ঢাকা     বুধবার   ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ১৯ ১৪২৯

মৃত্যুর আগে নাদিয়ার শেষ কথা ছিলো ‘ও মা গো’

মামুন খান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:২৭, ২৫ জানুয়ারি ২০২৩   আপডেট: ১৫:২৬, ২৫ জানুয়ারি ২০২৩
মৃত্যুর আগে নাদিয়ার শেষ কথা ছিলো ‘ও মা গো’

নাদিয়া

সর্বদা হাসিমুখে থাকা মেয়েটি এভাবে মারা যাবে কল্পনাও করতে পারেনি কেউ। স্বপ্ন পিষ্ট হলো বাসের চাকায়। মাত্র  কয়েকদিনের ব্যবধানেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া-আসার মধ্যেই সবার মন জয় করে নিয়েছিলেন নাদিয়া। কিন্তু মৃত্যু সব শেষ করে দিলো। নাদিয়া মৃত্যুর আগে সর্বশেষ বারের মতো উচ্চারণ করেছিলেন,‘ও মা গো’।

রোববার (২২ জানুয়ারি) দুপুর পৌনে ১টায় রাজধানীর প্রগতি স্বরণিতে ভিক্টর পরিবহনের একটি বাসের চাপায় নিহত হন নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী নাদিয়া।

এ ঘটনায় ওই দিনই নাদিয়ার বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন ভাটারা থানায় মামলা করেন। মামলার পর  ভিক্টর পরিবহনের বাসের চালক লিটন (৩৮) ও তার সহকারী মো. আবুল খায়েরকে সোমবার (২৩ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বাড্ডার আনন্দনগর থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মোস্তফা রেজা নূরের আদালত দুজনের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এদিকে, সোমবার মামলার এজাহার আদালতে আসে। আদালত আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ধার্য করেন। 

মামলা সম্পর্কে জানতে তদন্ত কর্মকর্তা ভাটারা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আল ইমরান রাজনের সাথে যোগাযোগ করা হয়। তবে এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে চাননি।

কথা হয় নাদিয়া যার মোটরসাইকেলে করে যাচ্ছিলেন সেই বন্ধু মেহেদী হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ঘটনার ২/৩ মাস আগে নাদিয়ার সঙ্গে ফেসবুকে আমার পরিচয়। নাদিয়ায় আমাকে নক করেছিল। আমি নর্দানে স্টাডি করি। আর ও নর্দানে ভর্তি হবে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আমার কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে জানতো। পরে ও তো নর্দানে ভর্তি হলো। আস্তে আস্তে আমাদের বোঝাপড়াটা ভালো হয়ে ওঠে। এভাবেই চলছিলো।

মেহেদী হাসান বলেন, ঘটনার দিন সকালে নাদিয়া আমাকে ৪/৫ টেক্সট করে। ওই টেক্সটে আমার ঘুম ভাঙে। বলে উত্তরা থেকে সে আসতেছে। আমিও বলি আসো। ওই দিন ইজতেমার কারণে বাস চলছিল না। আমাকে বলে রাস্তায় তো বাস নাই। সিএনজি আর বাইক ছাড়া কিছু চলছে না। আমি বলি কি করবে তাহলে? ও বলে আমার কাছে এত টাকায় নাই সিএনজি বা বাইকে আসবো। বলে রিকশায় আসবে। কিছুক্ষণ পর ফোন দিয়ে বলে, ও খালপাড় আছে। আমি বলি, ওইদিকে গেছো কেন? পরে সিএনজিতে নিকুঞ্জ আসে। আমিও আগাচ্ছিলাম এয়ারপোর্টের দিকে। কিন্তু জ্যামের কারণে আর যেতে পারিনি। ও নিকুঞ্জ এসে আমাকে ফোন দেয়। ফুটওভার পার হয়ে ওকে আসতে বলি। আমাদের এক সাথে নাস্তা করার কথা ছিলো। ওর আসতে লেট হওয়ায় আমি নাস্তা করে নেই। ও আসার পর মুখ দেখে বুঝতে পারি নাস্তা করেনি। পরে ওকে নাস্তা করাই। নাস্তা করতে করতে ও ওর স্বপ্নের গল্প কথা বলে। এরই মাঝে ওর আম্মু ওকে ফোন দিলে কথা বলে। দুপুর ২টা থেকে আমার অফিস। তখন ১২টা বাজে। ভাবলাম নিকুঞ্জ লেকটা সুন্দর, ওকে দেখিয়ে নিয়ে আসি। বাইকে করে লেকে যাই। লেকে যাওয়ার পর বলে যমুনা ফিউচার পার্কটা নাকি অনেক সুন্দর। আমি বলি, কাছেই তো। চলো ঘুরে আসি।

মেহেদী বলেন, নিকুঞ্জ-১ পার হওয়ার সময় নাদিয়াকে হেলমেট পরতে বলি। বলি, হেলমেট না পরলে ট্রাফিক পুলিশ মামলা দিবে। ও বলে পুলিশ দেখার আগে পড়ে ফেলবো। এ কথা বলে আর হেলমেট পরে না। এভাবে যাচ্ছিলাম। খিলক্ষেত ফ্লাইওভারে উঠলে ও বাইক থামাতে বলে। ওর মোবাইলটা পার্সে রাখে। আর ফ্লাইওভার থেকে ঢাকা শহর দেখে প্রশংসা করে। ওকে আবারও হেলমেট পরতে বলি। কিন্তু পরে না। যমুনা ফিউচার পার্কের গেটে গাড়ি স্টপ করি। বাইক, সিএনজির ভিড়ের কারণে ঢুকতে পারছিলাম না। তখন মনে পড়ে আউট গেট দিয়ে ঢুকার কথা। কিন্তু তখন নাদিয়া বলে ভিতরে যাবে না। পরে আমরা সাইড দিয়ে যাচ্ছিলাম। যমুনা ফিউচার পার্কের সামনের ওই রাইডটা নাদিয়াকে হাত দিয়ে দেখাচ্ছিলাম। ওকে বলছিলাম, এটাই টিভিতে দেখো। আমাদের বাইকটি ১৫/২০ কিলোমিটার গতিতে চলছিল। তখন বাসটি এসে বাইকে ধাক্কা দেয়। আমরা ২ জন দুই পাশে পড়ে যায়। শুনছিলাম বাসটির হেলপার চিৎকার করে বলছে, ওস্তাদ ব্রেক। আশেপাশের লোকজনও বলছিল গাড়ি থামানো জন্য। কিন্তু চালক গাড়িটি থামায়নি। ২/১ সেকেন্ড ব্রেক করলে নাদিয়া উঠে পড়তে পারতো। ও ওঠার চেষ্টা করছিল। যখনই উঠতে যাবে তখনই বাসটি নাদিয়ার মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়। নাদিয়ার শেষ শব্দ ছিল,‘ও মা গো।’ কি থেকে কি হয়ে গেলো। ওর রক্ত, মগজ আমার গায়ে ছিটে আসে। আমি স্পিসলেস হয়ে যাই। ওই স্মৃতি ভুলতে পারছি না।

নাদিয়ার বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমার কোনো ছেলে নাই। তিন মেয়ের মধ্যে নাদিয়া ছিল বড়। ওই ছিলো আমার ছেলের মতো। অনেক কষ্ট করে ওকে এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছি। ও চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়েছিল। কিন্তু পছন্দের সাবজেক্ট ফার্মেসি না পাওয়ায় সেখানে ভর্তি হয়নি। নর্দানে ফার্মেসিতে ভর্তি হয়। আশা ছিল, পড়াশোনা শেষ করে মেয়েটা মানুষের মতো মানুষ হবে। ছোট দুই-বোনের দায়িত্ব ও নিবে। ওই ছিলো আশা ভরসা। কিন্তু কি হয়ে গেলো।

তিনি বলেন, ও একটি পার্টটাইম জবও নিয়েছিল। আমাকে বলতো বাবা তুমি আর এক বছর চাকরি করবে। এরপর আমি দেখবো। আমার সব শেষ হয়ে গেছে। সব আশা-ভরসা শেষ। যাদের কারণে আমার মেয়েকে এই বয়সে দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। তাদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা চাই। সর্বোচ্চ বিচার চাই।

উল্লেখ্য, রোববার (২২ জানুয়ারি) দুপুর পৌনে ১টায় প্রগতি সরণিতে ভিক্টর পরিবহনের একটি বাসের চাপায় নিহত হন নাদিয়া। মাত্র দুই সপ্তাহ আগে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।

/মামুন/সাইফ/

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়