ঢাকা     রোববার   ০৭ জুন ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ২৪ ১৪৩৩ || ২২ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

মার্কিন সেনা ও পরিবারগুলো ইরান যুদ্ধের নতুন স্বাভাবিকতার সঙ্গে যেভাবে মানিয়ে নিচ্ছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:৫৫, ৭ জুন ২০২৬   আপডেট: ১৯:৫৫, ৭ জুন ২০২৬
মার্কিন সেনা ও পরিবারগুলো ইরান যুদ্ধের নতুন স্বাভাবিকতার সঙ্গে যেভাবে মানিয়ে নিচ্ছে

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের ওপর হামলার নির্দেশ দেওয়ার ১৪ সপ্তাহ পর, মার্কিন সামরিক বাহিনী এক অস্বাভাবিক সংঘাতময় পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে। এই পরিস্থিতি পুরোপুরি যুদ্ধের না হলেও শান্তি থেকে অনেক দূরে।

মধ্যপ্রাচ্যের জাহাজ ও ঘাঁটিগুলোতে মার্কিন সেনারা—যাদের মধ্যে কেউ কেউ আঘাত থেকে সেরে উঠছেন—প্রতি কয়েকদিন পর পর ইরানের সঙ্গে গোলাগুলির বিনিময়ের মধ্যেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ নৌবাহিনী ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে রেখেছে। দেশে, পেন্টাগন গোলাবারুদের উৎপাদন বাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, আর সামরিক সদস্যদের পরিবারগুলো দীর্ঘমেয়াদী মোতায়েনের মানসিক চাপ সামলাচ্ছে।
এই অঞ্চলে মার্কিন মিত্র দেশ, যেমন বাহরাইন ও কুয়েতের বিরুদ্ধে ইরানের পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার ইরান কুয়েতকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।

আরো পড়ুন:

ট্রাম্প এপ্রিলে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধটি একটি অচলাবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে; ইরান হরমুজ প্রণালি মূলত নৌচলাচলের জন্য বন্ধ রেখেছে এবং শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হলে ট্রাম্প ইরানের ওপর পুনরায় পুরোদমে বোমা হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন। এই হুমকির কারণে মার্কিন সেনাদের সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা বজায় রাখতে হয়।

এর অর্থ হলো, ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ইন্টারসেপ্টর মজুদ করা থেকে শুরু করে ড্রোন ও স্যাটেলাইট থেকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে ইরানের অভ্যন্তরে লক্ষ্যবস্তুর তালিকা হালনাগাদ করা পর্যন্ত সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। কারণ বড় আকারের লড়াই আবার শুরু হতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, “১০ মাত্রার সতর্কাবস্থার এই অবিরাম অবস্থা বজায় রাখা, যেকোনো মুহূর্তে প্রস্তুত থাকা, একটি অত্যন্ত চাপপূর্ণ ও কঠিন অভিযানিক কাজ।”

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের সাবেক কমান্ডার জোসেফ ভোটেল বর্তমান সংঘাতের পর্যায়কে ‘আমাদের জন্য একটি অত্যন্ত, অত্যন্ত বিপজ্জনক সময়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যুদ্ধবিরতির সময় সেনাদের প্রস্তুত রাখা কোনো ছোটখাটো চ্যালেঞ্জ নয় বলে জানিয়েছেন তিনি।

ভোটেল বলেন, “কর্মীরা যেন সবসময় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকে, তা নিশ্চিত করতে এটি নেতাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে।”

মন্তব্য জানতে চাইলে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী মোতায়েনকৃত সেনাদের ‘কল্পনাযোগ্য সব উপায়ে’ সমর্থন করতে প্রস্তুত।

পার্নেল বলেন, “যুদ্ধ বিভাগ আমাদের অসাধারণ সেনাদের নিয়ে গর্বিত। তাদের সাহস, প্রস্তুতি, দৃঢ়তা এবং অতুলনীয় পেশাদারিত্বের কারণেই তারা মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ যুদ্ধ শক্তি।”

সেনা ও পরিবারের উপর প্রভাব

আহত মার্কিন সেনাদের জন্য সামরিক বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়াটা এক গভীর সমন্বয়ের দাবি রাখে।

মার্কিন আর্মি রিজার্ভের সার্জেন্ট ফার্স্ট ক্লাস ৩৭ বছর বয়সী কোরি হিকস সেইসব আহতদের মধ্যে একজন, যারা যুদ্ধের শুরুতে একটি ইরানি ড্রোন হামলায় আহত হয়েছিলেন। ওই হামলায় কয়েক মিনিটের জন্য তার হৃদ স্পন্দন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শার্পনেলের আঘাতে তার একটি ধমনী ছিঁড়ে যায় এবং চোয়াল ভেঙে যায়। হিকস বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট মস্তিষ্কের গুরুতর আঘাতের সাথেও লড়াই করছেন, যা তার জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

হিকস রয়টার্সকে বলেন, “মনে হচ্ছিল যেন একটা ছোট প্রপেলার প্লেন দ্রুত গতিতে ধেয়ে আসছে এবং তারপর এটি সজোরে বিল্ডিংয়ে আছড়ে পড়ে এবং বিস্ফোরিত হয়। আমার মনে আছে, আগুনের একটি বড় উজ্জ্বল গোলা, প্রচণ্ড চাপ ও তাপ, এবং আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।”

হিকসই একমাত্র নন যিনি এই নতুন স্বাভাবিকতার সাথে মানিয়ে নিচ্ছেন। 

হিকস জানান, মেরিল্যান্ডের ওয়াল্টার রিড ন্যাশনাল মিলিটারি মেডিকেল সেন্টার, যেখানে তার চিকিৎসা চলছে, আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের বহু বছর পর যুদ্ধাহতদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে নতুন করে সৃষ্ট চাপ সামলাচ্ছে।

এই সংঘাতে প্রায় ৪০০ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকেই হিকসের মতো মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ৯০ শতাংশেরও বেশি সেনা কাজে ফিরেছেন। এই সংঘাতে ১৩ জন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন।

যুদ্ধবিরতির সময় কী ঘটছে তা নিয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে মার্কিন সেনা সদস্যদের পরিবারগুলোও মানসিক চাপের সম্মুখীন হচ্ছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিয়মিতভাবে মার্কিন জাহাজ ও বিমানে হামলার দাবি প্রকাশ করে। শুক্রবার ইরান বলেছে, তারা ওমান উপসাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে সতর্কতামূলক গুলি চালিয়েছে, যদিও মার্কিন সামরিক বাহিনী এই ঘটনা ঘটার কথা অস্বীকার করেছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফার্নান্দো ভ্যালির আর্মি রিজার্ভের একজন সার্জেন্টের মা ইয়াদিরা দেসাঁ বলেন, “ঠিক কী ঘটছে তার বিস্তারিত না জানাটা সত্যিই খুব ভীতিকর।”

মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রতিশোধের ভয়ে দেসাঁ তার ছেলের পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন। তিনি এই যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে প্রতিবাদ করে আসছেন, যা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

মে মাসে রয়টার্স/ইপসোস পরিচালিত এক জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মাত্র চারজনের মধ্যে একজন জানিয়েছেন, ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযান সার্থক হয়েছে।

দেসাঁ জানান, তার ছেলে তার অবস্থানে ইরানি ড্রোনের একাধিক হামলা দেখেছে, যেগুলোর ধ্বংসাবশেষ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত হওয়ার পর তার চারপাশে এসে পড়েছে।

দেসাঁ বলেন, “আমি প্রতিদিন একটি বার্তা পাঠাই: ‘শুভ সকাল, বাবা। আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ মাঝে মাঝেই আমি ‘মা, আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বা ‘তোমার কথা মনে পড়ে’ বা এই ধরনের কিছু বার্তা পাই।

ঢাকা/শাহেদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়