ঢাকা     শুক্রবার   ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ||  বৈশাখ ১১ ১৪৩৩ || ৬ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

সতর্কতাই সাফল্যের চাবিকাঠি

ক্রীড়া প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:৩৬, ২৪ এপ্রিল ২০২৬  
সতর্কতাই সাফল্যের চাবিকাঠি

খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই ওপার বাংলা থেকেও হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন ভেসে আসে, “আসলে কি মোস্তাফিজুর রহমান আর নাহিদ রানাকে পিএসএলে যেতে দেয়নি বিসিবি? বিজ্ঞপ্তিটা পাঠাবে?”

দুই পেসারের অনাপত্তিপত্র না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে বড় খবর হয়েছে। তবে বিষয়টি যতটা আলোচিত, ততটা জটিল বা বিতর্কিত নয়। এখানে কোনো রাজনৈতিক টানাপড়েন নেই, নেই পিসিবি-বিসিবি সম্পর্কের টানাপড়েনের ইঙ্গিতও। নানা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো গেলেও সেগুলো শেষ পর্যন্ত অমূলকই মনে হবে।

বর্তমান অ্যাডহক কমিটির অধীনে বিসিবির বার্তা পরিষ্কার, “আইসিসির সব দেশই আমাদের কাছে সমান।” আর দুই পেসারকে ছাড় না দেওয়ার কারণটাও বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়েছে, সতর্কতা। আধুনিক ক্রিকেটে শুধু পরিশ্রম নয়, সাফল্যের জন্য প্রয়োজন সতর্কতা।

মোস্তাফিজুর সদ্য চোট কাটিয়ে ফিরেছেন। অন্যদিকে নাহিদ রানা টানা খেলছেন, সামনে পাকিস্তানের বিপক্ষে দুই টেস্টে তার ওপরই নির্ভর করতে হবে দলকে। তাই দলের সেরা পেস আক্রমণকে সুরক্ষিত রাখতে বাড়তি সতর্কতা নিয়েছে টিম ম্যানেজমেন্ট। সেই ভাবনা থেকেই তাকে দেশে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নাহিদও হাসিমুখে সিদ্ধান্ত মেনে আজ চাঁপাইনবাবগঞ্জের পথে রওনা হওয়ার কথা।

মোস্তাফিজুর রহমান এক ম্যাচ খেলেই বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি এখনো কতটা ভয়ংকর হতে পারেন। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ৫ উইকেট নিয়ে একাই এলোমেলো করে দেন তাদের ব্যাটিং লাইনআপ। সময়ের অন্যতম সেরা বাঁহাতি পেসার হিসেবে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে তার চাহিদা তো আছেই। সীমিত ওভারের দুই ফরম্যাটেই তিনি ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করে যাচ্ছেন।

কিউইদের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে পিএসএল খেলে এসেছিলেন, আইপিএলেও খেলার সুযোগ ছিল। সবকিছু ঠিক থাকলে জুনে ‘দ্য হান্ড্রেড’-এ অংশ নেওয়ার পরিকল্পনাও আছে। তবে এসবের ঊর্ধ্বে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তার ফিটনেস।

আগামী বছর ওয়ানডে বিশ্বকাপ সামনে রেখে বিসিবি কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না। এর আগে রয়েছে দেশে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ, দক্ষিণ আফ্রিকা সফর, আর ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে লড়াই। এত ব্যস্ত সূচিতে টিকে থাকতে হলে মোস্তাফিজুরকে থাকতে হবে শতভাগ ফিট। এই কারণেই তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে কোনো ছাড় দিচ্ছে না টিম ম্যানেজমেন্ট। আজ তার স্ক্যান করানো হবে, এরপর বিসিবির তত্ত্বাবধানে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যেই থাকবেন তিনি।

সিরিজ নিশ্চিতের পর অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ মোস্তাফিজুর রহমানকে নিয়ে প্রশংসায় ভাসান, “অসাধারণ পারফরম্যান্স করেছে। যেভাবে বোলিং করেছে, আমরা সবসময়ই চাই মোস্তাফিজুর এমন পারফরম্যান্স ধরে রাখুক।”

এর পরপরই উঠে আসে নাহিদ রানার প্রসঙ্গ। কোনো দ্বিধা ছাড়াই মিরাজ বলেন, “ও আমাদের দেশের জন্য অনেক বড় সম্পদ।” সেই সম্পদকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে বিসিবিও বেশ সতর্ক। পিএসএলে না পাঠিয়ে তাকে টেস্ট সিরিজের জন্য প্রস্তুত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যেখানে গুরুত্ব পাচ্ছে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও নিয়ন্ত্রিত ওয়ার্কলোড।

পাকিস্তানের পর নিউ জিল্যান্ড সিরিজেও সিরিজসেরা হয়েছেন নাহিদ। বাংলাদেশের কোনো পেসারের টানা দুই সিরিজে এই কীর্তি নেই। এতেই তার মূল্য কতটা, তা স্পষ্ট হয়ে যায়।

পরিসংখ্যানও তার পারফরম্যান্সের পক্ষে কথা বলে। ৪.৪৬ ইকোনমি, ১৬.৭৫ গড়ে তিন ম্যাচে ৮ উইকেট, নাহিদ ছিলেন সত্যিই অনন্য। দ্বিতীয় ম্যাচে প্রচণ্ড গরমেও ১৪০ কিলোমিটার গতির ওপর ধারাবাহিকভাবে বোলিং করে গেছেন। প্রায় চার ঘণ্টার স্পেলে নিজের ১০ ওভারের ৬০ বলের মধ্যে ৫৯টিই ছিল ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে যা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। এমন প্রতিভাকে ঘিরে বাড়তি সতর্কতা থাকাটাই স্বাভাবিক।

দ্বিতীয় ম্যাচে ৫ উইকেট নেওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনেও নাহিদ নিজেই ফিটনেস ও সতর্কতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। অফ-টাইমে জিম, রানিং সবকিছু নিয়ম মেনে করে নিজেকে প্রস্তুত রাখার কথাও জানান। ফিটনেস ট্রেনারের পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজেকে উজাড় করে দেন তিনি।

ফাস্ট বোলারদের ইনজুরি ঝুঁকি সবসময়ই বেশি। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন বিসিবি অনেক বেশি সচেতন। তাই মোস্তাফিজুর হোক বা নাহিদ প্রতিটি পেসারকেই যত্নে রাখার চেষ্টা চলছে। বিশ্রাম দিয়ে খেলানো, বেঞ্চ শক্তিকে পরীক্ষা করা এসব সুযোগও পাচ্ছেন অধিনায়ক মিরাজ।

এমন পরিস্থিতিকে তিনি এক ধরনের প্রাপ্তিই মনে করেন, “আমাদের পেস ইউনিটটা শুধু আজ নয়, গত তিন-চার বছর ধরেই ধারাবাহিকভাবে ভালো করছে। দেশে-বিদেশে অনেক ম্যাচ জিতিয়েছে। শক্তিশালী পেস আক্রমণ থাকলে দলের মোমেন্টাম বদলে যায়। বোলাররা ভালো শুরু করলে ব্যাটসম্যানরাও আত্মবিশ্বাস পায়। এখন আমাদের দলে অভিজ্ঞ পেসার আছে, ব্যাটিং ইউনিটেও ফর্মে থাকা খেলোয়াড় আছে। এই দুইয়ের সমন্বয় ঠিকভাবে করতে পারলে দল হিসেবে আমরা আরো ভালো ফল করতে পারব।”

সতর্কতা ও সচেতনতার সমন্বয়েই পেসারদের পরিচালনা করছে বিসিবি। দলের পেস আক্রমণ এখন শুধু শক্তিই নয়, এক ধরনের সম্পদ। মোস্তাফিজুর রহমান ও নাহিদ রানার মতো বোলারদের ঘিরে বিসিবির বাড়তি সতর্কতা তাই অযৌক্তিক নয়, বরং সময়োপযোগী ও অগ্রাধিকার সিদ্ধান্ত।

ঢাকা/ইয়াসিন

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়