হরমুজে সামরিক উপস্থিতি নিয়ে ট্রাম্পের আহ্বান প্রত্যাখ্যান ইউরোপের
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বান নাকচ করেছেন ইউরোপের নেতারা। তিনি চেয়েছিলেন ইউরোপ যেন হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।
সোমবার (১৬ মার্চ) বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) বৈঠকে যোগ দিয়ে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়েডফুল বলেন, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের সময় জার্মানি কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা রাখে না।
ওই বৈঠকে মূলত তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল।
বৈঠকের আগে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “এখানে আমাদের আরো পরিষ্কার তথ্য দরকার। আমরা আশা করি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আমাদের জানাবে তারা সেখানে কী করছে, আমাদেরকে সেই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করবে এবং তাদের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে কি না, তাও স্পষ্ট করবে।”
তিনি আরো বলেন, “যখন আমরা পুরো বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারব, তখন পরবর্তী ধাপে যেতে হবে অর্থাৎ আশপাশের দেশগুলোর সঙ্গে মিলেই পুরো অঞ্চলের জন্য একটি নিরাপত্তা কাঠামো নির্ধারণ করা।”
এদিকে বার্লিন থেকে জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস বলেন, জার্মানি কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না। তবে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় দেশটি সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
তিনি বলেন, “এটা আমাদের যুদ্ধ নয়। আমরা এই যুদ্ধ শুরু করিনি। ট্রাম্প আসলে কী আশা করছেন? হরমুজ প্রণালিতে কয়েকটি ইউরোপীয় ফ্রিগেট পাঠিয়ে এমন কী করা সম্ভব, যা শক্তিশালী মার্কিন নৌবাহিনী নিজেই করতে পারে না?”
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্জের মুখপাত্র স্টিফেন করনেলিয়াস বলেন, এই সংঘাতের সঙ্গে ন্যাটোর কোনো সম্পর্ক নেই।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “ন্যাটো মূলত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভূখণ্ড রক্ষার জন্য গঠিত একটি জোট। এখানে ন্যাটো মোতায়েন করার মতো কোনো ম্যান্ডেট নেই।”
জার্মানির এই অবস্থানের সঙ্গে একমত হয়েছে আরেক ন্যাটো সদস্য দেশ যুক্তরাজ্য। লন্ডন থেকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, হরমুজ প্রণালিতে কোনো মিশনে অংশ নেওয়ার প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট করে বলতে চান, এটি কখনোই ন্যাটো মিশন হিসেবে ভাবা হয়নি।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, “যুক্তরাজ্য এই বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে না।” তবে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা চলছে, যাতে করে ওই এলাকায় আগে থেকেই থাকা ব্রিটিশ মাইন শনাক্তকারী ড্রোন ব্যবহার করা যেতে পারে কি না।
সন্দেহ ও দ্বিধা
রবিবার (১৫ মার্চ) ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি নৌ জোট গঠনের আহ্বান জানান। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি দেশ এই প্রস্তাব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানোর পর থেকে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
এর জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
ডাচ প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন দেশটির সংবাদ সংস্থা এএনপিকে বলেন, “স্বল্পসময়ের মধ্যে সেখানে সফল কোনো অভিযান শুরু করা খুবই কঠিন হবে।”
অন্যদিকে লিথুয়ানিয়া ও এস্তোনিয়া বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধ ন্যাটো দেশগুলোর বিবেচনা করা উচিত। তবে সম্ভাব্য মিশন সম্পর্কে আরো পরিষ্কার তথ্য প্রয়োজন।
এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গাস শাকনা বলেন, ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা ট্রাম্পের কৌশলগত লক্ষ্য জানতে চায়।
তিনি বলেন, “পরিকল্পনাটা আসলে কী?”
গ্রিস সরকারের মুখপাত্র প্যাভলস মারিনাকিস বলেন, গ্রিস হরমুজ প্রণালিতে কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না।
ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি বলেন, ইতালি এমন কোনো নৌ অভিযানে জড়িত নয়, যা ওই এলাকায় সম্প্রসারণ করা হতে পারে।
তবে ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন বলেন, ইউরোপের উচিত বিষয়টি খোলা মনে বিবেচনা করা। যদিও ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেনি।
তিনি বলেন, “আমাদের পৃথিবীকে যেমন আছে তেমনভাবেই মোকাবিলা করতে হবে, যেমনটা আমরা চাই তেমনভাবে নয়।”
তিনি আরো বলেন, উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে একটি পরিকল্পনা ঠিক করতে হবে।
পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী র্যাডেক সিকোর্স্কি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা।
তিনি বলেন, “যদি ন্যাটোর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ আসে, তাহলে অবশ্যই আমাদের আমেরিকান মিত্রদের প্রতি সম্মান ও সমর্থনের কারণে আমরা বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব।”
সিকোর্স্কি ন্যাটোর প্রতিষ্ঠা চুক্তির অনুচ্ছেদ চার-এর কথাও তুলে ধরেন। এই ধারাটি সদস্য দেশগুলো ব্যবহার করতে পারে, যদি তারা মনে করে তাদের নিরাপত্তা বা ভূখণ্ড হুমকির মুখে পড়েছে।
ঢাকা/রাসেল