ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ||  বৈশাখ ১০ ১৪৩৩ || ৫ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি: একটি গাণিতিক বিশ্লেষণ

মোস্তফা মোরশেদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:২১, ২৩ এপ্রিল ২০২৬  
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি: একটি গাণিতিক বিশ্লেষণ

বর্তমান সরকার নির্বাচনি ইশতেহারে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নিত করার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছে। অর্থনীতির আকার ট্রিলিয়ন ডলারে যাবে কি না সেটি ভিন্ন বিষয়। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের অভিপ্রায়ের দুটি প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। এক. মানুষের মনে অর্থনীতি নিয়ে আস্থা তৈরি হওয়া, দুই. ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে উৎসাহ বোধ করেন। এরকম ইতিবাচক প্রত্যাশার মাধ্যমেই অর্থনীতি সাফল্যের সাথে সামনে এগিয়ে যায়। ভবিষ্যতে যার নিশ্চয়তা রয়েছে তা কার্যত বর্তমানেই অস্তিত্ব লাভ করে। অর্থনীতির পাঠ বলছে, যদি ছয় মাস পরে কোনো পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকে তবে তার দাম এখনই বেড়ে যাবে। তাই ভবিষ্যতের আশাব্যাঞ্জক প্রত্যাশা অর্থনীতিতে গতির সঞ্চার করবে। 

সরকারের পক্ষ হতে বলা হয়েছে, আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে আমাদের অর্থনীতি ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। সাধারণত, একটি ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে উন্নত অবকাঠামো, প্রতিষ্ঠিত মানবসম্পদ, বিকশিত পুঁজি বাজার, বৈচিত্র্যপূর্ণ রপ্তানি বাজার, টেকসই প্রবৃদ্ধি, ভারী শিল্পায়ন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অগ্রসর আর্থিক ব্যবস্থা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কর্তৃত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দৃঢ় সংযোগ ইত্যাদি বিদ্যমান থাকে। ট্রিলিয়ন ডলার ক্লাবে মোট ১৯টি দেশ রয়েছে; যুক্তরাষ্ট্র (১৯৬৯), জাপান (১৯৭৯), জার্মানি (১৯৮৭), ফ্রান্স (১৯৮৮), ইউকে (১৯৮৯), ইতালি (১৯৯০), চীন (১৯৯৮), স্পেন (২০০৪), কানাডা (২০০৪), ব্রাজিল (২০০৬), দক্ষিণ কোরিয়া (২০০৬), ভারত (২০০৭), মেক্সিকো (২০০৭), রাশিয়া (২০০৭), অস্ট্রেলিয়া (২০০৮), ইন্দোনেশিয়া (২০১৭), নেদারল্যান্ডস (২০২১), সৌদি আরব (২০২২), তুরস্ক (২০২৩)। 

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের নমিনাল জিডিপি প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলার ছিল। অর্থনীতির গতি স্বাভাবিক থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে এটি বেড়ে ৭১৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সহজেই এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। যদিও নমিনাল জিডিপি মুদ্রাস্ফীতি এবং টাকার সম্ভাব্য অবমূল্যায়ন উভয়কে ধারণ করে; তবু যেহেতু প্রবৃদ্ধির হার প্রকৃত জিডিপিকে প্রকাশ করে তাই মুদ্রাস্ফীতির সমন্বয় হয়ে যায়। সরকার আশা করছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতি ৫০০ বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি অতিক্রম করবে। 

বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০১৮ সালের ৪২তম অবস্থান থেকে বর্তমানে বিশ্বের ৩৭তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। ২০৩০ সালে তা ২৬তম এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ২৫তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশকে এখন ‘নতুন এশিয়ান বাঘ’ বা ‘পঞ্চম এশিয়ান বাঘ’ হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্যবসায়িক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশ ২০৪০ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির ক্লাবের সদস্য হবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বলছে, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জনের জন্য বার্ষিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির যে প্রতিশ্রুতি তা অতিরিক্ত কোনো নীতিগত পদক্ষেপ ছাড়া বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও আশা করা হচ্ছে। তবে বৈশ্বিক নেতিবাচক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঋণ পরিশোধের চাপ এবং অপ্রতুল ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও এর কারণে অর্থনীতির গতিকে স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে সঠিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এ লেখায় সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোকে বিশ্লেষণ করে একটি গাণিতিক আলোচনার চেষ্টা করা হয়েছে।

খুব প্রচলিত গাণিতিক একটা rule রয়েছে যাকে ‘rule of 70’ বলে। যদিও এটি আসলে ৭০ এর স্থলে ৭২ হবে; তবে বিশ্লেষণের সুবিধার্থে ৭০ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি সঠিক ও যথাযথ হিসাব প্রকাশ না করলেও সহজে ধারণা পাওয়ার জন্য খুবই কার্যকরী। Rule of 70 অনুসারে, ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে জাতীয় আয় দিগুণ হতে ৭০ বছর, ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে জাতীয় আয় দিগুণ হতে ১০ বছর, ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে ১৪ বছর এবং ১০ শতাংশ হলে ৭ বছর সময় লাগবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হিসাব করে আমরা জাতীয় আয়ের একটি হিসাব দাঁড় করাতে পারবো। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ৫.৭৮ শতাংশ, ৪.২২ শতাংশ ও ৩.৪৯ শতাংশ। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনকে ঘিরে ২০২৪ ও ২০২৫ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি আমাদের অর্থনীতিকে সত্যিকার অর্থে প্রতিফলিত করে না। দুটি কারণে প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ বিবেচনা করা যায়; এক. নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকায় business as usual কে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে, এবং দুই. যদি অর্থনীতির চাকা সচল হয় তাহলে প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। ফলে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে Rule of 70 এর গাণিতিক হিসাব করে নেওয়া যেতে পারে। বর্তমান মন্দা সত্ত্বেও সরকার ক্রমান্বয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের আশা করছে। মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বাহ্যিক খাতকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে ২০২৮ অর্থবছর নাগাদ প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫.৫ থেকে ৬.৫ শতাংশের মধ্যে পৌঁছাবে বলে অর্থ বিভাগ পূর্বাভাস দিয়েছে। 

আগামীতে প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ হলে জাতীয় আয় দিগুণ হতে ১১.৭ বছরের মতো লেগে যাবে। বর্তমানে জিডিপি ৪৬০ বিলিয়ন ডলার হিসাবে ২০৩৮ সালে ৪৬০ এর দিগুণ অর্থাৎ, ৯২০ ডলার হবে। কিন্তু এ হিসাব ভিন্নভাবেও করা যায়। জাতীয় আয় ক্রমবর্ধমান হিসাবে কীভাবে বাড়বে সেটি বিবেচনা করা যেতে পারে। ২০২৬ সালে ৪৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ৬ শতাংশ বেড়ে পরের বছর ৪৭৩ বিলিয়ন ডলার হবে। ২০২৮ সালে ৪৭৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ওপর ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে তা ৪৮৫.৬৮ বিলিয়নে উন্নিত হবে। এভাবে, ক্রমবর্ধমান হিসাবে ২০৩৪ সালে জিডিপি হবে ৭৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা এক ট্রিলিয়ন অর্থনীতির ৭৭.৭ শতাংশ। এ ধারাবাহিকতায় ২০৩৯ সালে জাতীয় আয় হবে ৯৮১.১৪ বিলিয়ন ডলার যা ২০৪০ সালে ১ ট্রিলিয়ন মাইলস্টোন অতিক্রম করবে। সরকারের প্রত্যাশার চেয়ে ৫ বছর বেশি সময় লাগলেও নিরাশ হওয়ার কিছু নাই। কারণ মানুষের লক্ষ্য এবং প্রাপ্তির মাঝে এরকম পার্থক্য হয়েই থাকে।

তবে আশার কথা অন্য জায়গায়। ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দিয়ে অর্থনীতির পথচলা শুরু হলে তা সময়ের পরিক্রমায় বেড়ে যাবে। ফলে ৭ শতাংশ বা তার অধিক প্রবৃদ্ধি ২০৪০ সালের আগেই দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করবে। ২০৪০ সালের কত আগে ট্রিলিয়ন ডলার হবে তার পুরোটাই নির্ভর করবে প্রবৃদ্ধি কত হবে তার ওপর। বৈশ্বিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাব, কর্মসংস্থানের অপ্রতুলতা এবং লেনদেন ভারসাম্যে ঋণাত্মক প্রভাবের কারণে নিকট ভবিষ্যতে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন যথেষ্ট। তবে অর্থনীতি রিয়েল বিজনেস সাইকেল তত্ত্বের মতো যদি ঘুরে দাঁড়ায় তবে ৭ শতাংশ বা এর বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন হতেই পারে। এছাড়া, সরকারের পক্ষ থেকে আগামী অর্থবছরে জিডিপি হিসাব করার জন্য ভিত্তি বছর পরিবর্তন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরকে নতুন ভিত্তি বছর হিসেবে নির্ধারণ করা হলে জিডিপির আকার আরও বড় হবে।

প্রবৃদ্ধি আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত, ব্যক্তি পর্যায়ের ভোগের পরিমাণ মোট জাতীয় আয়ের কমপক্ষে ৭০ শতাংশ হলে কেইন্সিয়ান মাল্টিপ্লায়ার প্রভাবের মাধ্যমে তা জাতীয় আয়কে সামনে নিয়ে যাবে। আমাদের এতো বিশাল জনসংখ্যার কারণে সামগ্রিক চাহিদায় কোনো ঘাটতি নাই। ফলে আগামী দিনগুলোতেও ব্যক্তি পর্যায়ের ভোগ ৭০ শতাংশের নিচে নামার আশঙ্কা নাই। দ্বিতীয়ত, ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি বিনির্মাণে সরকারি ও ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে। সরকারি বিনিয়োগ অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং জাতীয় আয় বাড়াবে।

২০২২, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ অর্থবছরে মোট জাতীয় আয়ে বিনিয়োগের পরিমাণ যথাক্রমে ৩২.০৫, ৩০.৯৫, ৩০.৭০ ও ২৮.৫৪ শতাংশ। যদি বিনিয়োগ ৩০ শতাংশ এবং প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ হয় তাহলে মূলধনের উৎপাদনশীলতা বা মূলধনের প্রান্তিক দক্ষতা (ইক্রিমেন্টাল ক্যাপিটাল আউটপুট অনুপাত) ৫ ইউনিট। ইক্রিমেন্টাল ক্যাপিটাল আউটপুট অনুপাতের মাধ্যমে এক একক মূলধন দিয়ে কত শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব তা পরিমাপ করা হয়। সূত্র বলছে, বিনিয়োগ চাহিদা মূলধনের প্রান্তিক দক্ষতা ও প্রবৃদ্ধির গুণফলের সমান। মূলধনকে আরও কার্যকর ও দক্ষতার সাথে ব্যবহার করে একই বিনিয়োগ দিয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। যদি কম মূলধন দিয়ে বেশি উৎপাদন করা যায় তবে মূলধনের উৎপাদনশীলতা বাড়ে। উদাহরণস্বরূপ, ইক্রিমেন্টাল ক্যাপিটাল আউটপুট অনুপাত যদি ৫ থেকে কমে ৪ হয়ে যায় তাহলে একই পরিমাণ বিনিয়োগ (বিনিয়োগ জিডিপি এর ৩০ শতাংশ) দিয়ে ৭.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। এখান থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার, মূলধনের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়লে প্রবৃদ্ধি তথা জাতীয় আয় বাড়বে। সেক্ষেত্রে ২০২৬ সালে বিনিয়োগের পরিমাণ ১৩৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০৩৫ সালে ২৮৪ বিলিয়ন ডলারে এবং ২০৩৫ সালে মোট জাতীয় আয় ৯৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নিত হবে। যেহেতু মূলধনের পিছনে মানুষ কাজ করে তাই মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে গুরুত্ব দিতে হবে।

বিনিয়োগ বাড়াতে বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ইশতেহার বলছে, বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের নিট প্রবাহ জিডিপির ০.৪৫ শতাংশ থেকে ২.৫ হতাংশে উন্নিত করা হবে। পার্শ্ববর্তী ভিয়েতনাম (৪.২৩ শতাংশ), ইন্দোনেশিয়া (১.৭৩ শতাংশ), ফিলিপাইন (১.৯৩ শতাংশ), ভারত (০.৬৯ শতাংশ) ও শ্রীলঙ্কার (০.৭৭ শতাংশ) চেয়ে আমাদের বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ কম। এছাড়া, অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুসারে, কম উৎপাদনশীল দেশগুলো উন্নত অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তি গ্রহণ, তাদের আর্থিক রীতি ও জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। এটি মূলত অর্থনীতির ‘Flying Geese Paradigm’ এর ধারনাকে প্রতিষ্ঠা করে। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমরা কাজে লাগাতে পারি। যেমন, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো তুলনামূলক অগ্রসর কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকং ও সিঙ্গাপুরের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছে; যারা মূলত জাপান থেকে শিখেছে এবং জাপান নিজেও পশ্চিমা বিশ্ব থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর বিকল্প নাই। 

অর্থনীতিতে মোটাদাগে তিনটি সেক্টর রয়েছে; কৃষি, শিল্প ও সেবা। অনেক ক্ষেত্রে কৃষির পর ম্যানুফেকচারিং, তারপর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, তারপর বৃহৎ শিল্প নামেও নতুন খাত বিবেচনা করা হয়। উন্নয়ন অর্থনীতির ধারণায় একটি দেশের উন্নয়নের পরিক্রমায় মোট জিডিপিতে কৃষি, শিল্প ও সেবার পরিমাণ পরিবর্তিত হয়। উন্নয়নের প্রথম ধাপে কৃষি, তারপরের ধাপে শিল্প এবং সর্বশেষ ধাপে জিডিপিতে সেবার অংশ বেশি থাকে। উন্নত দেশগুলোতে জিডিপিতে সেবার পরিমাণ প্রায় ৭০ শতাংশ। প্রাসঙ্গিকভাবে, কোথায় বিনিয়োগ করতে হবে? সেক্টরভিত্তিক আলোচনা করে এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যেতে পারে। একটি দেশ কি উন্নয়নের প্রাথমিক স্থরে সেবা খাতে বিনিয়োগ করবে? অবশ্যই নয়। সেবা খাত মূলত শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট নতুন নতুন আর্থিক ও পরিষেবার সংযোগকে একীভূত করে যা উন্নয়ন আলোচনার শেষ ধাপ।

ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে এ পর্যায়ে কোন খাতে বিনিয়োগ হবে সেটি বোঝার জন্য বিখ্যাত লুইস মডেলের দর্শন শিরোধার্য। ২০২৫ অর্থবছরের পরিসংখ্যান বলছে, জিডিপিতে কৃষির অবদান ১১ শতাংশ, শিল্পের (মূলত ম্যানুফেকচারিং) অবদান ৩৭.৫ শতাংশ এবং সেবা খাতের অবদান ৫১.৫ শতাংশ। লেবার ফোর্স সার্ভে বলছে, কৃষি খাতে মোট শ্রম বাজারের ৪০ শতাংশ, শিল্প খাতে ২০ শতাংশ এবং অবশিষ্ট শ্রমিক সেবা খাতে নিয়োজিত। ২০২৫ অর্থবছরে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ২.৪২, ৩.৭১ ও ৪.৩৫ শতাংশ। 

জাতীয় আয় বাড়াতে যে কোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিনিয়োগের সবচেয়ে কার্যকর খাত হলো শিল্প। লুইস মডেলের দুটি বিষয় নিয়ে আলোকপাত করতে চাই। প্রথমত, মডেলটি অনুমান করে নিয়েছে যে কৃষি খাতের উৎপাদন দক্ষ নয় কারণ এ খাতের মজুরি গড় হিসাবে নির্ধারিত হয়। আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, কৃষি খাতে ৪০ শতাংশ জনবল মাত্র ১১ শতাংশ উৎপাদন করছে। তাই ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কৃষি খাত থেকে শ্রমিক শিল্প খাতে স্থানান্তর করা যেতে পারে। এখানে যে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি তা হলো কৃষি থেকে শ্রমিক স্থানান্তর করলে কৃষি উৎপাদন কমে যাবে কিনা? লুইস মডেল অনুযায়ী, পরিবারকেন্দ্রিক শ্রম ব্যবস্থার কারণে কৃষি খাতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শ্রমিক কাজ করে যাদের প্রান্তিক উৎপাদন একটা বড় অংশের শ্রমিকের জন্য শূন্য বা এর কাছাকাছি। ফলে এখান থেকে শ্রমিক স্থানান্তর করলেও কৃষির উৎপাদন কমবে না। 

ধরা যাক, ট্রিলিয়ন ডলার এ উন্নিত হওয়ার জন্য সরকার প্রথম ধাপ হিসেবে ১৫ শতাংশ লোকবল কৃষি থেকে শিল্পে স্থানান্তর করতে আগ্রহী। ফলে কৃষি খাতে ২৫ শতাংশ মানুষ কাজ করবে। সাধারণ গানিতিক হিসাবে, কৃষির উৎপাদন ৬.৮৮ শতাংশে নেমে যাওয়ার কথা কিন্তু শ্রমিকের একটা বড় অংশের জন্য প্রান্তিক উৎপাদন শূন্য হওয়ায় তা সেভাবে কমবে না। তবে, যেহেতু বাংলাদেশের কৃষি খাত দীর্ঘদিন ধরে সফলতার সাথে উৎপাদন করছে তাই ধরে নিচ্ছি উৎপাদন কিছুটা কমে যেতে পারে। ধরে নিলাম, কৃষির উৎপাদন ১০ শতাংশে নেমে গেল। এখন স্থানান্তরিত ১৫ শতাংশ শ্রমিককে শিল্প খাতে নিয়োজিত করতে পারলে শিল্প খাতের উৎপাদন বাড়বে। লুইস মডেলের দ্বিতীয় যে বিষয়টি নিয়ে বলতে চেয়েছিলাম তা হলো আমাদের দেশে রেডিমেইড শিল্প খাত নাই যেখানে কৃষি থেকে সরাসরি লোকবল স্থানান্তর করা যাবে। এটাই লুইস মডেলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। 

তবে একইসাথে লুইস মডেলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এ ধারনা যে কৃষি থেকে শিল্পে শ্রমিক স্থানান্তরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক রূপান্তর সম্ভব। অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ শ্রমিক শিল্পে নিয়োজিত হলে ঐকিক নিয়ম বলছে শিল্পের উৎপাদন ৬৫.৬২ শতাংশে উন্নিত হবে। সেবা খাত প্রাথমিক পর্যায়ে অপরিবর্তিত থাকবে। কারণ শিল্প খাতের পরিপূর্ণ বিকাশ হলে সেবা খাতের জনবল ও জাতীয় আয়ে এর অবদান বাড়বে। প্রাথমিক পর্যায়ে কৃষি থেকে শিল্পে শ্রমিক স্থানান্তর হলে মোট জাতীয় আয় ১০ (কৃষি) + ৬৫.৬২ (শিল্প) + ৫১.৫ (সেবা) = ১২৭.১২ তে উন্নিত করা সম্ভব। এর মানে দাঁড়াচ্ছে জাতীয় আয় ১০০ থেকে ১২৭.১২ তে উন্নিত হলো। এখানে প্রবৃদ্ধি ২৭ শতাংশ!

একটি শক্তিশালী ধারণা হিসেবে অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য কৃষি থেকে শিল্পে শ্রমিক স্থানান্তর এর বিকল্প নাই। যদিও সমীকরণ এরকম সহজ নয়। বিশেষ করে, যেসব দেশে শিল্প খাত প্রতিষ্ঠিত নয়। এছাড়া, কৃষি খাতে অনেকসময়ই মৌসুমি লোক কাজ করে ফলে তাদের স্থানান্তর সম্ভব নয়। উপরন্তু, কৃষির অপেশাদার লোক কীভাবে শিল্প খাতে খাপ খাওয়াবে তা আলোচনার দাবি রাখে। যদিও কোনোরূপ প্রশিক্ষণ ও স্কিল ছাড়াই আমাদের পোশাক শিল্প দাঁড়িয়ে গিয়েছে। তাই মজ্জাগতভাবে আমরা শিল্প খাতে মানিয়ে নিতে পারব বলে আশা করা যায়। 

চারটি ধাপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে লুইস মডেলের দর্শনকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি বিনির্মাণের মূল তত্ত্ব হিসেবে বিবেচনা করা যায়। প্রধম ধাপে গ্রামীণ উদ্বৃত্ত শ্রমিককে শিল্পের উৎপাদন খাতে অন্তর্ভুক্ত করা; যার জন্য তৈরি পোশাক শিল্পকে আরও গভীর এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে মূলধন স্টক বাড়ানোর জন্য শিল্পের মুনাফা পুনঃবিনিয়োগ করা; যার জন্য দেশজ অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের হার প্রায় ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করতে হবে। তৃতীয় পর্যায়ে লুইস টার্নিং পয়েন্টের দিকে অগ্রসর হলে মজুরি বাড়তে শুরু করবে ফলে শ্রমঘন শিল্পে ঘাটতির ইঙ্গিত পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে শিল্পের উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনতে হবে। সর্বশেষ ধাপে প্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যালস, আর্থিক পরিষেবা, ডিজিটাল অর্থনীতি বিনির্মাণে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশের সার্বিক আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনে জোর দেওয়া যেতে পারে। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে অনেক কিছু বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষকরে, সম্পদের সুষম বিন্যাস এবং মানুষের জীবন-যাত্রার মানোন্নয়নে অধিক মনোযোগ দিতে হবে যাতে কাঙ্ক্ষিত এ অর্থনীতি সকলের জন্য সুফল বয়ে আনে।

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতি বিশ্লেষক
 

ঢাকা/তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়