রোনালদো: এখনো শেষ হয়নি যার গল্প
সাতসতেরো ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া
পর্তুগালের জার্সিতে এটি তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। বয়স ৪১ পেরিয়েছে, তবুও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সেই এক নাম— ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে পর্তুগালের ১-১ গোলে ড্রয়ের ম্যাচে প্রত্যাশিত ছন্দে দেখা যায়নি তাকে। পুরো ম্যাচে তিনি ছিলেন অনেকটাই নিষ্প্রভ। গোলের সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি, আর ম্যাচ শেষে সমালোচকদের একটি অংশ প্রশ্ন তুলেছে—রোনালদো কি এখনও পর্তুগালের আক্রমণের প্রধান ভরসা? তবে রোনালদোর গল্প কখনোই একটি ম্যাচের গল্প নয়। এটি এমন এক ফুটবলারের কাহিনি, যিনি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছেন। প্রতিবার যখন মনে হয়েছে তার সময় শেষ, তখনই তিনি নতুন করে ফিরে এসে ভেঙেছেন রেকর্ডের পর রেকর্ড।
মাদেইরার দরিদ্র ঘর থেকে বিশ্বসেরা হওয়ার গল্প
১৯৮৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্তুগালের মাদেইরা দ্বীপের ফুঞ্চালে জন্মগ্রহণ করেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ছোটবেলায় পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। বাবা ছিলেন পৌরসভার মালি এবং ক্লাবের কিটম্যান, মা কাজ করতেন রান্নার সহকারী হিসেবে। শৈশব থেকেই ফুটবল ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। মাত্র ১২ বছর বয়সে পরিবার ছেড়ে চলে যান লিসবনে, যোগ দেন স্পোর্টিং ক্লাব দে পর্তুগালের একাডেমিতে। সেখানেই শুরু হয় স্বপ্নপূরণের পথচলা।
স্যার অ্যালেক্সের চোখে ধরা পড়া বিস্ময়
২০০৩ সালে স্পোর্টিংয়ের বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে নজর কাড়েন স্যার অ্যালেক্সের। ম্যাচের পরই ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তাকে দলে ভেড়ায়।ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে এসে কিশোর উইঙ্গার থেকে তিনি হয়ে ওঠেন গোলমেশিন। ক্লাবটির হয়ে জেতেন তিনটি প্রিমিয়ার লিগ, একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং ২০০৮ সালে প্রথম ব্যালন ডি’অর।
রিয়াল মাদ্রিদে ইতিহাসের সেরা অধ্যায়
২০০৯ সালে রেকর্ড ট্রান্সফারে যোগ দেন রিয়াল মাদ্রিদে। এরপর শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়।মাত্র ৪৩৮ ম্যাচে ৪৫০ গোল করে রিয়াল মাদ্রিদের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন রোনালদো। তার নেতৃত্বে ক্লাবটি জেতে চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা। পাঁচবার ব্যালন ডি’অর জয় করে তিনি নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
জুভেন্টাস, প্রত্যাবর্তন এবং সৌদি অধ্যায়
রিয়ালের পর ইতালির জুভেন্টাস-এ তিন বছর কাটিয়ে জেতেন একাধিক শিরোপা। এরপর আবার ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে ফিরে আসেন। ২০২৩ সালে সৌদি আরবের আল নাসের-এ যোগ দেন। অনেকেই ভেবেছিলেন ইউরোপ ছাড়ার মাধ্যমে তার প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের অধ্যায় শেষ। কিন্তু রোনালদো সেখানে গিয়েও গোলের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন এবং ক্যারিয়ারের এক হাজার গোলের মাইলফলকের দিকে এগিয়ে চলেছেন।
রোনালদোর ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত ২০১৮ বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক। সেই ম্যাচে ফ্রি-কিক থেকে গোল করার পর বিখ্যাত ধারাভাষ্যকার পিটার ড্রুরি বলেছিলেন— "মাদেইরা, ম্যানচেস্টার, মাদ্রিদ, তুরিন, তারপর আবার ম্যানচেস্টার—নক্ষত্রের আকাশে যেন নতুন করে লেখা হলো এক মহাকাব্য। নাম তার ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো।" এই উক্তিটি শুধু একটি গোলের বর্ণনা নয়; এটি রোনালদোর পুরো ক্যারিয়ারের সারসংক্ষেপ হয়ে আছে।
আরেকবার রোনালদোর গোলের পর ড্রুরির বিখ্যাত মন্তব্য ছিল— "আহ, কী দুর্দান্ত এক সময়ের সাক্ষী আমরা!" ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এই কথাগুলো আজও আবেগের অংশ হয়ে আছে।
ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে রোনালদো হয়তো তার সেরা ছন্দে ছিলেন না। সমালোচনা হচ্ছে, প্রশ্ন উঠছে তার ভূমিকা নিয়ে। কিন্তু ইতিহাস বলে, রোনালদোকে খুব দ্রুত বাতিল ঘোষণা করা বিপজ্জনক। কারণ তিনি এমন একজন ফুটবলার, যিনি বারবার প্রমাণ করেছেন—অসম্ভবকে সম্ভব করাই তার স্বভাব। ২০২৬ বিশ্বকাপ হয়তো তার শেষ বিশ্বকাপ। আর সেই কারণেই কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী এখনও অপেক্ষা করছেন, আরেকবার হয়তো দেখা যাবে সেই পরিচিত উদযাপন—‘সিউউউ’—যা দুই দশক ধরে ফুটবল বিশ্বের অন্যতম প্রতীক হয়ে আছে।
সূত্র: রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান
ঢাকা/লিপি
সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান