ঢাকা, মঙ্গলবার, ১ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৬ জুলাই ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

রজনীগন্ধাপুর : পঞ্চম পর্ব

ইমদাদুল হক মিলন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৭-০২-০৭ ৮:২২:০৩ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০২-০৭ ১২:৪২:৩২ পিএম
রজনীগন্ধাপুর : পঞ্চম পর্ব
Voice Control HD Smart LED

বাতিল মানুষরা একাই হয়।
আমি আমার মতো একটা দিকে হাঁটতে লাগলাম। আজকালকার কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে পড়া ছেলেদের মতো নিজের ব্যাগটা নিয়েছি কাঁধে। দুপুরে অষুদ নেই। ব্যাগে বিস্কুট আছে, পানির বোতল আছে, ক্যান্ডি আছে। খিদে পেলে বিস্কুট খাওয়া যাবে। সুগার কমে আসতে চাইলে ক্যান্ডি। আর পানির পিপাসা তো যখন তখনই পেতে পারে।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিক। ফাগুন মাস। বসন্তকাল। ভারি সুন্দর আবহাওয়া। না গরম না ঠাণ্ডা। গাছপালায় বইছে বসন্তদিনের হাওয়া। বাঁশঝাড় শন শন করছে। পাখি ডাকছে চারদিকে। বুনো ঝোঁপঝাড়ে অচেনা ফুল ফুটেছে। ভারি সুন্দর পরিবেশ। হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল বহুদূরে ফেলে আসা ছেলেবেলার ফাগুন মাসের গ্রামে যেন চলে এসেছি।

সত্যি দারুণ আইডিয়া শওকত সাহেবের। একটা গ্রাম তৈরি করবেন। কিচ্ছু বদলাবেন না। আমাদের ফেলে আসা জীবনের গ্রাম। বাংলাদেশের প্রকৃত গ্রাম।

দারুণ আইডিয়া! দারুণ!

টাকাঅলা লোক এখন বাংলাদেশে অনেক। বহু বড় ব্যবসায়ীর কথা শুনি ঢাকার আশপাশে, শত শত, হাজার হাজার বিঘা জমি কিনে রেখেছেন। সবাই ব্যবসার উদ্দেশ্যে। মিলকারখানা করবেন, হাউজিং করবেন। কম দামে কেনা জমি অনেক বেশি দামে বিক্রি করবেন। অর্থাৎ ব্যবসা।

এই একজন মানুষ দেখলাম ব্যবসার উদ্দেশ্যে জমি কেনেননি। কিনেছেন নিজের জন্য। নিজের একটা গ্রাম থাকবে। শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে নিজের স্বপ্নপূরণ করছেন।

টাকা থাকলে কত রকমভাবেই তো স্বপ্নপূরণ করা যায়। কেউ যে আস্ত একটা গ্রাম কিনে, নিজস্ব গ্রাম তৈরি করে স্বপ্নপূরণ করেন, ভাবাই যায় না।

আর কী সুন্দর নাম দিয়েছেন গ্রামের- রজনীগন্ধাপুর।

দারুণ আইডিয়া! দারুণ!

দিপুরও উদ্ভাবনী ক্ষমতা ছিল দারুণ। তরুণ আর্কিটেক্ট হিসেবে এমন সব বাড়ি, রেস্টুরেন্ট, বিজনেস সেন্টার, ইনটেরিয়র ডেকোরেসান করছিল- সব নতুন। একেবারেই নতুন। দিপুর আগে অমন করে কেউ ভাবেনি যে এত সহজ সুন্দর ভাবেও, কম খরচে চোখে পড়ার মতো কাজ করা যায়।

স্থাপত্য কৌশলের সঙ্গে সাহিত্যের একটা মিশেল দিয়েছিল সে। বারো, তেরো বছরের ক্যারিয়ারে কিছু বড়লোকের বাংলোবাড়ি করেছিল ঢাকার বাইরে। আমাকে দেখাতে নিয়ে গেছে কোনও কোনওটা। দেখে তাক লেগে গেছে। খুবই গৌরব বোধ করেছি ছেলেকে নিয়ে।

কিন্তু শাসন করা দরকার ছিল। ওকে একটু শাসন করা দরকার ছিল। মায়ার কথা শোনা উচিত ছিল। তাহলে হয়তো...

দিপু খুব সাহিত্য পড়তো। বাংলা সাহিত্য, বিদেশি সাহিত্য। একটু আধটু কবিতাও লিখতো। আলস্য বলে কিচ্ছু ছিল না শরীরে। চঞ্চল, ছটফটে স্বভাব। এই এটা করছে, এই ওটা করছে। অফিসে কাজ করছে তো করছেই, রাত হয়তো বারোটা বেজে গেছে খেয়াল নেই। পিয়ন মনে করিয়ে দেওয়ার পর লাফিয়ে উঠেছে। এত রাত হয়ে গেছে!

বই পড়ছে তো পড়ছেই। সিনেমা দেখছে তো দেখছেই। ড্রয়িং করছে তো করছেই। কবিতা লিখছে তো লিখছেই। মদ খাচ্ছে তো খাচ্ছেই।

এই একটা জিনিসই শেষ করল দিপুকে।

প্রথম প্রথম বাইরে থেকে খেয়ে আসতো। তারপর শুরু করলো বাড়িতে। মিলিয়া বাঁধা দিত না। বোধহয় সে ব্যাপারটা তেমন অপছন্দ করতো না। মিতুয়া অপুও দেখতো, ওরাও কিছু ভাবতো না।

মায়া তো চলেই গেছে। সে বেঁচে থাকলে হয়তো এসব নিয়ে কথা বলতো। হয়তো শাসন করতো ছেলেকে, বকাবকি করতো। দিপু শুনতো কি শুনতো না জানি না। তবে মায়া এটা মেনে নিতো না।

আমার তো মেনে না নিয়ে উপায় নেই। আমি তো ছেলের জন্মের পর থেকেই একরকম। কোনও কিছুতেই তাকে বাঁধা দেইনি, শাসন করিনি। একটু ধমক, বকাঝকা করা, মনে পড়ে না কখনও করেছি।

যখন করার তখন করিনি, এই বয়সে আর কী করবো? ছেলে থাকুক তার মতো, নিজের জগৎ নিয়ে।

 

 

এমনও হয়েছে বাড়িতে পার্টি দিয়েছে দিপু। তার লেখক, কবি বন্ধুরা এসেছে, আর্কিটেক্ট বন্ধুরা এসেছে। সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়েছে মদ খাওয়া। আড্ডা হৈ চৈ। কেউ বদ্ধ মাতাল হয়ে গেছে, কেউ বমি করে ভাসাচ্ছে। কেউ কেউ বারোটা একটার দিকে ফিরে গেছে। কেউ রয়ে গেছে গেস্ট রুমে, ড্রয়িং রুমের সোফায়। পুরো বাড়ি লণ্ডভণ্ড। জিন হুইস্কি রাম, বিয়ার রেড ওয়াইন, হোয়াইট ওয়াইনের গন্ধে ফ্ল্যাট ভরে আছে। আমি দরজা বন্ধ করে বসে আছি আমার রুমে। জুলেখার মা ট্রেতে করে আমার রাতের খাবার নিঃশব্দে এনে দিয়ে গেছে।

এমনও হয়েছে, ওরকম অবস্থায় মাতাল দুয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে আমার রুমে এসে ঢুকেছে দিপু। নিজে বদ্ধ মাতাল, সঙ্গেরগুলোরও একই অবস্থা। জড়ানো গলায় বাবার সঙ্গে বন্ধুদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।

মাতাল অবস্থায় কেউ কেউ অতি বিনয়ী হয়ে ওঠে। তেমন দুয়েকটা ওই অবস্থায় আমাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম পর্যন্ত করেছে।

আমি অসহায় চোখে তাকিয়ে থেকেছি। মাথায় হাত দিয়ে নিয়ম মাফিক কোনও কোনও মাতালকে বলেছি- বেঁচে থাকো বাবা, বেঁচে থাকো।

সেইসব মাতালের সবাই বেঁচে আছে। শুধু আমার ছেলেটা নেই। দিপু নেই। মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে...

আর একটা দুরন্ত স্বভাব ছিল দিপুর। ড্রাংকড অবস্থায় গাড়ি চালাতে খুব পছন্দ করতো। নিজে ড্রাইভ করতো। দিপু চলে যাওয়ার পর আমরা ড্রাইভার রাখলাম। তার আগে দিপু নিজেই ড্রাইভ করতো।

গাজিপুরের ওই দিকে বাংলোবাড়ি করে দিয়েছে এক ব্যবসায়ির। বাড়ির ওপেনিং হবে। ঢাকা থেকে অতিথি গেছে অনেক। বিশাল পার্টি। মদের জোয়ার বইছিল। দিপু তার স্বভাব মতো আকণ্ঠ পান করেছে। সঙ্গীরা সবাই বলল, থেকে যা দিপু। এই অবস্থায় ড্রাইভ করা ঠিক হবে না।

দিপু কেয়ারই করলো না। বদ্ধ মাতালদের কনফিডেন্ট লেবেল কোনও কোনও সময় হাই হয়ে যায়। দিপুর এটা হতো খুব। না কিচ্ছু হবে না। আই য়্যাম ওকে, আই য়্যাম ফাইন।

গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে এল।

রাতেরবেলা ট্রাকগুলো চলে দৈত্যের কায়দায়। সে রকম এক দৈত্যের সঙ্গে মুখোমুখি...

বাস ট্রাকের ড্রাইভার, হেলপাররা প্রাইভেট কারগুলোকে বলে ‘প্লাস্টিক’ ঠাট্টা করে বলা। অর্থাৎ ওদের কাছে ওগুলো খেলনা। প্লাস্টিকের খেলনা।

দিপুর প্লাস্টিকের খেলনাটা ওরা দুমড়ে মুচড়ে দিল। সঙ্গে দিপুকেও। স্পট ডেথ।

আমরা খবর পেয়েছিলাম ভোররাতে। পুলিশ দিপুকে নিয়ে গিয়েছিল ঢাকা মেডিক্যালে। আমরা ছুটে গেলাম। মিলিয়ার বাবা-মা ভাই, অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন। আমাদের আত্মীয়-স্বজন, দিপুর বন্ধুবান্ধব। লাভ কী? সব তো শেষ।

কান্নাকাটির রোল পড়েছিল হাসপাতালে।

আমি খুব চেষ্টা করেছিলাম কাঁদতে। পারিনি। চোখে পানি আমার এলই না। আমি আসলে পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। গভীর ভারি এক পাথর।

পাথরের চোখে কি পানি আসে!

দিপুর শরীর কাটাছেঁড়া করা হয়েছিল। ঢাকা মেডিক্যালের পেছন দিকে মর্গ। সেখানে একটা দিন থাকলো দিপু। পরদিন সকালে লাশ হস্তান্তর। সবার সঙ্গে আমিও গিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরা। মাথায় একটা টুপি। লাশবাহি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আমি আছি পাথর হয়ে।

মর্গের পাশে একতলা একটা বিল্ডিং। একটা পরিবার থাকে। হাসপাতালের কর্মচারীর পরিবার। ওরা রোজ এরকম দৃশ্য দেখে। খুন কিংবা অ্যাকসিডেন্ট করা লাশ। দেখতে দেখতে অভ্যস্ত। কার লাশ এল গেল, ওদের কিছুই যায় আসে না।

একটা যুবতী মেয়েকে দেখি মোবাইলে কার সঙ্গে কথা বলতে বলতে হাসি আনন্দে ফেটে পড়ছে।

মেয়েটিকে দেখে আমার মিলিয়ার কথা মনে হল। একজনের জীবন থেকে হাসি আনন্দ চলে গেল, পাশেই আরেকজন কত আনন্দে হাসছে। কী অদ্ভুত লীলাখেলা জগৎ সংসারের।

মিলিয়ার জীবনে হাসি আনন্দ ফিরে এল। মিতুয়া অপুর জীবনেও ফিরলো। ফিরলো না শুধু আমার জীবনে। প্রথমে পাথর হলাম, তারপর দিনে দিনে হয়ে গেলাম বাতিল মানুষ।

ফাগুন দিনের এই মনোরম পরিবেশে নির্জন গাছপালা ঘেরা গ্রামের পথে হাঁটতে হাঁটতে আমার আজ মনে হল, বাবা হিসেবে আমি যেমন তেমন না হয়ে যদি উল্টোটা হতাম! কঠিন ধরনের বাবা। ছেলে যা বলছে তাই শুনছি না। আদরে আদরে মাথায় না তুলে যদি অবস্থাটা করতাম এমন, ছেলে আমাকে যমের মতো ভয় পায়। যেমন আমরা সব ভাইবোন ভয় পেতাম আমাদের বাবাকে। বাবার ছায়া দেখলেই পালিয়ে যেতাম।

যদি তেমন বাবা হতাম?

তাহলে কি দিপুর জীবন এমন হতো? (চলবে)

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭/তারা

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge