ঢাকা     রোববার   ১২ এপ্রিল ২০২৬ ||  চৈত্র ৩০ ১৪৩২ || ২৪ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

গণভোটের রায় বাস্তবায়নে রাজপথে ১১ দলীয় জোট, কোন দিকে গড়াবে আন্দোলন

রায়হান হোসেন  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:৪২, ১২ এপ্রিল ২০২৬   আপডেট: ২১:৪৩, ১২ এপ্রিল ২০২৬
গণভোটের রায় বাস্তবায়নে রাজপথে ১১ দলীয় জোট, কোন দিকে গড়াবে আন্দোলন

গণভোটের রায় বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিশেষ করে, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটের রাজপথমুখী কর্মসূচি পরিস্থিতিকে আরো অনিশ্চিত করে তুলেছে। গণভোটে জনগণের সুস্পষ্ট মতামত প্রকাশের পর সেই রায় কার্যকর করার দাবিতে আন্দোলনের যে ধারা শুরু হয়েছে, তা এখন শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বৃহত্তর জনআন্দোলনে রূপ নিতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। 

ইতোমধ্যেই গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে চাপে রাখতে সংসদের পাশাপাশি রাজপথে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোট। দাবি আদায়ে সংসদে ওয়াকআউটের পাশাপাশি রাজপথে ধারাবাহিক কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছে জোটটি। এখন প্রশ্ন উঠছে, এই আন্দোলন কি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি তা আরো তীব্র ও সংঘাতমুখী পথে অগ্রসর হবে? সব মিলিয়ে এই গণভোটের রায় বাস্তবায়নে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ গতিপথ কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে।

আরো পড়ুন:

রবিবার (১২ এপ্রিল) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে ১১ দলীয় ঐক্য সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও সরব থাকবে। সরকার গণভোটের রায় মেনে সংস্কার বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত তারা এই আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। আলোচনা ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে দাবি আদায় না হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনে কঠোর আন্দোলন করা হতে পারে জানিয়েছে ১১ দলীয় ঐক্যজোট।

গণভোটের রায় বাস্তবায়নে আন্দোলন কতদূর গড়াবে?

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন নতুন টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণের রায় স্পষ্ট হলেও তা বাস্তবায়ন নিয়ে এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে একপ্রকার অচলাবস্থা। বিশেষ করে, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সংসদ থেকে ওয়াকআউট ও রাজপথে আন্দোলন করছে।

১১ দলীয় ঐক্যজোটের সূত্র জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৪টি বাতিল এবং ১৬টি এখনই বিল আকারে না আনার সুপারিশ করেছে সংসদের বিশেষ কমিটি। ফলে, এই ২০টি অধ্যাদেশের কার্যকারিতা থাকছে না। বিরোধী দলের আপত্তিতে সরকারি দলের কর্ণপাত না করা এবং গণভোটের রায় পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে রাজপথে কঠোর আন্দোলনের পথ তৈরি হচ্ছে ১১ দলীয় ঐক্য জোটের।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের এক সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, “জামায়াতের আন্দোলন কখনো ব্যর্থ হয়নি। জামায়াত জানে, কীভাবে দাবি আদায় করে নিতে হয়। জনআকাঙ্ক্ষা ও গণভোটের রায় জুলাই সনদের ৪৮টি প্রস্তাবের পক্ষে জনগণ যে সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট দিয়েছে, তা সরকারকে মানতে হবে। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন হলেও জুলাইয়ের সেই গণরায় বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত বিপ্লবের আসল উদ্দেশ্য সফল হবে না। জনগণের রায় বাস্তবায়নের এই আন্দোলনের এখন আর কেবল নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি হয়ে উঠেছে জুলাইয়ের চেতনার ধারক সাধারণ মানুষের এক বিশাল নৈতিক অবস্থান। আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এখন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিচ্ছি। তবে, সরকারকে মনে রাখতে হবে, এই দেশের মানুষের এখন চোখ খুলেছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার মতো দানবকে তারা তাড়িয়ে দিয়েছে। এই জনগণ সব পারবে।”

জামায়াত জোটের সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি 
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি চলছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য‌ জোটের। গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পক্ষে ৯ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ কর্মসূচি পালন করছে ১১ দলীয় ঐক্য‌ জোট। এর মধ্যে ১১ এপ্রিল সারা দেশের উপজেলা ও থানায় বিক্ষোভ মিছিল, ১২ এপ্রিল সব জেলায় বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল এবং ১৩ এপ্রিল ঢাকায় জাতীয় সেমিনারের কথা রয়েছে।

এছাড়া, বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে ১০ এপ্রিল রাজধানীতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে জামায়াতে ইসলামী।

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনের সম্পর্কে জানতে চাইলে ১১ দলীয় ঐক্য‌জোটের অন্যতম শরিক দল খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেছেন, “আমরা ধীরে ধীরে পথ চলতে চাই। এখনই কঠোর কর্মসূচি দিতে চাই না। সরকারকে অনুধাবন করতে হবে, জনগণের রায় বাস্তবায়নের জন্য আমার যৌক্তিক আন্দোলনে আছি। আমরা গণভোটের রায় যেকোনো মূল্যে বাস্তবায়ন করতে চাই। তাই, শুরুতেই মারমুখী কর্মসূচিতে না গিয়ে গণসংযোগ ও জনমত গঠনে কাজ করতে করছি। এতে না হলে জোট আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবে।”

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ৭২ ঘণ্টা অনশন
জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ তিন দফা দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে ৭২ ঘণ্টা অনশন করেছেন শিক্ষার্থীরা।

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ থেকে বিরত রাখা এবং গুম প্রতিরোধসহ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো সংসদে বিল আকারে উপস্থাপনের দাবিতে গত বুধবার (৮ এপ্রিল) বিকেলে ঢাবির রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আমরণ অনশনে বসেন সাদিক মনোয়ার। ওই দিন সন্ধ্যায় তার সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে অনশনে বসেন সাকিবুর। বৃহস্পতিবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইকবাল হোসেন শাহীন ওই অনশনে যোগ দেন। শনিবার (১১ এপ্রিল) বিকালে একাধিক শহীদ পরিবারের সদস্যের অনুরোধে অনশন ভাঙেন তিন শিক্ষার্থী।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গণ‌ভোটের রায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান ও আগামীর অনিশ্চয়তা বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের জন্য এসিড টেস্ট। জুলাই বিপ্লবের ফসল হিসেবে ক্ষমতায় আসা এই সরকারের বিরুদ্ধে যখন জুলাই সনদের রায় বাস্তবায়নের দাবিতেই বিরোধী দল রাজপথে নামে, তখন নৈতিকভাবে সরকার কিছুটা রক্ষণাত্মক অবস্থানে চলে যায়। সরকারের ভেতর থেকে বলা হচ্ছে সময় প্রয়োজন, কিন্তু রাজপথ সেই সময় দিতে নারাজ। একদিকে জনগণের ঐতিহাসিক রায়ের প্রতিফলন ঘটানোর দায়, অন্যদিকে সরকারের ক্ষমতার স্থিতিশীলতা রক্ষা। সব মিলিয়ে দেশজুড়ে এখন একটাই আলোচনা—গণভোটের এই রায় কি শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে কার্যকর হবে, নাকি রাজপথের উত্তাপ নতুন কোনো অনিশ্চিত মোড় ঘুরিয়ে দেবে বাংলাদেশের ইতিহাসের চাকা?

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে আগামী দিনের কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে আমাদের সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি চলছে। আমার চাই, সংসদে ফয়সালা হোক। সংসদে এই বিষয়ে সিদ্ধান্তে না হলে প্রয়োজনে আমরা রাজপথে কঠোর কর্মসূচি দেবো। সে বিষয়ে জোটের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। সিদ্ধান্ত হলে জানানো হবে।”

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আন্দোলন সম্পর্কে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মিডিয়া সেক্রেটারি ইয়াসির আরাফাত রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেছেন, “গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য আমাদের যা করা প্রয়োজন, আমরা তা করব। রাষ্ট্র সংস্কারে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন জরুরি, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করতেই হবে। সরকারি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে গণভোটে রায় মানতে চাচ্ছে না। আমরা মাঠে আছি। জনগণ দেশে পরিবর্তনের রাজনীতি দেখতে চেয়েছে। তারা আমাদের সাথে আছে। গণভোটের রায় সম্পর্কে সংসদে সমাধান না হলে তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনে আরো জোরালো কর্মসূচি দিয়ে রাজপথে নামব।”

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, “দাবি আদায়ে বিরোধী জোট সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও সরব থাকবে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে দেশে আবারো ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে। দেশের জনগণ সেটি আর হতে দেবে না। সরকার গণভোটের রায় মেনে সংস্কার বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে। কোনো অবস্থায় জনগণের রায়কে অগ্রাহ্য করার সরকারি সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া হবে না।”

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের বিষয়ে সম্প্রতি এক কর্মী সম্মেলনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, “জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত গণভোটই সর্বোচ্চ আইনি ভিত্তি বহন করে। যখন ৭০ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দেয়, তখন তা অস্বীকারের সুযোগ নেই। সংবিধানের আলোকে জনগণের অভিপ্রায়ই সর্বোচ্চ আইন এবং সেই অভিপ্রায় উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী। গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় উপেক্ষা করে সরকার দেশে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট তৈরি করছে। ৫ কোটি মানুষের ‘হ্যাঁ’ ভোটে গৃহীত সংস্কারকে অস্বীকার করা জনগণের মতামতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার শামিল।”

সংসদে জামায়াত দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক বিরোধী শক্তি হিসেবে কাজ করছে, উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “সহিংসতার পথ পরিহার করে আমরা সংসদ ও রাজপথে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের অধিকার আদায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাব।”

ঢাকা/রফিক

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়