ঢাকা     বুধবার   ১৭ জুন ২০২৬ ||  আষাঢ় ৩ ১৪৩৩ || ১ মহররম ১৪৪৮ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

গল্পটা ফুটবলের জাদুকর লিওনেল মেসির

সাতসতেরো ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:৫৬, ১৭ জুন ২০২৬   আপডেট: ০৯:২০, ১৭ জুন ২০২৬
গল্পটা ফুটবলের জাদুকর লিওনেল মেসির

লিওনেল আন্দ্রেস মেসি

ফুটবলের ইতিহাসে কিছু নাম শুধু খেলোয়াড়ের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা হয়ে ওঠেন একেকটি যুগের প্রতীক। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি তেমনই এক নাম। ২০২৬ বিশ্বকাপে আবারও মাঠে দেখা যাচ্ছে ফুটবলের জাদুকর লিওনেল মেসিকে। চলতি আসরে নিজেদের প্রথম ম্যাচে মাঠে নেমেই বিশ্বকাপের ইতিহাসে আরেকটি অবিস্মরণীয় অধ্যায় যোগ করলেন মেসি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৬-তে নিয়ে গেছেন এই ফুটবলের মহাতারকা। এর মধ্য দিয়ে জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন মেসি।

আরো পড়ুন:

বয়স, সাফল্য কিংবা অর্জনের হিসাব কষলে তার আর কিছু প্রমাণ করার বাকি নেই। মেসি শুধু একজন খেলোয়াড় নন, তিনি এক অনুভূতি, এক প্রজন্মের আবেগ, এক জীবন্ত কিংবদন্তি। বল পায়ে তার জাদু, মাঠে তার নীরব নেতৃত্ব এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তার অবিশ্বাস্য লড়াই তাকে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে দিয়েছে।

রোজারিওর ছোট্ট ছেলেটি
লিওনেল আন্দ্রেস মেসি ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল ছিল তার নেশা। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি স্থানীয় ক্লাব গ্রানদোলিতে খেলতে শুরু করেন। পরে যোগ দেন নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের যুব দলে।খুব অল্প বয়সেই তার অসাধারণ প্রতিভা সবার নজর কাড়ে।

কঠিন এক লড়াইয়ের শুরু
শৈশবেই মেসির শরীরে ধরা পড়ে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি। এই রোগের কারণে তার শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। চিকিৎসার খরচ ছিল এত বেশি যে পরিবারের পক্ষে তা বহন করা কঠিন হয়েছিলো। একদিকে স্বপ্ন, অন্যদিকে আর্থিক সংকট—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিল ছোট্ট মেসির ভবিষ্যৎ। এই যখন অবস্থা, অনেকের স্বপ্ন এখানেই থেমে যেত। কিন্তু মেসির গল্পটা ছিল অন্যরকম।

বার্সেলোনার পথে নতুন জীবন
মাত্র ১৩ বছর বয়সে মেসি পরিবারসহ স্পেনে পাড়ি জমান। এরপর বিশ্বখ্যাত ক্লাব বার্সেলোনা তার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাকে তাদের বিখ্যাত একাডেমি ‘লা মাসিয়া’-তে সুযোগ করে দেয়। শুধু তাই নয়, তার চিকিৎসার ব্যয়ভারও গ্রহণ করে লা মাসিয়া। সেই সিদ্ধান্ত বদলে দেয় একটি পরিবারের ভাগ্য, বদলে দেয় বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসও।লা মাসিয়ার অনুশীলন মাঠে প্রতিদিন নিজের দক্ষতাকে আরও শাণিত করেন মেসি। খুব দ্রুতই তিনি প্রমাণ করে দেন যে বার্সেলোনার আস্থা ভুল ছিল না।

এক কিংবদন্তির উত্থান
২০০৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেক ঘটে মেসির। এরপর শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য এক যাত্রা। একের পর এক গোল, অসংখ্য অ্যাসিস্ট এবং শিরোপা জয়ের মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন ক্লাবটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তারকা। বার্সেলোনার জার্সিতে গায়ে মাঠে নেমে তিনি ভেঙেছেন অগণিত রেকর্ড। ২০১১-১২ মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৭৩ গোল করে তিনি ফুটবল বিশ্বকে বিস্মিত করেন মেসি। ড্রিবলিং, গতি, পাসিং এবং গোল করার ক্ষমতা তাকে নিয়ে যায় অনন্য এক উচ্চতায়।বিশ্বসেরার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি জিতেছেন রেকর্ডসংখ্যক আটটি ব্যালন ডি'অর।

অপেক্ষার অবসান
ক্লাব ফুটবলে সবকিছু জিতলেও জাতীয় দলের হয়ে বড় কোনো শিরোপা না পাওয়ার আক্ষেপ দীর্ঘদিন তাড়া করে ফিরেছিল ফুটবলের জাদুকরকে। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে হার, এরপর একের পর এক কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়—সব মিলিয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। এমনকি একসময় জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি।কিন্তু প্রকৃত কিংবদন্তিরা হার মানেন না। ২০২১ সালে আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকার শিরোপা এনে দেন তিনি। আর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে পূরণ করেন জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে মেসির সেই হাসি যেন ছিল বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা সব অপেক্ষা, সব কষ্ট আর সব স্বপ্নপূরণের প্রতিচ্ছবি।

মাঠের বাইরের মানুষটি
বিশ্বজোড়া খ্যাতি থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে মেসি শান্ত ও নিরহংকার প্রকৃতির মানুষ। সংসার পেতেছেনে শৈশবের বন্ধু আন্তোনেলা রোকুজ্জোর সঙ্গে। তাদের তিন সন্তান রয়েছে। মেসির মতে, পরিবারই তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং আশ্রয়।

এখনও চলছেন স্বপ্নের পেছনে
বর্তমানে মেসি খেলছেন ইন্টার মায়ামি ক্লাবের হয়ে। ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে পৌঁছেও তার জাদু ম্লান হয়নি। ২০২৬ বিশ্বকাপে তার উপস্থিতি প্রমাণ করে, ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসা এখনও আগের মতোই অটুট। লিওনেল মেসির গল্প আসলে শুধু একজন ফুটবলারের গল্প নয়। এটি সংগ্রামের গল্প, স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। এটি বিশ্বাসের গল্প, যেখানে প্রতিকূলতা কখনও শেষ কথা বলতে পারেনি। রোজারিওর ছোট্ট সেই ছেলেটি প্রমাণ করেছেন—প্রতিভা, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে পৃথিবীর যেকোনো মঞ্চ জয় করা সম্ভব। মেসি তাই শুধু একজন খেলোয়াড় নন; তিনি একটি অনুপ্রেরণা, একটি যুগ, একটি কিংবদন্তির নাম।

সূত্র: এনসাইক্লোপিডিয়া, ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপ কাতার ২০২২ রেকর্ডস

ঢাকা/লিপি

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়