ঢাকা, বুধবার, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২১ নভেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

বিদেশে বিপজ্জনক ট্যাক্সিচালকের পাল্লায়

ফেরদৌস জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৭-০৯ ৬:৫৬:১৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৭-০৯ ৬:৫৬:১৮ পিএম

(ভিয়েতনামের পথে: ৩৪তম পর্ব)
ফেরদৌস জামান: ইতিহাসের সেই নতুন নগরী চিয়াং মাই-এ আজকের দিনই শেষ দিন। কোথাও এক টানা তিন-চার দিন অবস্থান করলে সেই জায়গা বিশেষ করে থাকার ঘরের প্রতি এক ধরনের মায়া জন্মে যায়। এটা আমার স্বভাব কিন্তু জ্যামস গেস্ট হাউজের এই ঘরটির ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না। উপরন্তু মনে হচ্ছে, মুক্তি পেলাম!

সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠার তাড়া ছিল না। ব্যাগ গুছিয়ে গেস্ট হাউজ ত্যাগের প্রস্তুতি সম্পন্ন। তবে এখনই বের হচ্ছি না। হতে সময় আছে বেশ- দুপুর বারোটা পর্যন্ত। যথারীতি নিচে এসে ডাইনিং-এ বসলাম। আজকে সকালের নাস্তায় অনেক পদ, যার প্রতিটিই স্বাস্থ্যকর বলা যায়। ইউবিনের উপহার দেয়া নাস্তা। গত দুই দিন সঙ্গ পেয়ে সে এতটাই খুশি যে আমাদের জন্য ফলের প্যাকেট কিনে এনেছে। সবই অপরিচিত ফল, কেটে কেটে সার করে রাখা। ফলাহার শেষে এক পেয়ালা কফি, কফির চুমুকে চুমুকে চলছে ইতিহাসের কথা। ইউবিন এক জয়াগায় স্থির থাকার নয়, এক প্রসঙ্গ শেষ না হতেই লাফ দিয়ে অন্যখানে। ১৯৭১-এ বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যার সংবাদ তাকে ব্যথিত করে তুললো। স্বভাবসুলভ চটজলদি বইয়ের পাতার মাঝেই দু’চার কথা টুকে রাখল। কি টুকে রাখল সে-ই জানে। দুই কোরিয়ান যুদ্ধেও যে এমন হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে, যাতে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ গেছে তা জানা আছে কি না? এমন প্রশ্নে বোবার মত শুধু তাকিয়ে থাকে। সরল সোজা মেয়ে, ইতিমধ্যে ইতিহাস থেকে দু’চার কথা শোনার পর আমার ব্যাপারে নির্ঘাৎ তার মাধ্যে ধারণা জন্মে গেছে; পৃথিবীর সমস্ত ইতিহাস আমার মুখস্ত। অতএব, আসন্ন বিপদ থেকে বাঁচতে কফি শেষ করে উঠে পরা উত্তম।
 


যোগ দিল মানন। ক্লাব থেকে মাস্তি-মৌজ শেষে অনেক রাত করে ফিরেছে। লম্বা ঘুমের পর এত বেলা করে উঠে নাস্তা নিয়ে যোগ দিল আসরে। বাংলাদেশের পোশাক তার খুব প্রিয়। মালয়েশিয়া বেড়াতে গেলে এক বাঙালি তাকে কামিজ-পাজামা উপহার দিয়েছিল। মালয়েশিয়ার রাস্তায় রাস্তায় সেই পেশাক পরে ঘুরে বেড়িয়েছে। পোশাকগুলি তার এতটাই পছন্দ যে ব্যাগে এখনও তোলা আছে। চেয়ার সরিয়ে উঠে যেতে নিল, ব্যাগ থেকে এনে দেখাবে। তার প্রয়োজন হবে না বললে আবারও বসে পরল। সদা হস্যজ্জল মাননকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে, সে এক বড় বিপদের মাঝে পরে আছে। ঘটনা শোনার পর অবাক বনে গেলাম। কয়েক দিন হলো এখানে সে বিনা পাসপোর্টে অবস্থান করছে। কোথায় হারিয়ে ফেলেছে জানে না। এখন সে বুঝতে পারছে না কি করবে। আশ্চর্য ব্যাপার হলো তার কর্মকাণ্ড এবং চেহারায় বিন্দুমাত্র তার ছাপ নেই। ওর পরিস্থিতি একটু হলেও অনুধাবন করার সক্ষমতা আমার আছে কারণ ভিন্ন রকমের হলেও ঠিক একই ঘটনা আমার জীবনেও ঘটেছে, যার ভার আজও বয়ে বেড়াতে হয়।

আজ শহরের এই রাস্তা, সেই রাস্তায় শুধু হাঁটব আর দেখব। গেস্ট হাউজ ছেড়ে দেয়ার যদিও অনেক সময় বাকি তারপরও আগেভাগে ব্যাগ নামিয়ে এনে অভ্যর্থনা কক্ষে নুনের কাছে জমা রাখলাম। নুনের চেখে-মুখে এখনও কৃত্রিম সৌজন্যতা। বলতে গেলে সে এখন আমাদের ধারই ধারছে না। এমন হওয়াটা বোধহয় স্বাভাবিক। বেচারি এত কষ্ট করে কতগুলি প্যাকেজ বর্ণনা করল অথচ, আমরা কিনা একটাও নিলাম না। সাপ্তাহিক ছুটির পর আজ প্রথম কর্ম দিবস। থাপায়া গেট চত্বর ফাঁকা, হাতে গোনা মানুষ। কবুতরের দলও যেন পালিয়েছে। সুজিত একটা ব্যাগ কিনবে। সেই আসার পর থেকেই খুঁজছে। চাহিদার সেই ব্যাগটির সন্ধান এখনও মেলেনি। আমারও সামান্য কিছু কেনার আছে। আজ বিদায়ের দিন, তাছাড়া বিশেষ কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা নেই। অতএব, কেনাকাটায় মনোযোগ দেয়া যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত ব্যাগের সন্ধান পেতে ব্যর্থ তবে আমার কিছু কেনা হয়েছে, যা আসলে পরিকল্পনার বইরের জিনিস। রাস্তায় উদ্দেশ্যহীন হাঁটতে মোটেও খারাপ লাগছে না। কে বলে উদ্দেশ্য নেই, খামাখা পথে পথে হাঁটাই কি একটা দামি উদ্দেশ্য হতে পারে না? এ যাবৎ অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে নিজেদের মধ্যে চলছে নানান কথাবার্তা। পথের ধারে এক প্যাকেজ ট্যুর অপারেটরের কার্যালয়। দেয়ালে সুন্দর সব ছবি আটকানো। সেদিকে দৃষ্টি পরলে নিকটে এগিয়ে যেতেই ভেতরে যাওয়ার আহ্বান করা হলো। সুজিত এগিয়ে যেতেই আসনে বসা নারী কর্মকর্তা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল- আমি অমুক, তোমার নাম? নাম শুনে অনেক উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠল, ও সুসিইইই! সুজিত হয়ে গেল সুসি। যাহোক, সে যেন আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল, কেউ সামনে দিয়ে গেলেই ধরে ফেলবে। সেক্ষেত্রে আকর্ষণীয় ছবিগুলিকে টোপ হিসেবে ধরে নেয়া যেতে পারে। বিরতিহীন প্যাকেজ বর্ণনা চলমান। সামান্যতম সুযোগটিও মিলছে না যে, ওকে বলব আজ আমাদের বিদায়ের দিন। যা দেখার ছিল তা দেখে নিয়েছি। কথার মাঝে কিছুক্ষণ পরপর হাত টানটান করে বাড়িয়ে দিয়ে জোরেসোরে বলে উঠছে- সুসিইইই, সাথে হাতে কয়েক ঝাকি!  অর্থাৎ এক প্যাকেজ বর্ণনা শেষ এবং অন্য প্যাকেজ বর্ণনা শুরুর আগে এই অন্তর্বর্তীকালীন এমন কিছু বলা তার মূদ্রা দোষ। আবার নিজের কথার সাথে আমাদের মনোযোগ অটুট রাখতে এটা তার কৌশলও হয়ে থাকতে পারে। যেমন- আমরাও অনেক সময় কথার মাঝে বলে থাকি- বুঝতে পেরেছেন? ঠিক আছে? তাই নয় কি? ইত্যাদি। ইতিমধ্যে সে এতটাই বলে ফেলেছে যে, আমাদের বিদায়ের সংবাদটা দেয়ার পরিস্থিতি আর নেই। কারণ ওটা এখন তার নিকট দুঃসংবাদ হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে। দুপুরের খাবার খেতে ছুটে চললাম বার্গার কিং-এর দিকে। হাঁটছি অন্য পথ দিয়ে ,শনিবারের বাজারের আগেই বাম দিকের মোড়টা ধরে। এই পথই এগিয়ে যুক্ত হয়েছে শুক্রবারের বাজার এলাকায়। চিয়াং মাই- এ দেখা এ যাবৎ সর্বাপেক্ষা বিলাসবহুল জায়গা। একাধিক পাঁচ তারকা হোটেল আছে। প্রাদেশিক রাজধানীর সর্বোচ্চ দালানগুলির অবস্থান এই এলাকায়।
 


উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরিতে দিন শেষে এখন প্রায় সন্ধ্যা। ব্যাগ নিয়ে বের হতেই ইউবিনের সাথে দেখা। ওর থেকে বিদায় নেয়া বাকি ছিল । সুজিত আমাকে দাদা বলে সম্বোধন করে। অনুসরণ করতে গিয়ে ইতিমধ্যে সেও আমাকে দাদা বলে সম্বোধন করার অভ্যাসটা রপ্ত করে নিয়েছে। যদিও উচ্চারণের ক্ষেত্রে দাদার জায়গায় ডাডা হয়ে যায়। তার কাছ থেকে আবেগ ঘন বিদায় শেষে বাস টর্মিনানের দিকে রওনা করলাম। পথ বেশি নয়, সিদ্ধান্ত নিয়েছি হেঁটেই যাব। তাছাড়া হাতে সময়ও আছে যথেষ্ট। সন্ধ্যার পর ইতিমধ্যেই শহরের সমস্ত বাতি জ্বলে ইঠেছে। নদীর স্রোতের সাথে ভেসে যাচ্ছে লাল, নীল, হলুদ রঙের রেখামালা। সেতু পেরিয়ে সোজা না ডানে যাব, তা নিয়ে একটু সংশয় হলো। পাড় ধরে নিরিবিলি ফুটপাথ। পথ চেনা ঠেকছে না। টার্মিনাল থেকে যে পথে এসেছিলাম সে পথ আর এই পথ এক নয়। পথচারীর সংখ্যা নগন্য। জিজ্ঞেস করার কেউ নেই। দু’একজন যাকেই পেলাম তারা আমাদের কথার আগা মাথা কিছুই বোঝে না। কেউ কেউ মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে আন্দাজেই হাত ইশারায় সামনে যেতে বলে। প্রায় দেড় ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। অথচ, টার্মিনাল পৌঁছাতে এত সময় লাগার কথা নয়। সামনে আলো ঝলমলে দালান। নিচের উন্মুক্ত বসার জায়গায় এক ঝাক যুবতীর মেলা। লাল টকটকে পোশাক পরা যুবতীরা আমাদের আগমনের আভাস পেয়ে যেন নড়েচড়ে উঠল। কমপক্ষে বিশ জোড়া ডাগর চোখের তীর্যক চাহুনিতে পায়ের কদম যেন এলোমেলো পরছে। কোন মতে পেরিয়ে আসতে পেরে যেন স্বস্তি মিলল।
 


ক্রমেই আরও নিরিবিলি এলাকায় চলে এসেছি। দু’পাশে সরকারী বিভিন্ন দপ্তর এবং তার দীর্ঘ প্রাচীর ছাড়া অন্য কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। নিশ্চিত ভুল পথে আছি। রাস্তার পাশে এক দল যুবকের আড্ডা থেকে জানানো হলো, হ্যাঁ ভুল পথে চলে এসেছি অনেক দূর। ফিরে যেতে হবে আবার সেই সেতুর গোড়ায়। এখন মনে হলো সত্যিই বিপদে পরে গেছি। সময় চলে গেছে অনেক। আশঙ্কা করছি গাড়ি ধরতে ব্যর্থ হই কিনা! সেতুর কাছে আসার আগেই ট্যাক্সি পেয়ে গেলাম। ট্যাক্সিতে আরও কিছু যাত্রী আছে। তাদেরকে নামিয়ে দিয়ে অলিগলি মাড়িয়ে রাস্তার এক পর্যায়ে এসে আচমকা গাড়ি থামিয়ে বলল, তিনশ বাথ না দিলে যাবে না। নিস্তব্ধ জায়গায় এসে এমন দাবির অর্থ আমাদের বেকায়দায় ফেলার মতলব। ওদিকে সাড়ে নয়টা বাজতে আর মাত্র চল্লিশ মিনিট বাকি। একশ বাথে সই করেই তুলেছে এখন বিপদে ঠেলে দিত চাইলেই তো হবে না। মাথা গরম হয়ে যাওয়ার জোগাড়! চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করার আগেই ভাব পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করে বলল, ঠিক আছে উঠে বসুন। সময় মত টার্মিনালে পৌঁছে যেন বাঁচলাম! নিজেদের হঠকারীতার কথা ভেবে অট্ট হাসিতে ফেটে পরলাম। এমন কেন হলো জানি না। ওদিকে ট্যাক্সি চালক বোকার মতো তাকিয়ে তাকিয়ে কি ভাবছে কে জানে? অল্পক্ষণ বাদেই বাস ছেড়ে দিল। চিয়াং মাইকে বিদায় জানিয়ে ছুটলাম ব্যাংককের দিকে।  (চলবে)

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৯ জুলাই ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC