‘মাদুরো অপহরণ’ নিন্দা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে ‘অপহরণ’ করার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা। নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোও এই অভিযানে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। খবর আল-জাজিরার।
নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা সতর্ক করে বলেছেন, একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে এভাবে আটক করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনের জন্য একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হতে পারে।
ভেনেজুয়েলা পরিস্থিতি নিয়ে ১৫ সদস্যের জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ স্থানীয় সময় সোমবার (৫ জানুয়ারি) নিউ ইয়র্ক সিটিতে একটি জরুরি বৈঠকের আয়োজন করে। একই দিনে নিউ ইয়র্কের একটি আদালতে মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে বিরুদ্ধে মার্কিন মামলার শুনানি শুরু হয়।
জাতিসংঘে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রদূত স্যামুয়েল মনকাডা মার্কিন এই অভিযানকে ‘কোনো আইনি ভিত্তিহীন একটি অবৈধ সশস্ত্র হামলা’ হিসেবে নিন্দা জানিয়েছেন। তার এই বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শোনা গেছে কিউবা, কলম্বিয়া এবং নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাশিয়া ও চীনের কণ্ঠে।
কিউবার রাষ্ট্রদূত আর্নেস্টো সোবেরন গুজম্যান বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের ভূখণ্ডের বাইরে এবং উপকূল থেকে দূরে, যেখানে তাদের কোনো এখতিয়ার নেই, সেখানে হামলা চালিয়ে এবং সম্পদ দখল করে নিজেদের আইন চাপিয়ে দিচ্ছে।” তিনি আরো যোগ করেন, এ ধরনের পদক্ষেপ কিউবাকেও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে ‘এমন কোনো সর্বোচ্চ বিচারক’ হিসেবে ঘোষণা করতে পারে না, যার একারই অধিকার আছে যেকোনো দেশ আক্রমণ করার, অপরাধী চিহ্নিত করার এবং আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব ও হস্তক্ষেপ না করার নীতি উপেক্ষা করে শাস্তি প্রদান ও কার্যকর করার’।
এই জরুরি অধিবেশনে উল্লেখযোগ্য সমালোচকদের মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী মিত্র মেক্সিকো এবং ডেনমার্ক। গত এক বছরে ট্রাম্প এই উভয় দেশকেই আলাদাভাবে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছিলেন।
মেক্সিকোর রাষ্ট্রদূত হেক্টর ভাসকনসেলোস বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন না করে সিদ্ধান্তমূলকভাবে কাজ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তিনি আরো যোগ করেন, জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, সার্বভৌম জনগণই তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
মাদুরোকে আটকের পর মেক্সিকোর ড্রাগ কার্টেল নিয়ে ট্রাম্প সাংবাদিকদের কাছে ‘মেক্সিকোর বিষয়ে কিছু একটা করতে হবে’ বলার মাত্র কয়েক দিন পরই রাষ্ট্রদূতের এই মন্তব্য এল।
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা মিত্র ডেনমার্ক বলেছে, কোনো রাষ্ট্রেরই উচিত নয় বলপ্রয়োগ বা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ অন্য কোনো উপায়ে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ফলাফলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা।
ডেনমার্কের স্বশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্র দখল করে নেবে- ট্রাম্পের এমন হুমকির প্রতি পরোক্ষ ইঙ্গিত করে ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টিনা মার্কাস লাসেন নিরাপত্তা পরিষদকে বলেন, “সীমান্তের অলঙ্ঘনীয়তা নিয়ে কোনো আলোচনা হতে পারে না।”
নিরাপত্তা পরিষদের আরেক স্থায়ী সদস্য ফ্রান্সও যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেছে। এ বিষয়টি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁখোর সাম্প্রতিক মন্তব্যের তুলনায় সুরের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, মাদুরোর আটকের পর ভেনেজুয়েলানরা ‘কেবল আনন্দই করতে পারে’।
ফ্রান্সের উপ-রাষ্ট্রদূত জে ধর্মধিকারী বলেন, “মাদুরোকে আটক করার সামরিক অভিযানটি শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তি এবং শক্তি প্রয়োগ না করার নীতির পরিপন্থি।”
লাতভিয়া এবং নিরাপত্তা পরিষদের আরেক স্থায়ী সদস্য যুক্তরাজ্যে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করেন।
লাতভিয়ার রাষ্ট্রদূত সানিতা পাভলুতা-ডেসল্যান্ডেস বলেন, ব্যাপক দমন-পীড়ন, দুর্নীতি, সংগঠিত অপরাধ এবং মাদক পাচারের কারণে মাদুরোর অধীনে ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি ‘অঞ্চল এবং বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য এক গুরুতর হুমকি’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত জেমস কারিউকি বলেন, ‘মাদুরো প্রতারণামূলকভাবে ক্ষমতায় ছিলেন।’
মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তুলে নেওয়ার ঘটনাটিকে ‘মার্কিন বিচার ব্যবস্থার চোখে পলাতক দুই আসামির বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সহায়তায় পরিচালিত একটি সূক্ষ্ম আইন প্রয়োগকারী অভিযান’ হিসেবে অভিহিত করেন।
হোয়াইট হাউজ ভেনেজুয়েলায় এবং এর আশপাশের জলসীমায় বিমান হামলা এবং মাদুরোকে তুলে নেওয়ার ঘটনাটিকে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বলে সমর্থন করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র মাদুরো মাদক-সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করতেন বলে যে দাবি তুলেছে, তার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি।
ঢাকা/ফিরোজ