ঢাকা, বুধবার, ১১ বৈশাখ ১৪২৬, ২৪ এপ্রিল ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ছোটগল্প || ছায়াসঙ্গী

হাসান মোস্তাফিজুর রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৪-০৯ ৬:৫৩:৩৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৪-০৯ ৬:৫৯:০৯ পিএম

|| হাসান মোস্তাফিজুর রহমান ||

ঘুম ভেঙে গেলেও চোখ বুজে পড়ে আছি। উঠতে ইচ্ছে করছে না। শরীরজুড়ে আরাম আরাম একটা অনুভূতি। ওষুধগুলো দারুণ কাজ করছে! একঘুমে রাত পার। খুটখাট শব্দ ভেসে আসছে রান্নাঘর থেকে। মুনাসকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে এসে নাশতা বানাচ্ছে ফারিহা। একটু আগে ডেকে গেছে আমাকে- উঠে ফ্রেশ হয়ে নাশতা খাওয়ার জন্য। যাওয়ার আগে মাথার কাছের জানালার পর্দা সরিয়ে দিয়ে গেছে। যাতে আমাকে ফের ডেকে তুলতে না হয় বিছানা থেকে। রোদের আলোয় আপনাতেই উঠে পড়ি। কিন্তু বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না। আরামের সঙ্গে একটা শান্তি শান্তি ভাব মনে। আর কোনো টেনশন তো নেই-ই, দুঃস্বপ্ন দেখাও নেই। উফ্! গত কিছুদিন কীসের মধ্যে যে ছিলাম! কী যে গেছে আমার উপর দিয়ে! সেই লোকটার চেহারা মনের পর্দায় ভেসে উঠতেই কেমন অস্বস্তি ভাব হলো।

গাউছিয়া মার্কেটে সেদিন ভয়ের ঠান্ডা একটা স্রোত শিরশির করে বয়ে গিয়েছিলো আমার মেরুদণ্ড বেয়ে। ওই তো সেই লোকটা! কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা কোকড়া, এলোমেলো চুল। কুচকুচে কালো পাতলা ঠোঁট, তোবড়ানো চোয়াল। চোখ দুটো কেমন বলতে পারবো না। গাঢ় কালো রঙের সানগ্লাস পরা। সবকিছু মিলিয়ে কঠিন চেহারা। ভিড়ের সঙ্গে মিশে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি তাকে লক্ষ্য করছি বুঝতে পেরে আস্তে ঘাড় ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকালো।

উপচেপড়া ভিড় ছিলো গাউছিয়া মার্কেটে। পুরুষ ক্রেতা খুবই কম। তরুণী আর মহিলাদের সংখ্যাই বেশি। প্রচন্ড গরমে দরদর করে ঘামছে সবাই। ঘামের সঙ্গে কড়া পারফিউম মিশে তীব্র কটূ গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। একেবারেই সহ্য হচ্ছিলো না। বমি বমি ভাব হচ্ছিলো। তাই নাকে রুমাল চেপে ভিড় ঠেলে এগোচ্ছিলাম। এগোতে হচ্ছিলো সাবধানে। সামনে-পেছনে, ডানে-বাঁয়ে- চারদিকে রমণীরা। অসাবধানতাবশত গায়ে একটু গা লেগে গেলেই ফোঁস করে উঠবে। কিন্তু নিজেরা ট্রাকের মতো ধাক্কা দিলেও কোনো সমস্যা নেই। মুচকি হেসে মধুর সুরে ‘সরি’ বলে মুখ মুছে ফেলবে। কোন পাপের খেসারত দিতে যে এই লেডিস মার্কেটে এসেছিলাম! মনে মনে নিজেকে অভিসম্পাত করতে করতে দুই সারি দোকানের মাঝের সরু জায়গা দিয়ে রমণীদের গা বাঁচিয়ে এগোচ্ছিলাম। হঠাৎ সামনে চোখ পড়তেই দেখতে পেলাম লোকটাকে। একটা থামের পাশে দাঁড়িয়ে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে।

ততোক্ষণে খবর হয়ে গেছে আমার। পাঁজরের ভেতরে ধড়াক ধড়াক করে লাফাচ্ছে হৃৎপিণ্ডটা। চিন্তার ঝড় বয়ে যাচ্ছে মাথার ভেতর। কে এই লোক? ঢাকা শহরে এতো মানুষ থাকতে ঠিক আমাকেই কেন অনুসরণ করছে? কেন করছে? কী চায় আমার কাছে? আমাকে কি চেনে? চিনলে সামনে এসে কথা না বলে কয়েকদিন ধরে এভাবে অনুসরণ করছে কেন? মতলব কী তার? খুন করতে চায়? ভিড়ের সঙ্গে মিশে এগিয়ে এসে বুকে ছুরি ঢুকিয়ে দেবে? নাকি মাথায় নল ঠেকিয়ে গুলি করবে?

মানুষের স্রোতে মিশে এগোতে এগোতে হঠাৎ টের পেলাম গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে ভয়ে। ঢাকা শহরে খুন-খারাবি পান্তাভাত। তুচ্ছ সব কারণে এ ওকে মেরে ফেলছে মাছ মারার মতো। বড়ো কারণের জন্য আছে পেশাদার খুনি। মাত্র পঞ্চাশ হাজার পেলেও ঠান্ডা মাথায় কাজ করে দেয় এরা। অবস্থাভেদে কয়েক লাখও নেয়। এ লোকটাও কি তাদের একজন? খুন করতে চাচ্ছে আমাকে? কিন্তু আমাকে খুন করাতে কে একে ভাড়া করবে? জানামতে আমার তো কোনো শত্রু নেই। তাও আবার জানের শত্রু। কী জানি, কিছুই বুঝতে পারছি না। চিন্তার ঝড়ে এলোমেলো হয়ে গেছে মাথার ভেতরটা।

যতটা মনে পড়ে দিনদশেক আগে প্রথম দেখি লোকটাকে। অফিসে ঢোকার সময়। সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে ছিলো। স্যুইং ডোর ঠেলে ভেতরে ঢোকার সময় চোখ পড়ে তার উপর। চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিলো আমার দিকে। স্বভাবতই কোনো ভাবান্তর হয়নি আমার। কতো মানুষই তো দাঁড়িয়ে থাকে ওখানে। কতোজনই তো তাকায় আমার দিকে। মানুষ মানুষের দিকে তাকাতেই পারে।

এর কয়েকদিন পর আবারো দেখতে পেলাম লোকটাকে। টুকিটাকি কয়েকটা জিনিস কিনতে বাসার কাছের একটা ওয়ান স্টপ শপিং মলে ঢুকেছিলাম। বেশ ভিড়। শপিং কার্ট নিয়ে ঘুরে ঘুরে মাল তুলছে সবাই। একটা বাস্কেট নিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস খুঁজতে শুরু করলাম। হঠাৎ চোখ পড়লো লোকটার উপর। আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা কোকড়ানো চুল, চোখে গাঢ় কালো রঙের সানগ্লাস, কঠিন চেহারা। লোকটা অমন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে কেন আমার দিকে? চিনি তাকে? কোথায় যেন দেখেছি মনে হচ্ছে? তারপর বিদ্যুৎ চমকের মতো এক ঝলকে মনে পড়ে গেলো। আরে হ্যাঁ! অফিসের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ছিলো সেদিন! কে লোকটা? এ পাড়াতেই থাকে? চেনে নাকি আমাকে?

এসব যখন ভাবছি ঠিক তখন পেছন থেকে নারীকণ্ঠ ভেসে এলো, ‘এক্সকিউজ মি!’

চমকে পেছনে তাকিয়ে সরে জায়গা করে দিলাম ভদ্রমহিলাকে। তারপর সামনে তাকিয়ে দেখি নেই। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো সেখানে নেই লোকটা! ভিড়ের মধ্যে তীক্ষ্ম চোখ ফেলে খুঁজছি। নেই। ভিড়ের মধ্যে যতো দ্রুত সম্ভব হেঁটে পুরো শপিং মল চষে ফেললাম। কোথাও নেই। হাওয়া হয়ে গেছে স্রেফ। তার মানে কি মল থেকে বেরিয়ে গেছে? এভাবে হঠাৎ করে বেরিয়ে যাবে কেন? আমার দিকেই বা ওভাবে তাকিয়ে ছিলো কেন? কে সে? এসব ভাবতে ভাবতে শপিং সেরে বেরিয়ে পড়েছিলাম মল থেকে। বাসায় ফেরার পথে চারদিকে তীক্ষ্ম নজর বুলিয়ে খুঁজেছি তাকে। কিন্তু তার ছায়াও চোখে পড়েনি।

অনেক চিন্তা করেও কোনো থই না পেয়ে কাকতালীয় বলে মেনে নিয়েছিলাম ব্যাপারটাকে। কাজ আর বাস্তবতার চাপে কয়েকদিনের মধ্যে ভুলেও গিয়েছিলাম লোকটার কথা। তারপর আজ, আজ আবার দেখলাম তাকে। আজকে নিয়ে তিনদিন। এরপর আর ব্যাপারটাকে কাকতালীয় বলি কোন আক্কেলে!

আতঙ্কিত হয়ে ভিড় ঠেলে এগোতে এগোতে হঠাৎ ঘাড়ের পেছনের চুলগুলো দাঁড়িয়ে গেলো সড়সড় করে। ভিড়ের আড়াল নিয়ে চুপিসারে পেছন পেছন এগিয়ে আসছে না তো! কাছে এসে ছুরি চালাতে চায়? নাকি নিশ্চিত হয়ে মাথায় নল ঠেকিয়ে গুলি করবে? ভাবতেই শিউরে উঠে সাঁই করে ঘুরে দাঁড়ালাম। সঙ্গে সঙ্গে পেছনের মেয়েটা ধাক্কা খেলো আমার বুকে। ধাক্কা খেয়েই চিলকণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো- ‘অসভ্য! বদমাশ কোথাকার! দেখেশুনে চলতে পারেন না?’

‘দে...দেখেশুনেই তো চলছি! আপনিই না আমার ওপর এসে পড়লেন!’ বলতে বলতে চকিতে চোখ বোলালাম ভিড়ে। না, কোথাও নেই।

‘ন্যাকা সাজা হচ্ছে, না? এভাবে হঠাৎ ঘুরে ধাক্কা খাওয়ার শখ। চালাকি, না? শয়তান কোথাকার!’

ইতোমধ্যে কৌতূহলী মানুষের ছোটোখাটো ভিড় জমে গেছে আমাকে আর মেয়েটাকে ঘিরে। এ ভিড় আর বাড়তে দেয়া উচিত না। ভিড় বেড়ে গেলে জনগণের ধোলাই খাওয়ার আশঙ্কা।

ধমকে উঠে কড়া গলায় বললাম, ‘আর একটা কথা বলবেন না! একদম চুপ! আপনিই অসভ্যের মতো আমার গায়ের ওপর এসে পড়েছেন। অভিযোগ তো আমার করার কথা। দেখে পথ চলতে পারেন না? আমার সঙ্গে যে আছে পেছনে পড়ে গেছে সে। তাকে খোঁজার জন্যই ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম। আপনার সঙ্গে কোলাকুলি করার জন্য না!’

হঠাৎ এমন আক্রমণে ভড়কে গেলো মেয়েটা। ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। ওদিকে একজন লোক আমাকে সমর্থন দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছে তাকে। এ সুযোগে পেছনে জটলা ফেলে দ্রুত পায়ে এগোতে শুরু করলাম। কিছু দূর এগিয়ে চট করে ঢুকে পড়লাম ডানের গলিতে। ক্রমাগত ঘাড় ঘুরিয়ে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে নজর বোলাচ্ছি ভিড়ের উপর। কোথায় লোকটা? ভিড়ে মিশে ঘাপটি মেরে আছে? সুযোগ মতো আক্রমণ চালাবে? নাকি সেদিনের মতো মার্কেট ছেড়ে বেরিয়ে গেছে? তাহলে কি আমিও বেরিয়ে গিয়ে যতো দ্রুত সম্ভব বাসায় চলে যাবো? কিন্তু যদি মার্কেটের বাইরে আমার অপেক্ষায় থাকে? তখন তো তার জন্য আরো সহজ টার্গেটে পরিণত হবো। এর চেয়ে আপাতত এই ভিড়ের মধ্যে মিশে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। খুন করে পালাবার সময় সহজেই ধরা পড়ে যাবার কথা চিন্তা করে হয়তো এখানে সে কিছু করবে না। আচ্ছা, তাহলে সে আমাকে অনুসরণ করে মার্কেটে ঢুকে পড়লো কেন? রাস্তায়ই তো কাজ সারতে পারতো। নাকি যুৎসই সুযোগ পায়নি ওখানে বা মার্কেটের ভেতরই খুঁজে পেয়েছে আমাকে? কী জানি! আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে আসলে সে খুন করতে চায় না আমাকে? যদি চাইতো ওই দু দিনেই তো খুব সহজে করতে পারতো। তাহলে কি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে পিছু নেয়? এসব ভাবতে ভাবতে ভিড় ঠেলে যতোটা সম্ভব দ্রুত এ গলি থেকে ও গলিতে হেঁটে বেড়াতে বেড়াতে তীক্ষ্ম নজর বোলাচ্ছি চারদিকে।

হঠাৎ একটা কথা মনে পড়লো। লোকটার উদ্দেশ্য কী জানি না। তা না জেনেই এভাবে আতঙ্কিত হয়ে কাজ না সেরেই বাসায় চলে যাওয়া কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে? লোকটার হাতে মরণ লেখা থাকলে কেউ ঠেকাতে পারবে না। তাহলে কেন কাপুরুষের মতো শপিং না করেই চোরের মতো পালিয়ে যাবো? আজ আমার অষ্টম বিয়ে বার্ষিকী। এ ব্যাপারে টুঁ শব্দ করেনি ফারিহা। না করলেও নিশ্চিত জানি দিনটির কথা ভোলেনি ও। ভোলার কথাও না। মেয়েরা এ দিনের কথা কখনোই ভোলে না। সারাজীবন মনে থাকে ওদের। ফারিহা আসলে পরীক্ষা করছে আমাকে। যদি না ভুলি ভীষণ খুশি হবে। আর ভুলে গেলে কথার সোডা দিয়ে ইচ্ছেমতো কাচবে। ওকে সারপ্রাইজ দিতে আমিও চুপ করে আছি। কিস্‌সু বলিনি। পরিকল্পনা করেছি দামি একটা শাড়ি কিনে লুকিয়ে বাসায় নিয়ে যাবো। তারপর রাতে চমকে দেবো ওকে। সেই শাড়ি না কিনে অজানা অচেনা এক লোকের ভয়ে লেজ গুটিয়ে পালাবো মার্কেট ছেড়ে? এ হয় না। আমাকে মানায় না। জন্মেছি যখন মরতে তো একদিন হবেই। দু’দিন আগে বা দু’দিন পরে- এই যা।

এভাবে নিজেকে সাহস জুগিয়ে ঢুকে পড়েছিলাম একটা শাড়ির দোকানে। নিজেকে সাহস জোগালেও ভয়টা ঠিকই রয়ে গিয়েছিলো মনের ভেতর। টুলে বসে শাড়ি দেখতে দেখতে বারবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছিলাম। দোকান ঘুরে ঘুরে দরদাম করার অবস্থায় ছিলাম না। চার হাজার টাকা দামের একটা শাড়ি খুব পছন্দ হয়ে গিয়েছিলো। প্যাকেট বগলদাবা করে সাবধানে সোজা বাসায় চলে গিয়েছিলাম।

স্বামী যথারীতি সন্ধ্যার পর অফিস থেকে বাসায় ফিরে এসেছে। কিন্তু হাত তার খালি। র‌্যাপিং পেপারে মোড়ানো প্যাকেট বা কোনো কিছুই নেই। দেখে যা বোঝার বুঝে গেলো আমার স্ত্রী। বুঝে মুখ কালো হয়ে গেলো। কিন্তু কিছুই বললো না। আমিও কিছু বলিনি। মনে মনে হাসছিলাম শুধু। শেষে ফ্রেশ হয়ে চা-নাশতা খাওয়ার পর অফিস ব্যাগ থেকে শাড়ির প্যাকেটটা বের করলাম।

ফারিহার দিকে বাড়িয়ে ধরে হেসে বললাম, ‘হ্যাপি ম্যারেজ ডে! গরিব সোয়ামির পক্ষ থেকে তোমার জন্য সামান্য একটা উপহার।’

‘ফাজিলের ফাজিল! তোমার মনে আছে তাহলে! আমি তো ভেবেছিলাম...।’ কথা শেষ না করে আমার হাত থেকে ছোঁ মেরে প্যাকেটটা নিয়ে নিলো ও। তারপর র‌্যাপিং পেপার ছিঁড়তে ছিঁড়তে মিষ্টি করে হেসে জানতে চাইলো, ‘কী এনেছো আটবছরের পুরনো বৌয়ের জন?’

জবাব না দিয়ে মুখ টিপে হাসলাম।

‘বাব্বাহ্! শাড়ি! তাও আবার সুতির নয়, জর্জেটের! আমার গরিব স্বামী হঠাৎ ধনী হয়ে গেছে মনে হচ্ছে? অ্যাই...না! তোমাকে না গরিব গরিব বলতে মানা করেছি? আমরা মোটেও গরিব নই।’

রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর হাসাহাসি আর খুনসুটি চলছিলো। কথায় কথায় শাড়ির দাম জানতে চাইলো ফারিহা।

চার হাজার শুনে মুখের হাসি নিভে গেলো ওর। ‘কী বলছো তুমি! ফান করছো?’

‘ফান করছি না। সত্যি। কেন, কী হয়েছে? বেশি নিয়েছে?’

‘আরে বেশি নিয়েছে কী? তোমাকে তো জবাই করেছে!’

‘মানে!’

‘এই শাড়ির দাম খুব বেশি হলে দেড় হাজার। পাশের বাসার ভাবি সেদিন কিনেছে। তেরোশো টাকা। ঠিক এই শাড়ি। রঙটা শুধু ভিন্ন। এহ্ হে! আড়াই হাজার টাকা ঠকিয়েছে তোমাকে।’

মাথার তালু জ্বলে যাচ্ছে প্রচন্ড রাগে। ওই লোকটার ভয়ে টেনশনে ছিলাম ঠিক আছে। কিন্তু তাই বলে কলার দামে মুলা কিনে নিয়ে এসেছি!

‘মার্কেটে ঢুকে আজ তোমার কী হয়েছিলো বলো তো? সবসময় তুমিই তো আমার জন্য শাড়ি কেনো। এই আটবছরে কোনোদিন তো এমন হয়নি?’

এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলাম প্রথমে। তারপর কীভাবে যেন মুখ ফসকে বেরিয়ে গেলো। বেরুতেই থাকলো। কারণ তখন আর থেমে যাওয়ার উপায় নেই। প্রথম থেকে সব খুলে বললাম ওকে।

সব শুনে রক্ত সরে গেলো ওর মুখ থেকে। তারপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক কিছু জানতে চাইলো। একই প্রশ্ন বারবার করলো। চোখ বুজে দৃশ্যপট কল্পনা করে বিশ্লেষণ করলো। তারপর ফের প্রশ্ন। এভাবে চললো অনেক রাত পর্যন্ত।

ঠিক পরদিন সকাল থেকেই আমার ওপর রীতিমতো হামলে পড়লো ফারিহা। সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যেতে হবে। কেন? আমি কি মানসিক রোগী নাকি পাগল? পাগল হতে নাকি আর বেশি বাকি নেই! অফিসের চাপে মাথা আমার গেছে। কোন লোকের ঠ্যাকা পড়েছে আমার মতো নিরীহ একজন মানুষকে খুন করার? সবার সঙ্গেই তো আমার সদ্ভাব। কারো সঙ্গে কোনোদিন এমন কিছু হয়নি যে ভাড়াটে খুনি লাগিয়ে দেবে পেছনে। আর যদি সত্যি সত্যি লাগিয়েই দিতো অনেক আগেই বিধবা হয়ে যেতো ও। সবই নাকি আমার উত্তপ্ত মস্তিষ্কের কল্পনা! তিনদিন তিন লোককে দেখে একই লোক হিসেবে কল্পনা করেছি! বা একইজনকে বড়োজোর দু’দিন দেখেছি। ঢাকার মতো এমন গিজগিজে মানুষে ভরা ছোট্ট শহরে এমনটা হতেই পারে। বড়ো প্রমোশনটার জন্য বছরেও একবার ছুটি নিয়ে পরিবারসহ বেড়াতে যাচ্ছি না বলেও কথা শোনালো। ছুটি না নিয়ে অফিসে এভাবে দিনরাত কাজ দেখাচ্ছি বলেই নাকি মাথায় চাপ পড়ে আজগুবি সব কল্পনা করছি। তাই আমার উচিত অতি সত্বর কিছুদিনের ছুটি নিয়ে বাসায় বিশ্রামে থাকা। সবচেয়ে ভালো হয় কক্সবাজার বা সেন্ট মার্টিন’স-এ বেড়াতে গেলে। তবে সবার আগে দরকার একজন ভালো সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো। ডাক্তার দেখানোয় তো কোনো সমস্যা নেই। তাকে সব খুলে বলা যাবে। উনি ঘটনা সত্য মনে করলে তখন অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়া যাবে।

মাইয়া লোকের ঘ্যানঘ্যান যে কী জিনিস হাড়ে-মজ্জায় টের পাচ্ছিলাম। জান কয়লা হয়ে যাওয়ার দশা! ওদিকে বাসা থেকে বেরুলেই ওই লোকটার ভয় তো আছেই। ওই সময়ে আর দেখিনি তাকে। তবে প্রায় প্রতিদিন স্বপ্নে হানা দিতে শুরু করলো সে। ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন। ইয়া বড়ো এক মেশিন গান হাতে নিয়ে ব্রাশ ফায়ার করছে আমাকে। কিন্তু মরছি না। মরছি গুলি শেষ হয়ে যাওয়ার পর। ধীরে ধীরে। সবসময় ঠিক একই স্বপ্ন। দাঁত কেলাবে বলে গোপন করে গেছি ফারিহার কাছে। কিন্তু লোকটাকে আর দেখছি না জানতে পেরে আরো বদ্ধমূল হয়ে গেলো ওর ধারণা। সব আমার উত্তপ্ত মস্তিষ্কের ফসল- ভিজুয়াল হেলুসিনেশন! অতএব মানসিক ডাক্তারের কাছে যাওয়ার বিকল্প নেই।

দিনদশেকের মধ্যে হার মানলাম ঘ্যানঘ্যানের কাছে। নামকরা এক সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গেলো ও আমাকে। সব শুনলেন তিনি। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক প্রশ্ন করলেন ওকে আর আমাকে। পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডসহ অনেক কিছুর নোট নিলেন। তারপর কিছু ওষুধ লিখে দিয়ে পনেরো দিন পর আবার দেখা করতে বললেন।

ডাক্তারের পরামর্শে এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছি। নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছি। দারুণ ঘুম হয় প্রতিদিন রাতে। একঘুমে সকাল। ঝরঝরে লাগে শরীর। মাথা কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা মনে হয়। কোনো দুশ্চিন্তা নেই। ওদিকে বাস্তবে দূরে থাক, দুঃস্বপ্নেও আর দেখিনি লোকটাকে। ধন্দে পড়ে গেছি। ফারিহা আর ডাক্তারের কথাই ঠিক মনে হয়। সবই আমার মস্তিষ্কপ্রসূত কল্পনা। কিন্তু মন থেকে পুরোপুরি মেনে নিতে পারি না। নিজের চোখকে কীভাবে অবিশ্বাস করি!

চোখ বুজে চুপচাপ পড়ে আছি বিছানায়। উঠতে ইচ্ছে করছে না। শরীরে কেমন এক আরাম আরাম আলস্য। আরামের দিন অবশ্য শেষ। আগামীকাল থেকে আবার সেই অফিস। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই দ্রুত তৈরি হয়ে নিয়ে নাশতা খেয়ে দৌড়। এতো বেলা পর্যন্ত এভাবে বিছানায় পড়ে থাকা যাবে না।

কিছুক্ষণ পর গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়লাম। এখনো শুয়ে শুয়ে লেজ নাড়ছি দেখলে ক্ষেপে যাবে বৌ। বিছানা থেকে নেমে বাথরুমের দিকে এগোলাম। বাথরুমের দরজার পাশেই রাস্তার দিকে আরেকটা জানালা। পর্দা সরিয়ে দেয়া দরকার। আরো আলো ঢুকুক ঘরে। এগিয়ে গিয়ে পর্দা সরিয়ে রাস্তার দিকে তাকাতেই স্রেফ জমে গেলাম। রাস্তার ওই পারের বৈদ্যুতিক থামের পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই লোকটা! সেই একই বেশ। কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা কোকড়ানো চুল। চোখে গাঢ় কালো রঙের সানগ্লাস। মুখ উঁচিয়ে সরাসরি তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

সংবিত ফিরে পেতেই পর্দা ছেড়ে দিয়ে ডাইনিং রুমের দিকে লাফিয়ে গিয়ে চিৎকার করে ডাকলাম, ‘ফারিহা! তাড়াতাড়ি এসো এদিকে!’

আমার গলার স্বরে কী ছিলো কে জানে ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকলো ও। আতঙ্কিত স্বরে বললো, ‘কী...কী হয়েছে?’

‘ও...ওই লোকটা!’

‘কোন লোকটা?’

‘আরে সেই লোকটা! রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে জানালা দিকে তাকিয়ে আছে!’

‘কী বলছো তুমি!’

থাবা দিয়ে ফারিহার হাত ধরে জানালার দিকে দৌড় দিয়ে বললাম, ‘এসো, নিজের চোখে দেখো এবার!’

বৈদ্যুতিক থামটা যেন ব্যঙ্গ করছে আমাকে। পাশে বা আশপাশে কেউ নেই!

অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ফারিহা বললো, ‘কোথায় লোকটা? ওখানে তো কেউ নেই! ওষুধগুলো ঠিকমতো খাচ্ছো না, না?’

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৯ এপ্রিল ২০১৯/তারা

Walton Laptop
     
Walton AC
Marcel Fridge