আমি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলার পক্ষে নই : বিপ্রদাশ বড়ুয়া
তাপস রায় || রাইজিংবিডি.কম
লেখক, গবেষক, নিসর্গবিদ বিপ্রদাশ বড়ুয়া। ছবিটি সংগৃহীত
বিপ্রদাশ বড়ুয়া সমকালীন ও চিরায়ত বিচিত্র বিষয় নিয়ে গল্পের ভুবন নির্মাণ করেন, উপন্যাস রচনা করেন বড়-ছোট সবার জন্য। অসচরাচর বিষয় নিয়ে লেখা তার গল্পগুলো প্রবাদতুল্য প্রসিদ্ধি পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্প লিখেছেন প্রায় শতাধিক। তার প্রথম উপন্যাস ‘অচেনা’ (১৯৭৫), এবং প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সাদা কফিন’ (১৯৮৪)। এর বাইরেও বড়দের জন্য ১৬টি এবং ছোটদের জন্য ৪৪টি গল্পগ্রন্থ লিখেছেন। পেয়েছেন বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ও তিনবার অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার। নিসর্গবিদ হিসেবেও তার সমধিক পরিচিতি রয়েছে। সম্প্রতি তিনি এসেছিলেন রাইজিংবিডি কার্যালয়ে। এ সময় অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে কেন্দ্র করে তিনি একটি সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার দেন। সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হলো; নিয়েছেন তাপস রায়।
তাপস রায় : এ সময়ে এসে অমর একুশে গ্রন্থমেলার কোন পরিবর্তনগুলো বেশি চোখে পড়ছে?
বিপ্রদাশ বড়ুয়া : অনেক স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে। প্রথমে মেলা অনেক ছোট ছিল। মানুষ কম ছিল। এখনকার মতো এতটা ভিড় ছিল না। ফলে পাঠক বাংলা একাডেমি চত্বরে মেলায় এসে ঘুরতে পারত, বই পড়তে পারত। অর্থাৎ ঘুরে, পড়ে দেখেশুনে পছন্দের বইটি কিনতে পারত। এখন বাংলা একাডেমি এই মেলা ধারণ করতে পারছে না। মাঝখানে তো এই মেলা কেন্দ্র করে বেশ বিশৃঙ্খল পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। এখন অবশ্য সে পরিস্থিতি অনেকটাই অতিক্রম করা গেছে।
তাপস রায় : মেলার পরিসরও আগের তুলনায় বেড়েছে।
বিপ্রদাশ বড়ুয়া : হ্যাঁ। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলার পক্ষপাতী আমি নই। কেননা এটা হলো উদ্যান। এর আলাদা একটি সত্বা আছে। এই সত্বাটি কোনো কিছুর বিনিময়েই বিকানো যাবে না। প্রকৃতিকে অবশ্যই প্রকৃতির মতো থাকতে দিতে হবে। গাছ তো এসব সহ্য করতে পারে না। সুতরাং এর প্রভাব গাছের ওপর পড়বেই। একটা গাছ মারা যেতে দুই-পাঁচ-সাত বছর লেগে যায়। ফলে এর ক্ষতিকর প্রভাব এখন বোঝা যাবে না। আবার এটাও ঠিক, বইমেলার প্রয়োজন আছে। আবার গাছেরও তো প্রয়োজন আছে।
তাপস রায় : তাহলে এর সমাধান কীভাবে হতে পারে?
বিপ্রদাশ বড়ুয়া : এটা সবাই মিলে বসে ভাবতে হবে। তার আগে সমস্যাটা স্বীকার করতে হবে এবং এই উদ্যোগ বাংলা একাডেমিকেই নিতে হবে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শুধু বইমেলা কেন, যে কোনো জনসভা, গানবাজনার আসর- এগুলোর পক্ষপাতী আমি নই। উদ্যানটিকে বাঁচাতে হবে। ঢাকায় তো উল্লেখযোগ্য উদ্যান নেই। অনেকে বিনোদনের জন্য বইমেলায় আসে (বই কিনতেও আসে অনেকে), কারণ বেড়ানোর মতো জায়গার খুব অভাব। সোহরাওয়র্দী উদ্যান কিন্তু এ অভাব পূরণ করতে পারে। যদিও এ জন্য বিশেষ প্রস্তুতির প্রয়োজন।
তাপস রায় : একজন লেখক হিসেবে এবারের মেলার জন্য আপনার প্রস্তুতি কেমন হলো?
বিপ্রদাশ বড়ুয়া : সরকারি চাকরির বয়সসীমা যখন পাড় হলো এরপর আর কোনো চাকরি নেইনি। অথচ আরো দুবছর চাকরির সময়সীমা বাড়িয়ে নিতে পারতাম। কিন্তু এরপর আমি শুধু লিখতেই চেয়েছি। দেখতে চেয়েছি প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে। এই জীবনে কত জায়গায় গিয়েছি তা বলার নয়। এবার মেলায় আমার নয়টি বই প্রকাশিত হবে। এর মধ্যে শিশুতোষ গল্পসমগ্র দুটি (আদিগন্ত প্রকাশনী), বিভিন্ন দেশের গল্প সংকলন একটি (গ্রন্থকুটির), বড়দের গল্প এবং প্রকৃতি বিষয়ক একটি (পার্ল পাবলিকেশন্স); প্রকৃতি বিষয়ক এই বইটিকে আমার আত্মজীবনী বলা যেতে পারে। ‘গৃহসজ্জায় ৬০ টবসুন্দর’ শিরোনামে আরেকটি বই করবে বাংলাপ্রকাশ। এ ছাড়াও অ্যাডর্ন থেকে প্রকাশিত হবে ‘বিদ্যাসাগরের জীবনী’।
তাপস রায় : আপনি শিশুসাহিত্য লিখেছেন। কিন্তু সাহিত্যের এই ধারাটি ক্রমেই যেন রসশূন্য হয়ে পড়ছে!
বিপ্রদাশ বড়ুয়া : সাহিত্যে বড় লেখক তারাই যারা ছোটদের জন্যও সমানভাবে লিখেছেন। পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকালেও কিন্তু আমরা এটা দেখব। আমাদের এখানেও অনেক বড় সাহিত্যিক ছোটদের জন্য লিখেছেন। তবে তা পরিমাণে বেশ কম। তারা নিয়মিত কিশোরদের জন্য লেখেন না। অথচ সুনীল, শীর্ষেন্দু, সমরেশদের শিশুসাহিত্য সমগ্র রয়েছে ঢাউস আকৃতির। আমাদের লেখকরা যদি নিয়মিত শিশুকিশোরদের জন্য লিখতেন তাহলে এমন মনে হতো না। প্রকাশকদের এ জন্য যথাযোগ্য লেখকদের দিয়ে লিখিয়ে নিতে হবে। লেখকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। এখানে সৃজনশীলতার কমতি নেই, অভাব হলো সেটাকে সুনির্দিষ্ট পথে চালনা করার। আরেকটি ব্যাপার হলো লেখক-প্রকাশক-পাঠকদের মধ্যে একটা গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠা জরুরি, আমাদের এখানে তা হয়নি।
তাপস রায় : প্রকাশকদের লেখক সম্মানী না দেয়ার প্রবণতা কি এর একটি কারণ?
বিপ্রদাশ বড়ুয়া : অনেক প্রকাশক লেখককে সম্মানী দিতে চান না। আমি দীর্ঘদিন লিখছি, আমার যদি এ অবস্থা হয়, তাহলে তরুণ লেখকদের অবস্থা সহজেই অনুমান করে নেয়া যায়। আমার এক প্রকাশক আমাকে দেখলেই উল্টো দিকে মুখ ঘুড়িয়ে হাঁটতে শুরু করেন। দেশ যদি আজ সঠিক পথে চলত, তাহলে তার ছাপ সব ক্ষেত্রে পাওয়া যেত। সব জায়গায় অসততা যেন ঘিরে রেখেছে। অনেক ক্ষেত্রে আমি জানতেই পারি না আমার কয় কপি বই বিক্রি হলো!
প্রকাশকরা ব্যবসায়ী। অনেকে সেখানেও ফাঁকি দিচ্ছেন। একটি প্রকাশনা সংস্থায় রিভিউ বোর্ড থাকা প্রয়োজন। হাতে গোণা দু-একটি প্রকাশনী ছাড়া কারো রিভিউ বোর্ড নেই। তাহলে বই সম্পাদনা কে করবেন বা করছেন? আসলে অনেক প্রকাশক তাদের ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করছেন না।
রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৮ জানুয়ারি ২০১৫/তাপস রায়
রাইজিংবিডি.কম
নারী সাফ: ভারতের কাছে ৩-১ গোলে হেরে রানার্সআপ বাংলাদেশ