ঢাকা     শুক্রবার   ২৪ মার্চ ২০২৩ ||  চৈত্র ১১ ১৪২৯

ওপেনিং করুক না লিটন-সাকিব

মানজুর মোরশেদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:২৭, ১৩ অক্টোবর ২০২২   আপডেট: ১৪:২৯, ১৩ অক্টোবর ২০২২
ওপেনিং করুক না লিটন-সাকিব

পরীক্ষার আগের রাতের পড়া খুব একটা কাজে লাগে না, কিন্তু বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্ট তাদের কাজে-কর্মে ওই আগের রাতের পড়া অব্যাহত রেখেছে। বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে শেষ ম্যাচটিতেও ওপেনিংয়ে নিরীক্ষা চালিয়েছেন শ্রীরাম-মাহমুদ-সাকিবরা। ফলাফল অশ্বডিম্ব! আরও একবার ওপেনিং জুটিতে মিউজিক্যাল চেয়ারের মতো ক্রিকেটার বদল। সৌম্য সরকার পারেননি কিছু করতে, আর নাজমুল শান্ত প্রথম রান নিয়েছেন তার খেলা নবম বলে। দু’জনের ব্যর্থতার মাঝে পাওয়ার প্লে’তে স্বভাবজাত আলো ছড়িয়ে গেছেন ওয়ান ডাউন লিটন দাস।

সাকিব-লিটনের তৃতীয় উইকেট জুটি এই ম্যাচে পাওয়ার প্লে’র ২টি মাত্র বল পেয়েছে, ততক্ষণে ম্যাচের মোমেন্টাম পাকিস্তানের হাতে। এই যে প্রতি ম্যাচের শুরুতেই নেতিবাচক ব্যাটিং, সেটি দেখতে দর্শক-সমর্থকদের আর ভালো লাগছে না! তারা যারপরনাই হতাশ ও বিরক্ত। ১২০ বলের খেলায় প্রত্যেকটি বল গুরুত্বপূর্ণ; প্রথম ৩৬টি বল খেলার পর চাপে পড়ার চেয়ে প্রথম বল থেকে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার চেষ্টা করা অনেক স্বস্তিদায়ক। ব্যাটিংয়ে যেদিন এই ফর্মুলা কাজে লাগবে, সেদিন আপনার দলই বিজয়ী। তাতে ওই দলটির মিডল ও লেট মিডল-অর্ডারে যদি কোনও ভালো ব্যাটসম্যান নাও থাকে। এই ফর্মুলায় শুধু বাবর আজম ও মোহাম্মদ রিজওয়ানের ব্যাটে ভর করে অনেক সফল এক দল পাকিস্তান। দুজনের কেউই প্রথাগত ওপেনার নন, কিন্তু টি-টোয়েন্টি ওপেনিংয়ে তারা বিপ্লব এনেছেন। তারা ভিন্ন রকমের ২ জন ব্যাটসম্যান, কেউই বড় হিটার নন- তারপরও দারুণ স্ট্রাইকরেটে রান তুলতে ওস্তাদ।

একটু চেষ্টা করলে বাংলাদেশ দলের ওপেনিং পাকিস্তানের চেয়েও বৈচিত্রপূর্ণ করা সম্ভব। ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপে সাকিব ব্যাট হাতে ঝড় তুলেছিলেন ওয়ানডাউনে খেলে, প্রায়শই নতুন বলে খেলতে হয়েছে তাকে। আর, টি-টোয়েন্টিতে ওই নতুন বল-পুরনো বল এসব এখন মান্ধাতার চিন্তা। দলের সেরা দুই ব্যাটসম্যান লিটন ও সাকিব- এই বিষয়ে দ্বিমত করার কাউকে পাওয়া যাবে না বলে মনে হয়! এখন ওই ওপেনিংয়ে উলুখাগড়াদের দিয়ে চেষ্টা করার এই টানা ব্যর্থতা ঝেড়ে ফেলুন না! দিন না সাকিব-লিটনকে ওপেনিংয়ে। ওরা প্রতিদিন সফল হবে সেটা তো নয়, তবে যেদিন জমে যাবে সেদিন অন্তত ২০/৩০ রানের বাড়তি একটা সুবিধা স্কোরবোর্ডে থাকলেও থাকতে পারে; দিনশেষে সেটি টাইগারদের জন্য জয়ের ছকও হাজির করতে পারে, নাকি? 

প্রিয় টিম ম্যানেজমেন্ট, দয়া করে রক্ষণাত্মক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসুন! 

