ঢাকা     বুধবার   ১৭ জুন ২০২৬ ||  আষাঢ় ৩ ১৪৩৩ || ১ মহররম ১৪৪৮ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

৩০ হাজার টাকা থেকে দুই কোটির প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন আফরোজা হক

স্বরলিপি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:৩২, ১৭ জুন ২০২৬   আপডেট: ১৫:৪৫, ১৭ জুন ২০২৬
৩০ হাজার টাকা থেকে দুই কোটির প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন আফরোজা হক

আফরোজা হক

বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় একজন নারীর জন্য সংসার, সন্তান, পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার—সবকিছু একসঙ্গে সামাল দেওয়া কখনোই সহজ নয়। তারপরও কিছু নারী আছেন, যারা প্রতিকূলতাকে হার মানিয়ে নিজেদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন। তেমনই এক অনুপ্রেরণার নাম আফরোজা হক। মাত্র ৩০ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করে আজ তিনি গড়ে তুলেছেন ‘নগর রমণী’ নামের একটি জনপ্রিয় ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড, যার বর্তমান বিনিয়োগ দুই কোটির টাকারও বেশি।

আরো পড়ুন:

আফরোজা হকের জীবনের গল্প শুরু হয়েছে সংগ্রামের মধ্য দিয়েই। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়। তখন তিনি ইন্টারমিডিয়েটের প্রথম বর্ষ শেষ করেছেন। রক্ষণশীল শ্বশুরবাড়ির নতুন পরিবেশে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া ছিল তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু তিনি কখনোই পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবেননি।

আফরোজা হক

প্রথম সন্তানের গর্ভধারণের সাত মাসের মাথায় তিনি অনার্সে ভর্তি হন। দিনের সব কাজ শেষ করে রাত জেগে পড়াশোনা করতেন। তিনি বলেন, “আমাকে পড়তেই হবে—এই জেদটাই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি।”
সংগ্রামের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়টি আসে মাস্টার্স পরীক্ষার সময়। দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের মাত্র একদিন পরই তিনি পরীক্ষার হলে বসেন। চিকিৎসকেরা হাসপাতাল থেকে ছাড় দিতে চাননি। রক্তক্ষরণ ও শারীরিক দুর্বলতার মধ্যেও তিনি পরীক্ষা দেন। কারণ, তিনি কোনোভাবেই শিক্ষাজীবনে পিছিয়ে পড়তে চাননি। মাস্টার্স শেষ করে তিনি যোগ দেন দেশের অন্যতম পাঁচতারকা হোটেল রেডিসনে। সেখানে দীর্ঘ ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেছেন। ছোট সন্তানদের নিয়েও দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। কিন্তু একসময় উপলব্ধি করেন, সন্তানদের যথেষ্ট সময় দিতে পারছেন না। একজন মা হিসেবে সন্তানদের সঠিকভাবে বড় করে তোলাও তার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আফরোজা হক

এই উপলব্ধি থেকেই তিনি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সন্তানরা স্কুলে যাওয়া শুরু করলে নিজের জন্য নতুন একটি পথ খুঁজতে শুরু করেন। এমন একটি কাজ, যেখানে তিনি সন্তানদের সময় দিতে পারবেন, আবার নিজের স্বপ্নও পূরণ করতে পারবেন। প্রথমে কফিশপ খোলার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত বদলে ফ্যাশন ব্যবসায় নামেন। কারণ পোশাক, রুচি ও ফ্যাশন নিয়ে তার বরাবরই আগ্রহ ছিল।

মাত্র ৩০ হাজার টাকা নিয়ে তিনি ভারত থেকে কিছু পোশাক ও ফ্যাশন পণ্য সংগ্রহ করেন। ঘরোয়া পরিসরে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগের পণ্যগুলো ক্রেতাদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তিনি লক্ষ্য করেন, পণ্য আনার পরপরই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। তখন ধীরে ধীরে সংগ্রহ বাড়াতে শুরু করেন। এইভাবেই জন্ম নেয় ‘নগর রমণী’।

