মায়ের মতো ভালো মানুষ আর কেউ নেই
ইফতেখার রবিন || রাইজিংবিডি.কম
মা, ছোটবেলা থেকেই তোমাকে আমি কত যে কষ্ট দিয়েছি, তার কোনো হিসাব নেই। স্কুলে যেতে চাইতাম না, অকারণে জেদ করতাম, রাগ দেখাতাম, যা চাইতাম, তা না পেলে ঘর মাথায় তুলে ফেলতাম। অথচ তুমি কখনো আমাকে ছেড়ে যাওনি। বুকের গভীরে যত্ন করে আগলে রেখেছো বলেই আজ আমি ঢাকায় এসে পড়াশোনা করার সাহস পেয়েছি। তবু আমি তোমার ভালো ছেলে ছিলাম।
ঘর গুছিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে অনেক কাজই তোমার পাশে দাঁড়িয়ে করেছি। এখনো বাড়িতে গেলে করি। এসব ছোট ছোট কাজে তুমি যে কতটা খুশি হতে, তা ভাষায় কাউকে বোঝাতে পারব না। তোমার মুখের সেই শান্ত হাসিটুকুই ছিল আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। কিন্তু মা, যেদিন প্রথম তোমাদের ছেড়ে ঢাকায় এলাম, সেদিনই বুঝেছিলাম—তোমাদের ছাড়া আমি কতটা অসহায়। আমার সব জেদ, রাগ, অভিমান যেন এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে যেতে লাগল। কারণ সেগুলো করার মতো তোমার মতো মানুষ আর কোথাও পেলাম না। পৃথিবীতে তোমার মতো করে কেউ কোনোদিন আমাকে ভালোবাসেনি, মা।
যখন বাড়িতে যাই, তোমার আদর যেন শতগুণ বেড়ে যায়। নিজের হাতে খাইয়ে দাও, পাশে শুইয়ে রাখো, ছোটবেলার মতো বুকের কাছে টেনে ঘুম পাড়িয়ে দাও। ঢাকা আসার পর এমন একটা রাতও কাটেনি, যেদিন তোমাকে মনে পড়েনি। প্রতিটি রাতের স্বপ্নে আমি তোমাকেই ডাকি।
তোমাকে নিয়ে বলতে গেলে আমার কথা কখনোই শেষ হবে না, মা। কখনো কখনো মনে হয়, তোমাকে নিয়ে একটা আস্ত উপন্যাস লিখি। সেখানে তোমার সমস্ত ত্যাগ, ভালোবাসা আর নিঃস্বার্থ মমতার গল্প লিখে রাখব।
এই তো সেদিনের কথা—ঈদের ছুটিতে বাড়ি গেলাম। ঈদের পর আমার জীবনে বড় একটি দুর্ঘটনা ঘটে গেল। সেদিন তুমি বাড়িতে ছিলে না। খবর পেয়ে যখন ছুটে এলে, তোমার কান্নাভেজা মুখ দেখে আমি নিজেকেই আর সামলাতে পারিনি। সেই ঘটনার কথা মনে পড়লে এখনো তুমি ভেতরে ভেতরে কষ্ট পাও, আমি বুঝি। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে বড় কোনো ক্ষতি হয়নি। হয়তো শুধু তোমার দোয়া আর ভালোবাসার কারণেই আমি সুস্থ আছি।
কয়েকদিন আগে আবার ঢাকায় চলে এলাম। দীর্ঘ দুইটা মাস তোমার কাছে ছিলাম। প্রতিদিন নিজের হাতে খাইয়ে দিয়েছো, যত্ন করে গোসল করিয়ে দিয়েছো, ছোট শিশুর মতো বুকের কাছে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছো। এই স্মৃতিগুলো ভুলে থাকা যায় না মা, খুব বেশি মনে পড়ে।
ঢাকায় ফেরার তিন দিন আগে থেকেই বুকের ভেতর কষ্ট জমতে থাকে। মনে হয়, তোমাকে ছাড়া এত দূরে গিয়ে আমি কীভাবে থাকব! কত কিছু যে ভাবি। তবু থাকতে হয়, জীবনের প্রয়োজনেই তোমাদের ছেড়ে দূরে থাকতে হয়। কিন্তু বিশ্বাস করো মা, প্রতিটি মুহূর্তে আমি তোমাকে ভীষণভাবে মিস করি। তোমাকে হয়তো অনেক কষ্ট দিয়েছি, ভালো ছেলে হতে পারিনি পুরোপুরি। তবু তুমি সবাইকে বলো—“আমার ছেলে খুব ভালো।” এই পৃথিবীতে তোমার মতো ভালো মানুষ আর কেউ নেই মা।
তোমার ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না। পৃথিবীর সব ভালোবাসা এক পাশে রাখলেও তোমার মমতার কাছে তা খুব ছোট মনে হয়। তুমি নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে আমাদের হাসি কিনে দিয়েছো। নিজের কষ্ট লুকিয়ে রেখে আমাদের স্বপ্ন পূরণ করেছো। হয়তো অনেক সময় তোমার সেই ত্যাগগুলো আমরা বুঝতেই পারিনি।
ঢাকার ব্যস্ত শহরে হাজার মানুষের ভিড়ের মাঝেও আমি প্রায়ই একা হয়ে যাই। তখন খুব মনে পড়ে তোমার কথা। মনে পড়ে তোমার সেই ডাক, তোমার হাতের রান্না, তোমার পাশে বসে গল্প করার মুহূর্তগুলো। রাত গভীর হলে মনে হয়, এখন যদি তোমার পাশে গিয়ে একটু বসতে পারতাম! তোমার কোলের কাছে মাথা রেখে সব ক্লান্তি ভুলে থাকতে পারতাম!
মা, তুমি জানো না—তোমার একটা ফোনকল আমার কত বড় সাহস। তুমি যখন বলো, “নিজের খেয়াল রেখো বাবা।” তখন মনে হয়, পৃথিবীর সব শক্তি যেন আবার ফিরে পাই। তোমার দোয়া আছে বলেই হয়তো এত দূরে থেকেও এখনো টিকে আছি।
অনেক সময় তোমার সাথে রাগ করে কথা বলিনি, অভিমান করেছি। কিন্তু দিন শেষে বুঝেছি, আমার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় তুমি। তোমার মতো করে আমার কষ্ট কেউ বুঝতে পারে না। আমি চুপ থাকলেও তুমি বুঝে যাও আমার মন খারাপ কি না! এই পৃথিবীতে মায়ের মতো আপন আর কেউ হয় না।
আমি জানি না, ভবিষ্যতে কত বড় মানুষ হতে পারব। কিন্তু একটা স্বপ্ন সবসময় দেখি—একদিন তোমার সব কষ্ট দূর করব। তোমার মুখে শান্তির হাসি ফুটিয়ে তুলব। তুমি আর কোনো চিন্তা করবে না, শুধু শান্তিতে থাকবে। কারণ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া হলো—তুমি ভালো থাকো।
মা, যদি কোনোদিন তোমাকে কষ্ট দিয়ে থাকি, আমাকে ক্ষমা করে দিও। তোমার অবাধ্য ছেলে হয়তো অনেক ভুল করেছে, কিন্তু তোমাকে ভালোবাসার জায়গাটায় কখনো কোনো কমতি ছিল না। তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আশ্রয়, সবচেয়ে বড় ভালোবাসা।
আমি সবসময় আল্লাহর কাছে তোমার জন্য দোয়া করি। আল্লাহ যেন তোমাকে দীর্ঘ হায়াত দেন, যেন তোমার মনের সব আশা আমি পূরণ করতে পারি। তোমার মুখে শান্তির হাসি দেখতে চাই, মা। তুমি শুধু আমার জন্য বেঁচে থেকো। তোমার জন্য আমি সবকিছু করতে চাই। ভালো থেকো মা। আমার জন্য দোয়া করো সবসময়।
লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
ঢাকা কলেজ, ঢাকা
ঢাকা/শান্ত