক্ষা নেই!

হরিশখালী বাঁধের ওপরে দাঁড়িয়ে চোখে পড়ে কয়েকজন শিশুও ছুটছে বাঁধ মেরামতের কাজে। হাজার হাজার মানুষের এক মহাসম্মিলন। কেউ বাঁশ পুঁতছে, কেউ মাটির ওপর খড় বিছিয়ে দিচ্ছে, আবার কয়েকজন মিলে হাতে হাতে মাটি ফেলছে। স্বেচ্ছাশ্রমের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন পশ্চিম উপকূলীয় এলাকার মানুষ। বাঁধ নির্মাণ কাজে এলাকার মানুষের বন্ধন বেশ দৃঢ়। জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ছাত্র, মজুর বলে কোনো কথা নেই। ডাক পেলে সবাই বেরিয়ে আসেন ঘর থেকে।

বাঁধ মেরামতের কাজটি কীভাবে সমন্বয় হয়? জানতে চেয়েছিলাম বাঁধ মেরামতের কাজে নেতৃত্বদানকারী স্থানীয় যুবক ‘প্রিয় মাতৃভূমি প্রতাপনগর’-এর সমন্বয়ক মাহমুদুল হাসান মিরনের কাছে। তিনি বলেন, ‘বাঁধ মেরামতে সরকার থেকে খুব বেশি সহায়তা মেলে না। স্থানীয় মানুষদেরকেই এ কাজ করতে হয়। ঘের মালিকসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের চাঁদার টাকায় অধিকাংশ বাঁধ মেরামত হয়। সবাই এগিয়ে আসে। মানুষজন স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে।’

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পর স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামত, আশাশুনির প্রতাপনগরের হরিশখালীর ছবি

 

হরিশখালীর বাঁধ মেরামতের কাজে প্রায় প্রতিদিন উপস্থিত থাকেন বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। সরাসরি কাজে হাত লাগান তারা। হাতে-পায়ে কাদামাখা অবস্থায় কাজ থেকে উঠে এসে কথা বলছিলেন আশাশুনির এপিএস ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী শাহজাহান হোসেন। তিনি বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে অর্থ সংগ্রহ করে আমরা এ কাজ করছি। আমাদের কাজ আমাদেরই করতে হবে।’

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের দু’দিন পর থেকে আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের চারটি পয়েন্টে বাঁধ মেরামতের কাজ করছেন অন্তত ৫ হাজার মানুষ। ঘূর্ণিঝড়ের দেড়মাস পেরিয়ে গেলেও বাঁধ জোড়া লাগেনি। কোনো কোনো স্থানে কাজ প্রায় শেষ করে আনলেও শেষ মুহূর্তে তা আবার ধ্বসে যাচ্ছে। প্রতাপনগরের সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ আবু দাউদ বলেন, ‘আমরা নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করছি। সরকারের ভরসায় হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে আমাদের ভেসে যেতে হবে। বাঁধ মেরামতের জন্য সরকার থেকে যথাসময়ে বাঁশসহ অন্যান্য উপকরণ পেলে এ ইউনিয়নের মানুষ আরও আগেই পানি থেকে মুক্তি পেতো।’

ঘূর্ণিঝড় আম্পান পরবর্তী সময়ে পশ্চিম উপকূলের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে বেশ কয়েকটি স্থানে স্বেচ্ছাশ্রমে বেড়িবাঁধ মেরামতের দৃশ্য চোখে পড়ে। এর মধ্যে শ্যামনগরের গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, কাশিমাড়ি, পদ্মপুকুর, কয়রার হরিণখোলা, হাজতখালী উল্লেখযোগ্য। আবার অনেক স্থানে পানি বেশি থাকার কারণে বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু করাই সম্ভব হয়নি। আবার কোথাও কোথাও বাঁধ মেরামত সম্পন্ন হওয়ায় মানুষজনের মাঝে স্বস্তি ফিরেছে। প্রায় সব স্থানেই স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের প্রয়োজনেই বাঁধ মেরামতের সূচনা করেন। নীলডুমুরের প্রবীণ বাসিন্দা মোবারক হোসেন বলছিলেন, স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণের এই সংস্কৃতি এ অঞ্চলে অনেক আগে থেকেই। এ এলাকায় যখন কোনো বাঁধ ছিল না, তখন ছিল অষ্টমাসী বাঁধ। আমন ফলানোর জন্য আট মাসের জন্য বাঁধ দেওয়া হতো বলে এই নাম। সে বাঁধও গ্রামবাসী মিলেই করতো।’

সরেজমিনে বাঁধ মেরামত এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এগুলো প্রকৃতপক্ষে রিংবাঁধ। অর্থাৎ যে স্থানে বাঁধ ধ্বসে গেছে, সেই স্থান থেকে অনেক দূর দিয়ে জমি কিংবা বাড়িঘরের ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে ছোট আকারের একটি বাঁধ দেওয়া হয়, যাতে আপাতত পানি প্রবেশ বন্ধ হয়। কিন্তু বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ঘুরিয়ে বাঁধ দেওয়ার ফলে অনেক মানুষের জমি ও বাড়িঘর নষ্ট হয়। জীবন ও সম্পদ রক্ষার তাগিদে স্থানীয় বাসিন্দারা কোনো ক্ষতিপূরণ ছাড়াই এটুকু জমি ছেড়ে দেন। বিনিময়ে পরবর্তী সময়ে তারা কিছুই পান না। বিভিন্ন এলাকায় এভাবে শত শত একর জমি রিং বাঁধের ভেতরে চলে যাচ্ছে। বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাতিনাখালীতে রিং বাঁধ দিতে গিয়ে বাড়িঘরসহ ৬ বিঘার মতো জমি নষ্ট হয়েছে।     

স্থানীয় বাসিন্দা সংবাদকর্মী আবদুল হালিম বলেন, ‘জীবন ও সম্পদ রক্ষার প্রয়োজনে ঘূর্ণিঝড়ের পরপর ধ্বসে যাওয়া স্থানে তড়িঘড়ি করেই রিংবাঁধ দেওয়া হয়। কার জমি গেল, কার ভিটে গেল, এটা দেখার সময় তখন থাকে না। যাদের বেশি জমি আছে, তাদের কিছু জমি গেলে হয়তো সমস্যা নেই, কিন্তু যার শেষ সম্বলটুকু রিংবাঁধে চলে যায়, তার জন্য সরকারের ভাবা উচিত। সরকারিভাবে বাঁধ নির্মাণে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও থাকা উচিত।’ সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিষদের সদস্য সচিব আশেক-ই-এলাহী এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন।

পশ্চিম উপকূলের বাঁধভাঙা মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বাঁধ নির্মাণের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সাতক্ষীরা পাউবো (বিভাগ-১)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়ের বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ শুরু করতে পারে না। এলাকার মানুষ সঙ্গে সঙ্গে কাজে নেমে পড়েন। এ এক বিরল দৃষ্টান্তই বটে। তবে তারা যে বাঁধটি দেন, এটা রিংবাঁধ; স্থায়ী কিছু নয়। তবুও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের এ কাজটি গুরুত্বপূর্ণ।’

 

পড়ুন ধারাবাহিকের তৃতীয় পর্ব ** বাঁধভাঙা আশ্বাসে শুধুই দীর্ঘশ্বাস

পড়ুন ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্ব ** সর্বনাশের ষোলকলা চিংড়িতে

পড়ুন ধারাবাহিকের প্রথম পর্ব ** বাঁধের ফাঁদে উপকূলজীবন

একের পর এক ঝড়-জলোচ্ছ্বাস কীভাবে উপকূলবাসীকে বারবার নিঃস্ব করে দিচ্ছে জানতে পড়ুন: ** ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে আরো ৪ বিপর্যয়

 

আগামীকাল পড়ুন : বাঁধের মালিকানা দিতে হবে জনগণকে

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়