টোয়েন্টিতে ৭/৮ জন ব্যাটার, তারমধ্যে ২/৩ জন মিনি অলরাউন্ডারদের নিয়ে কোনও কাজ হয় না যদি না তাদের ম্যাচ উইনিং ক্ষমতা থাকে। দেশে ভালো ক্রিকেটারের আকার, আর তাই ‘দুধ-ভাত’ ক্রিকেটার লাগবেই আপনাদের একাদশ গড়তে, তবে তাদেরকে বড় দায়িত্ব দেবেন না প্লিজ। তাদেরকে ব্যাটিং-অর্ডারের নীচের দিকেই রাখেন। সাকিব ফর্মে ফিরেছেন, লিটন তিন ফরম্যাট মিলিয়েই সবচে ধারাবাহিক- ওদের দু’জনকে পাঠান ওপেনিংয়ে। ভুলে যাবেন না টি-টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ডকাপের মূলপর্বে গত দেড় দশকে বাংলাদেশের কোনও জয় নেই। রিক্তের বেদন কেউ বুঝবে না, তবে তার কিন্তু বড় কিছু হারানোর নেই! আর তাই দুর্বল সৈন্যকে সম্মুখ সারিতে রেখে আর যাই হোক পুরো সৈন্য দলকে ইতিবাচক রাখা যায় না! তাতে হিতে বিপরীত হয়, কান্না দীর্ঘ হয়! এখন আপনি প্রতিদিন কাঁদবেন নাকি কোন কোনদিন হাসবেন- সেই সিদ্ধান্ত আপনার। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে সাকিব ওপেন করতে চান কি না? সাকিবের তো আর নতুন করে প্রমাণের কিছু বাকি নেই, তিনি যদি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ওপেনিংয়ে ব্যাট হাতে চরম ব্যর্থও হন- তিনি তো আর দল থেকে বাদ পড়বেন না! তবে ওই উলুখাগড়াদের কিন্তু ভয় আছে বাদ পড়ার। প্রিয় অধিনায়ক আপনার আর লিটনের ৫৫ বলের ৮৮ রানের জুটিটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেছি পাকিস্তান ম্যাচে। আপনারা দুজন যত বেশি বল খেলবেন ততই মঙ্গল দলের জন্য, এটা বুঝতে খুব বেশি ক্রিকেট জ্ঞানের দরকার নেই- দায়িত্বটা নিন। আফিফ ফর্মে আছে, ইযাসিরকেও ইদানিং আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছে। ওরা তিনে আর চারে খেলুক। সোহানকে অবস্থা বুঝে পাঁচ বা ছয়ে খেলানো যায়, তার আগে পিছে দুজন মিনি অলরাউন্ডার। একাদশে মেহেদী মিরাজকে দরকার ইনফর্ম অফস্পিনের জন্য ব্যাটিংটা বোনাস, ডেথ বোলিংয়ে সাইফউদ্দিনের বিকল্প নেই। সে আস্তে ধীরে ছন্দ ফিরে পাচ্ছে। তাসকিন হয়তো এগিয়ে থাকবেন বিবেচনায় নিউজিল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে ইফেক্টিভ বোলিংয়ের কারণে। একাদশের শেষ বোলারটি মোস্তাফিজ, শরিফুল, হাসানের যে কোনও একজনই হয়তো শেষ পর্যন্ত হবেন।

আবারও শেষ ম্যাচটির উদাহরণ টানছি। সৌম্য ও শান্ত মিলে ওপেনিংয়ে ১৯ বল নষ্ট করেছেন। তারা মাত্র ১৬ রান দিতে পেরেছিলেন, কিন্তু এই সময়ে উইকেট যেকম ছিল তাতে আরও দশটি রান বেশি আসতে পারতো। টি-টোয়েন্টিতে ১০ রান অনেক, সেটি নিশ্চয় শ্রীধরন শ্রীরামের মতো ক্ষুরধার ক্রিকেট মস্তিস্ক আমাদের মতো সাধারণের চেয়ে আরও ভালো বুঝবেন। কথায় বলে ছাগল দিয়ে হাল চাষ হয় না। যাদেরকে দিয়ে হয়, এখন তাদেরই দায়িত্ব নিতে হবে। ডি-ভিলিয়ার্স, সুর্যকুমারদের চেয়েও বড় ব্যাটসম্যান দেখেছে পৃথিবী, কিন্তু সবাই তো আর তাদের মতো করে খেলাটিকে পড়তে পারেন না! যার হয় তার হয়; যার হয় না তার কস্মিনকালেও হয় না। এটা বোঝার জন্য দুধে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ হওয়া লাগে না! 

২০১৬ সালে আইপিএলে ৫২ বলে ১২৯ রানের ঝড়ো সেঞ্চুরি করার পর ডি-ভিলিয়ার্স ওই ইনিংসের সিক্রেট বলেছিলেন- ম্যাচের দিন তিনি তার বউয়ের দেখা পেয়েছিলেন- আর সেটাই তার সফলতার রহস্য! হিসাব হোক সহজ, চিন্তা হোক সরল; কারণ খেলাটা অনিশ্চয়তার হলেও গৌরবের! দিনশেষে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের বড় প্রত্যাশার জায়গা। দয়া করে চাপ নেবেন না, চাপ দেবেনও না!

লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, যমুনা টিভি

ঢাকা/ফাহিম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়