শিশুর গুড টাচ ও ব্যাড টাচ শেখানো কেন জরুরি
লাইফস্টাইল ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম
ছবি: সংগৃহীত
শিশুদের যৌন হয়রানি বর্তমান সমাজে উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে এ ধরনের ঘটনার খবর দেখা যায়। শুধু কন্যাশিশু নয়, পুত্রশিশুও হতে পারে যৌন নির্যাতনের শিকার। তাই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সবারই সচেতন হওয়া জরুরি। আর এই সচেতনতার শুরু হতে হবে পরিবার থেকেই।
শিশুকে ছোটবেলা থেকেই ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে শিশু নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হয় এবং বিপদের পরিস্থিতিতে নিজেকে রক্ষা করার মানসিক প্রস্তুতি পায়।
গুড টাচ ও ব্যাড টাচ কী?
শিশুকে আদর করা, ভালোবাসা বা স্নেহ প্রকাশ করা স্বাভাবিক বিষয়। তবে সেই স্পর্শ যেন কখনো অস্বস্তিকর বা অনুপযুক্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
গুড টাচ হলো এমন স্পর্শ, যেখানে শিশু নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও ভালো অনুভব করে। ব্যাড টাচ হলো এমন স্পর্শ, যা শিশুর কাছে ভীতিকর, অস্বস্তিকর বা অপছন্দের মনে হয়। শিশু একটু বুঝতে শেখার পর থেকেই তাকে জানাতে হবে—তার শরীরের কিছু ব্যক্তিগত অংশ আছে, যেখানে তার অনুমতি ছাড়া কেউ স্পর্শ করতে পারে না। এটি শিশুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সাধারণ শিক্ষা।
কত বছর বয়স থেকে শেখানো উচিত?
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মাহবুব আজাদ বলেন, দুই বছর বয়স থেকেই শিশুরা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্পর্কে ধারণা পেতে শুরু করে। তাই খেলার ছলে ধীরে ধীরে তাদের শরীর সম্পর্কে শেখানো যেতে পারে।
ছবি এঁকে বা সহজ ভাষায় হাত, পা, চোখ, মাথা ইত্যাদি চেনানোর পাশাপাশি ব্যক্তিগত অঙ্গ সম্পর্কেও ধারণা দিতে হবে। গোসল করানো বা পোশাক পরিবর্তনের সময়ও শিশুকে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি বোঝানো যেতে পারে।
দুই বছর বয়সের পর থেকে শিশুর সামনে পোশাক পরিবর্তন না করা ভালো। এমনকি তার পোশাক বদলানোর সময় অনুমতি চাওয়া যেতে পারে। এতে শিশু বুঝতে শেখে যে তার শরীরের ওপর তার নিজের অধিকার রয়েছে।
কীভাবে শিশুকে শেখাবেন?
শিশুরা অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে তাদের সঙ্গে কী ঘটছে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব অভিজ্ঞতা তাদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই ছোট থেকেই সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।
শিশুর সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তুলুন
শিশু যেন নির্ভয়ে সব কথা বলতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন এবং গুরুত্ব দিন। এতে সে বুঝবে—তার কথা বিশ্বাস করা হয় এবং সে নিরাপদ।
গল্প বা খেলার মাধ্যমে শেখান
গুড টাচ ও ব্যাড টাচ নিয়ে একসঙ্গে অনেক কথা না বলে ধীরে ধীরে গল্প, ছবি বা শিক্ষণীয় কার্টুনের মাধ্যমে বোঝানো ভালো। গুরুগম্ভীর আলোচনা না করে সহজ ও সাবলীল ভাষা ব্যবহার করতে হবে, যেন শিশু ভয় না পায়।
‘না’ বলতে শেখান
শিশুকে শেখাতে হবে—কারো স্পর্শ খারাপ লাগলে সে যেন প্রতিবাদ করে এবং সেখান থেকে দ্রুত সরে আসে। তাকে বোঝান, কেউ খারাপ আচরণ করলে সেটি তার দোষ নয়।
অপরিচিতদের বিষয়ে সতর্ক করুন
চিপস, চকলেট, খেলনা বা প্রিয় কিছু দেওয়ার প্রলোভনে অপরিচিত কেউ কোথাও নিয়ে যেতে চাইলে তা গ্রহণ না করতে শেখাতে হবে। অপরিচিত কারো কাছ থেকে কিছু না নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
শিশুর বন্ধু হয়ে উঠুন
শিশু কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের খেয়াল রাখা জরুরি। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিচিত বা কাছের মানুষদের মাধ্যমেই শিশুরা হয়রানির শিকার হয়।
অভিভাবকদের করণীয়
শিশুকে অতিরিক্ত শরীর ধরে আদর করা অপছন্দ করলে তা আত্মীয়-স্বজন বা অতিথিদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন।
- শিশু যদি কারো কোলে যেতে না চায়, তাকে জোর করবেন না।
- ছেলে শিশু হলেও সমানভাবে সতর্ক থাকুন।
- শিশুর ব্যক্তিগত সীমারেখাকে সম্মান করুন এবং তার অপছন্দকে গুরুত্ব দিন।
- শিশু ব্যাড টাচের শিকার হলে কী করবেন?
- যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতা একটি শিশুর কোমল মনে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে। এর প্রভাবে শিশু ভীত, অমনোযোগী বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। ঘুমের সমস্যা, দুঃস্বপ্ন কিংবা আচরণগত পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে।
- এমন পরিস্থিতিতে—
- শিশুকে দোষারোপ করবেন না।
- তাকে সময় দিন এবং নিরাপত্তার অনুভূতি দিন।
- তার ভয় ও মানসিক চাপ কাটাতে পাশে থাকুন।
- প্রয়োজনে কাউন্সেলিং বা বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিন।
- অপরাধীকে কোনোভাবেই ছাড় দেবেন না এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু পরিবারের নয়, পুরো সমাজের দায়িত্ব। গুড টাচ ও ব্যাড টাচ সম্পর্কে শিশুকে বোঝান, তাকে সাহসী হতে সহযোগিতা করুন।
ঢাকা/লিপি