ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

দ্বীপের পথে পথে, অজানার খোঁজে : শেষ পর্ব

জুনাইদ আল হাবিব : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১২-০৫ ৬:০৪:৩৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১২-০৫ ৬:০৪:৩৮ পিএম

জুনাইদ আল হাবিব : দ্বীপ হাইমচরে যাবো। ‘উপকূল বন্ধু’ রফিকুল ইসলাম মন্টু প্রস্তাব দিলেন, গত বছর বর্ষায় দ্বীপে মানুষের জীবনযাপন দেখেছি খুব কাছ থেকে। কিন্তু তা ছিল খুব স্বল্প সময়ের। এবার গ্রীষ্মের শেষের দিকে চলো দেখে আসি, দ্বীপের মানুষগুলো কেমন আছেন?

আমি সাড়া দিয়ে বললাম, আপনি ঢাকা থেকে আসেন। ভৈরবী লঞ্চঘাটে দেখা হবে। যত সকালে পারি দু’জন একসঙ্গে আবার দ্বীপ হাইমচর যাবো। পরিকল্পনা ছিল, একরাত দু’দিন দ্বীপে থাকবো। পরের দিন বিকেলে ফিরবো। সে অনুযায়ী আমাদের পথচলা।

 



গ্রীষ্ম বলে মেঘনা অনেকটা শান্ত। দ্বীপের পথে চলছে ট্রলার। কূলের কাছাকাছি আসতেই শুরু হলো প্রচণ্ড ঝড়। খালে পানি কম থাকায় ট্রলার থামলো সাহেবগঞ্জ বাজার থেকে পূর্বে মেঘনার কূলে। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে আমরা একটি দোকানের নিচে দাঁড়ালাম। দ্বীপে ঝড়ের দৃশ্য ফেসবুক লাইভে বিশ্ববাসীকে দেখানোর চেষ্টা করছি। কিছুক্ষণ পর সাহেবগঞ্জ বাজারের পথ ধরলাম দুজন। চোখ মেললেই দেখি দিগন্তজুড়ে সয়াবিন, মরিচ। দ্বীপের জমি ঊর্বর বলে এসব ফসল ভালোই ফলে ওখানে। বাজারে পা রাখতে না রাখতেই দেখা স্থানীয় গ্রাম পুলিশ রাজা মিয়ার সঙ্গে। রাজা মিয়া নাছোড়বান্দা। আমরা দূর থেকে এসেছি জেনে আমাদের পেছনে খাটতে লাগলেন। আমাদের প্রয়োজন হাইমচর ইউনিয়নের উদ্যোক্তাকে। খোঁজ করে আনলেন উদ্যোক্তা মো. সবুজকে। ইউনিয়ন অফিসে যাওয়ার সময় কিছু দূর এগিয়ে দিয়ে ফিরলেন তিনি। উপকূল বন্ধু, আমি আর উদ্যোক্তা চলছি ইউনিয়ন পরিষদের দিকে। পথিমধ্যে দেখি, প্রতিটি বাড়িতে পতাকা ওড়ে। এসব পতাকা বিভিন্ন পীর, দরবেশদের পরিচয় বহন করে। উদ্যোক্তা বললেন, দ্বীপের প্রতিটি মানুষ এসব মতবাদে বিশ্বাসী।

