মাদক-সন্ত্রাসবাদের মামলায় মার্কিন আদালতের মুখোমুখি মাদুরো
ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আজ সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে মাদক-সন্ত্রাসবাদের অভিযোগের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর অভিযানে মাদুরো আটক হওয়ার মাত্র দুইদিন পরেই এই শুনানি অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা তেলসমৃদ্ধ এই দক্ষিণ আমেরিকান দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬৩ বছর বয়সী মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলিনের একটি কারাগারে বন্দি রয়েছেন। গত শনিবার ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে একটি আকস্মিক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে মার্কিন বাহিনী তাদের আটক করে।
মার্কিন জেলা জজ আলভিন কে হেলরস্টেইনের আদালতে স্থানীয় সময় আজ দুপুর ১২টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায়) তাদের হাজির করার কথা রয়েছে। তারা কোনো আইনজীবী নিয়োগ করেছেন কি না বা তারা নিজেদের দোষ স্বীকার করবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে মাদুরো বিজয় ঘোষণা করার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাকে একজন অবৈধ স্বৈরশাসক হিসেবে অভিহিত করে আসছিল। তার এই গ্রেপ্তার ৩৭ বছর আগে পানামায় মার্কিন আগ্রাসনের পর ল্যাটিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিতর্কিত হস্তক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
মার্কিন প্রসিকিউটরদের দাবি, মাদুরো ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কার্টেলের মূল হোতা। অভিযোগ করা হয়েছে যে, তারা কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন মাদক পাচারকারী গোষ্ঠী এবং যুক্তরাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে যোগসাজশ করে যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার টন কোকেন পাচার করেছে।
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের একটি মামলায় মাদুরোকে প্রথম অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
গত শনিবার প্রকাশিত একটি নতুন অভিযোগপত্রে মার্কিন প্রসিকিউটররা দাবি করেন, মাদুরো ব্যক্তিগতভাবে একটি রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট কোকেন পাচার নেটওয়ার্ক তদারকি করতেন। এই নেটওয়ার্ক মেক্সিকোর সিনালোয়া ও জেতাস কার্টেল, কলম্বিয়ার আধাসামরিক গোষ্ঠী এফএআরসি এবং ভেনেজুয়েলার গ্যাং ‘ট্রেন দে আরাগুয়া’র মতো বিশ্বের সবচেয়ে সহিংস ও শক্তিশালী মাদক পাচারকারী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছিল।
নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের মার্কিন অ্যাটর্নি অফিসের প্রসিকিউটরদের দাখিল করা অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, “ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমান কার্যত শাসক হিসেবে মাদুরো নিজের, তার পরিবারের এবং তার শাসকগোষ্ঠীর সদস্যদের স্বার্থে কোকেন-নির্ভর দুর্নীতির বিকাশ ঘটিয়েছেন।”
মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাসবাদ, কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্র, মেশিনগান ও ধ্বংসাত্মক সরঞ্জাম রাখা এবং সেগুলো ব্যবহারের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রতিটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে তার কয়েক দশক থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।
প্রসিকিউটররা আরো বলছেন, ২০০০ সালে ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচিত হওয়া থেকে শুরু করে ২০০৬-২০১৩ সাল পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং ২০১৩ সালে হুগো শাভেজের উত্তরসূরি হিসেবে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেও মাদুরো মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন মাদুরো পরিচিত মাদক পাচারকারীদের কাছে কূটনৈতিক পাসপোর্ট বিক্রি করেছেন এবং মেক্সিকো থেকে ভেনেজুয়েলায় মাদক বিক্রির টাকা পরিবহনের জন্য বিমানের কূটনৈতিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
প্রসিকিউটরদের দাবি, ২০০৪ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মাদুরো ও তার স্ত্রী রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট অপরাধী গ্যাং ব্যবহার করে ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষের জব্দ করা কোকেন পাচার করেছেন এবং নিজেদের কার্যক্রম রক্ষা ও ঋণ আদায়ের জন্য অপহরণ, মারধর ও হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন।
এছাড়া প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন মাদুরো কোকেন পাচারের রুট নির্ধারণ, চালানের সুরক্ষায় সামরিক বাহিনী ব্যবহার, সহিংস পাচারকারী গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেওয়া এবং মাদক সরানোর জন্য প্রেসিডেন্সিয়াল সুবিধা ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদুরোর সাজা নিশ্চিত করতে প্রসিকিউটরদের মাদক পাচারে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ দেখাতে হবে। যদি তিনি নিজেকে পর্দার আড়ালে রেখে সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন, তবে তা প্রমাণ করা কঠিন হতে পারে।
মাদুরো দীর্ঘ ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে শক্ত হাতে ভেনেজুয়েলা শাসন করেছেন। তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের অভ্যন্তরীণ বিরোধী দল ও বিদেশি সরকারগুলোর চাপ প্রতিরোধ করে এসেছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েক মাসের চাপের পর মাদুরোকে আটক করা হয়।
আন্তর্জাতিক আইনের নজিরবিহীন লঙ্ঘন করে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা ও মাদুরোকে আটকের ঘটনায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ আজ সোমবার জরুরি বৈঠক ডেকেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস মার্কিন অভিযানটিকে একটি ‘বিপজ্জনক নজির’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ভেনেজুয়েলার প্রধান সমর্থক রাশিয়া ও চীনও যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে।
ঢাকা/ফিরোজ