ঢাকা     শুক্রবার   ০১ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ১৮ ১৪৩৩ || ১৩ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

প্রদীপের নিচে অন্ধকার: অভাব-অনটনে চলচ্চিত্রের এক্সট্রা শিল্পীরা

রাহাত সাইফুল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:০৮, ১ মে ২০২৬   আপডেট: ১০:১৫, ১ মে ২০২৬
প্রদীপের নিচে অন্ধকার: অভাব-অনটনে চলচ্চিত্রের এক্সট্রা শিল্পীরা

মহান মে দিবস এলেই শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা হয়। এ চর্চায়ও সব শ্রমজীবী আলো পায় না। এমন একদল মানুষ আছেন, যারা প্রতিদিন কাজ করেন, অথচ ‘দেখা’ পান না। তারা ক্যামেরার সামনে থাকেন, কিন্তু গল্পের কেন্দ্রে কখনোই জায়গা পান না। তারা চলচ্চিত্রের এক্সট্রা শিল্পী—নামহীন, পরিচয়হীন অথচ একটি দৃশ্যের পূর্ণতার জন্য অপরিহার্য।

চলচ্চিত্রই তাদের জীবন, এই মাধ্যমেই তাদের সংসার। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাজ কমেছে, সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। আজ তারা বেঁচে থাকার লড়াই করছেন। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি) প্রাঙ্গণে ঢুকলেই তাদের দেখা মেলে—কেউ অপেক্ষায়, কেউ আশায়, কেউ হতাশায়। অথচ একসময় এই জায়গাটি ছিল প্রাণের মতো সরব, আলো আর কর্মচাঞ্চল্যে ভরা।

আরো পড়ুন:

পর্দায় যাদের দেখে মনে হয় উৎসবের অংশ, বাস্তবে তাদের জীবন নিভু নিভু প্রদীপের মতো। ঝলমলে আলোয় দেখা যায় মুখ, কিন্তু সেই আলোর নিচেই লুকিয়ে থাকে গভীর অন্ধকার। দিনাজপুর থেকে ঢাকায় আসা স্বপ্নার গল্প যেন এই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি, দিনমজুর বাবার অল্প আয়ে তার বেড়ে ওঠা। 

এফডিসির পাশের বস্তিতে স্বপ্নার বাস। শুটিং দেখার অভ্যাস থেকেই জন্ম নেয়—নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন। এক নৃত্য পরিচালকের হাত ধরে নাচের দলে কাজ, তারপর সিনেমায় সুযোগ। পরিচিত মুখগুলোর পেছনে দাঁড়িয়ে নেচেছেন বহুবার। কিন্তু নায়িকা হওয়া হয়নি, এক্সট্রা শিল্পীর কাতারে থমকে গেছে স্বপ্নার সেই স্বপ্ন। একদিনের কাজের জন্য ৫০০-১০০০ টাকা পান স্বপ্না। সেখান থেকেও দিতে হয় দালালের অংশ। বছরের বেশিরভাগ সময়ই কাজ থাকে না। অভাব আর আপোসই হয়ে ওঠে জীবনের নিয়ম।

রাত্রির গল্প আরো নির্মম। একমাত্র সন্তানকে নিয়ে তার সংগ্রাম। যার সঙ্গে তার একসময় সম্পর্ক ছিল, তিনি এখন নামকরা নায়ক। কিন্তু আজ আর তাদের স্বীকৃতি দেন না। রাত্রির কণ্ঠে জমে থাকা কষ্ট খুব সহজে বেরিয়ে আসে। তার কথায়—“অসংখ্য সিনেমায় কাজ করে ছেলেটাকে বড় করছি। আগে প্রতিদিন কাজ পেতাম, এখন সেটা নেই। নিজে না খেয়ে ছেলেকে খাইয়েছি। পরে বুঝলাম শুধু সিনেমা দিয়ে বাঁচা যাবে না। ছেলেটাকেও কাজে দিতে হয়েছে।” একই চিত্র মর্জিনার জীবনেও। তিনি বলেন, “কাজ না থাকলে উপোস থাকতে হয়। আগে কিছু টাকা পাওয়া যেত, এখন সেটাও অনিশ্চিত। দালালের মাধ্যমে কাজ পেলে অর্ধেক চলে যায়। আমাদের হাতে কিছুই থাকে না।” 

