সোনালী ব্যাংক সুড়ঙ্গের আলোচিত ২৬ জানুয়ারি আজ
রুমন চক্রবর্ত্তী || রাইজিংবিডি.কম
সেই সুড়ঙ্গ এবং ব্যাংক লুটের মূলহোতা সোহেল ও তার সহোদর
রুমন চক্রবর্ত্তী, কিশোরগঞ্জ : আজ সোনালী ব্যাংক সুড়ঙ্গের আলোচিত ২৬ জানুয়ারি। কিশোরগঞ্জে সুড়ঙ্গপথে লুটে নেওয়া হয় সোনালী ব্যাংকের ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। দুঃসাহসিক, অকল্পনীয় আর ফিল্মি কায়দায় ঘটেছিল কিশোরগঞ্জ জেলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখায় টাকা লুটের ঘটনা। দেখতে দেখতে একটি বছর চলে গেল। অথচ গেল বছরের শুরুতেই একমাত্র আলোচনার বিষয় ছিল সুড়ঙ্গপথে ব্যাংক লুটের কাহিনি।
মিডিয়াগুলোতে সেদিন ফলাও হয়ে প্রচার হয় ব্যাংক লুটের ঘটনাটি। তখন দেশে-বিদেশে আলোচনায় শীর্ষ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছিল সুড়ঙ্গপথে লুটের এই কেচ্ছা কাহিনি। যা দেশের প্রতিটি নাগরিককে বিস্ময়করভাবে স্মরণ করিতে দেবে হয়তো বিশেষ কোনো মুহূর্তে।
ঘটে যাওয়া দিনগুলো : ২৬ জানুয়ারি ২০১৪ রোববার বেলা ৩টায় কিশোরগঞ্জ সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নজরে আসে সুড়ঙ্গ তৈরি করে লুটের ঘটনা। কর্তব্যে অবহেলার জন্য রাতেই ব্যাংকে দায়িত্বরত আটজন পুলিশ সদস্যকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল। ২৭ জানুয়ারি চলে র্যাব, সিআইডি ও গোয়েন্দা সংস্থার কঠোর তদন্ত, জিজ্ঞাসাবাদ ও চিরুনি অভিযান।
২৮ জানুয়ারি ঘটনার অবসান ঘটে। ঢাকার শ্যামপুরের বালুঘাট এলাকায় ‘তনয় ভিলা’ নামক ছয়তলা ভবন থেকে চুরির ঘটনার মূল হোতা হাবিব ওরফে সোহেল ও তার সহযোগী ইদ্রিছ ওরফে মোতাহার গ্রেফতার করা হয়। আর দুই ধাপে ঢাকার শ্যামপুরের বালুঘাট এলাকার ‘তনয় ভিলা’ ও কদমতলীর মদিনা মসজিদসংলগ্ন সোহেলের ভাড়া করা তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে উদ্ধার করে মোট ১৬ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৬৪ টাকা এবং সে সঙ্গে তদন্তকারী দল আটক করে সোহেলের স্ত্রী মাহিমাকে। ২৯ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জ শাখার ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক এ কে এম ফজলুল হক আদালতের অনুমতি পাওয়ার পর আলোচিত সুড়ঙ্গপথটি কড়া নজর দারিতে ইট-সিমেন্ট আর বালুর মিশ্রণে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সুড়ঙ্গ মেলা : দেশের ইতিহাসে ব্যাংক থেকে সবচেয়ে বড় অঙ্কের টাকা চুরির ঘটনায় ব্যবহৃত হয় এই সুড়ঙ্গপথটি ছিল ব্যাপক চাঞ্চল্যকর। কিশোরগঞ্জ জেলার সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে টানা তিন দিন ধরে ২৫ ফুট দীর্ঘ এই সুড়ঙ্গপথটি নিয়ে জন্ম ছিল ব্যাপক কৌতূহল আর উন্মাদনা। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এ সুড়ঙ্গটিকে এক নজর দেখার আশায় সব বয়সের অসংখ্য নারী-পুরুষ ভিড় ছিল ব্যাংকের সামনে। কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অসংখ্য মানুষের ভিড় থাকত বলে কৌতূহলী অনেকেই বলতেন সুড়ঙ্গ মেলা।
দুঃসাহসিক চুরির পরিকল্পনা : গ্রেপ্তারের পর হাবিব জানিয়েছিল দুঃসাহসিক চুরির পরিকল্পনার কথা। ব্যাংকের পেছনে বাসা ভাড়া নেওয়ার ছয় মাস পর থেকে শুরু হয় তার সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ। প্রতিদিনই একটু একটু করে ছেনি আর হাতুড়ি দিয়ে গর্ত খুঁড়েন হাবিব। ব্যবসায়িক এলাকা থাকায় আর প্রতিনিয়ত গাড়ি চলাচল করায় অনেক শব্দ থাকত। আর এর সুবিধা ভোগ করে হাবিব সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ করতেন দিনের বেলায়। সন্ধ্যায় বাসার সবকিছু বন্ধ করে নগুয়া এলাকায় তার স্ত্রীর কাছে চলে যেতেন।
ছয় মাস পর থেকে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজে কাটার ও ড্রিল মেশিন ব্যবহার করা হয়। কাঠ ও বাঁশ দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে কৌশলে বিদ্যুতের বাতি জ্বালিয়ে চলে কাজ। ভুল জায়গার কারণে প্রথমবার তার সুড়ঙ্গ তৈরি ভেস্তে যায়। প্রথমবার তৈরি সুড়ঙ্গ ভল্টের পাশের একটি প্যাসেজ দিয়ে বের হয়। তবে তিনি দ্রুত তা ভরাট করে ফেলেন। এরপর তিনি গ্রেফতার হওয়া ব্যাংকের পিয়ন আবু বাক্কারের সঙ্গে বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি পরিচয়ে সম্পর্ক গড়ে তুলেন।
এর মধ্যে ভল্টের ভেতর বৈদ্যুতিক সমস্যা দেখা দিলে আবু বাক্কার তা সমাধানের জন্য সোহেলকে নিয়ে আসেন। এভাবে আবু বাক্কারের কাছ থেকে কৌশলে জেনে নেন ব্যাংকের কোন স্থানে কী আছে। জেনে নেন কখন কখন ভল্ট ও ব্যাংক খোলা হয়। ভল্টের ভেতর বিদ্যুতের কাজ করার সময় সোহেল ভালোমতো ধারণা নেন এবং পরবর্তী সময়ে আবার নতুন করে সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ শুরু করে। দ্বিতীয় দফায় সে সফলভাবেই ভোল্টের ভেতর প্রবেশ করতে সক্ষম হয়।
চূড়ান্ত পরিকল্পনা ও অভিযান : ২৪ জানুয়ারি রাতে শুরু হয় তার চূড়ান্ত অভিযান। ওই দিন রাত ৮টার দিকে সুড়ঙ্গপথে সোহেল সোনালী ব্যাংকের ভল্ট কক্ষের মেঝের সন্ধান পান। এরপর নিজ কক্ষে ফিরে এসে ৪০ টন ও ২০ টনের ২টি গাড়ির কাজে ব্যবহৃত জগ ব্যবহার করেন ফ্লোর ভাঙার জন্য। এ সময় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে একের পর এক ভল্ট ভাঙার কাজ শুরু করেন। রাত ১০টার দিকে পাঁচটি বস্তা নিয়ে আবারও সুড়ঙ্গ দিয়ে ব্যাংকে ঢোকেন হাবিব। টানা চার ঘণ্টায় পাঁচটি বস্তায় টাকা ভর্তি করে রাত ২টার দিকে শেষ হয় তার অভিযান। পরে পাঁচটি টাকাভরা বস্তা নিয়ে নিজের কক্ষে ফিরে আসেন সোহেল।
পুলিশ সূত্রমতে, সোহেল চুরির ঘটনার পর থেকে ১৯টি সিম কার্ড ও ৯টি মোবাইল সেট পরিবর্তন করেছিলেন। ওই সব নম্বর মোবাইলের কললিস্টের সূত্র ধরে তার গতিবিধি শনাক্ত করা হয়। বর্তমান র্যাবের উন্নত তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার কারণেই খুব অল্প সময়ে তাকে শনাক্ত ও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছিল।
বর্তমান অবস্থা : মামলার স্পেশাল আইনজীবী এ বি এম লুৎফর রশিদ রানা রাইজিংবিডিকে জানান, সোনালী ব্যাংকে লুটের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া আসামিরা বর্তমানে জেলহাজতে রয়েছেন। তবে সোহেলের কথিত স্ত্রী মাহিমা জামিনে মুক্ত হয়েছেন। সর্বশেষ ২১ জানুয়ারি ব্যাংক কর্মচারী মো. সিদ্দিকও জামিনে মুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে ট্রাক হেলপার আলমগীরকে এ মামলা থেকে মুক্তি দেওয়া হবে। তবে সেটি মামলা চার্জশিট গ্রহণের পর। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আলাউল আকবরের আদালতে আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি ব্যাংক লুটের ঘটনায় গ্রেফতারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট গ্রহণ করা হবে।
রাইজিংবিডি/কিশোরগঞ্জ/২৬ জানুয়ারি ২০১৫/ রুমন/শাহ মতিন টিপু/এএ
রাইজিংবিডি.কম
যুদ্ধ শেষ, ইরানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত: ট্রাম্প