ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৪ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

কম্বোডিয়ার শ্রমবাজার রক্ষায় হার্ডলাইনে যাচ্ছে সরকার

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-০৪ ২:০৬:০৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-০৪ ২:০৬:০৮ পিএম

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির দ্বার উন্মোচিত হয়েছে কয়েক মাস আগে। দেশটিতে নির্মাণ শিল্পের বিকাশ ঘটছে ব্যাপকভাবে। ফলে বাড়ছে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকের চাহিদা। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু দালালচক্র মানবপাচারে জড়িত হচ্ছে বলে সরকারের হাতে তথ্য এসেছে। এসব পাচারকারীদের চিহ্নিত এবং শাস্তির আওতায় আনতে হার্ডলাইনে যাচ্ছে সরকার। পাশাপাশি দেশটিতে জনশক্তি রপ্তানির প্রক্রিয়া সুষ্ঠু এবং আরও তরান্বিত করতে বেশকিছু কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা এবং মন্ত্রণালয়।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, গত বছরের অক্টোবরের দিকে বাংলাদেশিদের জন্য কম্বোডিয়ার শ্রমবাজার চালু হয়। এক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে দেশটির যে চুক্তি হয়েছে সেখানে বলা হয়েছে দক্ষ শ্রমিক নেবে কম্বোডিয়া। কিন্তু এখনো সরকারিভাবে উল্লেখযোগ্য হারে জনশক্তি রপ্তানি করতে পারেনি সরকার। বরং অপতৎপতরা চালাচ্ছে অসাধু চক্র।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশে কম্বোডিয়ার কোনো দূতাবাস নেই। তাই মন্ত্রণালয়ের মধ্যস্থতা ছাড়া আগে থেকে ভিসা নেওয়ার কোনো উপায় নেই। তবে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য অন এরাইভাল ভিসার সুবিধা দিয়েছে সে দেশের সরকার। ফলে সেখানে গিয়ে ভিসা নিতে পারেন বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী যে কেউ। এছাড়া দেশটিতে বাংলাদেশের দূতাবাস নেই। থাইল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার কাউন্সিলর কম্বোডিয়ার বিষয়টি দেখভাল করে। এসব সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দেশটিতে জনশক্তি রপ্তানি কিংবা মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশে নেওয়ার কথা বলে মানবপাচার করছে কিছু অসাধু চক্র।

সম্প্রতি মানবপাচারের দায়ে মিজানুর রহমান নামে এক বাংলাদেশিকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন কম্বোডিয়ার একটি আদালত। বাংলাদেশ থেকে কম্বোডিয়া হয়ে মালয়েশিয়ায় ৮০ জনের বেশি লোককে পাচারের দায়ে দেশটির নমপেন পৌর আদালত তাকে ওই সাজার আদেশ দেন। কিন্তু মানবপাচার বন্ধ হয়নি। এরপর ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে দালালচক্র দুই দফায় ৭ জন শ্রমিককে নমপেন বিমানবন্দরে পাঠায়। যাচাই-বাছাইয়ে ধরা পড়ার পর সেসব শ্রমিককে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায় নমপেন বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন। এসব কারণে দেশটিতে জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনা বিনষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

এর আগে দীর্ঘদিন গৃহযুদ্ধ ছিল দেশটিতে। গণহত্যার বিভীষিকাময় পরিবেশ থেকে বের করে আনতে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তাই বাংলাদেশের প্রতি দেশটির একটি দুর্বলতাও রয়েছে। কিন্তু দালাল চক্র প্রতিহত করার জন্য দেশটির পক্ষ থেকে তাগাদা দেওয়া হয় বাংলাদেশ সরকারকে।

মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রাইজিংবিডিকে বলেন, দেশটির শ্রমবাজার চালু হওয়ার পর জনশক্তি রপ্তানির বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আগে দালাল ও পাচারকারী নির্মূলের কাজ করতে হচ্ছে সরকারকে। কারণ বাংলাদেশের একটি ইমেজ ছিল কম্বোডিয়ায়, তা এখন নষ্ট হতে চলেছে এসব অসাধু চক্রের দৌরাত্মে। মানবপাচারের নতুন রুট হিসেবে তারা কম্বোডিয়াকে ব্যবহারও করছে। পাচারকারী চক্র এ দেশটিকে ব্যবহার করছে ট্রানজিট হিসেবে। এসব রোধ করা বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁডিয়েছে। তাই হার্ডলাইনে গিয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। এমনকি দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যিক সর্ম্পক স্থাপনের লক্ষ্য নিয়েও কাজ করছে বাংলাদেশ। সার্বিক বিষয়ে দেশটিতে মানবপাচার রোধকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

জানা গেছে, মানবপাচার বন্ধ করতে এরইমধ্যে দুটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বন্ধ করা হয়েছে। স্টিকার ভিসায় কম্বোডিয়া যাওয়ার ক্ষেত্রে স্মার্টকার্ড ইস্যু বন্ধ করা হয়েছে। গত ৪ মার্চ মানবপাচারকারী ও দালালদের অপতৎপরতার বিষয়ে একটি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ে। এর ওপর ভিত্তি করেও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিলের পাশাপাশি মামলা করার কথাও ভাবছে সরকার।

মন্ত্রণালয়ের জানুয়ারি মাসের সমন্বয় সভায় কম্বোডিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির বিষয়ে জোর দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গৃহযুদ্ধের ধাক্কা কাটিয়ে উন্নয়নের পথে রয়েছে দেশটি। ইউরোপ ও আমেরিকার আদলে পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া চলছে দ্রুতগতিতে। দেশটি প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করছে বিভিন্ন দেশ থেকে। ওষুধ, পাট, চা ও চামড়ার মতো বাংলাদেশের প্রধান প্রধান রপ্তানি পণ্যেরও ব্যাপক চাহিদা দেশটিতে। কিন্তু প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাবে সে সুযোগ এতো দিন কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। জনশক্তি রপ্তানির যে সূচনা হয়েছে, তা এগিয়ে নিতে পারলে লাভবান হবে বাংলাদেশ।

যোগাযোগ করা হলে মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব জাহাঙ্গীর আলম এ বিষয়ে রাইজিংবিডিকে বলেন, কম্বোডিয়ার শ্রমবাজারকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে সরকার। এরইমধ্যে মানবপাচারকারীদের বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর মন্ত্রণালয়ের হাতে এসেছে। এর ওপর ভিত্তি করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

 

ঢাকা/হাসান/এসএম