ঢাকা     রোববার   ৩১ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৭ ১৪৩৩ || ১৫ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

জাতির বীরত্বগাথার ইতিহাস ময়মনসিংহের বধ্যভূমি-গণকবর

মাহমুদুল হাসান মিলন, ময়মনসিংহ  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:১১, ১৬ ডিসেম্বর ২০২২   আপডেট: ১০:২৬, ১৬ ডিসেম্বর ২০২২
জাতির বীরত্বগাথার ইতিহাস ময়মনসিংহের বধ্যভূমি-গণকবর

ময়মনসিংহ নগরীর থানার ঘাট এলাকার ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে বধ্যভূমি।

বাঙালি জাতির চিরমুক্তির বীরত্বগাথা ইতিহাসের স্বাক্ষী বধ্যভূমি-গণকবর। যা ছড়িয়ে আছে দেশের প্রায় সব জেলা-উপজেলায়। মুক্তিকামী মানুষের স্বাধীনতার এই ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে স্মরণীয় করে রাখতে এই সব বধ্যভূমি ও গণকবর জাতীয়ভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার এতো বছর পরেও ময়মনসিংহের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অধিকাংশ বধ্যভূমি এখনো অরক্ষতি রয়ে গেছে। যা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষজন। 

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ময়মনসিংহ নগরীসহ বিভিন্ন উপজেলায় অসংখ্য বধ্যভূমি ও গণকবর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। রয়েছে একাধিক যুদ্ধক্ষেত্র। এসবের কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে চিহিৃত করা হয়ছে আবার কোনোটি নামমাত্র সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে অনেক গণকবর, বধ্যভূমি ও যুদ্ধের ময়দান স্বাধীনতার দীর্ঘদিনেও সঠিকভাবে সংরক্ষণ দূরে থাক চিহিৃতও করা হয়নি।

আরো পড়ুন:

ময়মনসিংহ নগরীর সবচেয়ে আলোচিত একটি বধ্যভুমি ছোট বাজারে একটি পূরাতন কূপ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্থানীয় রাজাকার, আলবদরদের সহযোগিতায় পাকিস্থানি হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ক্যাম্পে ধরে এনে নির্যাতনের পর হত্যা করে এই কূপে লাশ ফেলে রাখতো। মুক্তিযুদ্ধে ময়মনসিংহে গণহত্যা ও নির্মম নির্যাতন, নিপীড়নের অন্যতম সাক্ষী ছিল ছোট বাজারের এই কূপটি। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫০ বছরেও এই কূপটি বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। উদ্যোগ নেওয়া হয়নি সংরক্ষণের। ফলে এখন সেখানে আর কূপের কোনো চিহৃও নেই। বিনা বাধায় আলোচিত এই বধ্যভূমিটি ভরাট করে তার ওপর বানানো একটি ব্যাংকের ভবন। 

মুক্তাগাছা পৌরসভার সামনে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভাস্কর্য ‘রক্তিম স্বাধীনতা।’

সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক সদস্য সচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা সেলিম সরকার রবার্ট আক্ষেপ করে বলেন, ‘নগরীর ছোটবাজারের এই কূপটি ছিলো এই অঞ্চলের মুক্তিকামী মানুষের আতংক। অনেক যন্ত্রণা ও নির্যাতনের স্বাক্ষী। অথচ ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে এই ইতিহাস মুছে ফেলতে অত্যন্ত কৌশলে স্বাধীনতা বিরোধীরা এখানে গড়ে তুলেছে বহুতল ভবন। ভয়াল স্মৃতির সেই কূপের চি‎হ্নটি চিরতরে মুছে ফেলা হয়েছে।’

মহানগরীর ডাক বাংলোর পেছনে, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেস্টহাউসের পেছনে, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন পার্কেও ছিল বধ্যভূমি। তৎকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাম্প ছিল বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাসহ মুক্তিকামী অনেক মানুষকে ধরে নিয়ে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখা হয়। 

সদর উপজেলার বোরোর চরসহ বেশ কয়েকটি যুদ্ধক্ষেত্র রয়েছে যেগুলো সংরক্ষণ দূরে থাক চিহ্নিতও করা হয়নি।

জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার জমিদারবাড়ীর পরিত্যক্ত কূপ যেখানে বহু মানুষকে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখা হয় সেটি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বর্তমানে সেখানে আর্মড ব্যাটালিয়নের সদর দপ্তরের গ্যারেজ নির্মাণ করা হয়েছে। 

মুক্তাগাছার শশা এলাকায় গণকবরে ১৪ জনের লাশ মাটি চাপা দেওয়া হয়। সেটিও অরক্ষিত অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে। 

এছাড়া মহেশপুর গণকবর, মানকোন, বিদোনবাড়ি মানকোন, দরিকৃষ্ণপুর, কাতলসার, শ্রীপুরমাইজহাটিসহ বিভিন্ন স্থানে ১৬টির বেশি বধ্যভূমি ও গণকবর স্থানীয়ভাবে চিহিৃত করা হলেও অধিকাংশই অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তাগাছার কয়েকটি স্থানে কয়েকটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। 

মুক্তাগাছার ভিটিবাড়ী, বটতলা বাজারসহ বেশ কয়েকটি যুদ্ধ ক্ষেত্র এখনও পর্যন্ত চিহ্নিত করা হয়নি।

