ঢাকা     রোববার   ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ১২ ১৪২৭ ||  ০৯ সফর ১৪৪২

সন্দীপ লামিচানে – দ্য ‘গালি বয়’

ইয়াসিন হাসান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:১২, ৯ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
সন্দীপ লামিচানে – দ্য ‘গালি বয়’

হিমালয় কন্যা নেপালের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয় না কে? নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি যেন এক টুকরো স্বর্গরাজ্য। যেখানে হিমালয়ের বুক চিড়ে বের হওয়া রক্তিম সূর্যের আভা ক্ষণে ক্ষণে মেঘের আড়ালে উঁকি দেয়। সঙ্গে বয়ে যায় হিমশীতল হাওয়া।

সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে ক্রিকেটের জোয়ার। আর নেপাল ক্রিকেটকে বিশ্ব ক্রিকেটের মঞ্চে পরিচিত করার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সন্দীপ লামিচানের। এ লেগ স্পিনার নেপালে জাতীয় দলের জার্সির পাশাপাশি ফ্রাঞ্চাইজি লিগগুলোতে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছেন। তাতে খুব দ্রুতই নেপালের পোস্টারবয় হয়েছেন।

ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (সিপিএল) খেলতে সন্দীপ লামিচানে এখন ত্রিনিদাদে। অনেক বিপত্তি পেরিয়ে চার দেশ পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছেন। মাঠে নামার আগে থাকতে হচ্ছে ১৪ দিনের আইসোলেশনে। এই অবসরে ত্রিনিদাদের হোটেল থেকে তার অনেক না জানা কথা শুনল রাইজিংবিডি। মুঠোফোনে তার কথা শুনেছেন ইয়াসিন হাসান। আজ পড়ুন প্রথম পর্ব।

রাইজিংবিডি: জন্মদিনের শুভেচ্ছা। জীবন থেকে আরো একটি বছর কেটে গেল। জীবন আসলে কেমন?

সন্দীপ লামিচানে: ধন্যবাদ ইয়াসিন। অনেকদিন আপনাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। সেজন্য দুঃখিত। আসলে সিপিএলে অংশগ্রহণ নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলাম। করোনার সময় ত্রিনিদাদে আসা কতটা কঠিন আপনি হয়তো জানেন। অনেকগুলো দেশের অনুমতি নেওয়া লেগেছিল।

রাইজিংবিডি: বললেন না জীবনটা কেমন?

সন্দীপ লামিচানে: আরেকটি বছর কেটে গেল। আমি আরেকটু বড় হলাম (হাসি) । জীবন আসলে খুব সহজ। আপনি কিভাবে উপভোগ করছেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ। উঠা-নামা থাকবে। যখন উপরে উঠবে তখন মনে রাখতে হবে সেটা স্থায়ী জায়গা নয়। ঠিক তেমনই যখন খারাপ সময় আসবে তখন ভালো সময়ের অপেক্ষা করতে হবে। এভাবেই জীবন উঠা-নামায় কেটে যাচ্ছে।

রাইজিংবিডি: সম্প্রতি আপনার একটা মিউজিক ভিডিও ইউটিউবে প্রচারিত হয়েছে। ক্রিকেটের পাশাপাশি তো বেশ ভালো গানও করেন। সাথে মডেলিংও চলছে। স্পোর্টস বাইক পছন্দ করেন…

সন্দীপ লামিচানে: হ্যাঁ টুকটাক সব করাই হচ্ছে। আসলে এগুলো সবই করা হচ্ছে অবসরে। আমার আসল পরিচয় ক্রিকেটেই।

রাইজিংবিডি: তাহলে ক্রিকেট নিয়েই কথা বলি…আপনি এই মুহূর্তে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের অন্যতম হটকেক। টি-টোয়েন্টিতে কিভাবে নিজেকে এতটা পরিণত করেছেন? কী করে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে?

সন্দীপ লামিচানে: ক্রিকেট বা যেকোন ধরনের খেলার ক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাব এবং দৃঢ় মানসিকতা থাকলে মাঠে ভালো খেলা সহজ হয়ে যায়। এমনকি সবার দৃষ্টি কাড়াও সম্ভব হয়। আমি মনে করি সঠিক মানসিকতা ও ইতিবাচক দৃষ্টি ভঙ্গি আপনাকে ভালো খেলোয়াড় হতে সহায়তা করবে। প্রত্যেক খেলোয়াড় একজন ভালো নেতা হতে পারে না। তবে অন্যদের থেকে ভালো খেলোয়াড় হওয়া সম্ভব। আমার ক্ষেত্রে, সবাই ক্রিকেট মাঠে আমার দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইতিবাচক মনোভাব দেখতে পায়। আর এটাই আমাকে বাকি সবার চেয়ে আলাদা করে তুলেছে। লেগ স্পিনার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা খুব একটা সহজ ছিল না। যাই হোক, এতদূর আসতে পারা আমার জন্য বিশেষ কিছু।

রাইজিংবিডি: ম্যাচে মাত্র চার ওভার বোলিং করে নিজেকে প্রমাণ করা কতটা কঠিন?

সন্দীপ লামিচানে: এটাই বাস্তবতা। আপনি যখন ৫০ ওভারের ম্যাচ খেলবেন তখন আপনি ১০ ওভার বোলিং করার সুযোগ পাবেন। কিন্তু টি-টোয়েন্টিতে আপনি মাত্র ২৪ বল করতে পারবেন। তাই এই ফরম্যাটের ক্রিকেটে ভুল যত বেশি সম্ভব কম করা উচিত। বলা চলে, আপনি ভুল করতে পারবেন না। এই ফরম্যাটে ভুল করলে কিন্তু প্রতি সময়ে আপনার পক্ষে ফিরে আসা সম্ভব নয়। এজন্য আপনাকে খুব চতুর হতে হবে এবং ব্যাটসম্যান থেকে এক ধাপ এগিয়ে থাকতে হবে। টি-টোয়েন্টিতে প্রতি বলে নিজের শতভাগকে ছাড়িয়ে যেতে হবে। নিজের চেষ্টায় অবিচল থাকতে হবে। আমি এই ফরম্যাটের চার ওভারে ভীষণ রকমভাবে মনোযোগী থাকি, আর এটাই আমার ম্যাচে একমাত্র লক্ষ্য।

রাইজিংবিডি: আইপিএল কি আপনার প্রতিভা তুলে ধরতে বড় ভূমিকা রেখেছিল?

সন্দীপ লামিচানে: হ্যাঁ, সেটি বলা যায়। ২০১৮ সালে নিজের প্রথম আসরে মাত্র ৩ ম্যাচে খেলে ৫ উইকেট পেয়েছি। এটা আমার জন্য অনেক বড় অর্জন ছিল। তাই আইপিএলকে অবশ্যই ক্যারিয়ারের মোড় গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য ক্রেডিট দেওয়া উচিত। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফ্রাঞ্চাইজি লিগ। দর্শকদের আকর্ষণ, খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ, স্পন্সরদের ছড়াছড়ি থেকে শুরু করে আইপিএল ভিন্ন মাত্রার একটি টুর্নামেন্ট।

রাইজিংবিডি: লেগ স্পিনার হওয়ার ক্ষেত্রে আপনার শুরুর গল্পটা জানতে চাই? সেই সাথে অনুপ্রেরণা কী ছিল?

সন্দীপ লামিচানে: পাড়ার গলিতে বন্ধুদের সাথে ক্রিকেট খেলার শুরুতে আমি অফ স্পিন এবং সোজাসুজি বোলিং করতাম। কিন্তু আমি দেখতাম তারা লেগ স্পিন খেলতে খুব সমস্যার মুখে পড়ে। তখন আমি ভাবলাম, কেন আমি লেগ স্পিনে মন দিচ্ছি না। তারপরই আমি এই শিল্প রপ্ত করতে মনস্থির করলাম। সে থেকে আমার এই সফর শুরু, যার ফল এখন আপনাদের সামনেই। ব্যাটসম্যানদের বিভ্রান্ত করে উইকেট তুলে নেওয়া আমার একমাত্র পরিকল্পনা এবং এটাই আমাকে ভালো করতে আরও অনুপ্রাণিত করে।

রাইজিংবিডি: বোলিংয়ে আপনার শক্তির জায়গা?

সন্দীপ লামিচানে: দেখুন, অধিনায়ক আমাকে যখনই বোলিং করতে বলে, আমি হাসিমুখে তখনই বোলিং করি, সেটা পাওয়ার প্লে হোক বা ডেথ ওভারেই। নিজের বোলিংয়ের ক্ষেত্রে আমার সবচেয়ে বড় শক্তি দৃষ্টিভঙ্গি। ইতিবাচক মনোভাব আমাকে প্রতিযোগিতায় ভালো করতে উদ্বুদ্ধ করে। আর সে প্রতিযোগিতা কেবল নিজের সাথে। প্রতিদিন নিজেকে আরও ছাড়িয়ে যাওয়া এবং পরিণত করার প্রতিযোগিতা। আর যদি কেবল বোলিং এর কথা বলেন, তাহলে বলবো গুগলি এবং উল্টো বল হচ্ছে আমার সেরা অস্ত্র। গত কয়েক বছরে আমি উল্টো বলে দারুণ করছি। সুতরাং আমি বলতে পারি আমার দৃষ্টিভঙ্গি এবং উল্টো বল সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা।

রাইজিংবিডি: ধরে নিন, আপনি ভালো কোনো স্পেল করতে পারেননি, এমনকি মাঠে কঠিন সময় পার করছেন। উইকেট তো পাচ্ছেনই না বরং চার-ছক্কা হজম করছেন। আপনি সেই খারাপ সময় কিভাবে কাটিয়ে উঠতে চাইবেন?

সন্দীপ লামিচানে: আমি বিশ্বাস করি, যেটা ঘটে গেছে সেটা শেষ; ভালো হোক বা খারাপ, আমি সেটা আর ফিরে পাবো না। আমি আগের খেলা থেকে কেবল ইতিবাচক দিকগুলোই নিতে পারি। আমি মনে করি, যদি কোনো ব্যাটসম্যান আমাকে তিন ছয় হাঁকানোর পরের বলে আউট হয়, তবে সেটাই আমার জন্য ইতিবাচক বিষয়। আপনাকে সেই অবস্থাও বিবেচনা করতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় আপনাকে দলের জয় নিশ্চিত করতে হবে। আমার কাছে দলের জয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দলের সদস্য হিসেবে আপনাকে সবার সঙ্গে হাসতে হবে, কাঁদতে হবে এমনকি হাঁটতেও হবে। ক্রিকেটারদের কাছে দলের জয় তাই সবসময়ে এগিয়ে।

রাইজিংবিডি: বর্তমান সময়ের সেরা লেগ স্পিনার হতে নিজের কোন দিকে উন্নতি করা উচিত বলে মনে করেন?

সন্দীপ লামিচানে: দেখুন, আমি কিন্তু এখন মোটামুটি ধারণা পেয়েছি, কিভাবে বিভিন্ন কন্ডিশনে ভ্যারিয়েশন এনে বোলিং করা উচিত। মাঠে এখন আমাকে আরও বেশি অনুমানযোগ্য হতে হবে, ব্যাটসম্যানদের আরও ভালো পড়তে হবে। এটা আসলে একটা প্রক্রিয়া। আপনাকে সেরা হতে হলে আরও বেশি বুদ্ধিমান হতে হবে। আপনাকে এমন কিছু করতে হবে যাতে প্রতিপক্ষ আপনাকে হুমকি হিসেবে মনে করে। আর অবশ্যই নিজের জায়গা থেকে আমাদের আরও বেশি সতর্ক হয়ে খেলতে হবে। আর এই জিনিসটা সবসময় আমি নিজের মধ্যে ধরে রাখতে চাই।

রাইজিংবিডি: বিপিএলে কেবল এক মৌসুম খেলেছেন। এখানে আবার খেলতে চান কী?

সন্দীপ লামিচানে: আমি দুই বছর আগে সিলেট সিক্সার্সের হয়ে মাঠে নেমেছিলাম। যদি আমি সুযোগ পাই এবং আমার বোর্ড আমাকে অনুমতি দেয় তবে আমি যে কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলতে আগ্রহী।

ঢাকা/ইয়াসিন

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়