আফরোজা হক

আফরোজা হকের স্বপ্ন আরও বড়। তিনি চান নারীদের প্রয়োজনীয় সবকিছু এক ছাদের নিচে এনে একটি পূর্ণাঙ্গ লাইফস্টাইল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে। সেই ভাবনা থেকেই ‘নগর রমণী’ নামের জন্ম। বর্তমানে এখানে থ্রিপিস, শাড়ি, ওয়েস্টার্ন পোশাক, ব্যাগ, জুতা এবং থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের ফ্যাশন পণ্য পাওয়া যায়।
বর্তমানে ‘নগর রমণী’র অনলাইন ও অফলাইন কার্যক্রমে প্রায় ১৮ থেকে ১৯ জন কর্মী কাজ করছেন। ব্যবসার পথচলায় লাভ-লোকসান দুটোই এসেছে। কিন্তু তিনি কখনো থেমে যাননি। বরং প্রতিটি অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়েছেন।

তবে একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তাকে নানা সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখিও হতে হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন মন্তব্য ও কুরুচিপূর্ণ বার্তা তাকে অনেক সময় মানসিকভাবে কষ্ট দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন একজন নারী কীভাবে আয় করছেন, কোথা থেকে সফলতা আসছে। এসব পরিস্থিতিতে ভেঙে না পড়ে তিনি নিজেকেই মনে করিয়ে দেন নিজের অতীতের কথা। যখন তিনি শুধু গৃহিণী ছিলেন, তখনও জীবনে অপূর্ণতা ছিল। আর এখন সমালোচনা থাকলেও নিজের পরিচয়, স্বপ্ন ও অর্জন রয়েছে। তাই অন্যের কথার চেয়ে নিজের পথেই আস্থা রাখেন তিনি।

আফরোজা হকের এই দীর্ঘ যাত্রায় সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন তার মা। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন মায়ের সমর্থন সন্তানের জীবনে অনেক বড় শক্তি হয়ে কাজ করে।

ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি সমান ব্যস্ত। তিন সন্তানের দায়িত্ব, সংসার, ব্যবসা—সবকিছুই তাকে সামলাতে হয়। অনেক সময় রাতভর জেগে নতুন পোশাকের ডিজাইন করেন। ফজরের আজান পর্যন্ত কাজ করে সকালে আবার সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর দায়িত্ব পালন করেন। কঠিন এই জীবনযাত্রার মধ্যেও তার মধ্যে কোনো আক্ষেপ নেই। বরং তিনি মনে করেন, ব্যস্ত থাকাটাই তার সাফল্য। কারণ তিনি জানেন, তিনি কিছু করতে পারছেন, নিজের স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছেন।

আফরোজা হকের মতে, সফল উদ্যোক্তা হতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন নিজের কাজের প্রতি ভালোবাসা, রুচি এবং ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা। তিনি বলেন, “যার রিস্ক নেওয়ার প্রবণতা নেই, সে যেন এই পেশায় না আসে। সাহস আর চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মানসিকতাই মানুষকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়।”

আফরোজা হক

নিজের আইডল প্রসঙ্গে তার বক্তব্যও ব্যতিক্রমী। তিনি বলেন, “আমার আইডল আমি নিজেই। কারণ একজন মানুষের কাছ থেকে সবকিছু শেখা যায় না। আমি নিজেকেই অনুসরণ করি, নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই পথ চলি।”

নারীদের উদ্দেশে তার বার্তা —‘আমি মেয়ে’ এই চিন্তা যেন কখনো দুর্বলতার কারণ না হয়। বরং সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং পরিশ্রমকে সঙ্গী করে এগিয়ে যেতে হবে। তাহলেই একজন নারী নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবেন।

আফরোজা হকের জীবনের গল্প তাই শুধু একজন উদ্যোক্তার সাফল্যের গল্প নয়; এটি এক নারীর অদম্য ইচ্ছাশক্তি, আত্মবিশ্বাস এবং প্রতিকূলতাকে জয় করার অনুপ্রেরণার গল্প।

ঢাকা/লিপি

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়