RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     সোমবার   ৩০ নভেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ১৬ ১৪২৭ ||  ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

দুর্গাপূজা: সর্বভূতে নারীর অস্তিত্ব অনুধাবনের আয়োজন

জয়দীপ দে || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:৫০, ২৬ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৪:৫৭, ২৬ অক্টোবর ২০২০
দুর্গাপূজা: সর্বভূতে নারীর অস্তিত্ব অনুধাবনের আয়োজন

‘শুধু বিধাতার সৃষ্টি নহ তুমি নারী—
পুরুষ গড়েছে তোরে সৌন্দর্য সঞ্চারি
আপন অন্তর হতে। বসি কবিগণ
সোনার উপমাসূত্রে বুনিছে বসন।
সঁপিয়া তোমার ’পরে নূতন মহিমা
অমর করিছে শিল্পী তোমার প্রতিমা।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘চৈতালী’ কাব্যগ্রন্থের ‘মানসী’ কাব্যে এভাবেই নারীকে বর্ণনা করেছেন। এই নারীশক্তির পূর্ণ বিকাশ যেন মা দুর্গার মহামায়া রূপে আমরা দেখতে পাই। এই দশভূজা বিনির্মাণে বিধাতার যেমন অবদান আছে, ভক্তেরও কম নয়। সঙ্গে আছে কবির উপমা, শিল্পীর মহিমা। পয়ার ছন্দে কবি করেছেন তার গুণকীর্তণ, শিল্পী নিপুণ হাতে চাপিয়েছেন শিল্পের লালিত্য।

আর্যদের ধর্মগ্রন্থ ছিল বেদ। কিন্তু বেদে কোথাও দেবী দুর্গার উল্লেখ নেই। ঋগ্বেদের দেবীসূক্তকে দেবী দুর্গার সূক্ত বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু দুর্গার নাম সেখানে উল্লেখ নেই। খ্রিস্টাব্দ ৪০০ থেকে ৫০০-র মধ্যে লেখা দেবী ভাগবত পুরাণে দেবী দুর্গার উল্লেখ পাই। সেখানে লেখা আছে দেবতাদের সমষ্টিভূত তেজপুঞ্জ থেকে দেবী দুর্গার আবির্ভাব। তাঁর জন্ম হয় না, হয় আবির্ভাব।

অমলকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পৌরাণিকা’ গ্রন্থে দুর্গা সম্পর্কে বলা হয়, ‘দুর্গার বহু মূর্তিরূপ পুরাণে বর্ণিত হয়েছে। মহিষাসুরের অত্যাচারে স্বর্গচ্যুত দেবতারা ব্রহ্মার শরণ নিলে ব্রহ্মা, শিব ও অন্য সকলকে নিয়ে বিষ্ণুর কাছে আসেন। ব্রহ্মার বরে মহিষাসুর পুরুষের অবধ্য। বিষ্ণু নির্দেশ দেন নিজ নিজ স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয়ে নিজ নিজ তেজের কাছে প্রার্থনা করতে হবে যে- সমবেত তেজ থেকে যেন এক নারীমূর্তির আবির্ভাব হয়। এই শুনে দেবতাদের দেহ থেকে তেজ বার হয়ে সেই তেজ সমবেত হয়ে এক দেবীর সৃষ্টি হয়। দেবতারা নিজেদের অস্ত্র দিয়ে এঁকে সজ্জিত করেন। এই দেবী মহিষাসুরকে তিনবার বধ করে ছিলেন; প্রথমবার অষ্টাদশভূজা উগ্রচণ্ডা রূপে; দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার দশভূজা দুর্গা রূপে। স্বপ্নে ভদ্রকালীর মূর্তি দেখে মহিষাসুর এই মূর্তির আরাধনা করেছিলেন। দেবী দেখা দিলে মহিষাসুর জানান মৃত্যুতে তিনি ভীত নন, তিনি চান দেবীর সঙ্গে তিনিও যেন পূজিত হন। দেবী বর দিয়েছিলেন উগ্রচণ্ডা, ভদ্রকালী বা দুর্গা তিন মূর্তিতেই অসুর তাঁর পদলগ্ন থাকবেন এবং দেবতা রাক্ষস ও মানুষের পুজ্য হবেন। স্কন্দপুরাণে দুর্গা দৈত্যকে নিহত করে দেবী দুর্গা নামে খ্যাত হন’।

