ঢাকা     শুক্রবার   ০১ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ১৮ ১৪৩৩ || ১৩ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

মাল্টিটাস্কিংকে নারী নাকি পুরুষ এগিয়ে? গবেষণার ফলাফল জেনে নিন

লাইফস্টাইল ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:৫৩, ১ মে ২০২৬   আপডেট: ০৯:৫৮, ১ মে ২০২৬
মাল্টিটাস্কিংকে নারী নাকি পুরুষ এগিয়ে? গবেষণার ফলাফল জেনে নিন

পরিবারিক দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। ছবি: চ্যাটজিপিটির সাহায্যে তৈরি

মাল্টিটাস্কিংকে নারীদের বিশেষ দক্ষতা আছে বলে সমাজে একটি ধারণা প্রচলিত আছে। বিশেষ করে যেসব নারীর সন্তান আছে, তারা একসঙ্গে চাকরি করা এবং সংসার সামলানোর মতো নানা দায়িত্বে ব্যস্ত থাকেন—শিশুর লাঞ্চবক্স তৈরি, ঘরের কাজ, বিভিন্ন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও সামাজিক আয়োজন গোছানো—সব মিলিয়ে যেন এক অবিরাম ব্যস্ততা।

তবে নতুন একটি গবেষণা, যা বৈজ্ঞানিক সাময়িকী PLOS One-এ প্রকাশিত হয়েছে, এই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। গবেষণাটি বলছে, মাল্টিটাস্কিংয়ে নারীরা পুরুষদের চেয়ে মোটেও বেশি দক্ষ নন।
মাল্টিটাস্কিং: আসলে কী?

আরো পড়ুন:

মাল্টিটাস্কিং বলতে স্বল্প সময়ে একাধিক কাজ একসঙ্গে করার প্রক্রিয়াকে বোঝায়। এতে মস্তিষ্ককে দ্রুত এক কাজ থেকে অন্য কাজে মনোযোগ সরাতে হয়, ফলে এককভাবে একটি কাজ করার তুলনায় মানসিক চাপ বেড়ে যায়।

গবেষণাটি আরও দেখিয়েছে, মানুষের মস্তিষ্ক আসলে একসঙ্গে একাধিক কাজ করতে পারে না। বিশেষ করে দুটি কাজ যদি একই ধরনের হয়, তবে তা মস্তিষ্কের একই অংশ ব্যবহার করতে চায়—ফলে কাজটি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

আমরা অনেক সময় মনে করি আমরা মাল্টিটাস্কিং করছি, কিন্তু বাস্তবে মস্তিষ্ক এক সময় একটিই কাজ করছে—শুধু খুব দ্রুত কাজ বদল করছে বলেই এমন মনে হয়।

গবেষণার ফলাফল
জার্মান গবেষকেরা ৪৮ জন নারী ও ৪৮ জন পুরুষের ওপর পরীক্ষা চালান। তারা দেখেন, অংশগ্রহণকারীরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে অক্ষর ও সংখ্যা শনাক্ত করতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে তাদের একই সঙ্গে দুটি কাজে মনোযোগ দিতে বলা হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে এক কাজ থেকে অন্য কাজে দ্রুত সরে যেতে বলা হয়।  
ফলাফল পরিমাপ করা হয় প্রতিক্রিয়ার সময় ও নির্ভুলতার ভিত্তিতে।

গবেষণায় দেখা যায়, মাল্টিটাস্কিং উভয় ক্ষেত্রেই—পুরুষ ও নারী—কাজের গতি ও নির্ভুলতা কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ, দুই দলের মধ্যে কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।

গৃহস্থালির কাজ ও সামাজিক বাস্তবতা
সম্প্রতি আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা পুরুষদের চেয়ে বেশি ‘অগোছালো’ পরিবেশ শনাক্ত করতে পারেন—এই ধারণাটিও ভুল। নারী ও পুরুষ উভয়েই সমানভাবে কোনো জায়গাকে অগোছালো হিসেবে মূল্যায়ন করেন।

তাহলে কেন নারীরা বেশি ঘরের কাজ করেন?
এর একটি বড় কারণ হলো সামাজিক প্রত্যাশা। নারীদের কাছ থেকে পরিচ্ছন্নতা ও গৃহস্থালির মান অনেক বেশি প্রত্যাশা করা হয়, যা পুরুষদের ক্ষেত্রে ততটা নয়।

সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, পুরুষরা আগের তুলনায় এখন বেশি গৃহস্থালির কাজে অংশ নিচ্ছেন। তবুও নারীরাই এখনো অধিকাংশ কাজের ভার বহন করেন।

অন্যদিকে, কর্মজীবী নারীদের ক্ষেত্রে কাজ ও পরিবারের দায়িত্ব মিলিয়ে মোট সময়ের চাপ আরও বেড়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, উপার্জনকারী মায়েরা প্রতি সপ্তাহে এই দুই ক্ষেত্র মিলিয়ে বাবাদের তুলনায় প্রায় চার ঘণ্টা বেশি সময় ব্যয় করেন।

এই গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে—মাল্টিটাস্কিংয়ে নারীরা স্বাভাবিকভাবে বেশি দক্ষ—এমন ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং এটি একটি সামাজিকভাবে তৈরি মিথ, যা নারীদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

এ ধরনের গবেষণা প্রচলিত ভুল ধারণা ভাঙতে সাহায্য করে এবং কাজের দায়িত্ব ও প্রত্যাশার ক্ষেত্রে আরও সমতা আনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

রীরা পুরুষদের তুলনায় স্বাভাবিকভাবে বেশি দক্ষভাবে একসঙ্গে অনেক কাজ করতে পারেন—এমন দাবি একটি মিথ। এই বাস্তবতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে সাহায্য করে: পরিবারে নারীরা যে অতিরিক্ত কাজ করেন, সেটি আসলে “অতিরিক্ত কাজ”—কোনো স্বাভাবিক বা সহজাত দক্ষতার ফল নয়। তাই এই কাজগুলোকে দৃশ্যমান করতে হবে, তালিকাভুক্ত করতে হবে এবং পরিবারে সবার মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নিতে হবে।

বর্তমানে অনেক পুরুষই লিঙ্গসমতা, সমান দায়িত্ব ভাগাভাগি এবং যৌথভাবে সন্তান লালন-পালনের বিষয়ে আগের চেয়ে বেশি সচেতন। এই পরিবর্তন ইতিবাচক, তবে আরও অগ্রগতি প্রয়োজন।

কর্মক্ষেত্রেও এই ভুল ধারণাগুলো ভাঙা জরুরি। নারীরা ভালো মাল্টিটাস্কার—এই ধারণা থেকে অনেক সময় তাদের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়, যেমন মিটিংয়ের নোট নেওয়া বা আয়োজন করা। এসব কাজ কখনোই লিঙ্গভিত্তিকভাবে বণ্টন করা উচিত নয়।

একইভাবে, নীতিনির্ধারণ পর্যায়েও এই মিথ ভাঙতে হবে। কারণ সন্তান লালন-পালন এমন একটি কাজ, যা সহজে মাল্টিটাস্কিং করে সামলানো যায় না। তাই নারীদের জন্য সাশ্রয়ী, মানসম্মত এবং সহজলভ্য শিশু যত্নসেবা (চাইল্ডকেয়ার) নিশ্চিত করা জরুরি।

এর পাশাপাশি পুরুষদের জন্যও নমনীয় কর্মঘণ্টা, পিতৃত্বকালীন ছুটি এবং শিশু যত্নে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এমন সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পরিবারিক দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার জন্য তারা কোনো ধরনের পেশাগত ক্ষতির মুখে না পড়েন।

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট

ঢাকা/লিপি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়