অভিনেত্রী ভুলু বারীর গল্প যেন সময়ের নির্মমতার দলিল। তিনি বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ-এর অভিনেত্রী বিলকিস বারীর মেয়ে। ছোটবেলায় নৃত্যশিল্পী হিসেবে শুরু, তারপর অসংখ্য চলচ্চিত্রে পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয়। কিন্তু আজ তার জীবনও অনিশ্চয়তায় ভরা। তিনি বলেন, “কাজ থাকলে কিছু আয় হয়, না থাকলে নেই। এখন এফডিসিতেও তেমন কেউ নেই যে, সাহায্য করবে।”

ভুলুর কণ্ঠে আরো এক গভীর শঙ্কা ধরা পড়ে। তিনি বলেন, “আমার মা জীবনের শেষ সময়ে ভিক্ষা করে চলেছেন। আমার কপালেও হয়তো তাই লেখা আছে।”

এক সময়ের সরব এফডিসির চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। শিল্পী পলি স্মৃতির ভেতরেই খুঁজে ফেরেন সেই দিনগুলো। তিনি বলেন, “আগে এখানে এলে মনে হতো মেলায় এসেছি। চারদিকে কাজ, নাচ, শুটিং। ২০১৩ সালের পর থেকে সবকিছু বদলে গেল। এখন কোনো রকমে বেঁচে আছি।”

চলচ্চিত্রের কাজ কমে যাওয়ায় এখন তিনি স্কুলের শিশুদের নাচ শেখান। তবু এফডিসি ছাড়তে পারেন না। কারণ এই জায়গাটাই তার কাছে শুধু কর্মক্ষেত্র নয়—একটা আবেগ, একটা জীবন।

এই গল্পগুলো আলাদা নয়, বরং একটি বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ। স্বপ্না, রাত্রি, মর্জিনা, ভুলু বারী কিংবা পলি—তাদের মতো আরো শত শত এক্সট্রা শিল্পী প্রতিদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটান। শুটিং না থাকলে অনেকেরই খাবার জোটে না। অথচ এই মানুষগুলো ছাড়া চলচ্চিত্র পূর্ণতা পায় না। একটি দৃশ্যকে বাস্তব করে তোলার পেছনে তাদের উপস্থিতি অপরিহার্য।

ইতিহাস বলছে, এই এক্সট্রা শিল্পীদের মধ্য থেকেই উঠে এসেছেন অনেক বড় তারকা। কিংবদন্তি অভিনেত্রী শাবানা, নায়করাজ রাজ্জাকসহ অনেকে শুরু করেছিলেন এই পথ থেকেই। তবে তাদের সাফল্যের গল্প যতটা আলো ছড়ায়, আজকের বাস্তবতা ততটাই ছায়াময়। বর্তমানে এই শিল্পীদের জন্য নেই কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো, নেই স্থায়ী আয়, নেই সামাজিক নিরাপত্তা। তবু তারা কাজ করে যান। কারণ এটাই তাদের চেনা জগৎ, বেঁচে থাকার একমাত্র পথ।

তারা শুধু পর্দার পেছনের মানুষ নন—তারা শ্রমজীবী মানুষ। তাদের শ্রমেই দৃশ্য প্রাণ পায়, গল্প বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। রুপালি পর্দার আলো যতই উজ্জ্বল হোক, তার আড়ালের মানুষগুলোর জীবন যদি অন্ধকারে ডুবে থাকে—তাহলে সেই আলো কখনোই পূর্ণতা পায় না। মে দিবসের প্রাক্কালে তাদের কথাও মনে রাখা দরকার। 

ঢাকা/রাহাত/শান্ত

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়