‘মে দিবস কী জানি না, আমাদের সব দিনই সমান’
মো. সাহাব উদ্দিন, ফেনী || রাইজিংবিডি.কম
ফেনী শহরের ট্রাংক রোডের খেজুর চত্বরে শ্রমিক হাটে কাজের সন্ধানে আসা মানুষ।
“মে দিবস কী জানি না, আমাদের সব দিনই সমান। কাজ পাইলে দিন ভালো, না পাইলে উপোস থাকতে হয়।” শুক্রবার (১ মে) ভোরের আলো ফুটতেই ফেনী শহরের ট্রাংক রোডের খেজুর চত্বরে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রাম থেকে আসা দিনমজুর রহমত উল্লাহ। তার মতো শত শত শ্রমিক প্রতিদিন এখানে জড়ো হন। এখানে মানুষই যেন পণ্য, আর দরাদরিতে ঠিক হয় তাদের ভাগ্য।
প্রতিদিন ভোর থেকেই কাস্তে-কোদাল, ঝুড়ি আর পুরনো কাপড়ের ঝোলা নিয়ে হাজির হন শ্রমিকরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘শ্রমিকের হাট’ বা ‘মানব হাট’ নামে পরিচিত।
ফেনী শহরের ট্রাংক রোডস্থ খেজুর চত্বরে দীর্ঘদিন ধরে বসে আসছে এই হাট, যেখানে প্রতিদিন অন্তত ৪০০ থেকে ৫০০ শ্রমিক কাজের আশায় অপেক্ষা করেন। এসব শ্রমিকরা জানেন না, মে দিবস কী, বুঝেন না শ্রমিকের অধিকার কাকে বলে। পরিবারের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে প্রতিদিন তারা এই হাটে দাঁড়িয়ে থাকেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দেশের উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ নোয়াখালীর চরাঞ্চল থেকে আসা শ্রমিকরাই এখানে বেশি আসেন। নিজ এলাকায় কাজের অভাব, নদীভাঙন ও দ্রব্যমূল্যের চাপে তারা পাড়ি জমিয়েছেন ফেনীতে। প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত চলে শ্রম কেনাবেচা। ক্রেতারা এসে দরদাম করে শ্রমিক নিয়ে যান। কাজের ধরন অনুযায়ী মজুরি নির্ধারিত হয় ৫০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে। শ্রমিকদের কেউ ধান কাটার, কেউ ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার, আবার কেউ মাটি কাটাসহ বিভিন্ন কাজ করে থাকেন।
আজ ভোরে সরেজমিনে দেখা যায়, দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে শ্রমিকরা কাজের অপেক্ষা করছেন। কেউ ডেকে ডেকে নিজের পারিশ্রমিক বলছেন, কেউ চুপচাপ বসে আছেন। দরদাম শেষে যাদের নেওয়া হয় তারা অটো বা ভ্যানে করে গন্তব্যে চলে যান। আর যাদের ভাগ্যে কাজ জোটে না, তারা হতাশ মুখে ফিরে যান।
দামদর করে শ্রমিকদের নিয়ে যান মহাজনরা
এই শ্রমিকদের নেই কোনো নিয়োগপত্র, নেই নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা শ্রমিক অধিকার। আট ঘণ্টা শ্রমের যে দাবিতে আন্তর্জাতিকভাবে মে দিবস পালিত হয়, তার কোনো প্রতিফলন নেই এখানে। অনেক সময় ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করেও ন্যায্য মজুরি পান না।
শ্রমিকদের অভিযোগ, এই দরদাম সবসময় ন্যায্য হয় না। গাইবান্ধার শ্রমিক গফফার আলী বলেন, “কাজে নেওয়ার সময় এক কথা কয়, কাজ শেষে আরেক কথা। অনেক সময় ঠিকমতো টাকাও দেয় না। কিছু বললে পরের দিন আর ডাকে না।”
রংপুরের হাশেম মিয়া বলেন, “১০-১২ ঘণ্টা কাম করায়, কিন্তু মজুরি ৭০০ টাকা। এর মধ্যে নিজের দুই বেলা খাবারের জন্য ২০০ টাকা চলে যায়। বাকি ৫০০ টাকা বাড়িতে পাঠাই। এ টাকায় কিছুই হয় না।”
ফেনীতে ২২ বছর ধরে শ্রমিকের কাজ করেন বরিশালের আবুল কালাম। তিনি বলেন, “আমাদের এলাকায় কাজ পাওয়া যায় না, আবার কাজ থাকলেও মজুরি কম। তাই বেশি টাকার আশায় ফেনীতে আসা। ৬০ টাকা দিনমজুরিতেও কাজ করেছি, এখন ৭০০-৮০০ টাকা পাই। বাজার মূল্যের কারণে কুলায় না। প্রতিদিন ৪০০-৫০০ মানুষ এখানে কাজের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে, কোনো কোনো দিন কাজই পাই না। গত চার দিন বৃষ্টির কারণে কাজ করতে পারিনি। আজকে আশা নিয়ে এসেছি, যদি কাজ পাই।”
নোয়াখালীর চরাঞ্চল থেকে আসা তরুণ সাকিব বলেন, “অনেক দিন কাজই পাই না। সকাল থেকে দাঁড়িয়ে থাকি, শেষে খালি হাতে ফিরতে হয়। রুম ভাড়া, খাওয়াসহ সব মিলিয়ে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।”
বয়স্ক থেকে তরুণ সব বয়সী শ্রমিক কাজের সন্ধানে আসেন এই হাটে
ভোলার কৃষক মো. আলম বলেন, “মে দিবস পালনের নামে সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে, আর আমরা কৃষক-শ্রমিক না খেয়ে মরি। আমাদের খোঁজ কেউ রাখে না। কৃষক-শ্রমিক না বাঁচলে এসব দিবস দিয়ে কী হবে?”
বাদশা মিয়া নামে আরেক শ্রমিক বলেন, “শ্রমিকের দুঃখ কেউ বোঝে না। পরিবারের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে আমরা কাজ করি। গায়ে-গতরে খেটে যতটুকু আয় করি, তাতেই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করি। মে দিবস নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শ্রমিক হারুন বলেন, “ফেনীতে শ্রমিকের চাহিদা আছে। এখানে কাজ পাই, কিন্তু খরচ বেশি। যা আয় করি, তার অর্ধেকই চলে যায় খাওয়া-থাকার পেছনে।”
আরেক শ্রমিক নুর ইসলাম বলেন, “আমাদের কোনো কাগজ নেই, চুক্তি নেই। কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হলে বা দুর্ঘটনা ঘটলে কেউ দায়িত্ব নেয় না। নিজের টাকায় চিকিৎসা করতে হয়।”
স্থানীয় গৃহস্থ শাহ আলম বলেন, “এই হাট অন্তত ৩০ বছর ধরে চলছে। মৌসুম অনুযায়ী শ্রমিকের চাহিদা বাড়ে-কমে। দরদাম করেই শ্রমিক নিতে হয়। বেশিরভাগই উত্তরবঙ্গের। মজুরি যাই হোক, এরা কাজ ভালো করে।”
মোশাররফ হোসেন নামের ফেনীর এক বাসিন্দা বলেন, “ধান কাটার জন্য ছয়জন শ্রমিক নিতে এখানে এসেছি। প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত এখানে বিভিন্ন বয়সী শ্রমিক পাওয়া যায়। অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি, কিন্তু দাম একটু বেশি চাওয়ায় এখনো কাউকে নিতে পারিনি।”
শাহ আলম নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, “চাকরির সুবাদে ঢাকায় থাকি। আজ সকালে ফেনীতে এসেছি। বাড়িতে মাটি কাটার জন্য দুইজন শ্রমিক লাগবে, তাই সরাসরি ট্রাংক রোডে চলে এসেছি।”
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে আজ ফেনীতে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, পরিবহন ইউনিয়ন এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো বর্ণাঢ্য র্যালি, শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।
ঢাকা/মাসুদ
‘পয়লা মে দিবস’ এর ইতিহাস