ঢাকা     রোববার   ১৬ জানুয়ারি ২০২২ ||  মাঘ ২ ১৪২৮ ||  ১২ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

‘আমার থেকে বেশি কষ্ট বাংলাদেশে আর কেউ পায়নি’

ইয়াসিন হাসান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:০০, ১০ জুন ২০২০   আপডেট: ১২:২৯, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১
‘আমার থেকে বেশি কষ্ট বাংলাদেশে আর কেউ পায়নি’

অলংকরণ: সিজার

বদলে যাওয়া বাংলাদেশের উত্থান ২০১৫ বিশ্বকাপ থেকে, মাশরাফি বিন মুর্তজার হাত ধরে। বাংলাদেশের সফলতম অধিনায়কের নেতৃত্বে ওয়ানডে ক্রিকেটে নতুন উচ্চতায় উঠেছে বাংলাদেশ। সেই মশাল এখন এগিয়ে নেওয়ার ভার তামিম ইকবালের উপর।

২০১১ সালে হয়েছিলেন সাকিবের সহকারী। পূর্ণ অধিনায়ক হতে তামিমের লাগলো নয় বছর! মাঝে অনেক উত্থান-পতন হয়েছে। তামিম ভেঙেছেন, নতুন করে গড়েছেন নিজেকে। এখন তার সাফল্যের সূর্য মধ্যগগণে। সেরা সময়ে পেয়েছেন দলের নেতৃত্ব ভার।

হয়েছেন দেশ সেরা ওপেনার। পারবেন কি দেশ সেরা অধিনায়ক হতে? পারবেন কি বাংলাদেশকে আরও একধাপ এগিয়ে নিতে? কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে তামিমের কণ্ঠে নতুনের জয়গান। সেসব বাদেও তার কাছ থেকে জানা গেল করোনাকালের গল্প। রাইজিংবিডির দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তামিম খুলে দেন কথার ঝাঁপি।

মুঠোফোনে তার কথা শুনেছেন ইয়াসিন হাসান

রাইজিংবিডি: করোনায় প্রায় তিন মাস মাঠের বাইরে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নিশ্চয়ই মাঠে ফিরবেন। ফেরার পর প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ কি হতে পারে?

তামিম: আমার কাছে মনে হয় অভ্যস্ত হতে কিছুদিন সময় লাগবে। স্বাভাবিক সময়ে আমরা আউটডোরে কাজগুলো করে এসেছি। আবার ইনডোরেও করেছি। কিন্তু করোনার কারণে আমরা এখন যেগুলো ইনডোরে (ঘরে) করছি সেগুলোর সাথে বাইরের কিছুর মিল নেই। এজন্য শুরুতে মানিয়ে নেওয়া টাই প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে। এখন আবার বাংলাদেশে গরম পড়ে গেছে। এজন্য হুট করে বাইরে বেরুলে মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগবে। ফিটনেস নিয়ে কোনও সমস্যা হবার কথা না। যেটা নিয়ে আমরা একটু ভুগতে পারি, সেটা হলও আমাদের স্কিল ওয়ার্ক। হয়তো ১৫ সেশন প্রয়োজন হতে পারে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে। এজন্য স্কিল ওয়ার্কটাও আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে।

রাইজিংবিডি: ম্যাচ ফিটনেস বিষয়টি যার যার ব্যক্তিগত অনুশীলনের উপর নির্ভর করে। যদি সামগ্রিক চিন্তা করেন তাহলে ম্যাচ ফিটনেস পাওয়ার জন্য কতটা সময় লাগতে পারে?

তামিম: আমার মনে হয় এক থেকে দেড় মাস। তবে একমাস লাগবেই। আরেকটি বিষয়ও আছে, এখন কি অবস্থায় আছি, কেমন অনুভব করবো সেটা বাসায় বসে বলা কঠিন। মাঠে যাওয়ার পর ট্রেনিংয়ে ফিরলে আমরা নিজের শরীর সম্পর্কে আরও ভালো বুঝতে পারব। হয়তো ব্যাটসম্যানদের কম সময় লাগতে পারে। আবার দ্রুত গতির বোলারদের বেশি সময় লাগবে। আমার ও দ্রুতগতির বোলারদের একই সময় লাগবে এমনটা না। আমি যতটা দ্রুত নিজেকে ফিরে পাবো, একজন পেসার ততটা দ্রুত ফিরতে পারবে না। ওদের শরীরের উপর দিয়ে অনেক ধকল যাবে, চাপ যাবে। তাদের সময় বেশি লাগবে।

রাইজিংবিডি: একটু হাস্যকর মনে হতে পারে, যদিও এমনটা হয় না কখনো...আপনাকে যদি ফ্রি করে দেওয়া হয় যতক্ষণ মন চায় ব্যাটিং করতে, ঠিক কতক্ষণ ব্যাটিং করবেন?

তামিম: (হাসি) আমি খুব অল্প ব্যাটিং করবো। আমার মনে হয় না দুই ঘণ্টা বা আড়াই ঘণ্টা ব্যাটিং করলে কোনও লাভ হবে প্রথম দিন। প্রথম দিন যেহেতু ব্যাটিংয়ে যাবেন আপনি কিছুটা হলেও বিবর্ণ থাকবেন। এজন্য তাড়াহুড়ো না করে মৌলিক জিনিসগুলি যেমন ডিফেন্স, ব্যাক ফুট ডিফেন্স, ফ্রন্ট ফুট ডিফেন্স এগুলো ঠিক করবো। মৌলিক জিনিসগুলি ঠিক রেখে আমি যদি ২০ থেকে ২৫ মিনিট ব্যাটিং করতে পারি তাহলে পর্যাপ্ত। প্রথম দিন-ই যদি আমি দুই-তিন ঘণ্টা ব্যাটিং করি তাহলে ছোটখাটো ইনজুরি হয়ে যেতে পারে। এজন্য আমার কাছে মনে হয় প্রথমে কম সময়, তারপর আস্তে আস্তে গতি এবং সময় বাড়াতে হবে। এরকম হতে পারে, প্রথম দিন ১৫ মিনিট। পরের দিন ২৫ মিনিট। এরপর ৩০ মিনিট। এভাবে যেতে হবে। পরের দিন আরেকটু বেশি। তোড়জোড় করা যাবে না কোনোভাবেই।

রাইজিংবিডি: আপনি জানেন, লালা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। অনেকেই বলছে রিভার্স হবে না আগের মতো। টেস্টে পুরনো বলে বোলারদের জন্য কার্যকর কিছু থাকবে না। ব্যাটসম্যানদের কাজ সহজ হয়ে গেল না তাহলে?

তামিম: ওয়ানডে ক্রিকেটে এটা কোনও প্রভাব রাখবে না। আমার কাছে মনে হয় ওয়ানডে ক্রিকেটে বলের শাইন তেমন থাকে না। এ জন্য ওয়ানডেতে এটা প্রভাব রাখবে না। তবে এটা টেস্ট ক্রিকেটে প্রভাব রাখবে। টেস্টে বলের শাইন ধরে রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা স্পিন বোলিং ও ফাস্ট বোলিংয়েও সাহায্য করে। বলে শাইন না থাকলে তো কঠিন হবে বোলারদের জন্য। তবে বোলারদের অন্য কোনও উপায়ে এটা ব্যবস্থা করতে হবে। যেটা বললেন, লালা যদি ব্যবহার করতে না পারে এবং বলে যদি শাইন না থাকে তাহলে পরিস্থিতি ব্যাটসম্যানদের অনুকূলে থাকবে। কিছুটা হলেও ব্যাটসম্যানরা সুবিধাভোগ করবে।

রাইজিংবিডি: দীর্ঘ সময়ে মানুষের ভালোবাসা যেমন পেয়েছেন। করোনার সময় কি সেই ভালোবাসাগুলোই মানুষের সাথে ভাগাভাগি করলেন?

তামিম: এভাবে সত্যি-ই চিন্তা করিনি। হ্যাঁ, এটা ঠিক মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। বলতে দ্বিধা নেই এ দীর্ঘ সময়ে প্রচুর ভালোবাসা পেয়েছি। কিন্তু কিছু পেয়েছি বলেই যে তাদেরকে ফিরিয়ে দিতে হবে সেভাবে চিন্তা করি না। যেটাই করেছি বা যতটুকু করেছি আমি শুধু চিন্তা করেছি এ মুহূর্তে কি করলে মানুষ জন খুশি হবেন, মানুষের জন্য ভালো হবে। আমার দায়িত্বের জায়গা থেকে যদি আমি দুইজন মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারি এটাই আমার পরম পাওয়া। দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্কে আমি মোটেও বিশ্বাসী নই। আপনি মানুষের জন্য যতটুকু করতে পারবেন, আপনার ততটুকু করা উচিত তাদের জন্য।

রাইজিংবিডি: এমন কিছু কাজ করেছেন যেগুলো হয়তো আপনার গণ্ডির ভেতরে পড়ে না। কিন্তু আপনি করেছেন নিজের ইচ্ছেতেই। সেগুলো নিয়ে হয়তো বলার আছে সামান্যই। তবুও যদি নিজের মনের ভেতরে কি চলে সেগুলো শেয়ার করতেন?

তামিম: আমি সব সময় একটা জিনিস ভাবি, আজ আমি যে জায়গায় আছি, সেখানে দাঁড়িয়ে আমার পক্ষে যতটুকু করা সম্ভব ততটুকু আমার করা উচিত। শুধুমাত্র আমি ক্রিকেটার দেখে তা না, এটা আপনি হতে পারেন, সামর্থ্যবান যে কেউ হতে পারে। আমার মূল কথা, দরিদ্র একজন মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য যদি নিজের জমানো কিছু থেকে উপকার করা যায় সেটা করা উচিত। যদি করা সম্ভব তাহলে কেন না!
আল্লাহ আমাদেরকে এতকিছু দিচ্ছে, নাম দিচ্ছে, অর্থ দিচ্ছে তাহলে কেন তাঁরই বান্দাদের জন্য কিছু করবো না? আমি বিশ্বাস করি যারা একটু দুস্থ বা গরিব তাদের দেখা আমাদের দায়িত্ব। আমি এটা বলছি না, আপনার জমানো যা আছে সব দিয়ে দেন। কিছুটা হলেও যদি শেয়ার করা যায় সেটা অবশ্যই ভালো দিক। আপনার সামান্য সহায়তায় দশটা পরিবার হয়তো ভালো থাকতে পারবে। এভাবেই চিন্তা করে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। আমি এটাও মনে করি খুবই ছোটখাটো কাজ করেছি। এমন বড় কোনও কাজ করিনি। বাংলাদেশের অনেক মানুষ অনেক দরিদ্রকে সাহায্য করেছে, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। হয়তো আমি ক্রিকেটার বলে আমারটা প্রকাশ হচ্ছে, গণমাধ্যমে এসেছে। এরকম অনেক মানুষকে আমি চিনি যারা করে যাচ্ছে অথচ তাদেরকে সাধারণ মানুষ চেনেও না।

রাইজিংবিডি: জীবনের প্রতিটি অধ্যায় আমাদেরকে কিছু না কিছু শেখায়। আপনি কিছুদিন আগে একটি প্রোগ্রাম হোস্ট করলেন। যদি একটু বড় করে বলেন আপনি কি শিখলেন?

তামিম: দেশি-বিদেশি অনেককে নিয়ে আমি প্রোগ্রাম করেছি। তাদের সবার কাছ থেকে আমার শেখার অনেক কিছু ছিল। আমার এমনও প্রশ্ন ছিল যেগুলোতে আমার নিজের জানার আগ্রহ ছিল। যদি আপনি দেখে থাকেন তবে দেখবেন, বিরাট কোহলিকে আমি ব্যাটিং অ্যাপ্রোচ নিয়ে একটা প্রশ্ন করেছিলাম। সেটা আমার নিজের জন্য জানতে চেয়েছি। সেখান থেকে যেন আমি কিছু শিখতে পারি। ঠিক তেমনই মুশফিককে অনেক প্রশ্ন করেছি। মাশরাফি ভাইকে প্রশ্ন করেছি। তাকে অধিনায়কত্ব নিয়ে করেছি, সেগুলো আমি নিজে শিখতে চাই। একেকটা সময়ে একেকটা জিনিস নিয়ে করেছি যেখান থেকে যেন আমি শিখতে পারি। আমি নিশ্চিত যারা দেখেছে তারা যদি ক্রিকেটিং ফিল্ডে নাও থাকেন...অনেক কথা নিজের পেশাদার জীবনের সাথে মিলিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। শেখার অনেক কিছু ছিল, যারা শিখতে চায় তারা অবশ্যই কিছু না কিছু পাবে।

রাইজিংবিডি: আপনার হোস্ট করা প্রোগ্রামে যেটা দেখতে পেলাম আপনি সিনিয়র বলেন আর জুনিয়র সবার সঙ্গে বন্ধু সুলভ মনোভাব নিয়ে থাকেন। অফ স্ক্রিনে আরও বেশি। এটা কি আপনার অধিনায়কত্বের সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট?

তামিম: এটা আমার অধিনায়কত্বে কতটুকু প্রভাব ফেলবে সেটা আমি বলতে পারছি না। তবে আমার সাথে সবার সম্পর্ক এরকমই। সেটা আজ থেকে না, শেষ দশ বছর ধরে। আপনি যদি মাশরাফি ভাইয়ের কথা চিন্তা করেন...উনি কিন্তু আমার বড় ভাইয়ের বন্ধু। কিন্তু সামনাসামনি আমাদের আলোচনা যদি কেউ দেখে তাহলে কেউ বুঝতে পারবে না যে, উনি আমার বয়সে বড়। আমরা ফ্রেন্ডের মতো। আবার জুনিয়রদের সাথে আমার যে চলাফেরা এবং তাঁরা আমাকে যেভাবে সম্মান করে সেটা বোঝানো যাবে না। এটা একদম অন্য একটা অংশ আমাদের। অধিনায়কত্বে প্রভাব পড়বে কিনা আসলেও বোঝা যাচ্ছে না। কারণ আমি মানুষ হিসেবে পরিবর্তন হইনি। সেটা অধিনায়ক তামিম হোক বা ব্যক্তিগত তামিম হোক। অধিনায়কত্ব নির্ভর করে মাঠের উপর। মাঠে আপনি কিভাবে নেতৃত্বে দেবেন, খেলোয়াড়দের সহযোগিতা করবেন, মাঠে ওদের থেকে যে সম্মানটা আসবে সেটা এখনও অনুভব করা হয়নি। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার যে সম্পর্ক আমার সাথে সবার এরকমই থাকে।

রাইজিংবিডি: দীর্ঘ সময় বাসায় ছিলেন। ছেলে-মেয়ে দুজনই বড় হচ্ছে। ছেলের বড় হওয়ার সময়টায় পাশে থাকতে পারেননি। কিন্তু মেয়ের টা একেবারে শুরু থেকে দেখছেন। পিতৃত্ব কেমন উপভোগ করছেন?

তামিম: সত্যিই...প্রথম বাচ্চার সময় এতো বেশি ক্রিকেট ছিল যে আসলে কখন ও বড় হয়ে গেছে টের পাইনি। মেয়ের বয়স এখন ছয় মাস। প্রায় চারমাস ওর সাথেই আমি। এটা অবশ্যই খুব ভালো লাগার জিনিস। ওকে দেখছি। দিনকে দিন ওর অ্যাক্টিভিটিজ পরিবর্তন হচ্ছে। উপভোগ করছি সময়টা। সবচেয়ে বড় কথা কোনও কিছু মিস হচ্ছে না। এরকম সময় পাই না। আমি বিরক্ত বা আলসেমি করছি তেমন না। আমি আমার স্বাভাবিক জীবনযাপন করছি।

রাইজিংবিডি: আপনি এখন ওয়ানডে দলের অধিনায়ক। দেশের হয়ে খেলতে পারাটা গর্বের। সেখানে অধিনায়ক হওয়া আরও বড় দায়িত্ব। নিজের স্বপ্নের পরিধি আরও বেড়ে গেল কি না?

তামিম: এর আগেও আমাকে অধিনায়ক করা হয়েছিল। তবে আমি চেয়েছিলাম লম্বা সময়ের জন্য অধিনায়ক হতে। লম্বা সময় পেলে দলে আপনি ব্যবধান করতে পারবেন। দল হিসেবে যেটা আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমি খুব অভিজ্ঞ অধিনায়ক নই। তবে আমার বিশ্বাস আছে আমি পারব। এজন্য আমাকে সময় দিতে হবে। আমার উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। আমাদের দর্শক যারা আছেন, তাদেরও একটু ধৈর্য ধরতে হবে। আমার এটাই কাজ থাকবে দলের ভালোর জন্য যা যা করার, আমি সবটাই করার চেষ্টা করব।

রাইজিংবিডি: তামিম ইকবাল ভালো অধিনায়ক হবেন নাকি একজন ভালো নেতা হবেন। একজন অধিনায়কের কাজ শুধু স্টেডিয়ামের ভেতরেই। কিন্তু একজন নেতা নিজের সকল সৈন্যদের আগলে রাখে। তামিম কোনটা হবেন?

তামিম: এটা এ মুহূর্তে আমার জন্য বলা কঠিন। সময় আমার হয়ে কথা বলবে। আমি একজন ভালো অধিনায়ক হই নাকি একজন ভালো নেতা হই সেটা সময় বলবে। বর্তমানে থেকে কেউ তো ভবিষ্যৎ বলতে পারবে না। বিশেষ করে আমি অধিনায়কত্ব শুরু করিনি। দ্বিতীয়ত আমি অধিনায়ক হিসেবে নিজেকে এখনও প্রমাণ করার সুযোগ পাইনি। যদি আল্লাহ পাশে থাকেন, আমি যদি অধিনায়কত্বের সুযোগ পাই এবং বেশ কয়েকটি ম্যাচ অধিনায়কত্ব করে ফেলি তখন হয়তো আমি নিজে বলতে পারবো দলকে পরিচালনা করার জন্য আমার কি করা উচিত। বর্তমান অবস্থায় ভবিষ্যৎ কি হবে সেটা বলা কঠিন।

রাইজিংবিডি: যেহেতু এখন অধিনায়ক। আপনার ক্যানভাসটাও বিশাল বড়। আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেট এখন আগের থেকে অনেক শক্তিশালী। ঘরোয়া ক্রিকেটে রেগুলার পারফর্ম করে যাওয়া কোনও ক্রিকেটারকে দেখে যদি মনে হয় তার সুযোগ প্রাপ্য আপনি কি তাঁর জন্য লড়াই করবেন?

তামিম: দেখুন আমি নিজে এখন পর্যন্ত প্রমাণিত অধিনায়ক নই। কারো জন্য লড়াই করতে হলে আমাকে নিজেকে আগে অধিনায়ক হিসেবে প্রমাণ করতে হবে। ওইটা আমাকে অর্জন করতে হবে। আমার কথার যেন মূল্য থাকে সেটা আমাকে নিশ্চিত করতে হবে। অর্জন কিভাবে করতে পারি! আমার নেতৃত্বে বাংলাদেশকে ভালো করতে হবে। আমি যদি ব্যক্তিগতভাবে ভালো পারফরম্যান্স করি এবং দলকে ভালোভাবে নেতৃত্ব দেই তাহলে আমি অনেক কিছু চাইতে পারবো। সেটা নির্বাচক হোক বা বোর্ডের কাছে হোক। তখন জিনিসটা সহজ হয়ে যাবে। আমি কোনও কিছু না করেই যদি চিল্লাচিল্লি করা শুরু করে দেই তাহলে হবে না। আমাকে নিজের জায়গা অর্জন করতে হবে অন্য কারো জন্য লড়াই করতে হলে।

রাইজিংবিডি: আপনার অভিষেক হয়েছিল ১৭ বছর বয়সে। এ মুহূর্তে যদি ওই বয়সের একটি ছেলেকে আপনার দলে দেয় আপনি তাকে কিভাবে তৈরি করবেন বা কি পরামর্শ দেবেন?

তামিম: ১৬-১৭ বছরের কোনও ক্রিকেটারকে যদি আমার পরামর্শ দিতে হয় তাহলে আমি অবশ্যই তাকে তাঁর চিন্তাধারা বড় করার কথা বলবো। এরকম চিন্তা যেন সে না করে, তাকে ১১ জনের মধ্যে সেরা খেলোয়াড় হতে হবে। সে যদি অনূর্ধ্ব-১৯ দলের খেলোয়াড় হয়ে থাকে তাহলে সে ওই দলের সেরা খেলোয়াড় হবে এমন চিন্তাধারা যেন না করে। তাঁর চিন্তাধারা বড় থাকতে হবে। টপ টেন ক্রিকেটার যেন হতে পারে এরকম মনোভাব থাকতে হবে। কিংবা টপ ফাইভ ব্যাটসম্যান হতে হবে এরকম চিন্তা থাকতে হবে। এরকম চিন্তা থাকলে তাহলে অনেক কিছু সহজ হয়ে যায়। ধরুন, আপনি ৫০ বা ৬০ রান করলেন। আপনি যদি শুধু বাংলাদেশকে নিয়ে চিন্তা করেন তাহলে আপনি তৃপ্তি পেয়ে যাবেন। কিন্তু যখন আপনি বিশ্ব ক্রিকেট নিয়ে চিন্তা করবেন তখন আপনি ৫০-৬০ রানে তৃপ্তি পাবেন না। অন্তত শতকের চিন্তা করবেন নয়তো আরও বড় কিছু করতে পারবেন। ক্রিকেটারদের চিন্তাধারা বড় থাকা গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি।

রাইজিংবিডি: অধিনায়ক তামিমের প্রথম সিরিজ। ব্যাটসম্যান তামিম ৩০০-৩৫০ রান করলেন। কিন্তু তিন ম্যাচের সিরিজে বাংলাদেশ ২-১ ব্যবধানে হেরে গেল। ব্যক্তিগত সাফল্য কতটা উপভোগ করতে পারবেন তামিম?

তামিম: আমার কাছে মনে হয় না। বাংলাদেশ এখন এমন পর্যায়ে চলে এসেছে যে...শুধু আমি না বাংলাদেশ দলে খেলা কোনও খেলোয়াড় যদি তিন ম্যাচের সিরিজে ১২ উইকেট পায় কিন্তু বাংলাদেশ সিরিজ হেরে যায় তাহলে সে খুশি হবে। হয়তো ব্যক্তিগতভাবে ভাবনা আসতে পারে কিন্তু দলগত চিন্তা যখন করবে তখন কেউ খুশি হবে না। আপনি একশ করলেন কিন্তু ম্যাচ হেরে গেছেন। খুশি হলেও কেউ তৃপ্তি পাবে না। আবার ওই একশর মূল্যও থাকে না আসলে। আমরা এখন ওই পর্যায় পার করে ফেলেছি। শুধু আমি না সবাই। যদি বিজয়ী দলের হয়ে ৪০ করি তাহলেও খুশি হবো। পরাজিত দলের হয়ে ৭০-৮০ করলেও তৃপ্ত হবো না।

রাইজিংবিডি: একটু ২০১৯ বিশ্বকাপ প্রসঙ্গে আসি, আপনি ২০১৯ বিশ্বকাপের আগে শীর্ষ পাঁচজন ওপেনারের একজন ছিলেন। শুধু বাংলাদেশ না ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট আপনার দিকে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু নিশ্চয়ই সবথেকে বেশি প্রত্যাশা ছিল নিজের কাছে নিজের। নিজের প্রত্যাশা মেটাতে না পারা কতটা কষ্টের?

তামিম: এটা এমন জিনিস যেটা আমি অন্য কাউকে দোষ দিতে পারি না। হয়তো আমি নিজেই ঠিক করতে পারতাম। এজন্য সবটুকু দায় আমার নিজের। আমার নিজের কিছু ভুলের কারণেই হয়েছে। কোনও ক্রিকেটিং ভুলের জন্য হয়নি। কোনও স্কিলের ঘাটতি ছিল না, কোনও ফিটনেসের ঘাটতি ছিল না। যেটা বলতে চাচ্ছি আমার ক্রিকেটে কোনও ভুল ছিল না। স্কিল একই রকম ছিল। ফিটনেস দারুণ ছিল। বিশ্বকাপের আগে প্রিমিয়ার লিগ খেলে ৪০ লাখ টাকা আয় করা যেত কিন্তু আমি ওটা ত্যাগ করে ফিটনেসের জন্য কাজ করেছি। আমি আমাকে পুরোপুরি প্রস্তুত করেছিলাম বিশ্বকাপের জন্য।

রাইজিংবিডি: তাহলে সমস্যা হলো কোথায়? প্রস্তুতি গোল্ডেন এ প্লাসের মতো হলে রেজাল্ট তো অন্তত এ প্লাস হবে...

তামিম: আমি হেরে গিয়েছি মানসিক লড়াইয়ে। আমি এতোই ভালো করতে চাচ্ছিলাম যে, আমার সামান্য ভুলগুলো আমার কাছে বড় বড় মনে হচ্ছিল। যেটা পারতপক্ষে আমার নিজের ক্ষতি করেছে। যেটা চলে গেছে সেটা গেছে। এখান থেকে আমার অনেক কিছু শেখার ছিল। শিখতে পেরেছি, বড় মঞ্চে খেলতে যাওয়ার আগে এতো হার্ড হতে হয় না। জিনিসটা খুব স্বাভাবিকভাবে নিতে হয়। যদি ভবিষ্যতে এতো বড় ইভেন্টে খেলার সুযোগ আসে চেষ্টা করবো নিজের উপর হার্ড না হয়ে যতটুকু সম্ভব সিম্পল রাখা যায়। এখানে কপাল, ভাগ্যকে দোষ না দিয়ে নিজেকে দোষ দিলে আমি ভালো কিছু করতে পারব।

রাইজিংবিডি: ২০১৫ থেকে ২০১৯, দুই বিশ্বকাপের মাঝে ৫২ ম্যাচে ২৫১১ রান করা তামিম ইংল্যান্ডে ৮ ম্যাচে করেছেন ২৩৫ রান। আপনি কি মনে করেন বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলার আগে ২০১৫ বিশ্বকাপের কথা মনে করাতেই আপনি বিপদ ডেকেছিলেন?

তামিম: সত্যি বলতে আমি অনেক কিছুই ভেবেছি যেগুলো আমার করা উচিত হয়নি। আমি যখন ২০১৯ বিশ্বকাপে যাই তখন ভাবনায় এসেছিল ২০১৫ বিশ্বকাপ ভালো যায়নি, যে করেই হোক আমাকে ২০১৯ বিশ্বকাপ ভালো খেলতে হবে। আপনিও যেটা বললেন, দুই বিশ্বকাপের মাঝে আমি যখন এতোটা ভালো খেলেছি, তখন কিন্তু একবারও এসব নিয়ে ভাবিনি। আমি শুধু গিয়েছি, ব্যাটিং করেছি, ম্যাচটা উপভোগ করেছি, রান করার দরকার ছিল তাই করেছি। রান যে ম্যাচে পাইনি সেটা নিয়েও চিন্তা করিনি।

কিন্তু ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের আগে যখন নিজের মানসিক চিন্তাকে এই জায়গায় নিয়ে গিয়েছি যে, আমাকে ভালো করতেই হবে কিন্তু তখন আর পারিনি। আপনি দেখবেন বেশি জোর করে কোনও জিনিস চাইলে সেটার বিপরীত হয়ে যায়। আমি বর্তমানে যেভাবে চিন্তা করছি ওই সময়ে এই মানসিক চিন্তাটা কাজে দেয়নি। এটাই আর কি। আমার আসলে বলতে কোনও লজ্জা নেই, আমার ভুলের কারণেই আমি ফেল করেছি। আমি এটা গ্রহণ করবোই।

রাইজিংবিডি: আপনি নিজেই বললেন আপনি অনেক পরিশ্রম করেছেন। এই যে, এতো পরিশ্রম করেছেন বিশ্বকাপের আগে, বিশ্বকাপের পর যখন দেখলেন হয়নি তখন কতটা কষ্ট পেয়েছিলেন?

তামিম: আমি এতোটুকুর নিশ্চয়তা দিতে পারছি, আমার থেকে বেশি কষ্ট বাংলাদেশের আর কেউ পায়নি। আমার নিজের উপরে নিজের এতোটাই প্রত্যাশা ছিল যে, আমি সেটা বলে বোঝাতে পারব না। আমি জানতাম আমার উপর দলের নির্ভরতা। আমি পারিনি সেই ব্যর্থতা আমারই।

রাইজিংবিডি: আমাদের সাবেক কোচ আপনাকে ইনিংস দীর্ঘ করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। যতদূর সম্ভব ব্যাটিং করে যাও, বার্তাটা এমনই ছিল। বর্তমান কোচ রাসেল ডমিঙ্গো আপনাকে বেছে নিতে বলেছে অ্যাটাকিং। গিয়ার শিফট করার পিরিয়ডে মূল চ্যালেঞ্জ কি থাকে?

তামিম: প্রথম কথা আমাদের সাবেক কোচ এরকম কথা কখনোই বলেনি। এগুলো হচ্ছে একদম বানানো (হাসি)। এরকম কোনও কোচও কিছু বলেনি। আমাদের বর্তমান কোচও বলেছেন, যদি টপ ফাইভের একজন ৪০ ওভার পর্যন্ত ব্যাটিং করতে পারে তাহলে দলের জন্য ভালো। এরকম অ্যাটাকিং, ডিফেন্সিভ, বড় বা ছোট এসব নিয়ে কখনোই এবং খুব আলোচনা হয় না। এটা ব্যাটসম্যানের বুঝতে হবে, ব্যাটসম্যান যদি সেট হয়ে যায় তার উচিত ইনিংস বড় করা। এটা খুব স্বাভাবিক একটা বিষয়। আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা খুব ছোট জিনিসগুলোকে খুব বড় করে দেখি। এই আগের ও বর্তমান কোচের সবার বার্তা একই।

রাইজিংবিডি: শেষ প্রশ্ন, তামিমের চোখে তামিমের সেরা পাঁচ ইনিংস?

তামিম: আমি সেরা বলবো না। বলবো আমি উপভোগ করেছি এমন পাঁচ ইনিংস। ইংল্যান্ডের সাথে ২০১০ সালে মিরপুরে ওয়ানডেতে ১২৫ রান। ইংল্যান্ডের সাথে আমরা যেটাতে টেস্ট জিতেছি, ২০১৬ সালে ঢাকায় ১০৪ রান করেছিলাম। ২০১৫ বিশ্বকাপের পর পাকিস্তানের সাথে প্রথম শতক, ১৩২ রানের ইনিংস। লর্ডসে ২০১০ সালের সেই শতক, ১০৩ রান করেছিলাম। শ্রীলঙ্কায় শততম টেস্টে আমার ৮২ রানের ইনিংস। যেই ম্যাচটি আমরা জিতেছিলাম।

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়