ঢাকা     বুধবার   ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ২৮ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

সব প্রস্তুতি শেষ, রোজার আগেই নতুন সরকারের শপথ 

আসাদ আল মাহমুদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:২৭, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ২২:৩১, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সব প্রস্তুতি শেষ, রোজার আগেই নতুন সরকারের শপথ 

জাতীয় সংসদ ভবন। ফাইল ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ১২ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচন শেষ হওয়ার চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যেই নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

প্রশাসনিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, রোজা শুরুর আগেই আগামী ১৬ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বঙ্গভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন সরকারের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হবে।

আরো পড়ুন:

সরকারের একাধিক সূত্র জানায়, এই তিন দিনের মধ্যে ১৭ ফেব্রুয়ারিকে সবচেয়ে সম্ভাব্য তারিখ ধরে প্রস্তুতি এগোচ্ছে। যদিও নির্বাচন কমিশনের গেজেট প্রকাশ এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতির ওপর নির্ভর করেই শপথ অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত দিন ও সময় নির্ধারিত হবে।

সরকারের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, এবারের লক্ষ্য একটাই নির্বাচনের পর যেন রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো শূন্যতা তৈরি না হয়। প্রশাসনের ভাষায়, এটি কেবল নতুন একটি মন্ত্রিসভার শপথ নয়, বরং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, “নির্বাচনের পরপরই সরকার গঠন হলে দেশ ও প্রশাসন দুটোই স্থিতিশীল থাকে। আমরা চাইছি, এই বার্তাটা স্পষ্টভাবে যাক। এই কারণেই শপথ অনুষ্ঠানকে ঘিরে প্রস্তুতিতে কোনো ঢিলেমি রাখা হয়নি। সংসদ সচিবালয়, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর মধ্যে শুরু থেকেই সমন্বয় করা হচ্ছে।”

জানা গেছে, শপথ অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু বঙ্গভবন। রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন ও কার্যালয়কে ঘিরেই চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। দরবার হল, করিডর, অতিথি লাউঞ্জ, প্রবেশ ও প্রস্থান পথ সবকিছুই নতুন করে সাজানো ও যাচাই করা হচ্ছে।

আসন বিন্যাস থেকে শুরু করে অতিথিদের বসার দূরত্ব, ক্যামেরার অবস্থান, প্রটোকল লাইন—সবকিছু আগেই নির্ধারণ করা হয়েছে। অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা বলছেন, শপথ অনুষ্ঠান যত সংক্ষিপ্ত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়, ততই রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বজায় থাকে।

রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, “দরবার হলের ঐতিহ্য বজায় রেখেই আধুনিক রাষ্ট্রীয় আয়োজনের মান নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।”

নতুন সরকার গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক ধাপ হলো নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশ। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ভোটগ্রহণ ও ফলাফল ঘোষণার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

সরকারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের কারণে এবার এই প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা কম। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ১৩ অথবা ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশ হতে পারে। গেজেট প্রকাশের পর সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। এরপরই রাষ্ট্রপতির কাছে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা সরকার গঠনের দাবি জানাবেন। সেই প্রক্রিয়া শেষ হলে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। এই ধারাবাহিকতা মাথায় রেখেই ১৬ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বৈঠকের পর বৈঠক, সরেজমিন প্রস্তুতি
শপথ অনুষ্ঠান এবং ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়াকে ঘিরে ইতোমধ্যে একাধিক বৈঠক করেছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, সংসদ সচিবালয় ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বঙ্গভবন ও সংসদ ভবন সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “১৫ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যেকোনো দিন শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনের মতো আমরা প্রস্তুত। নির্দেশনা রয়েছে এই আয়োজন যেন সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে পরিপাটি ও মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানগুলোর একটি হয়।”

তিনি জানান, দেশি-বিদেশি কূটনীতিক, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকাও চূড়ান্ত করা হয়েছে।

নিরাপত্তা ও প্রটোকলে বিশেষ নজর
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ এই অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাজধানীতে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা বলয় নির্ধারণ সবকিছু নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে আগাম নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, “দীর্ঘদিন পর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। সে কারণে শপথ অনুষ্ঠান যেন শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও মর্যাদাপূর্ণ হয় সে নির্দেশনা স্পষ্ট।

ডিএমপি, র‍্যাব ও অন্যান্য বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় করে একাধিক স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হচ্ছে।

সংসদ ভবন প্রস্তুত
নতুন সরকারের শপথের পরপরই জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের প্রস্তুতিও প্রায় শেষ। সংসদ ভবন, এমপি হোস্টেল, ন্যাম ভবন এবং স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের সরকারি বাসভবনের সংস্কার ও মেরামত কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংসদ এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো ও সরঞ্জাম  প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে সংসদ ভবন যেকোনো সময় কার্যক্রম শুরুর জন্য প্রস্তুত।

সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা বলেন, জাতীয় সংসদ ভবন এখন অধিবেশন শুরুর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নির্ধারণে অগ্রগতি
নতুন প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন নির্ধারণেও অগ্রগতি হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

কমিটি ইতোমধ্যে চারটি সম্ভাব্য ভবন পরিদর্শন করেছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে নতুন সরকার।তবে অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা, জাতীয় সংসদ এলাকার স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন অথবা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন কোনো ভবন অস্থায়ী বাসভবন হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর বসবাসের উপযোগী করে একাধিক ভবন প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নতুন সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, আমরা সেটিই বাস্তবায়ন করব।”

রোজার আগে ক্ষমতা হস্তান্তরের গুরুত্ব
 সূত্র জানায়, রোজার আগে সরকার গঠনের একটি বাস্তব কারণও রয়েছে। রমজান মাসে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি তুলনামূলকভাবে কমে আসে। বাজেট, উন্নয়ন প্রকল্প ও নীতিনির্ধারণের কাজেও প্রভাব পড়ে। সে কারণেই রোজার আগেই নতুন সরকারের হাতে দায়িত্ব তুলে দিতে চায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এতে করে রমজানের মধ্যেই নতুন মন্ত্রিসভা কাজ শুরু করতে পারবে।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, “নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যেই নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ তিন দিন সময় লাগতে পারে। সে হিসাবে আগামী ১৭ অথবা ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে।”

তিনি বলেন, “নির্বাচনের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। ফল ঘোষণা হওয়ার পরপরই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করবেন। এরপরই শুরু হবে ক্ষমতা হস্তান্তরের মূল প্রক্রিয়া।”

ঢাকা/এএএম/এসবি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়