সামনে আরকেটু হাঁটতেই দেখি একটি ভিন্ন জাতের লাউয়ের গাছ। লাউয়ের রং বেশ সাদা। দেখতে অনেকটা কুমড়ার মতো মোটা। উদ্যোক্তার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ গল্প হলো। দ্বীপের জীবনযাপন সম্পর্কে তার রপ্ত করা বহু তথ্য সহজেই নোটবুকে টুকে নিলাম। সময়ও অনেক দূর গড়িয়েছে। এবার পূর্বের হেঁটে আসা পথে ফিরতে শুরু করলাম। সাহেবগঞ্জ বাজারে ফিরে দক্ষিণ দিকে ধূসর সেতু পার হয়ে সামনে আরো একটু হাঁটি। চোখ পড়লো নদীর উত্তাল ঢেউয়ের দিকে। আবারও ফেসবুক লাইভে এ দৃশ্য দেখাই। এ লাইভে যুক্ত হয় দ্বীপের মানুষের সরাসরি গল্প। একটু পথ পেরিয়ে খালের সাঁকো পার হয়ে তারেক মোল্লার ভিটের কোণায় এসে দাঁড়াই। ভিটে-মাটি খালি পড়ে আছে। নেই তারেক মোল্লা ও তার স্বজনরা। সেখানে নেই আবু সরদারও। এর আগে মাসুদ আলমের দাওয়াতে সেরে নিলাম দুপুরে খাওয়া। সন্ধ্যা নামলো আকাশে। সাহেবগঞ্জ বাজারের পথ ধরি দুজন। ল্যাপটপ, ক্যামেরা, মোবাইলে চার্জ সংযোগের জন্য জেনারেটরে উৎপন্ন বিদ্যুৎ কাজে লাগাই। নেটওর্য়াক ব্যবস্থা একদম শূন্য। রবি আর বাংলালিংকের গ্রাহকরা কিছুটা নেটওর্য়াকের আওতায় থাকেন। সেখানে গ্রামীণফোন অপারেটর বলে বেশ বিপাকেই পড়তে হয়েছিল আমাদের। রাত ঘনিয়ে আসছে। ঘুমানোর ব্যবস্থা হয়েছে দ্বীপের আলোকবর্তিকা এমজেএসকেএসএনএম জুনিয়র উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ারুল আজিম সবুজের ব্যবস্থায়।

 



বাজারের জেনারেটরের সুইচ বন্ধের আগে সংকেত দেয়। দোকান বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে রাজা মিয়ার অনুরোধে তার বাড়িতে যেতে হলো। রাজা মিয়ার অসাধারণ প্রতিভা দেখে আমরা অবাক! তিনি পেশায় চকিদার হলেও শখের নেশায় বয়াতি। গান করেন সঙ্গে গিটার বাজান। আমাদের আনন্দ দিয়েছেন তিনি। কিন্তু তার জীবনচিত্র ঘাটলে করুণ চিত্র উঠে আসে। ভাঙনে ভাঙনে রাজা মিয়ার জীবন তছনছ। শেষ ঠাঁই হলো গুচ্ছগ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্পে। রাজা মিয়া আমাদের ছাড়তে চান না। খেয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু স্কুল শিক্ষক সবুজের ব্যবস্থাপনার কারণে রাজা মিয়ার বাড়িতে খাওয়া হলো না। তবে খুশি হয়েছি তার আন্তরিকতায়। দ্বীপের মানুষগুলোর জীবনের গভীরের গল্প কী? খুঁজতে থাকেন উপকূল বন্ধু। ঘুমানোর আগ পর্যন্ত এসব মানুষের সঙ্গে গল্প হয়েছে।

দ্বীপে থেকে ভোরের সূর্যটা দেখার খুব ইচ্ছে আমাদের। সে অনুযায়ী ভোরেই মেঘনার একদম কূলে পৌঁছি আমরা। কিন্তু আকাশের মুখ ভার। পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। সাহেবগঞ্জ ফিরি। সকালের নাস্তা সেরে স্থানীয়দের সঙ্গে গল্পের আসর বেশ চাঙ্গাভাবে চলছিল। এরই মাঝে বৃষ্টি। বৃষ্টি থামলে সাহেবগঞ্জ বাজার কিল্লা থেকে সোজা উত্তর দিকে হাঁটি। সামনে যত হাঁটি, গল্প তত ভারি হয়। যার সঙ্গে দেখা, তার সঙ্গেই গল্প। গল্প করেছি দ্বীপের পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের সঙ্গে। ওরা বললো, ‘শুষ্ক মৌসুমে ক্ষেত দিয়ে হেঁটে আমরা স্কুলে যেতে পারি। কিন্তু বর্ষা এলে আমরা ঠিকমতো স্কুলে যেতে পারি না। স্কুলে যাওয়ার রাস্তাগুলো ভাঙা। স্কুলে যাওয়ার বেশি প্রয়োজন হলে নৌকা দিয়ে যাই। এছাড়া কোনো উপায় খুঁজে পাই না।’

 



সামনে আরো একটু হাঁটি। সাহেবগঞ্জ বাজার থেকে আঁকাবাঁকা দেড় কিলোমিটার পথ হেঁটে পাড়ি দেওয়ার মুহূর্তে সামনে পড়লো একটি প্রাইমারি স্কুল। স্কুলে ঢুকেই আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গল্প শুরু করি। ওদের কাছে জানতে চাই দেশের গুরুত্বপূর্ণ ক’জন ব্যক্তির কথা। ওদের সাধারণ জ্ঞানের ভাণ্ডার দেখে বুঝা গেল, বহু প্রতিকূলতার মাঝে ওরে কিছু শেখে। প্রধান শিক্ষকের অফিসে পা রাখার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রবল ঝড় শুরু হয়। বাইরে তাকানো বেশ মুশকিল! প্রকৃতি তখন এতটাই ক্ষিপ্ত। এদিকে প্রধান শিক্ষক কাঁচা আম ঝাল দিয়ে বানিয়ে সামনে আনলেন। ভিন্ন স্বাদের আম মজা করেই খেলাম। বৃষ্টি থামলে ওদের সঙ্গে ছবিও তুললাম। এবার সোজা এক কিলোমিটার পথ হেঁটে সাহেবগঞ্জ বাজারে পা রাখি। বেলা বেড়ে তখন দুটো। বৃষ্টিস্নাত এ মুহূর্তে চলে আসি এমজেএসকেএসএনএম জুনিয়র উচ্চ বিদ্যালয়ে। স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক আনোয়ারুল আজিম সবুজের সঙ্গে গল্প চলছিল। কী অসম্ভব গল্প! যে কোনো উদ্যমী মানুষই যে দ্বীপে আলো ছড়ানোর জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত তার উজ্জ্বল উদাহরণ তিনি। নিজের প্রচেষ্টায় দ্বীপে প্রাথমিক শিক্ষার পর নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার খুঁটি স্থাপন করেছেন। এখন দ্বীপের ছেলেমেয়েরা দ্বীপে থেকেই সুশিক্ষা লাভ করছে।

দুপুরের খাওয়া শেষে দ্বীপ থেকে ফেরার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু আবহাওয়ার হিংস্র আচরণে দ্বীপ ফেরা হয়নি। এবার আমরা চলি সাহেবগঞ্জ বাজার থেকে উত্তর-পশ্চিমে। একটু দূরে এলে চোখে পড়ে জমে ওঠা মার্কেট। বয়স্ক মানুষের ভিড় বেশ জমজমাট। বেশিরভাগ নদীভাঙা মানুষ। কারো ছয়বার, কারো সাতবার, কারো আট, নয়, ভাঙা দিয়েছে নদী। নিঃস্ব এসব মানুষের সঙ্গে গল্প শেষে পিচ্ছিল পথ দিয়ে সামনে চলি। শেষ বিকেলের সূর্যটা যখন বেশ ক্লান্ত তখন কাঠের সেতু পেরিয়ে গুচ্ছগ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসতি গড়া মানুষের সঙ্গে গল্প করি। আশ্রয়ণ প্রকল্পের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কিছু অবকাঠামোর অভাব চোখে পড়েছে। বাসিন্দারা ভিড় জমান নোটবুকের পাতায় নিজের নাম বসাতে। সবার আশা যদি কোনো ত্রাণ মিলে। এ আশ্রয়ণ প্রকল্পে একটি ক্লাবঘর থাকলেও তা বন্ধ। আমরা ফিরি সাহেবগঞ্জের পথে। সূর্যটা যখন শেষ গন্তব্যে তখন আমরা পৌঁছি সাহেবগঞ্জ বাজারের পাশ ঘেঁষে চলা খাল পাড়ে। একে ছোট্ট নদীও বলা চলে। খেয়া চলে, মানুষরাও যাতায়াত করে এ খেয়ায়। এটিই তাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার মূল মাধ্যম। গ্রাম-বাংলার এক অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করি দুজন। শুধু আমরা দুজন নয়, ফেসবুক লাইভে উপকূলকে দেখানোর চেষ্টা করি দেশ-বিদেশে অবস্থানরত অনলাইন বন্ধুদের। কমেন্ট বক্সে অনেকেই কমেন্ট করে আনন্দ পাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করেন।

 



গত রাতের মতো ল্যাপটপ, ক্যামেরা, মুঠোফোনে চার্জ দিয়ে খাওয়া শেষে ঘুমাতে গেলাম। গত ভোরে সূর্যটা নদী তীরে দেখা হয়নি বলে আবারও ছুটে গিয়েছি। আগের মতো আকাশের বিষণ্নতা চোখে পড়লো। সূর্য যখন উপর উঠলো তখন আকাশের বিষণ্নতা কিছুটা দূর হলে সূর্যের সঙ্গে সখ্য গড়ি এবং ছবিও তুলি। এরপর তেলহীন পরোটা ডিম-আলু ভাজি দিয়ে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। গাভীর খাঁটি দুধ বলে দধি আর দুধ-চা পান করতে বাধা ছিল না। এবার দ্বীপ ছেড়ে আসার পালা। দ্বীপের মানুষগুলোর আন্তরিকতার কথা ভেবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয়। আকাশটাও বেশ পরিষ্কার তাই ফিরতে হবে। কিন্তু কোথায় সে আবু সরদার? যাকে প্রথমবার এসে দেখলাম, এখন তিনি কই? তার পূর্বে আশ্রয় নেওয়া তারেক মোল্লার বাড়ি থেকে নতুন আশ্রয় নেওয়া বাড়ি খুঁজি। ওখান থেকে আধ কিলোমিটার সরু খালের পাশ দিয়ে হাঁটতেই মিলেছে সে বাড়ি। বাড়িতে পৌঁছলে দূর দিকে তাকালে তাকে দেখি গরু চরানো নিয়ে ব্যস্ত তিনি। আমাদের দেখে দৌঁড়ে এলেন। ছোট্ট মেয়েকে সঙ্গ নিয়ে। খোঁজ নেই, কোথায় অন্যরা? এক কথায় বলে দিলেন, তারেক মোল্লা পরিবার নিয়ে ঢাকায় চলে গেছেন। আমার স্বজনরাও ঢাকায়। নিজের প্রিয়তমা স্ত্রী জীবিকার টানে অন্য ক্ষেতে ফসল সংগ্রহে ব্যস্ত। নদী তার কত বার যে বাড়ি-ঘর ভেঙেছে এর সঠিক হিসেব জানেন না আবু সরদার।

গল্পের ফাঁকে আবু সরদার শরীরের ঘাম গামছায় মোছেন। দুঃখভরা এসব গল্প বলেন। বলেন, আমাদের কোনো খোঁজ নেয় না কেউ। ঘড়ির কাঁটায় সময় গড়িয়ে সকাল সাড়ে দশটারও বেশি। এগারোটায় ট্রলার ছাড়বে মূল ভূ-খণ্ডের দিকে। আর দেরি নয়, আবু সরদার ও তার ছোট্ট মেয়েকে বিদায় দিয়ে এক কিলোমিটার পথ হেঁটে আমরা ট্রলার ধরি। ভাটার মাঝে অল্প সময়ে বাঁধাহীন নিরাপদ দূরত্বে ফিরি দ্বীপ হাইমচর থেকে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ ডিসেম্বর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC