মানুষের মনের ভাষা পড়তে পারেন? কোরিয়ান পদ্ধতি ‘নুনচি’ সম্পর্কে জেনে নিন
লাইফস্টাইল ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম
নুনচি আসলে একটি নীরব দক্ষতা। ছবি: সংগৃহীত
‘নুনচি’ হলো মানুষের চোখের ভাষা পড়ার সুক্ষ্ম শিল্প। এই ধারণাকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন কোরিয়ান-আমেরিকান লেখক ইউনি হং। তার বই ‘দ্য পাওয়ার অব নুনচি’-তে লিখেছেন ‘‘নুনচি হলো মানুষ কী ভাবছে এবং অনুভব করছে তা বোঝার শিল্প—এক ধরনের সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, যা আমাদের চারপাশের পরিবেশ ও সম্পর্কের সূক্ষ্ম ইঙ্গিতগুলো ধরতে সাহায্য করে।’’
নুনচি কীভাবে গড়ে ওঠে
কোরিয়াতে খুব ছোট বয়স থেকেই শিশুদের নুনচি শেখানো হয়। দেশটির শিশুরা প্রায় তিন বছর বয়সেই তারা এই শব্দটির সঙ্গে পরিচিত হয়ে যায়। মজার ব্যাপার হলো, বেশিরভাগ সময়ই তারা এটি শেখে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। যেমন—একটি এস্কেলেটরের সবাই যদি ডান পাশে দাঁড়িয়ে থাকে আর কোনো শিশু বাম পাশে অলসভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন তাকে বলা হয়, “তোমার কি নুনচি নেই?” অর্থাৎ, তুমি কি বুঝতে পারছ না কী হচ্ছে?
নুনচির আসল অর্থ
‘নুনচি’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ‘চোখে মাপা’। কিন্তু বাস্তবে এটি কেবল কাউকে বিচার করা নয়, বরং পুরো পরিস্থিতি ও পরিবেশকে বোঝার ক্ষমতা। এটি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে চাকরির সাক্ষাৎকার—সব ধরনের সামাজিক পরিবেশেই প্রযোজ্য।
নুনচি ব্যবহার মানে হলো খেয়াল করা— কে কথা বলছে, কে চুপ করে শুনছে, কে মাঝখানে বাধা দিচ্ছে,
কে ক্ষমা চাইছে, আর কে বিরক্ত হয়ে চোখ ঘুরাচ্ছে। এই ছোট ছোট ইঙ্গিতগুলো থেকেই বোঝা যায় সম্পর্কের গভীরতা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং পরিবেশের সামগ্রিক আবহ।
নুনচি—সাফল্যের চাবিকাঠি
কোরিয়ানরা ‘ভালো নুনচি’ বলার বদলে ‘দ্রুত নুনচি’ বলতে পছন্দ করে। অর্থাৎ, দ্রুত পরিবর্তিত সামাজিক তথ্যগুলোকে মুহূর্তেই বুঝে ফেলার ক্ষমতা। যাদের এই দক্ষতা আছে, তারা সহজেই মানুষের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে, সম্পর্ক গড়তে পারে এবং অস্বস্তিকর ভুল বা বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে পারে।
অন্তর্মুখীদের জন্য এক বিশেষ শক্তি
নুনচি আসলে একটি নীরব দক্ষতা। তাই এটি অন্তর্মুখী মানুষদের জন্য এক ধরনের সুপারপাওয়ার হিসেবেও কাজ করতে পারে। ইউনি হং নিজেই বলেছেন, ‘‘নুনচির মাধ্যমে তিনি সামাজিক উদ্বেগ কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। কারণ এটি মানুষকে বেশি কথা বলার বদলে পর্যবেক্ষণ ও বোঝার দিকে মনোযোগী করে।’’
ব্যক্তিগত থেকে জাতীয় পর্যায়ে
ইউনি হং তার বইয়ে আরও দাবি করেছেন, নুনচি শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, বরং সাউথ কোরিয়া-র দ্রুত উন্নতির পেছনেও ভূমিকা রেখেছে। একটি দরিদ্র দেশ থেকে অল্প সময়ের মধ্যে উন্নত অর্থনীতির দেশে পরিণত হওয়ার পেছনে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সামাজিক সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে তিনি মনে করেন।
বর্তমান বিশ্বে যেখানে বিভাজন, মতবিরোধ ও উচ্চকণ্ঠ আচরণ বেশি চোখে পড়ে, সেখানে নুনচি এক ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। এটি আমাদের শেখায়—চুপ করে শোনা, বোঝা এবং সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।
উল্লেখ্য, পশ্চিমা সংস্কৃতিতে যেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বেশি গুরুত্ব পায়, সেখানে নুনচি কিছুটা বিপরীত মনে হতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
ঢাকা/লিপি