ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৯ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

অতিপ্রাকৃত গল্প || খাতা

আফসানা বেগম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-২৯ ২:১৩:৩৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১০-২৯ ২:৩১:৪৫ পিএম
অলঙ্করণ : মামুন হোসাইন

|| আফসানা বেগম ||

বাসের সবচেয়ে পেছনের সিটটাতে আমার কখনো বসতে ইচ্ছে করে না। আমার ধারণা, নিতান্ত বাধ্য না-হলে কেউ ওই সিটে বসে না। ওখানে একটা গুমোট ভাব লেগেই থাকে। তাছাড়া, ঝাঁকিতে কোমর ব্যথা হয়ে যায়। রাস্তায় তো আর গর্তের অভাব নেই! অথচ হাঁটতে হাঁটতে শরীরে যখন আর দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি ছিল না, ওদিকে দুপুরের চড়া রোদে মাথা বনবন করছিল, তখনই ছয় নম্বর বাসটা যাত্রী নামাবার জন্য আমার পাশে এসে দাঁড়াল। একজন নেমে গেলে আমি উঠলাম। উঠে দেখি প্রত্যেকটা সিটে যাত্রী বসে আছে, কেবল শেষ মাথার ওই লম্বা সিটটা ফাঁকা। আমি তখন একটা কোথাও বসতে পারলেই বাঁচি। কী আর করা, ধীরে ধীরে হেঁটে পেছনে চলে গেলাম। গিয়ে যেই বসতে যাব, দেখি সিটের উপরে এক বড়সড়ো খাতা। উপরে শক্ত কভারওলা, ধারে কাপড় দিয়ে বাঁধাই করা সাদা-লাল খাতা, ঠিক যেমনটা মুদির দোকানে হিসাব লেখার কাজে ব্যবহার হতে দেখেছি। খাতাটা হাতে নিয়ে আমার মনে হলো, একটু আগে যে লোকটা বাস থেকে নেমে গেল, এ খাতা তারই হবে। সে নিশ্চয় এই সিটে বসেছিল কারণ ওটা ছাড়া প্রত্যেকটা সিট কারো না-কারো দখলে। তাহলে এই সিট ছাড়া সে আর বসেছিলটা কোথায়? নিশ্চিত হতেই সামান্য উঠে আমি সামনের সিটের জানালার দিকে ঝুঁকলাম। ভাবলাম জানালা দিয়ে খাতাটা তার দিকে ছুঁড়ে দেব। কিন্তু সেদিকে কাউকেই দেখতে পেলাম না। মনটা অস্থির হয়ে থাকল। বাস ততক্ষণে ছেড়ে দিয়েছে আর বেশ খানিকটা চলেও গেছে। এদিক-ওদিকের জানালায় আমার চোখ দ্রুত ঘুরতে লাগল। নাহ্, পেছনে কেউই ছুটে আসছে না।

খাতাটা কোলের উপরে নিয়ে আমি সিটে বসে থাকলাম। বাস দ্রুত ছুটছে তখন। খাতার উপরের কভারটার দিকে তাকিয়ে আমার মনটা খচখচ করতে থাকল। লোকটা হিসাবনিকাশ হারিয়ে নিশ্চয় ভুগবে কিছুদিন। অথচ বাস থেকে নেমে অনেক দূর চলে যাবার পরেও খাতাটার কথা তার একবারও মনে পড়েনি। আমারইবা কী দোষ! আমি তো জানালা দিয়ে তাকে খুঁজেছিলামই। কিন্তু পরে মনে হলো চিৎকার করে ড্রাইভার বা হেলপারকে ডাকতে পারতাম, বাসের ছাদে বাড়ি মেরে বাসটা একটু থামাতেও বলতে পারতাম। বাস থামলে নেমে গিয়ে লোকটাকে খুঁজে খাতাটা দিয়ে আসা কী আর এমন কঠিন হতো। এসব ভাবনা আসার পরে মনটা আরো বেশি খুঁতখুঁত করতে লাগল। সামনের সিটের এক লোকের হাতে খাতাটা সামান্য ছুঁইয়ে বললাম, ‘এই যে ভাই, একটু আগে যিনি বাস থেকে নেমে গেলেন তিনি মনে হয় এই খাতাটা ফেলে গেছেন। কী করি বলেন তো?’ বুঝতে পারিনি লোকটা ঝিমাচ্ছিল। খাতার ছোঁয়ায় সামান্য চোখ খুলেই ‘ও’ বলে গভীরভাবে ঘুমিয়ে পড়ল। বৃষ্টি শেষের পরে জানালা দিয়ে আসা ঝিরিঝিরি বাতাস ঘুমানোর পক্ষে সুবিধাজনক বটে।

অন্যের জিনিস ফিরিয়ে না দিয়ে কোলের উপরে আগলে বসে থাকা এক যন্ত্রণা। আমি খাতাটা পাশে খালি সিটের উপরে রাখলাম। অথচ মনে হতে লাগল যা আমার পাবার কথা তা যেন অন্য কারো উদ্দেশ্যে বিলিয়ে দিতে চাচ্ছি। পরে কেউ যদি খাতাটা ফেলে দিয়ে নষ্ট করে ফেলে? কিংবা কেউই আমার মতো নিজের কোলে একে উঠিয়ে না নেয়? কেবল ফেলে রেখে যেতে যেতে একদিন পাতা ছিঁড়ে, বিবর্ণ হতে হতে... ভাবতে ভাবতে নিজের মনেই হাসলাম। একটা সাধারণ খাতা হঠাৎ করে আমার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল কেন! যাহোক, কারো হাতে খাতাটাকে ছাড়তে ইচ্ছে করছিল না। আবারো তাই সিট থেকে হাতে তুলে নিলাম। কভার উলটে ভিতরের প্রথম পাতায় দেখলাম লেখা, নাম:       ঠিকানা: ছয় নম্বর বাস।

চমকে উঠলাম! নামের জায়গা ফাঁকা আর ঠিকানা ছয় নম্বর বাস, এসবের মানে কী? এই খাতা কি তাহলে এই বাসেরই কারো? সামনে ড্রাইভার আর হেলপারের দিকে তাকালাম। ওদেরই কারো হবে হয়তো। আর আমি এতক্ষণ কত কী-না ভাবছিলাম। ওদের দিকে তাকাতেই বাসটা থামল। থামতেই হুড়মুড় করে একগাদা মানুষ উঠে গেল বাসে। পেছনের সিটে তখন একদিকে সেঁটে বসতে হলো আমাকে। খাতাটা বুকের কাছে চেপে ধরলাম। সিটের উপরে আর জায়গা নেই তখন। দুই সারির মাঝখানে এত মানুষ উঠে দাঁড়াল যে তখন সামনে কিছু দেখা যায় না। হেলপারকে যে ইশারায় খাতাটা দেখিয়ে  কিছু জিজ্ঞাসা করব, তাও হলো না। গুটিশুটি হয়ে বসা অবস্থায় কোনোরকমে সামনের পাতা উলটালাম...

‘বাসের পেছনের সিটে বসে আছি ঝাঁকিতে প্রাণ যায় যায় অবস্থা প্রতিবার ঝাঁকির পরে পাশের লোকটা আমার দিকে আরেকটু এগিয়ে আসছে মনে হচ্ছে কিছুক্ষণ পরে সে আমার গায়ের উপরে উঠে আসবে দুই সারির মাঝখানে প্রচুর লোক দাঁড়িয়ে আছে তারা খামোখাই হাত দিয়ে শক্ত করে এদিক-ওদিকের রড ধরে ঝোলার ভঙ্গি করছে ভিড় এত বেশি যে রড ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও পড়ে যাওয়া সম্ভব না চারদিকের চাপে তাকে দাঁড়িয়েই থাকতে হবে এরকম অবস্থায় পেছনের সিটে সিট পাওয়াতে আমি হয়ত ভাগ্যবান কিন্তু এই খাতাটা ভালোমতো খুলে পড়ার মতো অবস্থা নেই, সামান্য একটুখানি খোলার মতো ফাঁক করে পড়তে হচ্ছে।’

চমৎকার হাতের লেখা। টানা টানা। কোনো কাটাকাটি নেই। কলমের কালি নীল, আমার প্রিয়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো হাতের লেখা যেন আমার। আর ঠিক আমার ওই মুহূর্তের বর্ণনা। মানে, খাতায় যা লেখা আছে সেই মুহূর্তে সেটাই ঘটছে আমার সঙ্গে। পাশের লোকটি কোলে চড়ে বসল বলে! খাতাটা সত্যি পুরোপুরি খুলতে পারলাম না। সামান্য ফাঁক করে পড়ার চেষ্টা করছিলাম। পাশের লোকটা তীর্যক দৃষ্টিতে দু’একবার খাতার ভিতরের দিকে লক্ষ্য করার চেষ্টা করেছে। সে তাকালেই আমি বন্ধ করে ফেলেছি। এটা কেন করলাম জানি না। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো হাতের লেখাটা একেবারে আমার হাতের লেখার মতো। একবার একজন বলেছিল ঠিক আমার মতো চেহারার একজন লোককে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখেছে। তারপর বহুদিন রাস্তায় রাস্তায় আমি সেই লোকটিকে খুঁজতাম। ঠিক আমার মতো দেখতে একটা লোককে দেখলে আমার আসলে কেমন লাগবে? বহুদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়েও আমি আমার মতো দেখতে সেই লোকটির কথা ভেবেছি। তাকে দেখলে কি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকার মতো অনুভূতি হবে আমার? কিন্তু কী আশ্চর্য, এই খাতার হাতের লেখা দেখে আমার ঠিক তেমনই এক অনুভূতি হচ্ছে; যেন আমিই আমার সামনে দাঁড়িয়ে। নিজের হাতের লেখায় নিজেরই কথা লিখে রেখেছি। সুযোগ বুঝে পাশের লোকটিকে আড়াল করে পড়তে লাগলাম...

‘ছোটোবেলার কথা আমার প্রায়ই মনে পড়ে বিশেষ করে যখন ছোট কোনো ছেলেকে মায়ের হাত ধরে রাস্তা পার হতে দেখি ছোটবেলায় মা আমাকে হাত ধরে কয়েকবার রাস্তা পার করে দিয়েছিলেন মা হ্যাঁচকা টানে হাত না ধরলে একবার নির্ঘাত বাসের নিচে পাড়তাম, সেই স্মৃতিটা ভাবলে এখনো গায়ে কাঁটা দেয় আমার নিজের ছোটবেলার চেহারা পরিষ্কার করে মনে পড়ে না তবে মায়ের মুখটা ঠিকঠাক মনে পড়ে মা তখন প্রায় তরুণী, বাড়াবাড়ি ধরনের রঙিন কাপড় পরেন নিজের কথা ভাবার জন্য মাথার উপরে জোর দিলে যা মনে পড়ে তা হলো সেই বয়সের বেশ কিছু ছবি; বাড়ির দেয়ালে টাঙানো তিনটা আর হলদে হয়ে যাওয়া কোণের দিকে ছেঁড়া একটা অ্যালবামে গোটা বিশেক স্থির সেই ছবিগুলোর বাইরে নিজের কার্যকলাপের কোনো প্রমাণ আমি নিজের মাথার ভিতরে খুঁজে পাই না ছবিগুলো কেবল কিছু ঘটনা... কিন্তু নিজের সেই চেহারাটা সামনাসামনি আরেকবার ভালোমতো দেখতে পারলে বেশ হতো।’ 

পড়তে পড়তে অবাক হলাম। খুবই অদ্ভুত ব্যাপার তো! একেবারে আমারই কথা। আমার মনের কথা কিংবা মন থেকে উঠে আসা কথা। মায়ের সেই চেহারা আমি কল্পনা করলেই পেয়ে যাই, কিন্তু নিজেরটা হারিয়ে যায়, কিছুতেই চিন্তার মধ্যে পুরো অবয়বটা তৈরি হয়ে ওঠে না। ভাবতে ভাবতে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল হঠাৎ। পাশের লোকটি তাতে আমার দিকে কিছুটা আকৃষ্ট হলো। খাতার দিকে তাকাল। আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে খাতার শেষ লাইনটা মনে মনে আওড়ালাম- ‘নিজের চেহারাটা সামনাসামনি আরেকবার ভালোমতো দেখতে পারলে বেশ হতো।’

লোকটা তাকিয়ে আছে দেখে খাতাটা আর খুললাম না। জিরিয়ে নেবার মতো ভঙ্গি করে সামনের দিকে তাকালাম। একের পাশে আরেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। বাসের দুলুনির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাদের পিঠ আর কোমর দুলছে। সেইসমস্ত শরীর আর উঠে থাকা হাতের ফাঁকফোকর দিয়ে সামনের দিক থেকে দ্বিতীয় সারিতে বসে থাকা ছোট একটা ছেলের দিকে নজর গেল আমার। খাড়া চুল, চুলের নিচে চেক শার্টের কলার। ছোটবেলায় আমার ঠিক ওরকম একটা চেক শার্ট ছিল। নীল আর সাদায় চেক, বর্গক্ষেত্রগুলোর মাঝখান দিয়ে সরু একটা করে লাল স্ট্রাইপ। দেখলাম ছেলেটা এদিক ওদিক ঘাড় ঘোরাচ্ছে। কখনো তার কপাল, কখনো একদিকের চোখ, কখনো আবার তার নাকটা দেখতে পেলাম। কখনো মনে হলো এই বুঝি মুখটা দেখতে পারব, ঠিক তখনই দাঁড়িয়ে থাকা কারো হাত বা পিঠের কারণে সে ঢাকা পড়ে গেল। চেষ্টা করতে করতে ছাড়াছাড়াভাবে তার মুখের আদলটা আমার সামনে ভেসে উঠল। পুরোপুরি দেখতে না দেখতেই ধরে ফেললাম, এ কী, এ তো আমি! এ তো বারো বছর বয়সের আমি! চমকে কেন যেন খাতাটা চোখের সামনে মেলে ধরলাম...

‘নিজেকে আরেকবার দেখতে পারলে বেশ হতো, ভাবতে না ভাবতেই দেখি বাসের সামনের দিক থেকে দ্বিতীয় সিটে বারো বছর বয়সের আমি বসে আছি!’

বিস্ময়ে কেঁপে উঠে আমার হাত থেকে খাতাটা পায়ের কাছে পড়ে গেল। চলন্ত বাসের ঝাঁকিতে তা সিটের পেছনের দিকে চলে গেল খানিকটা। ওইটুকু জায়গার মধ্যে নিচু হয়ে সেটা তুলে নেয়া কঠিন। তবু আমি তাই করলাম। নিজের দুই হাঁটুর মধ্যে দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে কী করে যেন সিটের নিচ থেকে খাতাটাকে বের করে আনলাম। কিন্তু হাতে নিয়ে সোজা হয়ে বসতেই দেখলাম বাস থেমেছে আর বাচ্চা সেই ছেলেটা, মানে আমার বারো বছর বয়সের মতো হুবহু দেখতে ছেলেটা বাস থেকে নেমে যাচ্ছে। খাতা হাতে লাফিয়ে উঠলাম। পাশের লোকটির অস্তিত্ব সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে হুড়মুড় করে দুই সারির মাঝখানের দিকে যেতে লাগলাম। লোকটি আকস্মিক চিৎকার করে উঠল। সম্ভবত আমার পা তার পায়ের উপরে উঠে বিশ্রীভাবে পিষে দিয়েছে। সেদিকে দ্বিতীয়বার ফিরে না তাকিয়ে আমি দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোকে ঠেলা-ধাক্কা দিতে দিতে দরজার কাছে পৌঁছে গেলাম। মুখে জোরে জোরে বলতে লাগলাম, ‘আমি নামব, আমি নামব, দাঁড়ান একটু।’ লোকগুলো ধাক্কা খেয়ে বিরক্ত হলো। টানাটানিতে আমার গায়ের শার্টের কোনো দিকে প্যারপ্যার শব্দে ফেঁসে গেল। কিছুই তবু আমাকে থামাতে পারল না। এক লোক রেগে গিয়ে বলল, ‘আপনে আগে জানতেন না যে রামপুরা টিভি সেন্টারের সামনে নামতে হইব আপনার? ওই ঘুপচির মইধ্যে ঢুইকা বইসা রইছিলেন কোন দুঃখে?’ পেছনের সিটের পাশে বসা সেই লোকটি আর্তনাদ করে বলল, ‘আরে ভাই, আমার পায়ের পাতা তো ডইলা ভাইঙা দিয়া গেছে মুনে হয়। লোকটা পাগল নাকি কে জানে, এতক্ষণ একটা সাদা খাতার ভিতরে লুকায়ে লুকায়ে কী জানি পড়তেছিল। বিশ্বাস করেন, খাতার মইধ্যে কিছুই ল্যাখা নাই।’

আমি ততক্ষণে বাসের দরজার কাছে পৌঁছে গেলাম। পেছনের লোকটার অদ্ভুত কথার দিকে মনোযোগ দেয়ার সময় নেই তখন আমার। হেলপারের হাতে ভাড়াটা গুঁজে দিয়ে হুড়মুড় করে বাস থেকে নামলাম। দ্রুতচোখে এদিক-ওদিক তাকালাম, কাছেধারে কোথাও ছেলেটাকে দেখতে পেলাম না। অতটুকু ছেলে আর সঙ্গে কেউ ছিল কি না কে জানে, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি সে বা তারা কতদূর যাবে! আমি কিছুক্ষণ ডানদিকের ফুটপাথ ধরে হাঁটলাম। অনেক দূর গিয়েও যখন ছেলেটার দেখা পেলাম না তখন দিক বদলে বামদিকে হাঁটা শুরু করলাম। দেরি হয়ে যাচ্ছে ভেবে একসময় প্রায় দৌড়াতে শুরু করলাম। দৌড়ে অনেক দূর যাবার পরে মনে হলো নিশ্চয় ছেলেটা রাস্তা পার হয়ে উলটোদিকে চলে গেছে। হুম, এ কারণেই তাকে আমি ডানে-বামে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না! প্রায় দৌড়ে রাস্তা পার হলাম। উলটোদিকে পৌঁছে ডানে-বামে দেখতে লাগলাম। এক চা-সিগারেটের দোকানদারকে বসে থাকতে দেখে জানতে চাইলাম, ‘একটা বারো-তেরো বছর বয়সি ছেলেকে এদিক দিয়ে যেতে দেখেছেন নাকি?’ সে ঠোঁট উলটে বলল, ‘কত্ত আসে কত্ত যায়। অরা আমার কাস্টমার না। অদের দিকে তাকাই না আমি। তয় অদের মইদ্যে কেউ কেউ বিড়ি কিনতে কখনো-সখনো...’

‘না না বিড়ি কিনবে কেন? ও ভালো ছেলে,’ দোকানদারকে থামিয়ে দিয়ে বললাম আমি। সে ছোট্ট করে ‘অ’ বলে চুনের বাটি থেকে শুকনো চুন নখ দিয়ে খুঁটিয়ে উপড়াতে লাগল। আমার মেজাজ খারাপ হলো। আমি ছেলেটার বয়সে জীবনেও বিড়িতে একটা টান দিয়ে দেখিনি। আর দোকানদারটা বলে কী! আমি নিশ্চিত জানি, বারো বছরের যে আমাকে খুঁজছি সে-ও কোনোদিন বিড়ির ধারেকাছে যায়নি। কিন্তু আস্ত ছেলেটা উবে গেল কোথায়!

যা হোক, আমি অনেক বড় হয়ে সিগারেট খাওয়া ধরেছি। ওই ছোট ছেলেটাও বড় হয়ে তা করতে পারে। তার কথা ভাবতে ভাবতে আমি দোকানদারের কাছে একটা সিগারেট চেয়ে নিলাম। দোকানটার পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম। ফুঁ দিয়ে ধোঁয়া বের করতে করতে আশেপাশের প্রত্যেকের মুখে ওই ছেলেটার মুখ খুঁজতে লাগলাম। হাতের খাতাটার দিকে হঠাৎ চোখ গেল; বাসের পিছনের সিটে বসা চুরি করে খাতার দিকে তাকিয়ে থাকা লোকটা তখন ওই কথাটা কেন বলল? বলল যে খাতায় নাকি কিছুই লেখা নেই? আশ্চর্য, লোকটা পাগল নাকি চোখে কম দেখে! অন্যমনষ্কভাবে আমি খাতা খুললাম।

‘কপাল খারাপ না হলে কেউ হাতের কাছে কৈশোরকে ফেরত পেতে পেতে হারিয়ে ফেলে! আমার বারো বছরের আমিকে স্পষ্ট দেখতে পাই অথচ তার পেছনে ধাওয়া করতেই হাওয়া। এরকম ঘিঞ্জি একটা শহরের ব্যস্ত রাস্তা ধরে সে কোন অলিগলির মধ্যে ঘাপটি দেয় কে জানে। তবে আমিও ছাড়ার পাত্র নয়। রাস্তার উলটোদিকের একটা দোকানে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছি। সিগারেট শেষ হলেই খোঁজাখুঁজি শুরু করব। রাস্তার এদিকের আর ওদিকের সমস্ত অলিগলি তন্নতন্ন কওে খুঁজব। একটা বারো বছর বয়সি ছেলে বাস থেকে নামলে নিশ্চয় বাড়ি থেকে বহু দূরে নামবে না। আমার বিশ্বাস তার বাড়ি এখানেই, আশেপাশে। অলিগলি ঘুরে  শ’ পাঁচেক বাড়ি খুঁজে ফেলা কী এমন একটা কঠিন কাজ! আমি তাকে হারাতে পারি না। তাকে আমার অনেক কথা বলতে হবে, অনেক কথা... আর একবারের জন্য হলেও তাকে আমার পেতে হবে। সিগারেট শেষ হয়ে এসেছে, এবারে খোঁজার পালা।’

বিস্ময়ের ঘোরে খাতার পাতায় আটকে ছিলাম। হঠাৎ দেখি আঙুল পুড়ছে। সিগারেটের তামাক পোড়া শেষ হলে ফিল্টার পুড়ে আমার আঙুলে ছ্যাকা দিতেই ‘উহ্’ বলে আধাপোড়া ফিল্টারটা দূরে ছুঁড়ে দিলাম। অন্য হাত দিয়ে আঙুল চেপে যেই সামনে তাকিয়েছি দেখি বারো বছরের আমি রাস্তা পার হচ্ছে। আমার থেকে বেশ দূরে অবশ্য। কিন্তু স্পষ্ট দেখতে পেলাম সে রাস্তার মাঝামাঝি পৌঁছে গেছে। আর ঠিক তখনই সিগনাল পড়ে যাওয়ায় তার বামদিক থেকে বাঘের মতো গর্জনে এক গাদা বাস আর গাড়ি ছুটে আসছে। সে রাস্তার অর্ধেক পর্যন্ত পৌঁছে বিভ্রান্ত হয়ে গেছে, ফিরে আসবে নাকি আরেকদিকে পৌঁছানোর জন্য দৌড় লাগাবে। মনে হলো এক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে সে আরেক দিকে যাওয়াকেই সহজ মনে করল। ফিরে এলে সে আমার দিকে আসত আর আমি তাকে দৌড়ে গিয়ে ধরে ফেলতে পারতাম। তবে তাতে তার গাড়ির নিচে পড়ার আশঙ্কা থেকে যেত। উলটোদিকে যাওয়াতে সে বেঁচে গেল। ভালোমতো ওদিকের ফুটপাথে পৌঁছতে পেরেছে দেখে আমার জানে পানি এলো। এবারে কোনোরকমে দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরে ফেললেই হলো। কিন্তু কী করে যাব, রাস্তায় তখন দ্রুতগামী বাস আর গাড়ির ঢল। কোথা থেকে তারা ছাড়া পেয়ে এত জোরে ছুটছিল কে জানে, তবে তাদের যেন কোনো শেষ নেই। চোখের সামনে দিয়ে গাড়িগুলো ছুটে চলার ফাঁকে ফাঁকে আমার বারো বছর বয়সি আমিকে বিভিন্ন ভঙ্গিতে দেখতে পাচ্ছিলাম। প্রতিটা গাড়ি চোখ থেকে তাকে আড়াল করছিল কিন্তু গাড়ি যেতেই যা দেখতে চাই তা খুঁজে নিতে আমার অসুবিধা হয়নি। যেন কোনো সিনেমা হলে বসে পর্দার দিকে তাকিয়ে আছি আর পর্দার সামনে হাঁটাচলা করছে অসংখ্য মানুষ। কয়েক মুহূর্তের ছবি অদেখা থেকে যাচ্ছে। আগের সঙ্গে অদেখা মুহূর্তের পরের দৃশ্যমান মুহূর্ত জোড়া দিয়ে দিয়ে পুরোটা কল্পনা করে নিতে হচ্ছে। কয়েকবার ফুটপাথ থেকে রাস্তায় পা রাখলাম, তাকে ধরতে হলে আমাকেও রাস্তা পার হতে হবে। অথচ যেই পা রাখি ওমনি বড় একটা বাস বা কাভার্ড ভ্যান রাস্তার ধার ঘেঁষে এগিয়ে আসে। পা গুটিয়ে আবারো ফুটপাথে উঠে যাই। চোখের সামনে থেকে গাড়ি সরে গেলেই দেখতে পাই, বারো বছরের আমি একটা দোকানে ঢুকলাম, তারপর কিছু গাড়ি সরে গেলে দেখি হাতে চিপ্সের প্যাকেট নিয়ে দোকান থেকে বের হচ্ছি। আবারো গাড়ির দেয়াল। পরমুহূর্তে প্যাকেট খোলার কসরত। বারো বছরের হাতে ওই প্যাকেট ছেঁড়া অনেক সময় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কিছু গাড়ি আবারো সে কসরত ঢেকে দেয়। কয়েক মুহূর্ত পরে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে মজা করে চিপস খাওয়ার দৃশ্য। আমি দূর থেকে মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলাম। তাকে পেলে প্রথমে আমি কী জানতে চাইব, নাম? তার নাম তো আমি জানিই। আমার নামই তার নাম।

গাড়িগুলোর গতি একসময় কমতে শুরু করল। তারপর ধীরে ধীরে তারা রাস্তার ডান দিকে জমতে লাগল। আমি সেসবের ফাঁক ফোকর দিয়ে রাস্তার উলটোদিকে পৌঁছে গেলাম। রাস্তা পার হতে এত ব্যস্ত ছিলাম যে ছেলেটার দিকে নজর দিতে পারিনি। পৌঁছে দেখি কোথায় সে, যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল তার পাশে একটা চিপসের প্যাকেট পড়ে আছে শুধু। ততক্ষণে চড়া রোদ উঠেছে আর রোদে উগ্র ধরনের হলদেটে প্যাকেট সোনালি দেখাচ্ছে। প্যাকেটটা হাতে তুলে নিলাম। তারপর বোকা বোকা চোখে ডানে-বামে তাকাতে লাগলাম। আশেপাশে কোথাও সে নেই। আমি স্পষ্ট দেখেছি সে ওখানে দাঁড়িয়ে চিপস খাচ্ছিল। কয়েক মিনিট আগের ঘটনা। এরই মধ্যে সে হাওয়া হয়ে যেতে পারে না। তীক্ষè চোখে সবদিকে তাকাতে লাগলাম কিন্তু মানুষ আর গাড়ির ভিড়ে লম্বায় ছোট একটা মানুষকে খুঁজে পাবার তেমন সম্ভাবনা আছে বলে মনে হলো না। চিপসের প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে খানিক আগে দেখা দৃশ্যের কথা ভাবলাম। ছেলেটার গায়ের শার্টটা তো আমার ছেলেবেলার প্রিয় শার্টটাই, এমনকি তার পরনের প্যান্টটাও আমি চিনি। ওটাই আমার বহু পকেটঅলা প্রথম প্যান্ট। বাবা কিনে দিয়েছিল। কোমরের ঠিক নিচে সামনে-পেছনে তো আছেই, এমনকি হাঁটুর উপরে-নিচেও দুদিকে দুটো করে পকেট। তখন শহরে ছিনতাইকারীর দৌরাত্ম নতুন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাবা প্যান্টটা আমার হাতে দিয়ে বলেছিলেন, ‘এরকম প্যান্ট সবার পরা উচিত। কোন পকেটে টাকা আছে তা খুঁজে বের করতে ছিনতাইকারীর এত সময় লাগবে যে আশেপাশের মানুষ ততক্ষণে ব্যাটাকে ধরে ফেলবে।’ আমারো মজা লেগেছিল, এত্তগুলো পকেট! এখন আর দু’ চারটা নুড়ি পাথর, লজ্জাবতী লতার কয়েকটা ডগা, গাছের নিচে পড়ে থাকা বকুল ফুল কিংবা তিন-চারটা স্ক্রু-নাট নিয়ে চলাফেরা করতে অসুবিধা হবে না। একেকটার স্থান নিরাপদে হবে একেক পকেটে। তবে কিছুদিন ব্যবহার করার পরে দেখেছিলাম প্যান্টের অসুবিধাও আছে। কোন পকেটে কী আছে তা নিজেই ভুলে যাই। প্রয়োজনের সময়ে পকেট থেকে তাড়াহুড়ো করে কিছু বের করা যায় না। একের পর এক পকেট হাতিয়ে তখন খুঁজতে খুঁজতে হয়রান লাগে। শেষে এক বুদ্ধি বের করেছিলাম। কোন পকেটে দরকারি কী রাখলাম তার একটা ছোট্ট তালিকা রেখেছিলাম শার্টের বুকপকেটে। পকেটগুলোর নাম লেখা ছিল তাতে, নামও আমার আবিষ্কার, উত্তর-নিন্ম, দক্ষিণ-নিন্ম, উত্তর-হাঁটু, দক্ষিণ-হাঁটু, এরকম দাঁতভাঙা নাম ছিল সেসবের। আমি নিশ্চিত বারো বছরের আমার মতো ওই ছেলেটাকে খুঁজে পেলে তার বুকপকেটেও থাকবে আমার তালিকারই মতো একটা তালিকা। তাতেও একই একই পকেটের নাম থাকবে, কারণ, ওই ছেলেটা আমি।

সে যাই হোক, আশেপাশের কোথাও ছেলেটিকে দেখতে না-পেয়ে আর কড়া হলুদ চিপসের প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হলো, যে দোকান থেকে সে এটা কিনেছে সেখানে গিয়ে জানতে চাই বরং। বুকের কাছে চেপে ধরা খাতাটাও একবার খুলতে ইচ্ছে হলো কেন যেন তখন। দোকানের দিকে এগোতে এগোতে খাতার পাতা উলটালাম...

‘যে দোকানে ছেলেটা চিপস কিনেছিল, মানে, আমি নিজেই চিপস কিনেছিলাম, সেখানে গিয়ে চিপসের প্যাকেটটা দেখিয়ে জানতে চাই, ‘এই যে একটু আগে একটা ছেলে এখান থেকে এই চিপসটা কিনেছিল, তার বাড়িটা কোনদিকে বলতে পারেন?’

‘ক্যান ভাই, কী ব্যাপার?’ দোকানের একজন জানতে চায়।

‘কিছু না, আমি ওকে এই রাস্তায় দেখতে দেখতে হারিয়ে ফেলেছি কিন্তু ওকে আমার দরকার।’

‘দরকার মানে? আপনি কি ওরে চেনেন?’ আরেকজনের কণ্ঠস্বরে অদ্ভুত সন্দেহ মিশে থাকে

‘এই দোকানে প্রায়ই আসে এইটা-সেইটা নেয় আর কী বাড়ি আশেপাশেই হবে নিশ্চয়, ওই যে ওই লন্ড্রির পাশে যে গলিটা দেখতেছেন...’ প্রথমজন বলতে থাকলে সন্দেহপ্রবণ দ্বিতীয়জন তাকে কনুই  দিয়ে ছোট্ট ধাক্কা দেয় কানে কানে বলে, ‘চুপ থাক তুই এরে চিনিস? কিডন্যাপার হইতে পারে।’ তার কথা শুনে প্রথমজনের মুখ রক্তশূন্য হয়ে যায় দ্বিতীয়জন শান্তভাবে বলে, ‘ওরে আপনের কী দরকার বলেন তো?’

‘কিছু না ওকে আমার চেনা চেনা লাগল তো, তাই দেখা করে কথা বলতে চাই,’ আমিও যথেষ্ট শান্তভাবে উত্তর দিই।

‘কবে দেখছিলেন? কোথায়?’ লোকটা সন্দেহের চরমে চলে গেছে কিন্তু কেন যেন মনে হয় সে ছেলেটাকে চেনে তাই আমি ধৈর্য নিয়ে তার উত্তর দিই, ‘ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের বাড়িতে।’

‘মানে? আপনি ওই বাচ্চাটারে আপনের ছোটবেলায় দেখছেন আপনার বাড়িতে? হা হা হা...’ কথা থামিয়ে সে হাসতে থাকে তারপর দোকানের অন্যান্য কর্মচারীর উদ্দেশ্যে বলে, ‘এই ব্যাডা তো আচ্ছা পাগল!’ দোকানের বাকিরা হো হো করে হেসে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে ওভাবে অপমানিত হবার পরে আমার আর ওখানে দাঁড়িয়ে থাকার কথা না তারপরেও আমি শান্তমুখে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকি যে ছেলেটা প্রথমে কথার উত্তর দিয়েছিল তার কাছে জানতে চাই, ‘লন্ড্রির পাশের ওই গলিতে ছেলেটা থাকে, না? কোন বাড়ি, বলবেন একটু?’ আমার প্রশ্ন শুনে পাশের সন্দেহপ্রবণ লোকটা চিৎকার করে ওঠে, ‘ওই, খবরদার! ঠিকানা বলবি না।’ তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আবোলতাবোল কথা কইয়া বাচ্চারে পটাইয়া মানুষ কেমনে কিডন্যাপ করে, সেইটা আমরা বুঝি না মনে করছেন? ভালোয় ভালোয় এইখান থেইকা যান নাইলে...’

লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে কটমট করে নাইলে... বলে সে নিশ্চয় মনে মনে পুলিশ ডাকার কথা ভাবছে সেসব ঝামেলায় এই মুহূর্তে না জড়ানোই ভালো এমনিতেই আমার অনেক দেরি হয়ে গেছে আমি বরং লন্ড্রির পাশের ওই গলিতে ঢুকে কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করি...’

খাতাটা ঠাস করে বন্ধ করলাম। কিন্তু দোকানের দিকে আর পা এগোলো না। পুলিশের ব্যাপারটাও মাথা থেকে গেল না। মানুষ আসলে এখন কথায় কথায় সন্দেহ করে। মানুষ বড় অসহায়। আমার নিজের কৈশোরকে খোঁজার মধ্যে সন্দেহের কী থাকতে পারে আমার মাথায় ঢুকল না। তবে এটা ঠিক, ওই দোকানে ছেলেটার খোঁজ না করে বরং লন্ড্রিটার পাশের গলিতে গিয়ে খোঁজা ভালো। তবে তার প্রিয় হলো ওই দোকানের এই চিপস, এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। আমি দোকানে ঢুকে ওই চিপসটার দিকে তাকিয়ে চারটা প্যাকেট দিতে বললাম। ছেলেটার সঙ্গে দেখা হলে তাকে দেব। সে নিশ্চয় খুশি হবে। ওই বয়সে আমিও এরকম কুড়মুড়ে জিনিস খেতে পছন্দ করতাম। মা বাড়িতে ভেজে দিত। আসলে ওই ছেলেটাই আমি।

দোকানের কর্মচারীদের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম, ছেলেটার কথা জিজ্ঞাসা করলে কোন লোকটা প্রথমে উত্তর দিতে পারে আর কোন লোকটা আমাকে সন্দেহ করতে পারে? মনে মনে তাদের দু’জনকে ঠিক করে নিয়ে ভাবলাম, খাতায় যা লেখা তা সত্যি কী না তার একটা পরীক্ষা হয়ে যাক। চিপসের দাম দিতে গিয়ে জানতে চাইলাম, ‘একটু আগে যে একটা বাচ্চা ছেলে এই চিপসটা কিনে এখান থেকে বেরিয়ে গেল, তার বাড়িটা কোনদিকে বলতে পারেন?’

‘ওই তো, মনে হয় রাস্তার কোণের লন্ড্রির পাশের গলিতে,’ একজন উত্তর দিল। আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘ক্যান বলেন তো? আপনি তারে চিনেন?’

এরপরে কথা কোনদিকে গড়াবে তা আমার জানা। তাই আমি আর কথা বাড়ালাম না। তবে অবাক হলাম এই ভেবে যে যাকে ভেবেছি সন্দেহপ্রবণ সে সহজ-সরল আর যাকে ভেবেছিলাম বোকা সে তীক্ষ্ম চোখ করে সন্দেহ দেখাল। যা হোক, তার সন্দেহ উড়িয়ে দেবার জন্য আমি ভাব দেখালাম যে শুধু চিপস নয়, দরকারি কিছু একটা কিনতেই আমি দোকানে ঢুকেছিলাম। সামনে কতকগুলো পেনসিল থাকাতে সেখান থেকে একটা দিতে বললাম। চিপসের সঙ্গে পেনসিলটাও না-হয় ছেলেটাকে দিয়ে দেয়া যাবে।

দোকানটার পরে কয়েকটা দোকান পেরুলেই লন্ড্রি। লন্ড্রির পাশের সরু গলিতে আমি চিপস হাতে হাঁটতে লাগলাম। ওটুকু সরু গলিতে পাঁচটা ছেলে ক্রিকেট খেলছে। একজন বলে থুথু লাগিয়ে প্যান্টে ঘঁষছে দেখে সেই ফাঁকে আমি ফিল্ডারের কাছে জানতে চাইলাম, ‘এই গলিতে বারো-তেরো বছর বয়সি একটা ছেলে থাকে, তোমরা তাকে চেন? সে এই চিপসটা খেতে পছন্দ করে। তার বাড়ি কোনটা বলো তো?’

‘আমাদের বয়সও তো সেরকমই। আমরাও এই চিপসটা খাই। কিন্তু আপনি কাকে খোঁজেন?’ সে বলল। আমি বুঝতে পারলাম, বয়স আর চিপসের পছন্দ ওরকম একটা ছেলেকে খুঁজে পাওয়ার জন্য যথেষ্ট না। নিজের বোকামিতে নিজেরই হাসি পেল। ভিতরে ভিতরে তাকে খুঁজে পাবার জন্য আরো অস্থির হয়ে উঠলাম। একসময় হতাশায় তাকে বললাম, ‘এই চিপসগুলো তাহলে তোমরা খাও। এই নাও।’

‘আমরা কেন নেব? আমরা তো আপনাকে চিনি না।’

আমার খারাপ লাগল। এক একবার বলতে ইচ্ছে করল, আমাকে তোমরা চেন। আমিই ওই ছেলেটা, যে হয়ত অন্যদিন তোমাদের সঙ্গে এখানেই খেলে কিন্তু আজ কোনো ব্যস্ততায় আসতে পারেনি। বলা হয় না। ওরকম অদ্ভুত কথা শুনলে এরা কী বুঝবে কে জানে। আমি তাদেরকে ছাড়িয়ে চলে গেলাম। এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে বোঝা গেল গলিটা অনেকখানি গিয়ে শেষ হয়ে গেছে। ওরকম একটা অন্ধগলিতে একটা বাচ্চা ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, এটা একটা কথা হলো? বাড়িগুলোর বারান্দার দিকে নজর রেখে আমি গলির এ মাথা ওমাথা কয়েকবার হাঁটলাম। ছেলেদের ক্রিকেট খেলা একসময় শেষ হলো। তারা উইকেট আর ব্যাট হাতে নিজেদের বাড়িতে চলে গেল। আমি হাঁটতে হাঁটতে কোথাও দাঁড়ালাম, আবার হাঁটতে শুরু করলাম। একটা ল্যাম্পপোস্টে হেলান দিয়ে খাতার পাতা উলটালাম। কিন্তু এ কী, যে পর্যন্ত পড়েছিলাম, সেখানেই শেষ। তারপর আর কিছুই লেখা নেই। জিবে আঙুল ভিজিয়ে একে একে আমি খাতাটার শেষ পাতা অব্দি উলটালাম। কোথাও একটা লাইন নেই। খাতায় যার কথা লেখা হচ্ছিল, সেই লোকটা লন্ড্রির পাশের গলিতে ছেলেটাকে সারাজীবন খুঁজতেই থাকবে? তারপর কী হলো আর জানা যাবে না? খাতাটা হাতে ঝুলিয়ে ল্যাম্পপোস্টে হেলান দিয়ে আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। একবার সামান্য খুলে দেখলাম ধীরে ধীরে বিকেলের আলো চলে গিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার নামছে। কত মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে এসে ঢুকল। আমি চোখ বুজে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলাম। অন্ধকার পুরোপুরি নামার পরে হঠাৎ মনে হলো আমার ঠিক সামনে কেউ দাঁড়িয়ে। চোখ খুলে দেখি তিনটা ছেলে। একজন আমার ঘাড়ের উপর দিয়ে হাত লম্বা করে ল্যাম্পপোস্টে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। বলল, ‘এই গলিতে আপনের কামটা কী? দুপুর থেইকা ঘুরঘুর করতেছেন ক্যান?’

‘আমি, আমি মানে, একটা ছেলেকে খুঁজছিলাম।’

‘কোন ছেলে বলেন তো?’ আরেকজন জানতে চাইল।

‘একটা ছেলে, চেক শার্ট আর বহু পকেটওলা প্যান্ট পরা। চেহারা দেখতে আমার মতো।’

‘চেহারা আপনের মতো! তাই নাকি? কে হয় আপনের?’

‘কেউ হয় না। মানে ওটা আমি নিজেই। আমিই ওই ছেলেটা।’

ছেলেরা নিজেরা নিজেদের দিকে একবার তাকিয়ে নিল। তারপর আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিয়ে একজন বলল, ‘এই গলিতে ইদানিং সাইকেল থেইকা শুরু কইরা বারান্দায় মেইলা রাখা শাড়ি-লুঙ্গি পর্যন্ত চুরি হইতাছে ক্যান বুজতে পারতেছিস?’ আরেকজন জবাব দিল, ‘জ্বি ভাই, তা আর বলতে! চোর ভদ্রবেশী।’

‘দেখেন, আপনারা ভুল করছেন। আমি আসলে নেহায়েত ছোট একটা ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে... আমি চোর হতে যাব কেন? আমার নাম...’

‘ওই, তোরে আমরা চোর কইছি নাকি নাম জিগাইছি?’

‘ঠিক ভাই, চোরের আবার নাম কী?’

‘এরকম বললে ভা-ভালো হবে না বলে দিচ্ছি,’ আমি তোতলাতে তোতলাতে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। দুজনের পিছন থেকে তৃতীয়জন আমার শার্টের কলার চেপে ধরল, ‘ওই মিয়া, চোর বললে কী করবা? তুমি মিয়া চুরির ধান্দায় সারাদিন খাড়াইয়া থাকবা আর আমরা সেইটা বলতেও পারব না?’

‘ওই দড়ি নিয়া আয়, এরে পিলারের সঙ্গে বান্দি আগে,’ আমার হাত ধরে বলল আরেকজন। আমি তখন হাতের খাতাটা দেখিয়ে বললাম, ‘এই দেখেন, খাতাটা খুলে দেখেন কী লেখা, তাহলেই বুঝবেন।’

একজন সামান্য কৌতূহলী হয়ে খাতার পাতা উলটাল। দুই দুবার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উলটিয়ে বলল, কিছুই তো লেখা নাই। সাদা একটা খাতা দেখাইয়া কী বুঝাইবার চাও, মিয়া? ফাজলামি নাকি?’

শেষে চতুর্থজন বলল, ‘এরে তো চোর লাগে না, পাগল লাগে। ছাইড়া দে মনে হয়।’

‘হুম, পাগলই। দে ছাইড়া।’

ছেলেটার কথায় ছাড়া পেয়ে আমি আমার শার্টের কলার ঠিক করে নিলাম। তারপর খাতার পাতা উলটালাম। বলে কী এরা, খাতায় কিছু লেখা নেই মানে? উলটে দেখলাম যা যা পড়েছি তা-ই লেখা। পরিষ্কার নীল কালি, আমারই হাতের লেখা। অথচ ওরা ওরকম বলল কেন আমার মাথায় ঢুকল না। যা হোক, আমার কলার ছেড়ে দিয়ে তারা খানিক দূরে দাঁড়িয়ে আমাকে লক্ষ্য করছিল। তাদেরকে অগ্রাহ্য করে আমি বুকপকেট থেকে পেনসিলটা হাতে নিয়ে প্রথম পাতায় নামের ফাঁকা জায়গাটায় সুন্দর করে নিজের নাম লিখলাম। এটা তো আমারই খাতা, সুতরাং নামের জায়গায় নিজের নাম লিখতেই পারি। তারপর খাতার পাতায় যেখানে শেষ লাইনটা পড়েছিলাম সেই পাতাটা বের করলাম। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম তারপরে আরো লেখা। আগে তার পর থেকে সাদা পাতা মনে হয়েছিল কেন বুঝলাম না। শুধু মনে হয়েছিল, তা নয়। পরিষ্কার মনে আছে আমি একে একে সমস্ত পাতা উলটে দেখেছিলাম, কিছুই লেখা ছিল না। কিন্তু এরই মধ্যে তাতে লেখা হলো কী করে! যাহোক, ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে পড়তে শুরু করলাম...

‘প্রথমে ভেবেছিলাম ছেলেগুলোকে পেয়ে ভালোই হলো এরাই আমাকে ওই বাড়িটা খুঁজে দেবে যেখানে কৈশোরের আমি আছি কিন্তু পরে বুঝলাম এরা অন্য কারণে ধরেছে আমাকে তবে ভালো বাঁচা বেঁচে গেছি পাগল হবার সুবিধা আছে মানুষের মায়া পাওয়া যায় এমনিতে এই বয়সের তরুণ ছেলেরা খুব নিষ্ঠুর হয় বিনা কারণে কিংবা কেবল সন্দেহের কারণে এই ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে মারতে মারতে আমাকে মেরে ফেলা কিংবা অন্তত আধামরা করে ফেলা এরকম বয়সের ছেলেদের জন্য অসম্ভব ব্যাপার না এদের হাত সবসময় কাউকে মারার জন্য নিশপিশ করে মনের মধ্যে অদ্ভুত জিঘাংসা নিয়ে শহরময় ঘুরে বেড়ায় এরা এই গলিতে সাইকেল চুরি যাচ্ছে না কাপড় চুরি যাচ্ছে তাতে আমার কী! আমি এসেছিলাম আমার কৈশোরকে দেখতে একবার, একটাবার যদি তাকে ধরতে পারতাম, তাকে মন ভরে দেখতে পারতাম! মাত্র একবার তার ভিতর দিয়ে আমি আমার কৈশোরটা ঘুরে আসতে পারতাম! কেবলমাত্র একবার তাকে আমার জীবনে করা সমস্ত ভুলের কথা বলে যেতাম, সে যেন সেই ভুলগুলো আর না করে সে বিষয়ে সতর্ক করে যেতাম শুধরানো একটা জীবন পেতে কার না ইচ্ছে করে সময় চলে গেলে কেউ শুধরানোর সুযোগ পায় না অথচ সে পাচ্ছে, যার মানে কিনা আমিই পাচ্ছি সে সুযোগ!                                                       

আমি জানি ছেলেটার বাড়িটা ইটের মানে, বাড়ি ইটেরই তবে তাতে কোনো প্লাস্টার থাকবে না এখন ফ্যাশন করে মানুষ ওরকম বাড়ি বানায় প্লাস্টার না করে দেয়াল তোলার ইটের গাঁথুনি বের করে রাখে আমার ছোটবেলার বাড়ি ইটের ছিল বটে তবে নকশার কারণে নয় দেয়াল তুলতে তুলতে আর ছাদ বানাতে বানাতে বাবার টাকা ফুরিয়ে গিয়েছিল তাই বাড়িটাতে আর কখনো প্লাস্টার করা হয়নি বাইরে থেকে দেখা যেত কেবল ইট আর ইট বছরের পর বছর দেয়াল বেয়ে বৃষ্টি পড়ে পড়ে একসময় সেই ইটের দেয়ালে কার্পেটের মতো শ্যাওলা পড়েছিল ওইরকম বারো বছর বয়সে আমি দেয়ালের নরম কার্পেটে হাত বোলাতাম ঠান্ডা ঠান্ডা নরম নরম ছোঁয়াটা চাইলে আমার হাতের তালুতে এখনো অনুভব করি আমি জানি এই ছেলেটার বাড়িটাও ইটেরই হবে, তাতে শ্যাওলাও থাকতে পারে গলির শেষ মাথা পর্যন্ত একে একে প্রত্যেকটা বাড়ি ভালোমতো দেখা উচিত তার মধ্যে নিশ্চয় আমি ইটের দেয়াল আর পাঁচিলওলা কোনো বাড়ি পেয়ে যাব।’

খাতা বন্ধ করে মনে হলো, ঠিকই তো, আমাদের বাড়িটা যে প্লাস্টারবিহীন ইটের তৈরি ছিল তা তো আমার একবারও মনে পড়েনি! ওরকম একটা বাড়ি খুঁজে পেলেই তো হয়ে যায়। ছেলেটা যেহেতু আমি তাই তার আমার বাড়ির মতোই একটা বাড়ি থাকবে। হয়ত বাড়িতে আমার মায়ের মতো একজন মা, আমার বাবার মতো একজন বাবা আর ছোট ভাইয়ের মতো একটা ভাইও থাকতে পারে। ভাবতেই আমার সারা শরীর কেঁপে উঠল। ভয় আর আনন্দের কম্পন একইরকমের হয়। কোনো ধাক্কা ছাড়াই পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঝাঁকি খেলাম। যে ভাই মাত্র দশ বছর বয়সে পানিতে ডুবে মরে গিয়েছিল তাকে আমি আবার দেখতে পাব! যে বাবা-মা সেই কবে মরে গেছে তাদের দেখতে পাব! উত্তেজনা আর ধরে রাখতে পারছিলাম না। ছেলেটাকে আমার খুঁজে বের করতেই হবে।

খাতা হাতে উঠে দাঁড়ালাম। গলির শেষ মাথায় চলে গেলাম। অন্ধকারে ভালো দেখা না গেলেও হাল ছাড়লাম না। তিনতলা থেকে ছয়তলা বাড়িগুলোর নিচ থেকে উপরের দিকে ঘাড় ঝুঁকিয়ে দেখতে দেখতে ঘাড়ের পেছনে ব্যথা হয়ে গেল। কোথাও দুই বাড়ির মাঝখানে লুকোনো রাস্তার মতো কিছু দেখতে পেয়ে সেখানটাতেও নজর দিলাম। হঠাৎ দুটো বাড়ির মাঝখানে, পেছনের দিকে একখানে প্লাস্টার না করা দুটো ঘর দেখতে পেলাম। বামদিকের বাড়ির গেটে গিয়ে ধীরে ধীরে ধাক্কা দিলাম। কেউ সাড়া না দিলে ধাক্কার জোর বাড়িয়ে দিলাম। শেষে লুঙ্গি পরা খালি গায়ের এক লোক এসে বলল ‘কারে চান? এখন আমার ডিউটি না, আমি গেট খুলতে পারব না। যার ডিউটি সে বাইরে গেছে।’

‘আচ্ছা, গেট খুলতে হবে না। ভাই, ওই যে পেছনের দিকে দুটো ঘর, ওখানে কি ছোট কোনো ছেলে থাকে? এই ধরেন বারো-তেরো বছর বয়সের?’

‘ওই ঘরে তো আমরা দুই দারোয়ান আর দুই ডেরাইভার থাকি’, লোকটা জবাব দিল।

তার কথা শুনে মনে হলো, আচ্ছা, আমার কৈশোর যেমন বাড়িতে কেটেছে, এই ছেলেটার কৈশোরও কি তেমনই বাড়িতে কাটতে হবে? সামনের এই সাদা ধবধবে অ্যাপার্টমেন্টগুলোতেও তো সে থাকতে পারে। তাই প্রশ্ন বদলে লোকটাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এই বাড়িতে কোনো তলায় কি বারো-তেরো বছর বয়সের কোনো ছেলে আছে? এই ধরেন চেহারা দেখতে ঠিক আমার মতো? মানে, এখনকার আমার মতো নয়, আমার ছোটবেলার মতো ‘

‘ভাই, আপনে কী বলতেছেন তার কিছুই আমি বুঝতে পারতেছি না। মানে ছেলেটার চেহারা... সেইটা বাদ দেন, আপনে এই বাড়িতে কার কাছে আসছেন?’

‘কারো কাছে না। বারো-তেরো বছর বয়সের কোনো ছেলে কি আছে এই বিল্ডিংয়ে?’

‘এক্কেরে ছোট পোলাপান আছে তিনটা। আর বড় আছে দুইটা, ইনভার্সিটিত পড়ে। আপনে যেমন বলতেছেন সেইরকম তো নাই।’

তার কথা অবিশ্বাস্য শোনালেও আমার আর কিছু বলার থাকল না। বুঝলাম, অন্য বাড়িতে খোঁজ করতে হবে। তারপর কত রাত পর্যন্ত কে জানে আমি ওই গলির বাড়িতে বাড়িতে খোঁজ করলাম। ছেলেটা আমার মতো দেখতে, এই কথাটা বললেই কেন যেন মানুষ আমার কথা শোনার ধৈর্য হারিয়ে ফেলে। কেউ কেউ অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকায়। তারা আসলে আমার অবস্থাটা বুঝতে চায় না। আমি একজনকে কিংবা আমার কৈশোরকে ধাওয়া করছিলাম। প্রতিমুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি পেয়ে গেলাম, এই পেলাম!

পাইনি দেখে বেশি হতাশ লাগলে হাতে ঝোলানো খাতা খুললাম। যেখানে সাদা পাতা ছিল, প্রতিবার দেখলাম সেখানে নতুন লাইন লেখা হয়েছে। আমার সমস্যার সমাধান। যেমন ওই গলি পইপই করে খোঁজা শেষ হলে খাতা খুললাম, দেখলাম লেখা: ‘এটাই লন্ড্রির পাশে একমাত্র গলি না- হতে পারে আশেপাশে আরো অনেক গলি আছে।’

আশেপাশের প্রত্যেকটা গলি আমি একেকদিন তন্নতন্ন করে খুঁজলাম। তারপর একদিন দেখি খাতার আরেক সাদা পাতার মাঝ বরাবর লেখা: ‘এই এলাকায় এটাই তো একমাত্র লন্ড্রি নয়, আশেপাশে আরো বেশ কয়েকটা লন্ড্রি আছে সেই লন্ড্রিগুলো সাধারণত কোনো না কোনো গলির মুখে সেই গলি আরেক গলিতে গিয়ে মিশেছে তারপর সেই গলি আরেক গলিতে, তারপর সেই গলি...’                           

আমি খুঁজতে লাগলাম। দিনের পর দিন কেটে গেল। কতদিন জানি না। খোঁচা খোঁচা পেকে যাওয়া দাঁড়ি একসময় বাড়তে লাগল। বাড়তে বাড়তে বুকের কাছে চলে এলো। আমার কাপড়-চোপর মলিন আর ময়লা হয়ে গেল। খাওয়া-ঘুমের কোনো ঠিকঠিকানা থাকল না। প্রথমের সেই অন্ধগলি ছাড়িয়ে দিনের পর দিন কত অলিগলিতে যে আমি ঘুরে বেড়ালাম! হাতের খাতাটাও ধীরে ধীরে জীর্ণ হতে লাগল। অথচ যখনই মনে হয়েছে আমি যেন কোনো অন্ধগলিতে ঠেকে গেছি তখনই খাতায় নতুন লাইন, নতুন প্যারা লেখা হয়েছে। সেইমতো আমিও খোঁজাখুজি থামাতে পারিনি। নিজের মনে অনেক সময় মনে হয়েছে, আমি কি আসলেই পাগল হয়ে গেলাম?

শেষে একদিন মনে হলো আমার জীবন আর বেশিদিন নেই। কিন্তু এই খাতা, যাকে আমি যক্ষের ধনের মতো বুকের কাছে আগলে রাখি, ওটা আমার সঙ্গে থাকলে আমি অচিরেই মরে যাব। আমার কৈশোর আমারই যৌবন আর পরিণত বয়স কেড়ে নিচ্ছে যা আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখছি। খাতাটার উপরে ভারি রাগ হলো তখন। মনে হলো ছুঁড়ে ফেলে দিই। কিন্তু কেন যেন বুকের কাছে রাখতে রাখতে ওটার উপরে বড় মায়া পড়ে গেছে। নষ্ট করতে পারলাম না। মনে হলো, আমি পাইনি কিন্তু এটার সাহায্যে কেউ তো তার কৈশোর ফিরে পেতেও পারে। ছয় নম্বর বাসে যে মানুষটা খাতা ফেলে গিয়েছিল, সে কি পেয়েছিল তার কৈশোর? এই প্রশ্নের উত্তর আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তবে এটা ঠিক যে প্রত্যেকের আমার মতো ব্যর্থ হওয়া জরুরি নয়। অন্য কেউ সফল হতেও পারে। যেই ভাবা সেই কাজ। রাস্তার ধারের স্টেশনারি দোকান থেকে একটা ইরেজার কিনলাম। যত্ন করে খাতার নামের জায়গায় আমার নামটা ইরেজার দিয়ে ঘঁষে ঘঁষে মুছলাম। নামের জায়গাটা আবারো আগের মতো ফাঁকা হয়ে গেল। তারপর একটা ছয় নম্বর বাসে উঠে সবচেয়ে পেছনের সিটে গিয়ে বসলাম। এক সুযোগে খাতাটাকে সিটের উপরে রেখে বাস থেকে নেমে পড়লাম। নেমে মনে হলো আমার পরে খাতাটা কে পায় দেখলে ভালো হতো। আমি বাসের অন্য সিটে বসে তা দেখতে পারতাম। কিন্তু পরমুহূর্তে মনে হলো নাইবা দেখলাম। যার ভুল তারই ভুল। যার ভাগ্য বা দুর্ভাগ্য, একান্ত তার।


ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন