Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     শনিবার   ২৭ নভেম্বর ২০২১ ||  অগ্রহায়ণ ১৩ ১৪২৮ ||  ২০ রবিউস সানি ১৪৪৩

কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্য

এম মতিউর রহমান মামুন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:১৩, ২৭ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ০৮:৪৪, ২৯ আগস্ট ২০২০
কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্য

কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৪১ সালের ৫ এবং ৬ এপ্রিল কলকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির রজত জয়ন্তী উৎসবের সভাপতি হিসেবে তাঁর শেষ ভাষণে বলেছিলেন: ‘আর যদি বাঁশি না বাজে...’। সেদিন কেউ হয়তো বুঝে উঠতে পারেননি কবি কেন একথা বললেন। এরপর থেকেই কবি দীর্ঘ সময় সাহিত্য ও সৃজনশীল রচনা উপহার দিতে পারেননি। দীর্ঘ ৩৪ বছর বাকশক্তিহীন পঙ্গু অবস্থায় রোগ ভোগের পর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট সকাল ১০টা ১০ মিনিটে কবি না-ফেরার দেশে চলে যান।

বাংলা সাহিত্যে নজরুল ‘যুগস্রষ্টা’ কবি। তাঁর বিচিত্র ঘটনাবহুল নাটকীয় জীবন ও রচনাবলির পূর্ণাঙ্গ সংগ্রহের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ২২ বছরের সংক্ষিপ্ত সৃজনশীলতার কালে সাহিত্য ও সংগীতে কবি যা দিয়েছেন তা বাঙালির আত্মপরিচয়, জাতীয় চেতনা ও গৌরবময় অমূল্য সম্পদ। ক্ষুধিত-তৃষিত, প্রেম-বিপ্লব, সত্য সৌন্দর্য, বুদ্ধি এবং আবেগ ঢেলে দিয়েছেন তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মে।

১৯১০-১১ সালে স্থানীয় লেটোদলের ‘ছোট উস্তাদজী’ ‘শকুনিবধ’ ‘মেঘনাদবধ’ ‘রাজপুত্র’ ‘চাষার সং’ প্রভৃতি গীতিনাট্য ও প্রহসন এবং মারফতি, পাঁচালী ও কবি গান রচনায় খ্যাতি অর্জনের মধ্যে দিয়ে কবি নজরুলের আগমন। মাত্র ২২ বছর সাহিত্য সাধনায় নজরুল হয়ে ওঠেন কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক, শিশু-সাহিত্যিক, গীতিকার, গীতালেখ্য ও গীতিনাট্য রচয়িতা, সুরকার, স্বরলিপিকার, গায়ক, বাদক, সঙ্গীতজ্ঞ, সংগীত পরিচালক, পত্রিকা সম্পাদক, অভিনেতা, চলচ্চিত্র-কাহিনীকার এবং চলচ্চিত্র পরিচালক।

১৯১১ সলে মাথরুন হাইস্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করে স্কুল পরিত্যাগ করেন। ১৯১২ সালে রাণীগঞ্জে এক রেলওয়ে গার্ডের খপ্পরে পড়ে কিছুদিন বাবুর্চিগিরি এরপর ১৯১৪ সালে আসানসোলের তৎকালীন পুলিশ ইনস্পেক্টর কাজী রফিজউল্লাহর সঙ্গে পরিচয়। ১৯১৫ সালের জানুয়ারিতে রাণীগঞ্জ সিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি এবং সে সময় রচনা করেন ‘করুণ গাঁথা’ ‘বেদন বেহাগ’ ও ‘চড়ুই পাখির ছানা’। ১৯১৭ সালে নজরুল ৪৯ নং বাঙালি পল্টনে নাম লেখালেন এবং ঐ বছরেই নজরুল সৈনিক জীবনে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে শিঘ্রই ব্যাটালিয়ন কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পদে উন্নীত হন।
২৫ শ্রাবণ, ১৩২৯ সনে নজরুল নিজের সম্পাদনায় অর্ধ সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ প্রকাশ করেন। প্রথম সংখ্যার শিরে রবীন্দ্রনাথের আর্শীবাণী মুদ্রিত হয়- ‘আয় চলে আয় রে ধূমকেতু আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু’। ধূমকেতুতে নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি প্রকাশিত হলে ঐ কবিতার জন্য শারদীয় সংখ্যা বাজেয়াপ্ত হয় এবং কলকাতা চীফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়, এবং ১৬ জানুয়ারি ১৯২৩ মামলার রায় শুনানি হয় এবং ভারতীয় দণ্ডবিধি আইনের ১২৪-এ ধারা অনুসারে নজরুলের এক বছর কারাদণ্ড হয়।

এক বছর ৩ সপ্তাহ কারাভোগের পর ১৬ ডিসেম্বর নজরুল কারাবাস হতে মুক্তি পান। ১২ বৈশাখ ১৩৩১ সনে নজরুল ২৩ বছর বয়সে আশালতা সেনগুপ্তা ওরফে প্রমীলা দেবীকে বিয়ে করেন। ১৯২৭ সালে ঢাকা বিভাগ থেকে কেন্দ্রীয় আইন সভায় মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত দুটি আসনের একটিতে নজরুল নির্বাচনে প্রার্থী হন। অর্থাভাবে সঠিকভাবে প্রচারকার্য না হওয়ায় নজরুল কেবল নির্বাচনে হারলেন না, তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে গেল। ১৯৩০ সালে রাজদ্রোহমূলক অভিযোগে নজরুলের ‘প্রলয়শিখা’ গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত এবং নজরুলের ছয় মাসের কারাদণ্ডাদেশ হয়। কিন্তু গান্ধী-আরউইন চুক্তি অনুসারে কারাদণ্ড থেকে তিনি মুক্তি পান।

১৯৪২ সালের ১০ জুলাই মস্তিষ্ক রোগে আক্রান্ত হন কবি। ১৯ জুলাই মধুপুরে কবিকে চিকিৎসার স্বার্থে নেওয়া হয় এবং ২১ সেপ্টেম্বর কলকাতা ফিরিয়ে আনা হয়। ১৯৪৩ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে চিকিৎসার কোনো উন্নতি না হওয়ায় লুম্বিনী পার্কের মানসিক হাসপাতাল থেকে বাড়িতে আনা হয় এবং ডা. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ও সজনীকান্ত দাসকে সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ করে নজরুল সাহায্য কমিটি গঠন করা হয়।

১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক প্রদান করে। ১৯৫২সালে নজরুল নিরাময় সমিতি গঠন এবং চিকিৎসার জন্য করাচিতে কবি ও কবি পত্নী যান। কিন্তু স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতি না হওয়ায় ১৯৫৩ সালের মে মাসে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে কবিকে পাঠানো হয়। ১৫ ডিসেম্বর কবিকে পুনরায় কলকাতা ফিরিয়ে আনা হয়। ১৯৬০ সালে ভারত সরকার কবিকে পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত করেন এবং তার দুবছর পর ১৯৬২ সালে ৩০ জুন কবিপত্নী প্রমীলার মৃত্যু এবং নিজ গ্রাম চুরুলিয়ায় দাফন শেষে কবি আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৭২ জাতীর  পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবিকে ঢাকা আনার ব্যবস্থা করেন। ২৪ মে কবিকে বাংলাদেশ বিমানে করে কলকাতা থেকে ঢাকায় আনা হয়।

১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাসাহিত্য ও সংস্কৃতিতে গৌরবময় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কবিকে সম্মানসূচক ডি. লিট ডিগ্রি প্রদান করে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কয়েক দিন আগে  ১৯৭৫ সালের ২২ জুলাই নজরুলের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সার্বক্ষণিক  পিজি হাসপাতালে কবিকে স্থানান্তরিত করা হয়।

এ সময় কবি ধানমন্ডির কবিভবনেই থাকতেন। ১৯৭৬ সালে জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নাগরিকত্ব প্রদান করে এবং ২১ ফেব্রুয়ারি কবিকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। সে বছর ২৯ আগস্ট রবিবার সকাল ১০.১০ মিনিটে কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বেতার ও টেলিভিশনে খবরটি প্রচার হলে জাতি শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। কবির মরদেহ পি.জি হাসপাতাল হতে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে নেওয়া হলে সেখানে সর্বস্তরের মানুষ কবির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। বিকেল ৪.৩০ মিনিটে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কবির নামাজে জানাযার পর কবির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ প্রাঙ্গণে। সেখানে বাদ আসর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কবি শায়িত হন।

লেখক: রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রাহক ও গবেষক, প্রতিষ্ঠাতা রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রহশালা

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়