ঢাকা     রোববার   ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  ফাল্গুন ২ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ

জামায়াতের পশ্চিমে ‘উদয়’, পূর্বে অস্তগামী: আ.লীগ-বিএনপির দুর্গে কেমন হলো

সাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৩:১৬, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ০৩:৩২, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
জামায়াতের পশ্চিমে ‘উদয়’, পূর্বে অস্তগামী: আ.লীগ-বিএনপির দুর্গে কেমন হলো

সূর্য পূর্বে উঠে পশ্চিমে অস্ত যায়। তবে নির্বাচনে জনরায়ের ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর ঘটেছে উল্টোটা। ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে দলটি দেশের পশ্চিমাঞ্চলে অর্ধশতাধিক আসনে জয় তুলে নিয়ে দাঁড়িপাল্লার ঝলক দেখিয়েছে। তবে পূর্বাঞ্চলে প্রত্যাশিত ফল আনতে ব্যর্থ হয়েছে; যেন তাদের দাঁড়িপাল্লা পশ্চিমে অস্ত গেছে। যে কারণে সামগ্রিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বাধীন দলটি। 

আবার আওয়ামী লীগ-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে জামায়াতের ব্যর্থতা চোখে পড়ার মতো হলেও ২০৯ আসনে জয় তুলে নিয়ে সরকার গঠনের পথে থাকা বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আসনগুলোতে চমক দেখিয়েছে জামায়াত।  

আরো পড়ুন:

নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, রাজশাহী-রংপুর-খুলনা অঞ্চলে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক তৎপরতা, স্থানীয় ইস্যুভিত্তিক প্রচার এবং ভোটকেন্দ্রভিত্তিক সমন্বয়ের কারণে জামায়াত কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়। অনেক আসনে সরাসরি জয়, আবার কোথাও অল্প ব্যবধানে পরাজয় সব মিলিয়ে পশ্চিমাঞ্চলে দলটির উপস্থিতি ছিল দৃঢ় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।

অন্যদিকে, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগসহ পূর্বাঞ্চলে চিত্র ছিল ভিন্ন। এখানে ত্রিমুখী ও বহুমুখী লড়াইয়ে ভোট বিভাজন, স্থানীয় নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং প্রতিপক্ষের শক্ত অবস্থানের কারণে জামায়াত সুবিধা করতে পারেনি। বেশ কয়েকটি আসনে উল্লেখযোগ্য ভোট পেলেও তা জয়ে রূপ নেয়নি, ফলে প্রত্যাশা ভেঙে যায়।

আওয়ামী লীগ প্রভাবিত এলাকাগুলোতে জামায়াতের ব্যর্থতা বিশেষভাবে আলোচিত। ঐতিহ্যগতভাবে শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি ও স্থানীয় প্রভাবের কারণে এসব আসনে জামায়াত পিছিয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে তারা তৃতীয় বা চতুর্থ অবস্থানে নেমে যায়, যা দলটির নির্ধারিত কৌশলকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

তবে বিএনপির শক্ত ঘাঁটিগুলোতে ভিন্ন বাস্তবতা দেখা গেছে। কিছু আসনে বিরোধী ভোটের কৌশলগত সমাবেশ, স্থানীয় সমঝোতা এবং প্রার্থীদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণে জামায়াত প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফল করেছে। ফলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে ভোটের পুনর্বিন্যাস ও আঞ্চলিক কৌশলই ছিল সাফল্য-ব্যর্থতার প্রধান নির্ধারক।

খুলনায় বিপরীত চিত্র
খুলনা-২ দীর্ঘদিন বিএনপির ঘাঁটি। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে এখানে হারেনি দলটি। ২০০৮ সালেও জয়ী হয়েছিলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। কিন্তু এবার দক্ষিণবঙ্গে বিএনপির এই হেভিওয়েট প্রার্থী এবার জামায়াত প্রার্থীর কাছে ৫ হাজার ৫৯৫ ভোটে হেরে গেছেন।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের শক্ত আসন খুলনা-৩-এ প্রত্যাশা জাগিয়েও ৮ হাজার ৮৩৫ ভোটে হেরে যায় জামায়াত। দলীয় জরিপে জয়ের আশা থাকলেও ফল হয়েছে উল্টো।

আওয়ামী লীগের দুর্গ ভেদ করতে ব্যর্থ
গোপালগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ—আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটিগুলোতে দ্বিতীয় স্থানেও আসতে পারেনি জামায়াত জোটের প্রার্থীরা। গোপালগঞ্জ-১-এ প্রার্থী তৃতীয় হয়ে জামানত হারান। হবিগঞ্জের চার আসনেই বড় ব্যবধানে জয় পায় বিএনপি, জামায়াত ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে।

ঠাকুরগাঁও-২ ও দিনাজপুর-৬-এর মতো আসনে আওয়ামী লীগ না থাকায় জয় নিশ্চিত ধরে নিয়েছিল জামায়াত। কিন্তু সেখানে উল্টো বিএনপির কাছে হেরে যায় তারা। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত দিনাজপুর-৪ ও ৫-এও বড় ব্যবধানে পরাজয় ঘটে।

বিএনপির ঘাঁটিতে চমক ও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই
বগুড়া, জয়পুরহাট, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী—বিএনপির ঘাঁটিগুলোতে হয়েছে জমজমাট লড়াই। জয়পুরহাট-১ আসনে দীর্ঘদিন পর বিএনপিকে হারিয়ে জয় পায় জামায়াত। ফেনী ও লক্ষ্মীপুরের একাধিক আসনে ১০ থেকে ১৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারলেও ভোটের ব্যবধান তুলনামূলক কম ছিল।

দিনাজপুর-৩-এ শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলে জামায়াত, যদিও শেষ পর্যন্ত জয় পায় বিএনপি।

পশ্চিমাঞ্চলে অর্ধশতাধিক জয়, তবু অপূর্ণতা
রংপুর বিভাগের ৩৩টির মধ্যে ১৮টি, রাজশাহীর ৩৯টির মধ্যে ১১টি এবং খুলনার ৩৬টির মধ্যে ২৫টি আসনে জয় পেয়েছে জামায়াত জোট। পশ্চিমাঞ্চলের ১০৮ আসনের মধ্যে ১০০টিতে লড়ে এককভাবে ৫২টিতে জয় এসেছে।
দলীয় লক্ষ্য ছিল অন্তত ৮০ আসন। সেই হিসেবে অর্জন উল্লেখযোগ্য হলেও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

পূর্বাঞ্চলে ভরাডুবি ও ঢাকায় ইতিহাস
সিলেট বিভাগের ১৯ আসনের একটিতেও জয় নেই। চট্টগ্রামের ৫৮টির মধ্যে ৪২টিতে লড়ে মাত্র তিনটিতে জয়। কক্সবাজারের শক্ত ঘাঁটিতেও শূন্য ফল। দলটির দাবি, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বড় অংশ ধানের শীষে ভোট দেওয়ায় দাঁড়িপাল্লা পিছিয়ে পড়ে।

ইতিহাসে প্রথমবার ঢাকা মহানগরের ১৫ আসনের ছয়টিতে জয় পেয়েছে জামায়াত। তবে কয়েকটি আসনে অল্প ভোটে হার এবং প্রশাসনিক পক্ষপাতের অভিযোগে রয়েছে অসন্তোষ।

জাপার দুর্গ গুঁড়িয়ে জামায়াতের জয়তোরণ
রংপুরে একসময় প্রভাবশালী জাতীয় পার্টি এবার একটি আসনেও দ্বিতীয় হতে পারেনি। অধিকাংশ আসনেই জয় গেছে জামায়াত জোটের ঝুলিতে।লালমনিরহাট বাদে বাকি রংপুর বিভাগের ১৯ আসনের ১৮টিতে জিতেছে জামায়াত জোট।

জামায়াতের এমন মিশ্র ফলাফল নিয়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, যেসব আসনে ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগ শক্ত অবস্থানে ছিল, সেসব এলাকায় দলটি প্রত্যাশিত ফল করতে পারেনি। বিপরীতে, যেখানে অতীতে বিএনপি প্রভাবশালী ছিল, সেখানে জামায়াত জয় পেয়েছে বা অন্তত হাড্ডাহাড্ডি লড়াই গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

ঢাকা/রাসেল

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়