ঢাকা     শনিবার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ৪ ১৪২৭ ||  ৩০ মহরম ১৪৪২

লেখক-পাঠকের প্রত্যাশা, প্রকাশকের প্রস্তুতি

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৬:৩৩, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
লেখক-পাঠকের প্রত্যাশা, প্রকাশকের প্রস্তুতি

শীতের শেষে কিংবা বসন্তের পূর্বরাগে বাতাসে যেমন আমের বোলের মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যায়, ঠিক তেমনি এরই মধ্যে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ‌্যানে ছড়িয়ে পড়েছে শত শত গ্রন্থ ফুল। ফেব্রুয়ারির ২ তারিখ থেকে শুরু হয়েছে আমাদের বহুল প্রত‌্যাশিত একুশে গ্রন্থমেলা।

বইমেলা ঘিরে লেখক এবং প্রকাশকের বড় প্রস্তুতি থাকে। কিন্তু প্রতিবারই দেখা যায়, লেখক ও পাঠকের প্রত্যাশা আর প্রকাশকের কাজের মাঝে বিস্তর ফারাক থেকে যায়। আসুন তাহলে দেখা যাক, আমাদের এই প্রাণের বইমেলাকে ঘিরে তিনপক্ষের রশি টানাটানি আসলে ঠিক কোথায়?

শুরুতেই বরং পাঠকের মুখ থেকে শুনি। কারণ আমাদের সকল আয়োজন বস্তুত পাঠককে ঘিরে। পাঠক যদি মেলায় না আসেন, বা মেলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে লেখক বা প্রকাশকের সকল আয়োজন ব্যর্থ হতে বাধ্য। আমরা প্রায়শ বলে থাকি, ফেসবুক-অনলাইনের যুগে একশ্রেণির পাঠক আর বইমুখো হতে চায় না। বিশেষ করে যারা বয়সে তুলনামূলক তরুণ, পাঠ্যবইয়ের বাইরে তাদের সৃষ্টিশীল ধারার বইয়ের প্রতি আকর্ষণ বড্ড কম। এই কথা পুরোপুরি মিথ্যে নয়, বরং সত্যতা আছে। আমি লেখক হিসেবে বলতে চাই, পাঠকের দোষ খোঁজার আগে আমাদের নিজেদেরও খানিকটা আত্মজিজ্ঞাসা বা আত্মসমালোচনা থাকা সমীচীন।

পাঠক আসলে কী জানতে বা পড়তে চান? কেন তারা বইমেলা আসবেন? ধরা যাক, এখনকার যুগে বই একটি পণ্য বা প্রডাক্ট। যে যত কথাই বলি না কেন, বর্তমান সময়ে শুধু বই লিখলেই চলে না, সেই বইয়ের বিষয়ে আগাম আগমনীবার্তা দিতে হয়। নইলে পাঠক মেলায় আসবেন কোন ভরসায়! পাঠক চিরকালই খেয়ালি। বাঙালি পাঠক বই পড়তে অনিচ্ছুক বটে। এসকল কথা আমি নই, শ্রদ্ধেয় সৈয়দ মুজতবা আলী বলে গেছেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সেই পাঠবিমুখ পাঠককে কিছুতেই বইমুখো করা যাবে না। সেক্ষেত্রে প্রথমেই আমাদের যা করণীয় তা হলো কিছু মানসম্পন্ন ভালো বই তাদের উপহার দেয়া। লেখার মান যেমন বিবেচ্য, ঠিক তেমনি সেসব বই ছাপা ও বাঁধাই হয়ে মেলায় আসা পর্যন্ত বিশেষ যত্ন ও নজরদারি থাকা প্রয়োজন।

গত বইমেলায় কিছু কিছু বইয়ের নাম দেখে আমি নিজেও ভিরমি খেয়েছি, আঁতকে উঠেছি ভয়ে। কী সব খেতে খেতে নাকি গুলি করে দেবে! ভাবতে পারেন, কেমন সন্ত্রাসী চিন্তাভাবনা ভর করেছে আমাদের লেখকদের মগজে! আমি মানছি যে, বইয়ের নাম রাখার ব্যাপারে লেখকের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে, এবং তা থাকাই উচিত। কিন্তু তাই বলে একজন লেখকের কিছুমাত্র বিবেচনাবোধ থাকবে না! একথা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, বাংলাসাহিত্যে যেসকল লেখকের বই কালোত্তীর্ণ হয়েছে, পাঠকসমাজে বিশেষ সমাদৃত হয়েছে, তাদের কেউই অন্তত কিছু ‘খেতে খেতে গুলি করার’ মতো মনোবৈকল্যে ভোগেননি।

বলা বাহুল্য, আমাদের পাঠকরা এতই স্পর্শকাতর যে, আবহাওয়া একটুখানি টসকালেই তাদের মনও বদলে যায়। তারা বইমেলার পথ ছেড়ে শপিংমলের পথ ধরেন। যেন তারা বইমেলা গিয়ে জাতিকে রীতিমতো উদ্ধার করছেন। বইয়ের প্রতি এমন উদাসীন ও পরাম্মুখ জাতি আর হয় না। যদিও বা গেলেন, মেলার মাঠে তাদের অনেকেই অকারণ ঘুর ঘুর করেন, চা-ফুচকা, কফি-লুচি খান, আর পছন্দের নারী বা পুরুষের সঙ্গে কিঞ্চিত খোশগল্প করে বাসার পথ ধরেন। যদিও বা কোনো বই একটু মনে ধরে, দাম বেশির অজুহাতে তা না নিয়েই শেষমেশ অম্লান বদনে বেরিয়ে আসেন। আমি এমনও দেখেছি যে, গিয়েছেন বইমেলায়, অথচ জমিয়ে আড্ডা মারছেন আর বউ পছন্দ করছেন কেউ কেউ। রীতিমতো কনে দেখার মতো মজলিশ বসিয়ে বসে আছেন আর কি! আবার একশ্রেণির মানুষ মেলায় যান স্রেফ নিজের চোপাখানা মিডিয়ায় প্রদর্শন করবার মানসে। এরা উঠতি বা পড়তি সেলিব্রিটি। স্টুডিওতে ডাক পান না, তাই মেলার মাঠকে বেছে নিয়েছেন নিজের টিআরপি বাড়াবার জন্য। এরা উটের মতোন নাক উঁচু করে হন্যে হয়ে খোঁজেন, আর ক্যামেরা-বুম দেখলেই ছুটে গিয়ে তাকে পাকড়ান।

বইমেলায় গেলেই এদের ট্যাঁকে টাকা থাকে না, বন্ধুর মেয়ের বিয়ের উপঢৌকন কেনার কথা মনে পড়ে, কিংবা একফাঁকে অনলাইন শপে ঢুঁ মেরে শাড়ি-কাপড়ের দামদরও জেনে নেন। ফলে বই আর কেনা হয় না বরং এই মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, এবার হয়নি তো কী হয়েছে, আসছে মেলায় তিনি ঠিকই একখানা বই কিনবেন। কিছু সৌখিন পাঠক রয়েছেন, যারা কিনা বইয়ের মোটিফ বা উপজীব্য এবং গল্পের চেয়ে প্রডাকশনের দিকে নজর বেশি দিয়ে থাকেন। তারা বসে বসে লেখক ও প্রকাশকের নিন্দেমন্দ করেন, আগেকার লেখকরা কত উঁচু মাপের ছিলেন সেইসব বিষয়ে বিস্তর গপ্পো ফাঁদেন এবং মহা জ্ঞানীর ভাব ধরে মেলা থেকে নিষ্ক্রান্ত হন। বস্তুত, এরা জাতে নিন্দুক, জীবনেও ক্লাসের বইয়ের বাইরে কোনো সৃজনশীল বই টাচ্ করেননি, এরা অতিশয় পণ্ডিম্মন্য ও কূপমণ্ডূক

শ্রেণির মানুষ। কিছু পাঠক আছেন যারা বই পড়তে ভালোবাসেন, কিন্তু গাঁটের টাকা খরচ করবেন না। ফাউ পেলে তারা বিস্তর খুশি হন, এবং উঠতি লেখকের পিছু পিছু ঘোরেন, যাতে একখানা বই অন্তত সৌজন্য হিসেবে মুফতে পাওয়া যায়।

এবার আসুন লেখকের কথা কিছু বলি। আমি নিজে লেখক, তাই কতোটা কী ‘সমান আলোচনা’ করতে পারবো কে জানে! প্রতিবার একুশে বইমেলায় প্রায় হাজার পাঁচেক বই প্রকাশিত হয়। চলতি বাংলায় যাকে বলে বই ছাপা। কেসটা অনেকটা তা-ই। বই আর এখন প্রকাশ হয় না, ছাপা হয়। ফলে এখন প্রকাশক না হলেও চলে, বরং ছাপাখানার মেশিনম্যান হলেই কেসটা বেশ চুকে যায়। সাগরময় ঘোষের মতো প্রাজ্ঞ প্রকাশক এখন আর কই পাবেন বলুন! যিনি কি না নিজ উদ্যোগে লেখক তৈরিও করতেন।

সে যাক, ওপারের কথা বলে মিছে আর কী হবে! বই তো এখান স্রেফ পণ্য। প্রকাশক সেই সকল বই প্রকাশে আগ্রহী হন, যার কাটতি ভালো। মানে ভালো বেচাবিক্রি হবে। বইয়ের মান নিয়ে তাদের তত কৌতূহল নেই, তারা আলুপটলের মতোই বইয়ের ব্যবসা করেন। এবং এও বলেন, আমরা যারা লেখক তারাই নাকি বই বেচার দায়িত্ব নিজ স্কন্ধে নিয়ে নেব, প্রয়োজনে পয়সা খরচ করে বইয়ের প্রচার-বিজ্ঞাপন করবো। তিনি বসে বসে বই বেচবেন আর পয়সা কামাবেন। বলতে নেই, এই শেণির প্রকাশকের সংখ্যাই এখন বেশি। এদের প্রাদুর্ভাবে বাজার সয়লাব এখন।

কেউ কেউ বলেন বইমেলা নাকি এখন একটা বিশেষ চক্রের হাতে চলে গেছে। এই চক্র যেভাবে চান, সেভাবেই সবকিছু হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলা একাডেমিও এদের আয়ত্বের বাইরে নয়। ফলে বিপাকে পড়েছে উঠতি লেখকরা, যারা কিনা এখনও তাদের পায়ের নিচে একটু মাটির সংস্থান করে উঠতে পারেনি। হালে দুচারজন লেখক কিঞ্চিত জনপ্রিয়তার ছোঁয়া পেয়েছেন। কিন্তু কীভাবে! এদের নাকি প্রচুর নারীপাঠক। বলাই বাহুল্য, উহারা ব্যাচেলর ও ভাবি-স্ত্রী খুঁজছেন। এটাও নাকি এখন জনপ্রিয় হবার একটা তরিকা বৈকি। অর্থাৎ এলিজিবল ব্যাচেলর। তার মানে আমি বলতে চাই, লেখক এখন নিজেকে নেহাতই  পণ্যপ্রস্তুতকারক হিসেবে উপস্থাপন করছে। সেই সুযোগটাই নিচ্ছেন একশ্রেণির কুশলী প্রকাশক। তারা মুরগি ধরার মতো করে লেখক ধরছেন, আর অর্বাচীন লেখকের টাকায় নিজে মুনাফা কামিয়ে নিচ্ছেন। লেখক এখন নিজেই লেখে, বইয়ের বিজ্ঞাপন দেয়, আবার টেলিফোনে পাঠকের সঙ্গে ইনিয়ে বিনিয়ে নানান কথা বলে বই বিক্রির ধান্ধা করছে। ফলে প্রকাশকের ভূমিকা এখন স্রেফ ছাপাখানার বা মেশিনম্যানের।

এবার আসুন কিছু পজিটিভ কথা বলি। যেভাবেই হোক, বাংলা একাডেমির হিসেবে প্রতিবছর বইমেলায় পঞ্চাশ কোটিরও বেশি টাকার বই বিক্রি হয়। যদি আবহাওয়া ভালো থাকে আর বিশেষ কোনো দৈবদুর্বিপাক না ঘটে, তাহলে এবারেও তারচে কিছু কম বিক্রি হবে না, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। মেলা আবার এবার একদিন বেশি, লিপইয়ার বা অধিবর্ষ বলে কথা। আমি নিশ্চিত করে বলতে চাই, আমাদের দেশে রুচিশীল পাঠক এখনও আছেন, যারা কিনা ভালো বই পেলে পড়তে চান, টাকার দিকে তাকান না। কিন্তু আমরা লেখক এবং প্রকাশকরা যেন তাদের সঙ্গে প্রতারণা না করি। অর্থাৎ বিপুল বিক্রয়ের সম্ভাবনা দেখে মানহীন, বাজে শিরোনামযুক্ত কদর্য পাণ্ডুলিপি বেছে নিয়ে বিশেষ উদ্দেশ্যে কোনো বই না প্রকাশ করি। তাতে পাঠক নিজেকে প্রতারিত বোধ করেন এবং তাবৎ লেখকের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেন। চুন খেয়ে মুখ পুড়িয়ে তখন ভালো মানের বই বা দই দেখেও তারা মুখ ফিরিয়ে নেন। ফলে সাড়ে সর্বনাশ হয় আমাদের প্রতিশ্রুতিশীল লেখক ও তামাম প্রকাশনাশিল্পের। প্রসঙ্গত, পাঠকের রুচি ও মূল্যবোধ সৃষ্টির একটি দায়ও কিন্তু লেখক ও প্রকাশকের থেকে যায়।

আমি লন্ডনে দেখেছি বড় বড় প্রকাশনা সংস্থাগুলো এজেন্সির মাধ্যমে প্রথমে পাণ্ডুলিপি জমা নেন, প্রাথমিক এডিটোরিয়াল বোর্ডে সেসব লেখার চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়, লেখা আদৌ মনোনয়নযোগ্য কিনা বা হলে তাতে কোনো খামতি আছে কিনা সেসব বিচার-বিবেচনা করে তারপর ছাপা বা না-ছাপার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আর আমাদের দেশে হয় তার উল্টো। পারিবারিক পরিচয়, উপরমহলের চাপ বা বিশেষ ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে মানহীন পাণ্ডুলিপিও বই হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে কচি ছাগলের ন্যাদার মতো। তাতে পাঠের উপাদান কিছু নেই, বরং প্রকাশিত বইখানা সমানে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে এন্তার পাঠকের মনোযোগ নষ্ট করছে। তাই লেখক-প্রকাশকের প্রতি আমার বিশেষ অনুরোধ, পাঠকের সমালোচনা না করে বরং কোনো বই লেখা বা ছাপার আগে একবার অন্তত ভাবুন, আপনি এ কাজটি করবার জন্য প্রস্তুত তো! নাকি গোস্ট-রাইটারের মাধ্যমে লিখিয়ে নিয়ে তারপর বন্ধু-প্রকাশকের মাধ্যমে একটি অপাঠ্য পাণ্ডুলিপি ছাপাখানায় পাঠিয়ে অহেতুক পাঠকের রুচি নষ্ট করছেন! মনে রাখতে হবে এদেশ আমাদের, পুস্তকশিল্পও আমাদের। মিছে কেন বালখিল্য আচরণ করে এই সুমহান শিল্পটিকে নষ্ট করছি! বইমেলা ভালো হোক, প্রচুর পাঠক আসুন এবং আপনার পছন্দের মানসম্পন্ন বইটি কিনুন-এই প্রত্যাশা রাখি।


ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়