রমজানে মুসলমানদের ঐতিহাসিক বিজয়সমূহ
মুফতি আতাউর রহমান || রাইজিংবিডি.কম
রমজান ইবাদত ও আধ্যাত্মিক সাধনার মাস। কিন্তু ইসলাম আধ্যাত্মিক সাধনার কারণে জীবনের স্বাভাবিক ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অনুমতি দেয় না, বরং রমজান মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মুসলমানরা সে আত্মবল ও ঈমানি শক্তি অর্জন করে তাকে দ্বিন ও ইসলামের অগ্রযাত্রায় ব্যয় করার নির্দেশ দেয়। এজন্য আমরা দেখি, মুসলিম ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিজয় রমজান মাসে এসেছে। নিম্নে রমজানে মাসে অর্জিত এমন কয়েকটি ঐতিহাসিক বিজয়ের বর্ণনা দেওয়া হলো।
বদর যুদ্ধ : দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমজান মদিনার উপকণ্ঠে বদর নামক প্রান্তরে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ। এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী মক্কার কুরাইশ বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করে। মুসলিম জাতির ইতিহাসে বদর যুদ্ধের তাৎপর্য অপরিসীম। কেননা এটা ছিল মুসলমানদের প্রথম সামরিক বিজয়। এই বিজয়ের মাধ্যমে মুসলমানরা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অসম প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করায় মুসলমানদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদের বদরে সাহায্য করেছিলেন এবং তোমরা ছিলে দুর্বল। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যেন সফল হতে পারো।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১২৩)
মক্কা বিজয় : অষ্টম হিজরির ২৩ রমজান মুসলিম বাহিনী ঐতিহাসিক মক্কা নগরী জয় করে। এটা মক্কার মুশরিকদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের চূড়ান্ত বিজয়। এই বিজয়ের মাধ্যমে মুসলমানরা আরবের অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পাশাপাশি পৌত্তলিক হাত থেকে পবিত্র কাবাঘর মুক্ত হয়। ইসলামের ব্যাপারে আরব জাতিগুলোর দ্বিধা ও সংশয় কেটে যায়, ফলে তারা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এবং তুমি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বিনে প্রবেশ করতে দেখবে।’ (সুরা নাসর, আয়াত : ১-২)
বুওয়াইবের যুদ্ধ : ১৩ হিজরির ১৩ রমজান কুফার নিকটবর্তী ফুরাত নদীর তীরে মুসলিম বাহিনী মুখোমুখি হয় পারস্য সম্রাটের বাহিনীর সঙ্গে। যুদ্ধে পারস্য বাহিনী আধুনিক সব অস্ত্র ও যুদ্ধোপকরণের অধিকারী ছিল। বিপরীতে মুসলমানরা সাধারণ ঢাল-তালোয়ার ও বর্শা নিয়ে নেমেছিল। সৈন্য সংখ্যাও পারসিক বাহিনী কয়েকগুণ এগিয়ে ছিল। কিন্তু আল্লাহ মুসলমানদের বিজয় দান করেন। এই বিজয় পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ডেকে আনে। এই যুদ্ধকে ঐতিহাসিক ইয়ারমুক যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করা হয়। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৭/৩৬)
স্পেন বিজয় : ৭১১ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৯২ হিজরির রমজান সেনাপতি তারেক বিন জিয়াদের মুসলিম বাহিনী স্পেন জয় করে। তারা উত্তর আফ্রিকা থেকে জাহাজে করে স্পেনে গমন করে এবং স্পেনের শাসক রডারিককে পরাজিত করেন। মাত্র তিন বছরের ভেতর মুসলিম বাহিনী সমগ্র আইবেরীয় উপদ্বীপ (স্পেন ও পর্তুগাল) জয় করে এবং ফ্রান্সের দিকে অগ্রসর হয়। মুসলমানরা প্রায় আটশ বছর স্পেন শাসন করে। ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে আন্দালুস বা মুসলিম স্পেনের অসামান্য অবদান রয়েছে। (আল বায়ানুল মাগরিব : ৫/২)
আইনে জালুত যুদ্ধ : ২৫ রমজান ৬৫৮ হিজরি মুসলিম বাহিনী ঐতিহাসিক আইনে জালুত যুদ্ধ জয় করে। ফিলিস্তিনের আইনে জালুত নামক স্থানে মোঙ্গলীয় বাহিনীর সঙ্গে মুসলিম মামলুক বাহিনীর যুদ্ধ হয়। মুসলিম ইতিহাসে এই বিজয় অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে। কেননা মোঙ্গলীয় বাহিনীর হাতে ইতিপূর্বে বাগদাদ ও মধ্য এশিয়ার মুসলিম অঞ্চল ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছিল। মোঙ্গলীয় বাহিনীর সামনে মুসলিম বাহিনী কোনোভাবেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছিল না। অবশেষ আইনে জালুতের যুদ্ধে তারা পরাজিত হয়। বলা হয়, এই মুসলিমরা বিজয়ী না হলে সমগ্র আফ্রিকা ও আরব উপদ্বীপ মোঙ্গলীয়দের হাতে ধ্বংস হয়ে যেত। (আল মুখতাসার ফি আখবারিল বাশার : ৩/২০৫)
আমুরিয়্যা যুদ্ধ : ২২৩ হিজরির রমজান মাসে আব্বাসীয় খলিফা মুতাসিমের বাহিনী বাইজেন্টাইন শহর আমুরিয়য়্যা জয় করে। এটা ছিল একটি প্রতিশোধমূলক হামলা এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বড় জয়। এর আগে বাইজেন্টাইন বাহিনী একাধিক মুসলিম শহরে আক্রমণ করে লুটপাপ করে এবং মুসলিম নারীদের বন্দি করে নিয়ে যায়, তাদের অসম্মান করে। এই বিজয় মুসলিম বাহিনীকে উজ্জীবিত করে এবং বাইজেন্টাইন বাহিনীর পতন ত্বরান্বিত করে। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ১০/৩১৪)
বেলগ্রেড বিজয় : সুলতান সুলাইমান ২৫ রমজান ৮২৭ হিজরি সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড জয় করেন। তার আগে একাধিক উসমানীয় সুলতান বেলগ্রেড জয় করার চষ্টো করে ব্যর্থ হন। ইউরোপের দরজাখ্যাত এই শহরের বিজয় উসমানীয়দের ইউরোপ অভিযান সহজ করেছিল এবং হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে জয়যাত্রার দরজা খুলে দিয়েছিল। সুলতান সুলাইমান ক্ষমতা গ্রহণের পর এটাই ছিল তার প্রথম বড় বিজয়। (আল কানুনি আল কায়িদ, পৃষ্ঠা-২৮)
এছাড়াও রমজান মাসে মুসলিম বাহিনী সিরাকুজা, কার্ক, সাইপ্রাস, বসনিয়া ইত্যাদি শহর ও অঞ্চল জয় করে। যা মুসলিম ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায় রচনা করেছে।
হে আল্লাহ! এই রমজানেও আপনি নিপড়িত মুসলিমদের বিজয় দান করুন। আমিন।
ঢাকা/শাহেদ