যে নারী মায়াময়ী শান্তিদায়ী- তাঁকে এমন সংহারীরূপে কল্পনার কারণ কী? আজ থেকে অন্তত ৩০ হাজার বছর আগে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে পাথর খুঁদে উৎপাদনের প্রতীক হিসেবে নারী মূর্তি তৈরি করে উপাসনা করা হতো। এরকম একটি আলোচিত নারী মূর্তি ভেনাস অফ উইলেনডর্ফ। এটি পশ্চিম ইউরোপের অস্ট্রিয়ায় ১৯০৮ সালে আবিষ্কৃত হয়েছিল। সেই মূর্তির সঙ্গে মিল পাওয়া যায় কুষান যুগে তৈরি বগুড়ার মহাস্থানগড় জাদুঘরে রাখা চতুর্ভুজ মহিষমর্দিনী মূর্তিটির। উইলেনডর্ফের ভেনাসের মতোই এই চতুর্ভূজা দুর্গার ভারী বুক পৃথুলা শরীর। তার দেহে লাস্যময়ী তন্বীর বিভা নেই, বরং আছে মাতৃত্বের ভারে ঝুলে পড়া শরীর।

এই মূর্তিগুলো কিন্তু একটা বিশেষ ইঙ্গিত দেয়। পৃথিবীর প্রথম চাষী যেমন একজন নারী ছিলেন, তেমনি প্রথম প্রহরীও কিন্তু একজন নারী। তিনি তাঁর সন্তানকে রক্ষার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছিলেন। তখন বনচারী মানুষের প্রধান প্রতিপক্ষই ছিল বণ্য হিংস্র প্রাণী। সেই হিংস্র প্রাণীর প্রতিনিধি রূপেই মহিষ এসেছে দুর্গাপুজায়। এই মহিষের ব্যবহার অবশ্য মাইথলজিতে নতুন নয়। গ্রিক মাইথোলজিতে হাইড্রা বধের কাহিনীতে আমরা বাফেলো ডেমনের কথা পাই। আমেরিকায় দেখা যায় বাইসনের ব্যবহার। অ্যাসেরিয় ও ব্যাবিলোনীয় সভ্যতায় দেব-দেবীর কাঁধে পাখা লাগিয়ে তাঁকে মহিমান্বিত করা হয়। আর ভারতবর্ষে দেখা গেল পাখার বদলে হাত। ‘অল রাউন্ডার’ মা হয়ে উঠলেন দশভূজা। মায়ের এই আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠার শক্তিকে যুগ যুগ ধরে সিন্ধু অববাহিকার মানুষরা পূজা করে আসছে। তাই বেদে এর উল্লেখ না থাকলেও পরবর্তী পুরাণগুলোতে তা শক্তিশালী রূপ পেয়ে এসেছে। আরো পরে লোক আখ্যান দিয়েছে একে উজ্জীবনী শক্তি।

মার্কণ্ডেয় চণ্ডী অনুসারে, দুর্গাপূজার প্রথম প্রচলন হয়েছিল রাজা সুরথের মাধ্যমে। তখন এই পূজা চৈত্রমাসে হতো। চৈত্রমাস ঋতুচক্রে বসন্তকাল। বসন্তে হতো বলে একে বাসন্তীপূজাও বলা হত। চৈত্রের শুক্লপক্ষের সপ্তমী থেকে পরের তিনদিন এই পূজা করার উল্লেখ আছে ‘ভবিষ্যোত্তর’ পুরাণে। আষাঢ় থেকে কার্তিক মাস দেবতাদের নিদ্রাকাল। ঠিক সেসময় রামায়ণের যুদ্ধ চলছিল। শ্রীরামচন্দ্র সীতাকে উদ্ধার করার জন্য দেবী দুর্গার পুজা করেন। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে শরৎকালে দেবী দুর্গার পূজা শুরু হয়। অসময়ে এই পূজা করা হয় বলে একে অকালবোধনও বলা হয়। কিন্তু মজার বিষয় রামায়ণের কোথাও শ্রীরামচন্দ্র কর্তৃক দেবী দুর্গার পূজা করার কথা উল্লেখ নেই। তাহলে বাঙালি এই অকালবোধনের বিধান পেল কোত্থেকে?

এ স্রেফ কবির কল্পনা। সেই কল্পনাকে শত শত বছর ধরে বাঙালি শ্রদ্ধা ও ভক্তিতে লালন করে আসছে। রামচন্দ্রের অকালবোধনের কথা প্রথম জানা যায় বাঙালি কবি কৃত্তিবাসের করা রামায়ণের অনুবাদে। এই অনুবাদে কৃত্তিবাস রামায়ণের ঘটনার বাইরে অনেক ঘটনার সমাবেশ ঘটিয়েছেন। বাঙালি লোকজীবনের অনেক অনুষঙ্গ এখানে ঢুকিয়ে রাম-সীতাকে বাঙালি দম্পতি হিসেবেই তুলে ধরেছেন। সীতা আর দশজন গ্রাম্যবধূর মতো ঘরকন্নার কাজ করেন। রামায়ণের কাহিনীকে দেশজ প্রেক্ষপটে আত্তীকরণের কারণে বাংলার ঘরে ঘরে রামায়ণের কাহিনীগুলো পৌঁছে যায়। এভাবেই এক কবির কল্পনা থেকে দেবী মানবী হয়ে প্রতিবছর শরৎকালে কৈলাসের স্বামীর ভিটা ছেড়ে বাপের ভিটায় নইওর আসতে শুরু করেন। গ্রাম্যকবির কণ্ঠে শোনা যায়-
গা তোল গা তোল বাঁধ মা কুন্তল
ঐ এলো পাষাণী তোর ঈশানী,
লয়ে যুগল শিশু-কোলে,
মা কই কই বলে
ডাকিছে শশধর বদনী।

দেবীকে শুধু নাইওরে আসা পল্লীবধূরূপে ভেবে ক্ষান্ত হয়নি বাঙালি। দেবীকে দুর্গতিনাশিনী হিসেবে কল্পনা করেছেন কবি। তাই তাঁর কাছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ভারতবর্ষের পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন কবি শশিভূষণ দাস এভাবে:  
বোধনে বাদ্যি বাজিয়া উঠিল আবার আমার দেশ
আবার আসিছে আদ্যাশক্তি দেবী দশভূজা বেশে
এস মা জননী দুর্গতিনাশিনী নেহার দুর্গতি আজ
ধ্বংসের বাজনা বাজিয়ে ভারতের মাথায় পড়িছে বাজ
খাদ্যশস্যের অভাব হয়েছে পরণে বসন নাই…

দেবীকে মানবী করার এমন সহজিয়া অথচ দুঃসাহসিক কাজ বোধহয় বাংলার কবিরাই করতে পেরেছেন, অন্য কেউ নয়। যেমন ভক্তের সঙ্গে ঈশ্বরের মিলন ঘটাতে বাঙালি কবিরা জন্ম দিয়েছিলেন রাধাকে। যে রাধা মহাভারত কিংবা শ্রীকৃষ্ণের জীবনী কোথাও নেই।

কেবল মা নয়, নারী মাত্রই উপাস্য, সে যে বয়সেরই হোক। এমনকি যে নারী সন্তান উৎপাদনে এখনও সক্ষম হয়ে ওঠেনি সেও পূজনীয়। তাই দুর্গা পূজায় আমরা কুমারীকে পূজা করতে দেখি। যেখানে দুর্গা জননী রূপে পূজিত সেখানেই কুমারী কন্যারূপে পূজিত হচ্ছেন। জননীই কন্যারূপে ফিরে আসেন ভক্তের ঘরে। বিপন্ন ভক্তকে কোলাসুরের মতো অসুরদের হাত থেকে রক্ষা করেন। তাই ষোলবছর পর্যন্ত কন্যাকে দেবীর বিভিন্ন রূপে পূজা করা হয়।
এক বছরের কন্যা— সন্ধ্যা
দুই বছরের কন্যা— সরস্বতী
তিন বছরের কন্যা— ত্রিধামূর্তি
চার বছরের কন্যা — কালিকা
পাঁচ বছরের কন্যা — সুভগা
ছয় বছরের কন্যা — উমা
সাত বছরের কন্যা — মালিনী
আট বছরের কন্যা — কুষ্ঠিকা
নয় বছরের কন্যা — কালসন্দর্ভা
দশ বছরের কন্যা — অপরাজিতা
এগারো বছরের কন্যা — রূদ্রাণী
বারো বছরের কন্যা — ভৈরবী
তেরো বছরের কন্যা — মহালপ্তী
চৌদ্দ বছরের কন্যা — পীঠনায়িকা
পনেরো বছরের কন্যা — ক্ষেত্রজ্ঞা
ষোলো বছরের কন্যা — অন্নদা বা অম্বিকা

বাঙালি দেবীকে শুধু জন্মদাত্রী মা হিসেবেই কল্পনা করেনি, করেছে ধাত্রী ধরনী মা রূপে। সর্বভূতে মায়ের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে। সে জেনেছে পায়ের নিচের যে মাটি, যে অক্সিজেনে আমরা ডুবে আছি, তার উৎস যে বৃক্ষ, তাপদায়ী যে সূর্য- সবই আমাদেরকে মায়ের মতো বাঁচিয়ে রেখেছে এ ধরণীতে। তাই দুর্গাপুজোর মন্ত্রে বলা হয়:
যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ॥
যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ॥
সর্বভূতে দেবীর উপস্থিতি খুঁজে ফেরার চেষ্টা থেকেই দুর্গাপূজায় নবপত্রিকার বিধান। এখানে পত্রিকা মানে গাছের পাতা। ৯টি গাছের পাতাকে একত্রে নবপত্রিকা বলা হয়। এই নবপত্রিকায় দেবীর নয়টি রূপ খুঁজে ফেরা হয়।  
রূপগুলো হলো:
(১) কদলী বা রম্ভা: কদলি গাছ এর অধিষ্টাত্রী দেবী ব্রহ্মাণী;
(২) কচু: কচু গাছের অধিষ্টাত্রী দেবী কালিকা;
(৩) হরিদ্রা: হরিদ্রা গাছের অধিষ্টাত্রী দেবী উমা;
(৪) জয়ন্তী: জয়ন্তী গাছের অধিষ্টাত্রী দেবী কার্তিকী;
(৫) বিল্ব: বিল্ব গাছের অধিষ্টাত্রী দেবী শিবা;
(৬) দাড়িম্ব: দাড়িম্ব গাছের অধিষ্টাত্রী দেবী রক্তদন্তিকা;
(৭) অশোক: অশোক গাছের অধিষ্টাত্রী দেবী শোকরহিতা;
(৮) মান: মান গাছের অধিষ্টাত্রী দেবী চামুণ্ডা;
(৯) ধান: ধান গাছের অধিষ্টাত্রী দেবী লক্ষ্মী।

এ কারণেই দেবীর সামনে কাপড়ে মোড়ানো একটি কলাগাছ রাখা হয়। যাকে কলাবউ বলা হয়।
নারীকে এভাবে মাতৃরূপে পূজা করার হাজার বছরের ঐতিহ্য বাঙালি হিন্দু তার প্রধান ধর্মীয় উৎসব হিসেবে ধরে রেখেছে এখনো। ভক্তের কল্পনায় ভক্তের ভক্তিতে নারীর মায়াশক্তি বিভিন্ন রূপে মূর্ত হয়েছে আমাদের সামনে। দুর্গাপূজা মূলত নারী-বন্দনা। সর্বভূতে মায়ের অস্তিত্ব অনুধাবনের আয়োজন। প্রতিটি মা প্রতিটি কন্যা সুখে থাকুক। ধরণীতে মায়ার বিস্তার ঘটুক।

সূত্র:
বাংলার দুর্গোৎসব, নির্মল কর
পুরাণিকা, অমলকুমার বন্দোপাধ্যায়
কলিকাতা একালের সেকালের, হরিসাধন মুখোপাধ্যায়
কলিকাতার পুরনো কাহিনী ও প্রথা, মহেন্দ্রনাথ দত্ত

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকা

আরো পড়ুন:

* অপরাজিতা পুষ্পে অপরাজিতার অর্চনা ॥ বিপ্রদাশ বড়ুয়া
* দুর্গাদেবীর উৎস সন্ধানে || অজয় রায়
* দুর্গোৎসবের সর্বজনীন ও বৈপ্লবিক তাৎপর্য || যতীন সরকার
* দুর্গাপূজার উদ্ভব ও বিকাশ || তপন চক্রবর্তী

ঢাকা/তারা

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়