ইরান যুদ্ধে হুতিদের নীবর থাকার কারণ কী
হুতি-নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের রাজধানী সানায় ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা খামেনির ছবিতে চুম্বন করছেন এক ব্যক্তি
ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে এক চরম অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। এই উত্তেজনা এখন সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ও লেবাননের মতো একাধিক আরব শহরে ছড়িয়ে পড়েছে।
শনিবার (৭ মার্চ) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে বেশ কয়েকটি দেশে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লেও, ইয়েমেন এখন পর্যন্ত আশ্চর্যজনকভাবে শান্ত রয়েছে।
ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ক্ষমতাসীন ইরানপন্থি হুতি গোষ্ঠী ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজা যুদ্ধের পর থেকেই ক্রমাগত মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে আসছিল।
কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে হুতিরা তেহরানের প্রতি তাদের সমর্থন কেবল মৌখিক বিবৃতি ও বিক্ষোভ সমাবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, হুতিদের এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা এখনো রয়ে গেছে এবং তাদের বর্তমান নীরবতা মূলত ‘ধৈর্যের কৌশলের’ একটি অংশ।
এসিএলইডি’র সিনিয়র বিশ্লেষক লুকা নেভোলা আল-জাজিরাকে বলেন, “হুতিদের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। এটি ধাপে ধাপে উত্তেজনার রূপ নিতে পারে। বর্তমানে হুতিদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো সরাসরি মার্কিন ও ইসরায়েলি পাল্টা হামলা এড়িয়ে চলা।”
গত বছরের আগস্টে ইয়েমেনের রাজধানী সানা-তে ইসরায়েলি বিমান হামলায় প্রধানমন্ত্রী আহমেদ আল-রাহাওয়ি এবং চিফ অব স্টাফ মোহাম্মদ আল-ঘুমারিসহ অন্তত ১২ জন উচ্চপদস্থ হুতি নেতা নিহত হন। এটি ছিল এই গোষ্ঠীর জন্য অন্যতম বড় আঘাত। এই অভিজ্ঞতাই হুতি নেতৃত্বকে বর্তমানে অনেক বেশি সতর্ক করে তুলেছে। নেভোলার মতে, “এই গোষ্ঠীটি সম্ভবত তাদের তাদের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার হত্যার প্রচেষ্টাকে ভয় পাচ্ছে।”
তবে হুতি প্রধান আবদেল-মালিক আল-হুতি এই সপ্তাহে বলেছেন, “ইয়েমেন স্পষ্টভাবেই ইরানের পাশে আছে। আমাদের হাত ট্রিগারেই আছে এবং যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আমরা যুদ্ধে নামতে পারি।”
ইয়েমেনের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাদাম আল-হুরাইবির মতে, ইরান চাইলেই হুতিরা যুদ্ধে নামবে। তিনি বলেন, “তেহরান তার সব চাল বা কার্ড একসঙ্গে ব্যবহার করতে চায় না। তারা পরবর্তী ধাপের জন্য হুতি গোষ্ঠীকে জমিয়ে রাখছে।”
তিনি আরো যোগ করেন, “হুতিদের যুদ্ধে নামাটা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। যদি ইরানের ওপর হামলা না থামে, তাহলে হুতিরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। তারা রাজধানী সানা এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত প্রদেশগুলোতে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।”
যদি সংঘাত চলতে থাকে, তাহলে হুতিরা তাদের হামলার পরিধি বাড়াতে পারে। নেভোলার মতে, তাদের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে- ইসরায়েলের ভূখণ্ড, এই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক সম্পদ, ইসরায়েলের আঞ্চলিক অংশীদার (যেমন: সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সোমালিল্যান্ড)।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব যদি দুর্বল হয়ে পড়ে বা ক্ষমতাচ্যুত হয়, তাহলে তা হুতিদের জন্য মারাত্মক হবে। কারণ ইরানই তাদের অস্ত্রের মূল যোগানদাতা। এছাড়া ইরান তাদের ধর্মীয় আদর্শের কেন্দ্র। ইরান পরাজিত হলে হুতিদের মনোবলেও বড় ধরনের ধস নামবে।
ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই পরিস্থিতি নিয়ে চরম উদ্বেগ কাজ করছে। সানার বাসিন্দা ২৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ ইয়াহিয়া বলেন, যুদ্ধের খবর শুনেই তিনি তার পরিবারকে গ্যাস ও প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য মজুদ করতে বলেছেন। যদিও হুতিরা এখনো সরাসরি যুদ্ধে নামেনি, তবুও ইয়েমেনিরা আশঙ্কা করছেন, যেকোনো সময় সানা-তে আবার ইসরায়েলি বিমান হামলা শুরু হতে পারে।
ঢাকা/ফিরোজ