ঢাকা     রোববার   ১০ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ২৭ ১৪৩৩ || ২৩ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

রহস্যময়ী এক নারী, মা

সামিয়া তাসনীম স্বাতী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:৩০, ১০ মে ২০২৬   আপডেট: ১৮:০৯, ১০ মে ২০২৬
রহস্যময়ী এক নারী, মা

আম্মার দিকে তাকাই।
আমার হঠাৎ মনে হয়, আম্মা আসলে পুরোনো বাড়ির মধ্যে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা স্তম্ভগুলোর মতন, যেগুলো আহামরি ঘটা করে আমাদের চোখে পড়ে না কখনো; অথচ তার বুকের ওপর ভর দিয়েই পুরো ছাদটা বছরের পর বছর দাঁড়িয়ে থাকে একভাবে। মানুষজন ঘরের রং দেখে, আসবাব দেখে, সৌন্দর্য দেখে—কিন্তু ভিতরের চাপ বইতে থাকা স্তম্ভগুলোর ফাটল কেউ আর দেখে না। আম্মাও ঠিক তেমন। সংসারের প্রতিটা ভাঙন, প্রতিটা অভাব, প্রতিটা আতঙ্ক নিজের ভেতরে এমন সুনিপুণভাবে লুকিয়ে রাখেন যেন, ঘরের বাতাসটুকুও সে কথা টের না পায়।

আম্মার দিকে তাকাই।
আমার হঠাৎ নদী কিংবা সমুদ্রের কথা মনে পড়ে। নদীরও একসময় শুকিয়ে যাওয়ার অধিকার থাকে, কিন্তু মায়েদের বোধহয় সেই অধিকারটুকুও নেই। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, অসংখ্য মানুষের ক্লান্তি, রাগ, অভিমান, অবহেলা—সব নিজের ভেতরে জমা রাখার পরও সে বিস্ময়করভাবে বিশালই থাকেন। ঢেউ ভাঙে, জলোচ্ছ্বাস নামে, তবু সমুদ্র যেমন তার গভীরতা হারায় না, আম্মাও বুঝি তেমনই এক অতল বিস্তার।

আরো পড়ুন:

আম্মার দিকে তাকাই।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠাহর হয়, মায়েরা আসলে একেকটা পুরোনো ঘড়ির মতন। দেওয়ালের এক কোণায় ঝুলে থেকে সারাটা জীবন কেবল সময় দিয়ে যায়। কাঁটা ক্ষয়ে যায়, শব্দ কমে আসে, রং মলিন হয়, তবু থামে না। কেউ যত্ন করে কখনো বলে না, “তোমারও তো বিশ্রাম লাগে।” কেউ বিস্ময় নিয়ে কখনো খেয়াল করে না, কতদিন ওই ঘড়িটার ভেতরের স্প্রিংটা ক্লান্তিতে কেঁপে উঠেছে একা একাই!

আম্মার দিকে তাকাই।
মাঝে মাঝে ভাবি, খোদা মায়েদের সৃষ্টি করার সময় কিছু রহস্যও বুঝি গুঁজে দেন তার অগোচরে। এমনই রহস্য, যে তার জ্বর আসলেও রান্নাঘরের আগুন নেভে না। তার মাথা ধরলেও কাপড় ধোয়া বন্ধ হয় না। তার মন খারাপের দিনেও তিনবেলা টেবিল জুড়ে খাবার সাজানোতে ব্যাঘাত ঘটে না। আম্মা যেন মানুষ না, সে যেন সংসারের সঙ্গে আটকানো কোনো অলৌকিক নিয়ম; যে নিয়ম ভাঙা নিষেধ, কড়া নিষেধ!

আম্মার দিকে তাকাই।
মাঝে মধ্যে গভীর রাতে ঘুম ভাঙলে দেখি, পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে গেছে, শুধু মায়েরা জেগে আছে। কেউ সন্তানের জ্বর মাপছে, কেউ জামার ছেঁড়া অংশে সুঁই চালাচ্ছে, কেউ চাল-ডাল হিসাব করতে করতে ভাবছে মাসটা কীভাবে শেষ হবে। তার হাত দু’টোর দিকে তাকালে আমার হঠাৎ পুরোনো একটা বটগাছের শেকড়ের কথা মনে পড়ে। বাইরে থেকে রুক্ষ লাগে, শক্ত লাগে। কিন্তু ওই শেকড় ছাড়া গাছটা একদিনও দাঁড়িয়ে থাকতে পারতো না। তার হাত দু’খানিও তেমন। কতবার আগুনে পুড়লো, কতবার ছুরিতে কাটলো, কতবার থালা ধুতে ধুতে চামড়া উঠে গেল—হিসাব নেই। তবু সেই হাতেই মাথায় তেল পড়ে, সেই হাতেই জলপট্টি চেপে বসে থাকে কতশতবার।

আম্মার দিকে তাকাই। 
তার চোখের নিচে কালো দাগ, চুলের ফাঁকে হঠাৎ সাদা হয়ে যাওয়া কতগুলো রেখা, নিঃশ্বাসের গায়ে জমে থাকা ক্লান্তি, এসব কখনো খেয়াল করা হয় না সময় করে। তয় আজকাল খুব ভয় হয় বুঝলা, হুট করে একদিন হয়তো ঘরে ফিরে আর তোমার কাশির শব্দটা শুনতে পাবো না। রান্নাঘর থেকে ‘খাইয়া নিস’ ডাকটাও কানে এসে বিরক্ত করবে না। অভিমান করে দরজা বন্ধ রাখলে কেউ বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবে না। জ্বরের ঘোরে আর দেখতে পাবো না কেউ পাগলের মতন খোদার কাছে জায়নামাজ বিছিয়ে দোয়া পড়ছে। বুঝি পুরো পৃথিবী ভর্তি মানুষ থাকলেও তখন এই যত্নে আগলে রাখা আশ্রয়টা আর হাতড়ে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। তুমি থাকবে না, এমন বিষাক্ত দিনরাত্রি সব পালিয়ে থাকুক আজীবন, অনন্তকাল!

আম্মার দিকে তাকাই।
তারে দেখলে আমার মাঝে মাঝে শীতের সকালের কথা মনে পড়ে। সেই যে ভোরবেলা উঠোনে শিশির পড়ে থাকে—নিঃশব্দ, ঠান্ডা, স্বচ্ছ! আম্মাও ঠিক তেমন। নিঃশব্দ, ঠান্ডা, স্বচ্ছ এক রহস্যময়ী নারী!

লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার

ঢাকা/শান্ত

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়