বিনোদবাডিয়ানকোন বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ।

নান্দাইল উপজেলার মুশুল্লী ইউনিয়নের কালীগঞ্জ সেতু ও চন্ডীপাশা ইউনিয়নের বারুইগ্রাম মাদরাসা সংলগ্ন দুটি স্থানের বধ্যভূমি আজও চিহ্নিত করা হয়নি। অরক্ষিত রয়েছে গেছে বধ্যভূমি দুটি। নির্মাণ করা হয়নি কোন ধরনের স্মৃতিস্তম্ভ। ফলে ১৯৭১-এ পাক-বাহিনীর হাতে নৃশংসভাবে বহু বাঙালির শহীদ হওয়ার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে অজানাই রয়ে যাচ্ছে। 

মুজিব শতবর্ষকে উপলক্ষে করে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত এই বধ্যভূমিগুলো চিহ্নিতকরণসহ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য স্থানীয় বাসিন্দা, সুশীল সমাজ, মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবার প্রধানমন্ত্রীর নিকট জোর দাবি জানিয়েছেন। 

গফরগাঁও উপজেলায় ১১টি বধ্যভূমির মধ্যে শুধুমাত্র লঞ্চঘাটা বধ্যভূমিটিতে ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের অর্থায়নে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু এলাকাটি সংরক্ষিত হিসেবে ঘোষণা পায়নি। বাকি ১০টি বধ্যভূমি সংরক্ষণের কোনো ধরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি এখনো। অনাদরে পড়ে থাকা সেখানকার সুতার চাপর বাজার, নিগুয়ারী সাইদুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয় পাক বাহিনীর ক্যাম্প, প্রসাদপুর, ভারইল, কাওরাইদ-গয়েশপুর রেলব্রিজ, ফরচুঙ্গি-শিলা রেলব্রিজ, রসুলপুর, পৌর শহরের ইমামবাড়া, বারইগাঁও ও গন্ডগ্রাম বধ্যভূমিগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। 

মুক্তিযুদ্ধের সময় অসংখ্য মানুষকে এসব স্থানে ধরে এনে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ মাটিচাপা দিয়ে রাখা হতো। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব বধ্যভূমিতে মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে অসংখ্য মানুষের মাথার খুলি ও হাড় উদ্ধার করা হয়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসব বধ্যভূমি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। কোনটি আবার তলিয়ে যাচ্ছে নদীতে। কোনটি এখনো পর্যন্ত চিহ্নিতই করা হয়নি।

ফুলবাড়িয়া উপজেলায় ১২টি বধ্যভূমি অরক্ষিত রয়েছে। সেখানকার ভালুকজান নদীর পাড়ে কমপক্ষে অর্ধশতাধিক নিরীহ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে নদীতে লাশ ফেলে দেয় পাক বাহিনী। সেখানে ব্রিজ সংলগ্ন বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হলেও সেটি অরক্ষিত। 
উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া, লক্ষ্মীপুরসহ একাধিক আলোচিত যুদ্ধক্ষেত্র রয়ে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে।

সীমান্ত উপজেলা হালুয়াঘাটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি বধ্যভূমি ও গণকবর। ভূবনকুড়া ইউনিয়নে ঐতিহাসিক তেলি খালী যুদ্ধের ময়দানে স্মৃতিস্তম্ব নির্মান ও সংরক্ষণ করা হয়েছে। এদিকে গাঙ্গিনা নদীর পাড় ঘেষাঁ জসংলগ্ন স্থানে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘটেছিল নৃশংস গণহত্যা। সেখানে অনেককেই ধরে এনে হত্যা করে লাশ ফেলে দেওয়া হতো। জেলা পরিষদের উদ্যোগে ২০১১ সালে সেখানে ‘বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণ করা হলেও নেই যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ। সেখানে রয়েছে আরও বেশ কয়েকটি যুদ্ধক্ষেত্র যেগুলো আজও চিহ্নিত করা হয়নি। 

তারাকান্দা উপজেলার দাদরা এলাকাসহ কয়েকটি গ্রামে একাধিক বধ্যভূমি ও গণকবর সংরক্ষণে কোনো ধরণের উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি। গৌরীপুর, ভালুকা, ত্রিশাল ও ঈশ্বরগঞ্জসহ প্রত্যেকটি উপজেলাতেই একাধিক করে গণকবর ও বধ্যভূমি অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে।

মুক্তাগাছার কাতন্ত্রসার গ্রামের কয়াবিলে নির্মিত বড়গ্রাম বধ্যভূমি স্মৃতি স্তম্ভ ।

ময়মনসিংহের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘জনউদ্যোগ’ এর আহবায়ক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম চুন্নু বলেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে কেউ শুনেছে আবার কেউবা বইয়ে পড়েছে। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিকামী জনতার অতুলনীয় ত্যাগ, নির্যাতন ও বীরত্বগাথা ইতিহাসের স্বাক্ষী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দেশের সব জেলা-উপজেলায়। শুধু সঠিক সংরক্ষণের অভাবে কালের বিবর্তনে এই সব স্মৃতি চিহ্ন নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম চাক্ষুসভাবে স্মরণীয় করে রাখতে এই সব ঐতিহাসিক স্থান, বধ্যভূমি ও গণকবর সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ।’ 

ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজার রহমান বলেন, ‘জেলার ১৩টি উপজেলায় যেসব স্থানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের স্বাক্ষ্য রয়েছে পর্যাক্রমে সবগুলো স্থান চিহ্নিত করে তা সংরক্ষণ করা হবে।’

মাসুদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়